পাহাড়ে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা

চার পার্বত্য জেলায় পাহাড় ধসে নিহত হয়েছে ১৫১ জন৷ যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁরাও চরম সংকটে৷ খাদ্য, চিকিৎসা, আশ্রয়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট এবং বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সেখানে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে৷

রাঙামাটি এবং বান্দরবানে ২৫টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৫ হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু আশ্রয় নিয়েছে৷ কিন্তু এসব আশ্রয় কেন্দ্রে বিদ্যুৎ ও পানি সরকরাহ না থাকায় এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে৷ জেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে খাবার সরবরাহ করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়৷আর যাঁরা আশ্রয় কেন্দ্রে যাননি, তাঁদের কাছে ত্রাণ পৌছাচ্ছে না৷ কোথাও কোথাও প্রয়োজন বিবেচনা না করে খাবারের পরিবর্তে শুধু খাবার স্যালাইন পাঠানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে৷

রাঙামাটি টিভি স্টেশন কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া মামুন নামের একজন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, ‘‘আমাদের কাছে কোনও খাবার পৌঁছায়নি৷ এমনকি পানি পর্যন্ত পাইনি৷ টিভিস্টেশন কেন্দ্রে একজন এসে কিছু খাবার স্যালাইন ও ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে গেছেন৷''

এখন লাইভ
03:00 মিনিট
বিষয় | 16.06.2017

‘‘আমরা পুনর্বাসনের কাজ শুরু করব’’

বিএডিসি ভবন কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া আনোয়ার নামের একজন বলেন, ‘‘শুকনা খাবার চিড়া-মুড়ি দিয়ে গেছে৷ এগুলো পেয়েছি৷ তবে এখনও (শুক্রবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত) দুপুরের খাবার পাইনি৷ এলাকাবাসীর উদ্যোগে আমাদের জন্য ইফতার ও রাতের খাবারের ব্যবস্থা হচ্ছে৷''

পাহাড় ধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে রাঙামটি এলাকায়৷ সেখানে পাঁচ সেনা সদস্যসহ ১১০ হন নিহত হয়েছেন৷ চট্টগ্রাম থেকে রাঙামাটি শহর পর্যন্ত ১৩ কি.মি সড়ক ব্যাপকভাবে  ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ আর রাঙামাটি থেকে প্রত্যন্ত এলকার সড়ক যোগাযোগ ধস ও টানা বৃষ্টির কারণে ব্যবহারের অযোগ্য এবং ঝুকিপূর্ন হয়ে পড়েছে৷

সরবরাহ না থাকায় রাঙামাটিতে জ্বালনি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে৷ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যে জ্বালানিতেল ছিল, তা পেট্রোল পাম্প মালিকরা রেশনিং করে প্রায় দ্বিগুন দামে বিক্রি করেছেন৷ এরপর পাম্পগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়৷ কেরোসিন তেলের সংকট পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে৷ আর এলপি গ্যাসের সংকট ও চড়া দামের কারণে রান্নাও করা যাচ্ছে না৷ বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল ফোনের চার্জও দেয়া যাচ্ছে না৷ ফলে ওইসব এলাকার মানুষ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন৷ বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে৷ নতুন করে আতংক ছড়িয়ে পড়ছে৷ এমন পরিস্থতিতেও পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের সবাইকে সরিয়ে নেয়া হয়নি এখনো৷

ওইসব এলাকায় চালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য এবং শাকশব্জির দামও বেড়ে গেছে৷ নান ধরণের গুজব আর আতঙ্কের মধ্যে আছেন সেখানকার মানুষ৷

