‘পাহাড়িদের আস্থায় নিয়েই ভূমি সমস্যার সমাধান করতে হবে’

পাহাড়িদের অন্তর্ভূক্ত করে, তাঁদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে ও পার্বত্য চুক্তির পর যে প্রতিষ্ঠান হয়েছে, তাদের নিয়েই আদিবাসীদের সমস্যার সমাধান করতে হবে৷ ডয়চে ভেলেকে বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আমেনা মহসিন৷

ডয়চে ভেলে: সম্প্রতি পার্বত্য এলাকায় যে ঘটনাটা ঘটে গেল, দেড়শ'র বেশি মানুষ মারা গেল, এ অবস্থা তো একদিনে তৈরি হয়নি৷ তাহলে সমাধান করা যাচ্ছে না কেন?

অধ্যাপক ড. আমেনা মহসিন: পুরো জিনিসটা যদি আমরা মাথায় নেই তাহলে আমাদের বুঝতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সমস্যাটা তৈরি হয়েছে অস্থিরতার সময়৷ তখন বাঙালিদের নিয়ে ওখানে সেটেল করা হয়েছে৷ সেটেল করা হয়েছে ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স ছাড়াই৷ পাহাড়ের ভূমি আর সমতল ভূমি যে এক প্রকৃতির না, সেটা বুঝতে হবে৷ এটা কিন্ত কখনোই আমরা আমলে নিইনি৷ তখন সরকারের তরফ থেকে বারবার যুক্তি দেখানো হচ্ছিল, পাহাড়ে অনেক জমি খালি পড়ে আছে সে কারণেই বাঙালিদের ওখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷ পাহাড়ে আসলে ভূমি কখনোই খালি পড়ে ছিল না৷ যে জমিগুলো দেখানো হয়েছে, সেটা আবাসের জন্যও ঠিক ছিল না, ফসল করার জন্যও ঠিক ছিল না৷ ইকোলজিক্যাল ভারসাম্যের কথা চিন্তা না করেই আমরা খালি বলতে শুনলাম, ভূমি খালি পড়ে আছে৷ ওখানে যে বাঙালিদের নেয়া হয়েছে, তাঁদের প্রতিও অন্যায় করা হয়েছে৷ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনগোষ্ঠীর উপরও অন্যায় হয়েছে৷ ওদের যে ইকোলজি সেটার প্রতি তো চরমভাবে হয়েছে৷ সেটারই মাশুল দিচ্ছি আমরা৷ 

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়নে যে মডেল আছে, সেখানে কি তাহলে কোনো ত্রুটি আছে?

অবশ্যই ত্রুটি আছে৷ কারণ, আপনি যে উন্নয়ন করছেন, সেটা তো পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে করতে হবে৷ এ কথাটা তো বারবার বলা হচ্ছে৷ এখন না, যখন বাঙালিদের ওখানে প্রথম নেয়া হলো তখনকার পার্লামেন্টের ‘ডিবেট' যদি আমরা দেখি, সেখানে বলা হয়েছে, পার্বত্য এলাকার মানুষ উন্নয়ন চান না৷ তাঁরা অলস, কাজও করতে চায় না৷ কথাটা তো ঠিক না৷ ওঁরা তো উন্নয়ন ঠিকই চায়৷ এই উন্নয়নটা তো তাঁদের প্রকৃতির সঙ্গে মিলতে হবে৷ সেটা তো পরিবেশবান্ধব হতে হবে৷ সেটা তো হয়নি৷ সেখানে এটা একটা বড় ত্রুটি৷ ওখানে যে ধরনের উন্নয়ন হচ্ছে, সেটা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, লেখালেখি হয়েছে৷ আমরা মনে হয় না এটা সেভাবে আমলে নেয়া হয়েছে৷

সাম্প্রতিক পাহাড়ধ্বসের পর ভূমি অধিকারের বিষয়টা সামনে চলে এসেছে...

