পাহাড়িদের পৌরাণিক চোখ

খরস্রোতা শঙ্খ নদ দেখতে আমি অনেকবার পাহাড়ে গেছি৷ পাহাড়ের খাজে আঁকাবাঁকা নদ যেন শিরা-উপশিরার মতো এগিয়ে চলে৷ খুব বৃষ্টিতে পাহাড় আরো সবুজ৷ নদের পানি রুপোলি৷ দিগন্তের ওপারে সূর্য উঠলে তার সোনালি আলো ঝিকিমিকি করে সেই পানিতে৷

পাহাড়ের মানুষগুলোও তেমনই৷ কেমন একটা মায়াবি ঘোর যেন তাঁদের চোখে-মুখে৷ এই ঘোরের কথা পুরাণ নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাঁরাও লিখেছেন৷ যে পাহাড় তাঁদের ঘিরে থাকে, যে নদী বা ঝর্ণা কুল কুল করে বয়ে চলে পাথুরে পাহাড়ের গা ঘেঁষে, কিংবা পাহাড়ের বনে বনে যেসব পশুপাখি চরে বেড়ায়, সবকিছুকেই পৌরাণিক চোখ দিয়ে দেখেন পাহাড়িরা৷ তাঁদের কাছে এই প্রকৃতি পূজনীয়৷ কারণ, এই প্রকৃতিই খাদ্য দেয়, বাঁচিয়ে রাখে তাঁদের৷

প্রকৃতির টানে আর বৈচিত্র্যময় মানুষগুলোকে দেখতেই বারবার ছুটে যাওয়া দক্ষিণের পাহাড়গুলোতে৷ বৈশাখে সাংগ্রাই উৎসব হয় বান্দরবানে৷ ছেলেমেয়েরা তাঁদের নিজস্ব ধরণের নানান রঙিন পোশাক পড়ে৷ নাচ গান করে৷ আর মেতে ওঠে জলকেলি উৎসবে৷ এটি একটি বিশেষ ধরণের খেলা৷ এখন এটি আনুষ্ঠানিকভাবেই হয়৷ তরুণ-তরুণীরা একে অন্যের গায়ে পানি ছিটায়৷ এটি মূলত মারমাদের উৎসব৷  তাঁদের বিশ্বাস, এই পানি ধুয়ে-মুছে দেবে পুরনো বছরের যত দুঃখ-গ্লানি-বেদনা৷ তবে এই উৎসব এখন সার্বজনীন হয়ে গেছে৷ শুধু নিজেদের মধ্যেই নয়, পুরো বান্দরবানের সবাই যেন এই খেলায় মাতে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

জুম চাষে জড়িত যাঁরা

বান্দরবানে জুমঘেরা পাহাড়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি বসতি৷ তিন পার্বত্য জেলায় ৩৫ হাজারেরও বেশি জুমিয়া পরিবার এই জুম চাষের সঙ্গে জড়িত৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ভিন্ন নাম

খাগড়াছড়ির মহালছড়ির এক পাহাড়ের গাছপালা পোড়ানো হচ্ছে জুম চাষের জন্য৷ চাষ পদ্ধতি এক হলেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে জুম চাষ আলাদা নামে পরিচিত৷ জুম চাষকে চাকমা ভাষায় জুম, মারমা ভাষায় ইয়াঁ, ত্রিপুরা ভাষায় হুগ, ম্রো ভাষায় উঃঅ, খিয়াং ভাষায় লাই, বম ভাষায় লাও বলা হয়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

যেসব ফসল জন্মায়

খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে পাহাড়ের গায়ে জুম চাষ করছেন ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ৷ ভারী বৃষ্টির পর পাহাড়ের মাটি খুঁড়ে রোপণ করা হয় বিভিন্ন ফসল৷ জুমের ফসলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নানাজাতের ধান, কুমড়া, অড়হড়, শিম, শশা, করলা, ঢেঁড়শ, তিল, ভুট্টা, আদা, যব, তুলা, হলুদ, পাহাড়ি আলু, কচু, ইত্যাদি৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বন উজাড়

বান্দরবানে জুম চাষের ফলে গাছপালা শূন্য পাহাড়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ফসল কাটার সময়

রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরের পাহাড় থেকে জুমের ফসল তুলছেন চাকমা সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ৷ জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত জুমের ফসল কাটার মৌসুম৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ফসল ঘরে তোলা

রাঙ্গামাটির সাজেকে পাহাড় থেকে জুমের ফসল নিয়ে ফিরছেন ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের এক বৃদ্ধ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

কর্মব্যস্ততা

রাঙ্গামাটির সাজেকের কংলাক পাহাড়ে জুমের চাল ঝাড়ছেন এক ত্রিপুরা নারী৷

সমাজ-সংস্কৃতি

নতুন বনাঞ্চল

জুম চাষে পাহাড়ের বন উজাড় হলেও অনেক পাহাড়েই নতুন নতুন বনাঞ্চল গড়ে তুলেছে বাংলাদেশের বন বিভাগ৷ রাঙ্গামাটির মানিকছড়ির এই বনাঞ্চল এরকমই একটি উদাহরণ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বিকল্প কর্মসংস্থান

