প্যাড কেনার সামর্থ্য নেই তাই বাল্যবিয়ে!

উগান্ডায় অনেক দরিদ্র পরিবারের বাবা-মা'র স্যানিটারি প্যাড কেনার সামর্থ্য না থাকায় তাঁরা তাঁদের মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন৷ সাহায্য সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল এই তথ্য দিচ্ছে৷

সংস্থাটি বলছে, প্যাড কেনার মতো অর্থ না থাকায় অনেক মেয়েকে প্রয়োজনীয় অর্থের বিনিময়ে ছেলেদের সঙ্গে যৌনকর্মেও বাধ্য করা হচ্ছে৷

বিশ্ব | 05.02.2016

চলতি বছর প্রখ্যাত এক ক্যাম্পেইনারকে গ্রেপ্তারের পর উগান্ডায় স্যানিটারি প্যাডের ইস্যুটি আলোচিত হয়ে উঠে৷ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক স্টেলা নিয়ানজি ফেসবুকে এক পোস্টে নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণ না করায় দেশটির প্রেসিডেন্ট ইওয়েরি মুসেভেনিকে ‘এক জোড়া নিতম্ব' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন৷ নির্বাচনি প্রচারণার সময় মুসেভেনি স্কুলের সব মেয়েকে স্যানিটারি প্যাড দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন৷ তবে চলতি বছরের শুরুতে মুসেভেনির স্ত্রী ফার্স্ট লেডি ও শিক্ষামন্ত্রী জ্যানেট মুসেভেনি জানান, সবাইকে প্যাড দেয়ার মতো পর্যাপ্ত তহবিল নেই৷

এরপর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়ানজি হ্যাশট্যাগপ্যাডসফরগার্লসইউজি #Pads4GirlsUg নামে একটি ক্রাউডফান্ডিং ক্যাম্পেইন শুরু করেন৷ এর মাধ্যমে তিনি স্কুলে প্যাড বিতরণের জন্য অর্থ জোগাড় করছেন৷

ঋতুস্রাব বা মাসিক নিয়ে কয়েকটি ভুল ধারণা

চুল ধোয়া

ঋতুস্রাব হলে বলা হয়, মেয়েদের দু’দিন চুল ধোয়া উচিত নয়৷ এটার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই৷ বরং চিকিৎসকরা বলে থাকেন মাথায় পানি দিলে মাসিকের ব্যথা অনেকটা কমে এবং এতে আরাম পাওয়া যায়৷

ঋতুস্রাব বা মাসিক নিয়ে কয়েকটি ভুল ধারণা

মাসিকের দিনে সাঁতার

আগেরকার দিনে পুকুরে গোসল করতো অনেকেই৷ তাই হয়ত পানি নোংরা হওয়ার ভয়ে এ নিয়ম চালু হয়েছিল যে, মাসিক হলে গোসল করা যাবে না৷ কিন্তু এখনকার গোসলখানায় সে ধরনের কোনো অসুবিধা নেই৷ এমনকি ট্যাম্পন পরে অনেকে সাঁতারও কাটে এ সময়ে৷

ঋতুস্রাব বা মাসিক নিয়ে কয়েকটি ভুল ধারণা

অচ্ছুৎ ও অভিশপ্ত

মাসিকের চারদিন মেয়েদের সাথে এমন ব্যবহার করা হয়, যেন তারা অচ্ছুৎ এবং অভিশপ্ত৷ তাদের গাছে পানিও দিতে দেয়া হয় না৷ আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণা, তাদের দেয়া পানিতে গাছ নাকি মরে যাবে৷

ঋতুস্রাব বা মাসিক নিয়ে কয়েকটি ভুল ধারণা

মসলাযুক্ত খাবার

মাসিকের সময় হরমোন বেশি সক্রিয় থাকে৷ মসলাযুক্ত খাবার তাই না খাওয়া ভালো৷ কিন্তু অনেক বাড়িতে আচার ছুঁতে দেয়া হয় না মেয়েদের, এতে নাকি আচারও নষ্ট হয়ে যাবে৷ এমনকি আচার খেতেও দেয়া হয় না তাদের৷