ঢাকা-চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা চলছেই

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার শুরু

সমুদ্রের খুব কাছে থাকায় খাল-নদীর এই নগরের মানুষ জোয়ারের সঙ্গে পরিচিত নগরীর গোড়াপত্তন থেকেই৷ জলাবদ্ধতার ইতিহাস নিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী মত হচ্ছে, এখানে এই সমস্যার শুরু হয়েছে ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে৷ এরপর সময়ে সময়ে এটা কেবল বেড়েছে৷ বৃষ্টি ও আটকে যাওয়া জোয়ারের পানিতে এই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়৷ এ জন্য খাল দখল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়৷

ঢাকা-চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা চলছেই

চাক্তাই খাল

এক সময় চট্টগ্রামের চাক্তাই খাল ছিলো নগরীর প্রাণ৷ কয়েক দশক পূর্বেও এই খাল দিয়েই বহদ্দারহাট পর্যন্ত যেতো সওদাগরী নৌকা৷ তবে এখন আর সেই অবস্থায় নেই এই খাল৷ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ অংশে খালটি দখল হয়ে আছে৷ অভিযোগ রয়েছে, দখলদাররা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউই তাদেরকে উচ্ছেদ করতে কার্যকর উদ্যোগ নেয় না৷ এখন এই খালকে বলা হয় নগরীর দুঃখ৷

ঢাকা-চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা চলছেই

নতুন দুঃখ মহেশখালের বাঁধ

২০১৫ সালের চট্টগ্রামে নতুন এক দুঃখ যুক্ত হয়েছে৷ জোয়ারের পানি থেকে বাঁচতে নগর কর্তৃপক্ষের অনুরোধে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মহেশখালে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে৷ পরের বছরই এটি নগরীর বিশাল একটি এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷ ২০১৬ সালে এই বাঁধ অপসারণে সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর সাধারণ মানুষ বাঁধটি কাটতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়৷ এবার মেয়র বলছেন, সেখানে স্থায়ী স্লুইস গেট নির্মাণ করা হবে৷

ঢাকা-চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা চলছেই

খালের নৌকা রাস্তায়

চট্টগ্রাম নগরে মোট ১৭টি খাল রয়েছে৷ অধিকাংশ খালই বেদখল হয়ে নৌ চলাচল কঠিন বা অসম্ভব হয়ে গেছে৷ তবে বর্ষায় সেই নৌকা প্রায় প্রতি বছরই রাস্তায় ওঠে আসে৷ অবশ্য কারো কারো মতে খালের সংখ্যা ২৫টি৷

ঢাকা-চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা চলছেই

মূল ইস্যু, তবু দৃষ্টি নেই

নগরীর এই জলাবদ্ধতাই সেখানকার নির্বাচনসহ জনপরিসরের অন্য আলোচনায় প্রাধান্য পেলেও এই সমস্যা থেকে উত্তরণে কার্যকর উদ্যোগ নেই৷ অবশ্য জনপ্রতিনিধি হলেও বর্তমান কাঠামোয় নগর শাসনে সিটি কর্পোরেশনের একক ক্ষমতাও নেই৷ সরকারি নানা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে এই প্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে হয়৷ খাল উদ্ধারে গেলে প্রভাবশালীদের চাপে কর্পোরেশনের কর্তারাও পিছুটান দেন৷ এমনকি খালের জায়গায় কর্পোরেশনের ভবন থাকার অভিযোগও রয়েছে৷

ঢাকা-চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা চলছেই

পানিতে ডোবে রাজধানীও

যে ঢাকা নগরে এখনো সুপেয় পানির তীব্র সংকট রয়েছে, মানুষকে ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধ করে পানি খেতে হয়, সেই নগরে এখনো অল্প বৃষ্টিই বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷ ডুবে যায় নগরীর বিভিন্ন সড়ক৷