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে কাপড় বুনছেন ত্রিপুরা নারীরা৷ পাহাড়ে বসবাসরত সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীই কাপড় বুননসহ নানান শৈল্পিক কাজে অভিজ্ঞ৷ এসব জনগোষ্ঠীকে আরো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

হস্তশিল্প

বান্দরবানের শৈলপ্রপাত এলাকায় নিজেদের তৈরি কাপড় ও হস্তশিল্প সামগ্রীর পসরা সাজিয়েছেন স্থানীয় বম সম্প্রদায়ের নারীরা৷ পাহাড়ে তৈরি এসব পণ্যের দেশে ও বিদেশে বেশ সমাদর রয়েছে৷ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে এইসব সম্প্রদায় তাদের কাজের বিস্তৃতি ঘটাতে সক্ষম হবেন৷

সমাজ-সংস্কৃতি

জলকেলি উৎসব

রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় পানি খেলায় ব্যস্ত মারমা তরুণীরা৷ এই পানি খেলা বা জলকেলি উৎসব মারমা সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসব, যা পালন করা হয় নববর্ষে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বাঁশ নৃত্য

বান্দরবানের রুমা উপজেলার বেথেলপাড়ায় ঐতিহ্যবাহী বাঁশ নৃত্য পরিবেশনে বম তরুণীরা৷


একটি স্বনামধন্য টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিনিধি হিসেবে সেবার আমি গিয়েছিলাম এই অনুষ্ঠানগুলো কাভার করতে৷ পেছনে জলকেলি রেখে যেই ক্যামেরায় কথা বলা শুরু করলাম, অমনি একজন এসে গায়ে পানি ছিটিয়ে দিলেন আর বললেন, ‘‘গায়ে পানি না লাগলে ঠিক মানাচ্ছে না যে৷''

এরপর যতবার এই উৎসবে গিয়েছি, ক্যামেরা থাকুক আর না-ই থাকুক, ‘পানিযুদ্ধে' পরাজিত হতে হয়েছে প্রতিবারই৷ এমনকি বৌদ্ধ ভিক্ষু শিশুগুলোও কেউ কারো চেয়ে কম নয়৷ নানান ফন্দিফিকির করে পরিচিত আর অপরিচিত সবাইকেই সেদিন পানি বাণে অতিষ্ঠ করাই ওদের কাজ৷ তাদের কিয়াং বা ধর্মীয় আখড়ায়ও হয় অনুষ্ঠান৷

বিকেলের দিকে বুদ্ধস্নানের জন্য সারি সারি গেরুয়া পড়া ভিক্ষুগণ ছুটে চলেন শঙ্খ নদের পাড়ে৷ এ সময়টায় নদে পানি কম থাকে৷ চর পড়ে যায়৷ কোথাও কোথাও হেঁটেই নদ পার হয়ে যাওয়া যায়৷ সেখানে নদের পানি দিয়ে স্নান করানো হয় স্বর্ণের বুদ্ধমূর্তিকে৷ রাতে হয় সহস্র বাতি প্রজ্জ্বলন৷

রাতে গিয়েছি মারমা পাড়ায়৷ তরুণীরা উঠোনে বসে পিঠা বানাচ্ছে৷ আর ছেলেগুলো আশেপাশে ঘুরোঘুরি করছে৷ স্থানীয় সাংবাদিকরা জানালেন, এই ছেলেদের বেশিরভাগই জেএসএস-এর কর্মী৷

Zobaer Ahmed

যুবায়ের আহমেদ

বাঙালিরা আসার পর থেকে অনেক কিছুই বদলেছে পাহাড়ি সমাজে৷ জমি নিয়ে বিরোধ বেড়েছে৷ রক্তক্ষয় হয়েছে৷ অবিশ্বাস জন্মেছে৷ পাহাড়ি ছেলেগুলোর চোখেও তেমন অবিশ্বাস চোখে পড়ার মতো৷ পরদিন খুব ভোরে পাহাড়ি পথ ধরে গিয়েছি একটি পাড়ায়৷ শুনেছি, সেখানে পাশাপাশি বাঙ্গালি আর পাহাড়িরা থাকছে৷ গিয়ে দেখা গেল, দু'পক্ষই সমঝোতার ভিত্তিতে নিজেরা নিজেদের জমি ভাগ করে নিয়েছে৷ একটা অঞ্চলে জমি ভাগাভাগি বা প্রশাসনিক কাঠামোয় এত ধরনের নিয়ম, যা আর কোথাও নেই এদেশে৷ এর সমাধান দরকার৷

আর যেটি দরকার, তা হলো পাহাড়িদের পৌরাণিক চোখগুলো বাঁচিয়ে রাখা৷ তাঁদের জীবনপদ্ধতি ও দর্শন প্রকৃতির জন্য, জীববৈচিত্র্য বাঁচিয়ে রাখতে খুব দরকার৷ তা না হলে পাহাড় আর পাহাড় থাকবে না৷ প্রকৃতি হয়ে যাবে নকল আধুনিকতার উপনিবেশ৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