ভূমি অধিকারের বিষয়টা তো আসবেই৷ এটা সব সময় এসেছে৷ আমি তো শুরু থেকে বলছি, ওদের নিয়ন্ত্রণে যে ভূমিটা আছে, সেটা আমলে নিয়েই আমাদের এগুতে হবে৷ ওদের নিজস্ব আইন আছে, সামাজিক আইন আছে, কিন্তু আপনি তো ওখানে অন্য ধরনের আইন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন৷ আপনি যখন সেটেলমেন্টে যাবেন, তখন আপনাকে তো সবকিছু মাথায় রেখেই করতে হবে৷

সাম্প্রতিক যে বিপর্যয়টা ঘটে গেল, এটাকে কি আমরা প্রকৃতিক না মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয় বলব?

আমার মনে হয়, মূলত মনুষ্যসৃষ্ট, তারপর প্রাকৃতিক৷ যেসব জায়গায় এই ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেখানে মানুষকে সেটেল্ড করা ঠিকই হয়নি৷ আপনি পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করেছেন, এটার তো কোনো দরকার ছিল না৷

পার্বত্য এলাকায় বাড়ি-ঘর নির্মাণে কি কোনো ধরনের নীতিমালা আছে? 

সমাজ-সংস্কৃতি

জুম চাষে জড়িত যাঁরা

বান্দরবানে জুমঘেরা পাহাড়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি বসতি৷ তিন পার্বত্য জেলায় ৩৫ হাজারেরও বেশি জুমিয়া পরিবার এই জুম চাষের সঙ্গে জড়িত৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ভিন্ন নাম

খাগড়াছড়ির মহালছড়ির এক পাহাড়ের গাছপালা পোড়ানো হচ্ছে জুম চাষের জন্য৷ চাষ পদ্ধতি এক হলেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে জুম চাষ আলাদা নামে পরিচিত৷ জুম চাষকে চাকমা ভাষায় জুম, মারমা ভাষায় ইয়াঁ, ত্রিপুরা ভাষায় হুগ, ম্রো ভাষায় উঃঅ, খিয়াং ভাষায় লাই, বম ভাষায় লাও বলা হয়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

যেসব ফসল জন্মায়

খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে পাহাড়ের গায়ে জুম চাষ করছেন ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ৷ ভারী বৃষ্টির পর পাহাড়ের মাটি খুঁড়ে রোপণ করা হয় বিভিন্ন ফসল৷ জুমের ফসলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নানাজাতের ধান, কুমড়া, অড়হড়, শিম, শশা, করলা, ঢেঁড়শ, তিল, ভুট্টা, আদা, যব, তুলা, হলুদ, পাহাড়ি আলু, কচু, ইত্যাদি৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বন উজাড়

বান্দরবানে জুম চাষের ফলে গাছপালা শূন্য পাহাড়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ফসল কাটার সময়

রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরের পাহাড় থেকে জুমের ফসল তুলছেন চাকমা সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ৷ জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত জুমের ফসল কাটার মৌসুম৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ফসল ঘরে তোলা

রাঙ্গামাটির সাজেকে পাহাড় থেকে জুমের ফসল নিয়ে ফিরছেন ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের এক বৃদ্ধ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

কর্মব্যস্ততা

রাঙ্গামাটির সাজেকের কংলাক পাহাড়ে জুমের চাল ঝাড়ছেন এক ত্রিপুরা নারী৷

সমাজ-সংস্কৃতি

নতুন বনাঞ্চল

জুম চাষে পাহাড়ের বন উজাড় হলেও অনেক পাহাড়েই নতুন নতুন বনাঞ্চল গড়ে তুলেছে বাংলাদেশের বন বিভাগ৷ রাঙ্গামাটির মানিকছড়ির এই বনাঞ্চল এরকমই একটি উদাহরণ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বিকল্প কর্মসংস্থান

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে কাপড় বুনছেন ত্রিপুরা নারীরা৷ পাহাড়ে বসবাসরত সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীই কাপড় বুননসহ নানান শৈল্পিক কাজে অভিজ্ঞ৷ এসব জনগোষ্ঠীকে আরো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

হস্তশিল্প

বান্দরবানের শৈলপ্রপাত এলাকায় নিজেদের তৈরি কাপড় ও হস্তশিল্প সামগ্রীর পসরা সাজিয়েছেন স্থানীয় বম সম্প্রদায়ের নারীরা৷ পাহাড়ে তৈরি এসব পণ্যের দেশে ও বিদেশে বেশ সমাদর রয়েছে৷ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে এইসব সম্প্রদায় তাদের কাজের বিস্তৃতি ঘটাতে সক্ষম হবেন৷