ঋতুস্রাব বা মাসিক নিয়ে কয়েকটি ভুল ধারণা

যৌন সম্পর্ক নয়

মাসিক চলাকালীন মেয়েদের শরীর কিছুটা দুর্বল থাকে৷ অনেকের খুব ব্যথা হয়৷ তাই এ সময়ে মেয়েদের বিশ্রাম করা দরকার৷ মনে করা হয়, এ সময় যৌন সম্পর্কে লিপ্ত না হওয়াই ভালো৷ স্বামীর উচিত স্ত্রীকে এ সময় বিশ্রাম দেয়া ও যত্ন নেয়া, যাতে তার কাজের চাপ বেশি না হয়৷

ঋতুস্রাব বা মাসিক নিয়ে কয়েকটি ভুল ধারণা

রান্নাঘরে ঢুকতে মানা

অনেক হিন্দু পরিবারে মাসিক চলাকালীন মেয়েদের রান্না ঘরে ঢুকতে দেয়া হয় না৷ বিশেষ করে বড় পরিবারে এ ধরনের কুসংস্কার লক্ষ্য করা যায়, তারা মনে করে এতে খাবার দূষিত হয়৷ এই ধারণা একেবারেই ভুল৷

ঋতুস্রাব বা মাসিক নিয়ে কয়েকটি ভুল ধারণা

বিছানায় শুতে না দেয়া

অনেক পরিবারে মাসিক চলাকালীন মেয়েদের বিছানায় শুতে দেয়া হয় না৷ মাটিতে শুতে বলা হয়৷ কোনো কোনো পরিবারে তো ঘরে নয়, বরং বাইরে,অর্থাৎ বারান্দায় শুতে দেয়া হয় তাদের৷ অথচ এতে যে ঐ মেয়েটির কষ্ট আরো বেড়ে যায়, তা কেউই লক্ষ্য করে না৷

ঋতুস্রাব বা মাসিক নিয়ে কয়েকটি ভুল ধারণা

নাপাক রক্ত!

অনেকেই বলে থাকেন, মাসিকের রক্ত নাপাক, মানে অপবিত্র৷ তাদের ধারণা এই রক্ত দিয়ে জাদু, ঝাড়ফুকও করা যায়৷ আশ্চর্যের বিষয়, শুধুমাত্র অশিক্ষিত পরিবারে নয়, অনেক শিক্ষিত পরিবারেও এ ধারণা প্রচলিত আছে৷

প্রেসিডেন্টকে নিয়ে মন্তব্যের জন্য নিয়ানজিকে প্রায় এক মাস কারাগারে থাকতে হয়েছে৷ তবে সাইবার হয়রানির জন্য এখনও তাঁর বিচার চলছে৷

তবে সরকারি এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্কুলের মেয়েদের প্যাড দেয়ার জন্য একটি দাতব্য সংস্থা ও একটি ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চলছে৷

ইউনিসেফ বলছে, স্কুলগুলোতে মেয়েদের জন্য পৃথক টয়লেট না থাকায় উগান্ডার প্রায় ৬০ শতাংশ মেয়ে পিরিয়ডের সময় ক্লাসে যায় না৷ এভাবে অনেকে পিছিয়ে পড়ে এবং এক সময় স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দেয়৷ আর স্কুল থেকে ঝরে পড়লে তাদের পরিণতি হয় বাল্যবিয়ে৷

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের শিশুরক্ষা প্রোগ্রামের ব্যবস্থাপক প্যাট্রিক আডুপা বলেন, স্কুল থেকে মেয়েদের ঝরে পড়ার একটি অন্যতম বড় কারণ, মাসিকের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যের অভাব৷ ৪০ শতাংশের বেশি মেয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করতে পারে না৷ ‘‘যখন মেয়েরা পিরিয়ড সামলাতে না পেরে স্কুল থেকে ঝরে পড়ে, তখন তাদের পক্ষে বাল্যবিয়ে থেকে বাঁচা কঠিন হয়ে যায়,'' বলেন আডুপা৷

