পাপ বাপকে ছাড়ে না, বাংলাদেশকেও ছাড়ছে না

কথায় বলে, ‘পাপ বাপকেও ছাড়ে না৷’ বহু আগেই অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় এবং বাহবা দিয়ে অবিচারের পথ ধরা বাংলাদেশে এখন বিচারহীনতাই নাকি সংস্কৃতি৷ এই সংস্কৃতির ভিত্তিমূলে আছে এক ‘জাতীয় পাপ৷’ সেই পাপ যেন কিছুতেই ছাড়ছে না৷

বিচারহীনতার সংস্কৃতি৷ বাংলাদেশে অতি চর্চিত এক জোড়া শব্দ৷ কোথায়, কার মুখে শোনা যায় না এই শব্দগুচ্ছ, বলুন তো? বিরোধী দল বলে, সরকারী দল বলে, সাংবাদিক বলেন, বিশ্লেষক বলেন, আইনজীবী বলেন, মুক্তিযোদ্ধা বলেন, এমনকি রাজাকার এবং তাদের দোসররাও বলে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

তবে বিচারহীনতার চেয়ে অনেক বেশি ‘জনপ্রিয়' দায় অস্বীকার এবং দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর সংস্কৃতি৷ তাই বিচারহীনতা নিয়ে কথা হলেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের নেতাদের ইনিয়ে-বিনিয়ে বলতে শুনি, ‘‘আমরা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছি, আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি৷ এভাবে আমরা বরং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি৷ বিচারহীনতা এখন নেই, বিচারহীনতা ছিল বিএনপির আমলে৷'' আবার বিএনপি এবং সমমনারা খুব জোর গলায় বলেন, ‘‘এ সরকারের আমলে আমাদের হাজার হাজার নেতা-কর্মী গুম হয়েছে৷ অসংখ্য নেতা কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে৷''

সরকারবিরোধীদের কথা শুনে মনে হয় যেন হত্যা আর গুম হঠাৎ করে শুরু হয়েছে, তাদের আমলে দেশটি যেন একেবারে বেহেশত ছিল৷ আবার আওয়ামী লীগ নেতারা বোঝাতে চান, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলেই বুঝি ‘সাত খুন মাফ' হয়ে যায়৷ যেন সাগর-রুনির জীবন, তনুর জীবন, ক্রসফায়ারে নিহত মানুষদের জীবন, অসংখ্য ধর্ষিতার জীবন, সংখ্যালঘুদের জীবনের কোনো দাম নেই৷ যেন আজ বেছে বেছে কয়েকটি বিচার করলেই কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা যাবে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে৷

সমাজ

ব্লগার হত্যা

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি টিএসসির সামনে দুর্বৃত্তরা মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করে৷ এরপর একে একে হত্যার শিকার হন ব্লগার নীলাদ্রী নিলয়, অনন্ত বিজয় দাশ, ওয়াশিকুর বাবু, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন৷ এ সব হত্যাকাণ্ডের কোনোটির বিচারে ‘উল্লেখযোগ্য’ অগ্রগতি না হওয়ায় সম্প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান৷

সমাজ

সাংবাদিক দম্পতি হত্যা

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ভাড়া বাসায় সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনিকে হত্যা করা হয়৷ গত চার বছরে এই মামলার তদন্ত থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ হয়ে র‌্যাব-এর হাতে পৌঁছেছে৷ গত মে মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক সময়ে আমরা প্রত্যেক হত্যাকাণ্ড তদন্তের মাধ্যমে তার বিচার করতে পেরেছি৷ সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড অন্য কথা৷ ওটা এখানে না আসাই ভালো৷’’

সমাজ

ধর্ষণের বিচার

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে ৬৬০ জন নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ অথচ কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি৷

সমাজ

ত্বকী হত্যা

নারায়ণগঞ্জ গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তা রফিউর রাব্বির ছেলে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে ২০১৩ সালের ৬ মার্চ হত্যা করা হয়৷ হত্যার দুদিন পর শীতলক্ষ্যার একটি খালে তার লাশ পাওয়া যায়৷ রাষ্ট্রের অনিহা থাকায় এই হত্যাকাণ্ডের বিচার থমকে আছে বলে সম্প্রতি অভিযোগ করেন রফিউর রহমান রাব্বি৷ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাংসদ শামীম ওসমানের পরিবারের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে৷