ঢাকা-চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা চলছেই

হাতিরঝিলের রাস্তায়ও পানি

ভীষণ অপরিকল্পিত শহর ঢাকার জলাধার রক্ষায় তেমন কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে৷ নগরীর চারপাশ দখল উৎসবের মাঝে অবশ্য উচ্চ আদালত হাতিরঝিলে গড়ে উঠা একটি স্থাপনা উচ্ছেদে কঠোরভাবেই আদেশ দিয়েছে৷ যদিও সেই আদেশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি৷ তবুও নগরীর জলাধার ব্যবস্থাপনায় হাতিরঝিলকেই সবচেয়ে পরিকল্পিত এলাকা মনে করা হয়৷ তবে বৃষ্টির পানি জমে এই প্রকল্পের রাস্তায়ও৷

ঢাকা-চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা চলছেই

উন্নয়ন দুর্ভোগ

বাংলাদেশে অর্থ বছর শুরু হয় জুলাই থেকে৷ নগরের বাৎসরিক বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থ ছাড়ের পর কাজ শুরু করতে করতে বর্ষা এসে যায়৷ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছরই এটা জলাবদ্ধতার সাথে নতুন মাত্রা যোগ করে৷

ঢাকা-চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা চলছেই

খাল দখল ঢাকায়ও

ঢাবির বঙ্গবন্ধু হলের পাশে মৃতপ্রায় একটি পুকুর রয়েছে৷ তবে চমক হচ্ছে, এক সময় এটি ছিল একটি খাল৷ ঢাকার বহুল আলোচিত হাতিরঝিল নদী ছিল৷ পূর্বের বালুনদী থেকে পশ্চিমে তুরাগ পর্যন্ত এটি বিস্তৃত ছিলো৷ নড়াই নামে এই নদীর পূর্বাংশ এখনো স্বনামে রয়েছে৷ পশ্চিমে কোথাও এটা রামপুরা খাল, কোথাও হাতিরঝিল, কোথাও বেগুনবাড়ি খাল নামে পরিচিত৷ বাকি অংশ হারিয়ে গেছে৷ পুরাতন এই নদীর দুই তীরে নানা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা রয়েছে৷


পাহাড় ধসে আহতদের দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৪৮৩টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে৷ এসব টিমের সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করছেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ৷আর ত্রাণ ও  দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রনালয় জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ৫০০ মেট্রিক টন চাল, ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে৷চার জেলায় মোট ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে৷ নিহতদের প্রতি পরিবারকে ২০ হাজার এবং আহতদের ১০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে৷ আর জেলা প্রশাসকদের কাছে আগে থেকেই পর্যাপ্ত ত্রান আছে, যা তারা প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন বলে মন্ত্রনালয় জানায়৷

এখন লাইভ
02:34 মিনিট
বিষয় | 16.06.2017

‘‘আশ্রয়কেন্দ্রে একদিনের মধ্যে মানুষ দ্বিগুন হয়ে গেছে’’

এছাড়া যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আরো ৫০ লাখ টাকা এবং ৫০০ বান্ডিল টিন বরাদ্দের কথা জানিয়েছেন৷ 

রাঙামটির সাংবাদিক জিয়াউল হক জিয়া ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ৷ আশ্রয়কেন্দ্রে একদিনের মধ্যে মানুষ দ্বিগুন হয়ে গেছে৷ জেলা প্রশাসক বলছেন, ত্রান নিয়ে লাভ নাই৷ কারণ, তারা কিভাবে রান্না করে খাবে? সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গছে৷ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের সংকট আছে৷''

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছি৷ আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে দুই বেলা রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে৷ এরপর আমরা পুনর্বাসনের কাজ শুরু করব৷ আমরা চিকিৎসা সেবাকেও গুরুত্ব দিচ্ছি৷''

তিনি জানান, ‘‘কিছু অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্য মজুদ করে নিত্য প্রয়োজনীয় পন্যের দাম বাড়িয়েছিল৷ তারা এই দুর্যোগেও মুনাফা করার লোভ ছাড়তে পারেনি৷ তবে আমরা এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছি৷ কাপ্তাই থেকে লঞ্চ চলাচল শুরু করে খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি৷''

আমাদের অনুসরণ করুন