সমাজ-সংস্কৃতি

জলকেলি উৎসব

রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় পানি খেলায় ব্যস্ত মারমা তরুণীরা৷ এই পানি খেলা বা জলকেলি উৎসব মারমা সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসব, যা পালন করা হয় নববর্ষে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বাঁশ নৃত্য

বান্দরবানের রুমা উপজেলার বেথেলপাড়ায় ঐতিহ্যবাহী বাঁশ নৃত্য পরিবেশনে বম তরুণীরা৷

এটা আমি বলতে পারি না৷ ওদের বড়ি-ঘরগুলো ভিন্ন অবকাঠামো দিয়ে তৈরি৷ ওখানে এ, বি, সি – এই তিন ক্যাটাগরির ল্যান্ড আছে৷ সব ক্যাটাগরিতে আপনি বাড়ি-ঘর নির্মাণ করতে পারেন না৷ আমার মনে হয় না সেটা ফলো করা হয়েছে৷

সব সরকারই ভূমি সমস্যার নিষ্পত্তির কথা বলে আসছে, তাহলে এটা হচ্ছে না কেন?

ভূমির মালিকানা কার, এটা তো আমরা সমাধান করতে পারছি না৷ মালিকানার একটা বিরাট ব্যাপার আছে৷ আর আইনে পরিবর্তন আনতে হবে৷ এটা না আনা পর্যন্ত আমরা এ সমস্যার সমাধান তো আমরা করতে পারব না৷ বাংলাদেশ সরকার যেটাকে খাস জমি বলছে, পাহাড়িরা সেটাকে বলছে তাদের গোত্রভুক্ত জমি৷ এটার মধ্যে তো একটা সামঞ্জস্য আনতে হবে, তাই না?

দ্য চিটাগাং হিলট্র্যাক্টস রেগুলেশন অনুযায়ী, সেখানকার জমির মালিক সরকার৷ তাহলে একজন উপজাতির অধিকারে কি কোনো বাধা সৃষ্টি হয় না?

চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশনে বিভিন্ন ক্যাটাগরির ল্যান্ড আছে৷ এই রেগুলেশনে পাহাড়িদের জমির অধিকার দেয়া হয়েছে৷ ঔপনিবেশিক সময়ের কথা যদিধরেন, তাহলে সব জমির মালিকানা তো সরকারেরই ছিল৷ তখনও আদিবাসীদের জমির উপর মালিকানা ছিল৷ কিছু কিছু জমি তারা আলাদা করে নিয়েছিল ফরেস্টের জন্য৷ কিছু ছিল ফরেস্টের জন্য, কিছু ছিল উন্নয়নের জন্য৷ সেখানে একটা ধারাই ছিল যে, ডিসি চাইলে কাউকে সেখান থেকে বের করে দিতে পারবেন৷ বাইরে থেকে অভিবাসনটা সে সময় রেস্ট্রিকটেড ছিল৷

পার্বত্য চট্টগ্রাম তো পর্যটন এলাকা৷ ভূমি বিরোধের কারণে তো পর্যটন অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়?

এটা তো হবেই৷ দেখুন ভুটানও কিন্তু পর্যটন এলাকা৷ সেখানে তো ওরা অনেক কিছু মেনেই পর্যটন করে৷ আমরা যেটাকে বলি ইকো টুরিজম৷ এটা তারা করে৷ পার্বত্য চট্টগ্রমেও ইকো টুরিজমই করতে হবে৷

ভূমি সমস্যার সমাধান কীভাবে সম্ভব? আপনার পরামর্শ কী?

আমার মনে হয়, আলাপ-আলোচনা ছাড়া এটা হবে না৷ এখানে পাহাড়িদের অন্তর্ভূক্ত করেই তাঁদের যাঁরা কমিউনিটি লিডার আছে, তাঁদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে এবং তাঁদের যে ইনস্টিটিউশন আছে, পার্বত্য চুক্তির পর যেগুলো হয়েছে, তাদের নিয়ে সবাই মিলেই সমাধান করতে হবে৷ তাঁদের তো পুনর্বাসন করতে হবে, তা না হলে তো আর হবে না৷ 

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