সমাজ

তনু হত্যা

চলতি বছরের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর মৃতদেহ পাওয়ার পর দেশব্যাপী প্রতিবাদ উঠেছিল৷ দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি উঠেছিল৷ কিন্তু এখনও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি৷ তবে তদন্তকাজ চলছে৷

সমাজ

শিল্প কারখানায় দুর্ঘটনা

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে সাভারের রানা প্লাজা ধসে এগারশ’র বেশি মানুষের প্রাণ যায়৷ এর মধ্যে বেশিরভাগই পোশাক শ্রমিক ছিল৷ তিন বছরেরও বেশি সময় পর গত জুলাইতে এই ঘটনায় করা হত্যা মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়৷ ঢাকার এক অনলাইন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ বছরে উল্লেখ্যযোগ্য শিল্প দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৮টি৷ এর কোনোটিরই বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি৷ প্রতিবেদনটি পড়তে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

সমাজ

চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা

১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর বনানীর ১৭ নম্বর রোডের আবেদীন টাওয়ারে ট্রাম্পস ক্লাবের নীচে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করা হয়৷ ঘটনার দিনই তাঁর ভাই গুলশান থানায় হত্যা মামলা করেছিলেন৷ এই অভিনেতা খুন হওয়ার পর চলচ্চিত্র প্রযোজক ও ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও এখনও মামলার বিচার শুরু করা যায়নি৷ আরও তথ্য জানতে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

সমাজ

সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা

২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে আওয়ামী লীগের জনসভা শেষে ফেরার পথে গ্রেনেড হামলায় মারা যান সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াসহ পাঁচজন৷ এ ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক মামলা – দু’টিই হবিগঞ্জে দায়ের হলেও পরে সিলেটে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়৷

সমাজ

হতাশ রামুর ক্ষতিগ্রস্তরা

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজারের রামু উপজেলায় কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে বৌদ্ধপল্লীতে হামলা চালিয়ে ১২টি বৌদ্ধ মন্দির ও ৩০টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে একদল লোক৷ ঐ ঘটনার চার বছর পরও মামলা গতিশীল না হওয়ায় হাতাশা প্রকাশ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা৷ পিপি মমতাজ আহমদ সম্প্রতি বলেন, এই হামলার ঘটনায় দায়ের করা ১৯টি মামলায় ইতোমধ্যেই অভিযোগ গঠন করা হয়েছে৷ আরও তথ্য জানতে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

সমাজ

নারী নির্যাতনের মামলা ৫,০০৩টি, রায় ৮২০টির

২০১৫ সালে প্রকাশিত মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক জরিপ বলছে, গত নয় বছরে দেশের নয়টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২২,৩৮৬ জন নারী ধর্ষণসহ বিভিন্ন নির্যাতনের ঘটনায় চিকিৎসা নেন৷ এই ঘটনাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়ায় দেখা গেছে এ সব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৫,০০৩টি৷ রায় ঘোষণা হয়েছে ৮২০টি, শাস্তি হয়েছে ১০১ জনের৷ শতকরা হিসাবে রায় ঘোষণার হার ৩.৬৬ এবং সাজা পাওয়ার হার ০.৪৫ শতাংশ৷

কিন্তু আইনের শাসন কোনোদিন কোনো দেশেই হঠাৎ প্রতিষ্ঠিত হয়নি৷ জোড়াতালি দিয়ে বা শর্টকাটে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়৷ কোনো সংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতিও হঠাৎ ‘নাজিল' হয় না৷ চর্চাটা দীর্ঘদিন ধরে অনেকের মাঝে হতে হয়৷

বাংলাদেশে বিচারহীনতা সেই নিয়মেই আজ প্রায় ‘সংস্কৃতি' হয়ে দাঁড়িয়েছে৷এই পর্যায়টা হঠাৎ শুরু হয়নি৷ দেশে বিচারহীনতার আদর্শ পরিবেশ ছিল বলেই ৪৫ বছর পর কোনো সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলে সেই সরকারের প্রশংসা করতে হয়৷ দীর্ঘদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাওয়ারই তো সুযোগ ছিল না৷ হরণ করা হয়েছিল সেই অধিকার৷ তা না হলে তো কবেই বিচার হয়ে যেতো৷

তা কিন্তু হয়নি৷ বরং ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর সংসদে আইন পাশ করে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল, একজন রাষ্ট্রপতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার কোনো বিচার এ দেশে করা যাবে না৷ সভ্য দুনিয়ায় কুকুর-বিড়াল মারলেও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়৷ অথচ ৪১ বছর আগে যারা বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে এক রাতে নারী-শিশুসহ ২৬ জনকে হত্যা করেছিল, যারা জেলখানায় ঢুকে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছিল- বিচার করে শাস্তি দেয়া তো দূরের কথা, তাদের প্রকারান্তরে বরং পুরস্কৃত করা হয়েছিল৷

বাংলাদেশে পঁচাত্তরের পর থেকে যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে কী খেলাটা চলেছে তা-ও তো সবাই জানি৷ বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হলো ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট৷ জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী এবং আবু হেনা মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে কারাবন্দি করে কারাগারে ঢুকেই হত্যা করা হলো সে বছরের ৩ নভেম্বর৷ তারপর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে দুটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথই রুদ্ধ করা হলো৷ ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রমও বন্ধ করে দেয়া হলো৷ এসবের মানেটা কী দাঁড়ায়, যুদ্ধাপরাধ করলে, স্বাধীনতার স্থপতি, তাঁর স্বজনদের এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করলে মাফ? আইন পাশ আর আইন বাতিল করে বিচারপ্রার্থনার পথ রুদ্ধ করে কোন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হয়েছিল তখন?

এসব বললে আওয়ামী লীগ খুব খুশি হয়ে যায়৷ ভাবে, তাদের পক্ষে কথা বলা হচ্ছে, ভালোই তো! অন্যদিকে বিএনপি আর জামায়াতসহ তাদের রাজনৈতিক সহচররা ভাবে, ‘‘শুরু হয়ে গেল আওয়ামী লীগের পক্ষে দালালি৷''

আব্দুল্লাহ রিফাত, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ছাত্র

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ রিফাত৷ তার মতে, বাড়ি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় – কোথাও তেমন নিরাপদ না কেউই৷ তবে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে তিনি ভাবছেন না এই মুহূর্তে৷

নাফিউল হাসান, মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিউল হাসান মনে করেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউই নিরাপদ নয়৷ আমরা একরকম ভয়ের মধ্যেই বসবাস করছি৷ যতক্ষণ বাইরে থাকি, বাসায় অভিভাবকরা চিন্তায় থাকেন৷ অনেক সময় তো স্বাভাবিক ঘোরাফেরাও বন্ধ করতে হচ্ছে৷

প্যারিস তালুকদার, তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল বিভাগের ছাত্র

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া প্যারিস তালুকদার মনে করেন, গত দুই বছরের আগ পর্যন্ত নিজের নিরাপত্তা নিয়ে কখনো ভাবিনি, গভীর রাত পর্যন্তও ঘুরে বেড়াতাম বিভিন্ন জায়গায়৷ তবে গত দিনগুলোর নানান ঘটনায় আমার নিজেরই খুব ভয় হয়৷

ফারিয়া রিফাত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী

বেশ নির্ভিক টাইপের মানুষ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ফারিয়া রিফাত৷ কিন্তু দেশের বর্তামান পরিস্থিতিটা তার কাছে খুবই ঘোলাটে মনে হচ্ছে৷ প্রত্যেক দিনই বড় কোনো অঘটন ঘটছে৷ পত্রিকা খুললেই খুন-খারাবির খবর, মনে হচ্ছে ‘মার্ডার’ করাটা এখন সহজ ক্রাইম৷ আমরা প্রত্যেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি৷ ঘর থেকে বেড়িয়ে আবার যে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারব, এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না৷

আরিফ জেবতিক, ব্লগার

ব্লগার আরিফ জেবতিক বললেন, ‘‘নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই আছি৷ ব্যক্তিগতভাবে যে যেভাবে পারছি সাবধানে থাকার চেষ্টা করছি৷ জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন আনতে হয়েছে৷ এই যেমন, ‘পাবলিক প্লেসে’ যাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছি৷ সিনেমা দেখতাম, নাটক দেখতাম, জগিং করতাম৷ এখন এগুলো আর করতে পারি না৷ যেহেতু পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নেই, তাই এভাবেই সাবধানে থাকতে হচ্ছে৷

হযরত আলী, ব্যবসায়ী

পুরনো ঢাকার ব্যবসায়ী হযরত আলী৷ তাঁর মতে, দেশের কোনো শ্রেণির মানুষেরই নিরাপত্তা নেই৷ দিনে-‍দুপুরে খুন-খারাবি চলছে৷ তাই দিন কিংবা রাত – কখনোই নিরাপদ নই আমরা৷

হারিছ মিয়া, ফল ব্যবসায়ী

মাদারীপুরের হারিছ মিয়া গত প্রায় ১৭ বছর ধরে ঢাকায় ফলের ব্যবসা করেন৷ গত কয়েক বছরের তুলনায় বর্তমানে খুন-খারাবি বেড়ে যাওয়ায় খুবই চিন্তিত তিনি৷

আক্কাস আলী, দিনমজুর

পুরনো ঢাকায় ঠেলাগাড়ি চালান আক্কাস মিয়া৷ জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার সময় নেই তাঁর৷ আপাতত সন্তানদের মুখে তিনবেলা খাবার তুলে দিতে পালেই সন্তুষ্ট তিনি৷

আব্দুর রহমান, রিকশা চালক

লালমনির হাটের আব্দুর রহমান ঢাকায় রিকশা চালান গত প্রায় ছ’বছর ধরে৷ জীবনের নিরাপত্তার চেয়েও তাঁর কাছে বেশি চিন্তার বিষয় ছিনতাই৷ রাস্তায় থাকা হয় বলে প্রতিনিয়ত অনেক ছিনতাইয়ের সাক্ষী তিনি্৷ কিন্তু জীবনের ভয়ে সেগুলোর প্রতিবাদ না করে নিরব দর্শকের ভূমিকাই পালন করতে হয় তাঁকে৷ কিন্তু এতে খুবই মনোকষ্টে ভোগেন বিদ্যালয়ের প্রাথমিকের গণ্ডি পার হতে না পারা এই রিকশা চালক৷

আবুল কালাম, অটোরিকশা চালক

শেরপুরের আবুল কালাম অটোরিকশা চালান ঢাকা শহরে৷ তাঁর কথায়, দেশে কোনো নিরাপত্তা নেই৷ যে যেভাবে পারছে খুন-খারাবি করে যাচ্ছে৷ অপরাধীরা থাকছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে৷ অনেকে ধরা পড়ার খবর শুনলেও তাদের বিচারের আর কোনো খবর পান না বলে জানালেন এই অটোরিকশা চালক৷

নিজের বা দলের পক্ষে বললে ‘বেশ, বেশ, বেশ' আর বিপক্ষে বললেই রাজাকার বা আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি'র দালাল বলে দেয়ার এই যে প্রবণতা, এটিও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ৷ তবে এভাবে সমালোচককে হয়ত বিব্রত করার চেষ্টা করা যায়, কিন্তু সত্যকে মিথ্যের আড়ালে চাপা দেয়া যায় না৷ তথ্যপূর্ণ, যুক্তিগ্রাহ্য সমালোচনা তাতে  খারিজ হয়ে যায় না৷

যে ব্যক্তি বা যে দল যা-ই বলুক, ঐতিহাসিক সত্যি হলো, '৭৫-এর ১৫ আগস্ট এবং ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের পর আইনের শাসনকে সবচেয়ে নির্লজ্জভাবে বুড়ো আঙুলই দেখানো হয়েছিল৷ তাই হত্যাকাণ্ডের বিচার আইন করে ‘নিষিদ্ধ' করা হয়৷ ১৯৯৬-এর আগ পর্যন্ত এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে মামলা  করা যায়নি৷

বঙ্গবন্ধু হত্যার চার মাস পর, অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ‘দালাল আইন' বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও বন্ধ করে ৩০ লক্ষ শহীদের স্বজনদের বিচার চাওয়ার অধিকারও খর্ব করা হয়েছিল৷ একাত্তরের কোনো হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটের বিচার দীর্ঘদিন কেউ চাইতেই পারেনি৷

তো এভাবে বঙ্গবন্ধুর স্বজন ও তাঁর আদর্শিক অনুসারীদের, মুক্তিযোদ্ধাদের, শহীদদের এবং ধর্ষিতা মা-বোনদের বিচার পাওয়ার অধিকার কে কেড়ে নিয়েছিল? রাষ্ট্র৷ কীভাবে? বিচার করা যাবে না এমন আইন (ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ) করে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য যে আইনটি কার্যকর ছিল, সেটি বাতিল করে৷ বিশ্বের আর কোন দেশে এমন হয়েছে?

ওই দুটো বর্বরোচিত রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে স্বাধীন দেশের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক৷ ২১ বছর পর আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না ফেরা পর্যন্ত কোনো সরকারই বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার ও চার নেতা হত্যার এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগই নেয়নি৷ উল্টো মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি এবং আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করার ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে৷ ফলে দিনে দিনে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে শিকড় গেড়ে বসেছে তারা, একাত্তরে যারা গণহত্যা, গণধর্ষণ, ব্যাপক লুটপাটে অংশ নিয়েছিল কিংবা সেইসব অপকর্ম সমর্থন করেছিল৷

অথচ অপরাধীকুলে সবচেয়ে ‘জঘণ্য' অপরাধী নাকি যুদ্ধাপরাধী৷ তাদের পালন-পোষন-তোষণ করে যে সমাজ এগিয়ে চলার চেষ্টা করে সেই সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সত্যিই কঠিন এবং সময় সাপেক্ষ৷ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাও তাই সুদূর পরাহত৷ স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও তাই ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি' নিয়ে চর্চা হয় সব মহলে৷ হত্যা, গুম, ধর্ষণ এখনো চলছে৷ অনেকের বিচারের বাণী এখনো নিভৃতেই কাঁদে৷ পাশাপাশি চলছে দায় অস্বীকার আর সব দায় প্রতিপক্ষের ঘাড়ে চাপানোর প্রতিযোগিতা৷ এই প্রতিযোগিতায় কেউ কোনোদিন জিতবে না৷ বরং মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নগুলো ভেঙেচুরে যাবে৷ তা-ই তো যাচ্ছে!

Deutsche Welle DW Ashish Chakraborty

আশীষ চক্রবর্ত্তী, ডয়চে ভেলে

ক্ষমতায় ফিরতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কিছুটা জলাঞ্জলি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ৷ ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে জলাঞ্জলিপর্বই চলছে৷ হ্যাঁ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তারা করছে৷ কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ এখন সংখ্যালঘুদের কী দিচ্ছে? ৪৫ বছরে কত হাজার মন্দির ভাঙা হয়েছে? একটারও সুষ্ঠু বিচার হয়েছে? রামু, নাসির নগরে ধর্ম অবমাননার সাজানো অভিযোগে মন্দির, বাড়িঘরে ব্যাপক হামলায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরাও জড়িত৷ সুবিচার পেয়েছে কেউ? ৪৫ বছরে কয় লক্ষ সংখ্যালঘু দেশ ছেড়েছে? বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট'-এর নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা শুরু করেছিল, সেই সরকারের বিদায়ের এত বছর পরও তো ‘ক্রসফায়ার' চলছে৷ এ-ও তো বিচারবহির্ভূত হত্যা৷ এসব ক্ষেত্রেও বিচার প্রার্থনা এবং বিচার প্রাপ্তির সুযোগ-সুবিধা সীমিত৷ তাহলে ইতিহাস থেকে কী শিক্ষা নেয়া হলো?

১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্টের ‘পাপ' থেকে শিক্ষা না নিলে ‘পাপ' কি বাংলাদেশকে ছাড়বে? আপনার মতামত লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