উগান্ডায় বাল্যবিয়ে নিষিদ্ধ হলেও ইউনিসেফ বলছে, প্রতি ১০ জন মেয়ের মধ্যে চার জনের বয়স ১৮ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়৷ আর দশ জনের এক জনের বয়স ১৫ হওয়ার আগেই তাদের বিয়ে হয়৷

আডুপা বলছেন, স্যানিটারি প্যাডের জন্য একজন মেয়েকে মাসে দুই ডলারের মতো খরচ করতে হয়৷ উগান্ডার মতো দেশে সেটি অনেক অর্থ, কারণ, সেখানে প্রতি পাঁচ জনের এক জন দিন প্রতি এক ডলারেরও কম অর্থে জীবনযাপন করে৷

যেসব দেশে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি

নাইজার (৭৬%)

ইউনিসেফ বলছে, আফ্রিকার এই দেশটিতেই বাল্যবিবাহের হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি৷ সেখানে মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৫৷ তবে এটি পরিবর্তন করে ১৮ করার প্রস্তাব করা হয়েছে৷ মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ার পেছনে দরিদ্রতা একটি অন্যতম বড় কারণ হিসেবে কাজ করে৷ এছাড়া বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে মেয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়লে সামাজিকভাবে যে হেনস্তার শিকার হতে হয়, তা এড়াতেও মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয় পরিবার৷

যেসব দেশে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি

সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক (৬৮%)

দ্বিতীয় স্থানে থাকা এই দেশটিতে মেয়েদের বিয়ে করার বা দেয়ার বৈধ সর্বনিম্ন বয়স ১৮৷ তবে বাবা-মা ১৩ বছর বয়সি মেয়েরও বিয়ে দিতে পারেন, যদি আদালত অনুমতি দেয় কিংবা মেয়েটি যদি গর্ভবতী হয়৷ বাবা-মায়ের অনুমতি সাপেক্ষে তার চেয়েও কমবয়সি মেয়েদের বিয়ে দেয়া বৈধ সেখানে৷

যেসব দেশে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি

চাড (৬৮%)

২০১৫ সালের জুনে চাডের সংসদে পাস হওয়া অর্ডিন্যান্সে, মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৫ থেকে বাড়িয়ে ১৮ করা হয়েছে৷ এছাড়া বাল্যবিয়ের সঙ্গে জড়িতদের জরিমানাসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে৷

যেসব দেশে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি

মালি (৫৫%)

মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৬ আর ছেলেদের ক্ষেত্রে ১৮ বছর৷ তবে শরিয়া আইন অনুযায়ী ১৬ বছরের কমবয়সি মেয়েদেরও বিয়ে দেয়া যেতে পারে৷ কমবয়সি মেয়েদের সাধারণত দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করে থাকে বেশি বয়সি পুরুষরা৷

যেসব দেশে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি

বাংলাদেশ (৫২%)

মেয়েদের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বয়স ১৮, ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১৷ তবে সম্প্রতি পাস হওয়া একটি আইনে ‘বিশেষ প্রেক্ষাপট’ বিবেচনায় ১৮ বছরের কম বয়সিদেরও বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে৷

যেসব দেশে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি

বুর্কিনা ফাসো (৫২%)

২০ থেকে ২৪ বছর বয়সি নারী, যাদের বয়স ১৮ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়েছে, তাদের সংখ্যা ধরে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে ইউনিসেফ৷ ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য এতে ব্যবহার করা হয়েছে৷ বুর্কিনা ফাসোতে ১৫ বছরের কম বয়সি মেয়েদের বিয়ের হার ১০ শতাংশ৷ আর ১৮ বছরের কমবয়সিদের ক্ষেত্রে হারটি ৫২ শতাংশ৷

যেসব দেশে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি

গিনি (৫২%)

মা-বাবা’র অনুমতি নিয়ে বা না নিয়ে ১৮ বছরের ছেলে কিংবা মেয়ে সেখানে বিয়ে করতে পারেন৷ দেশটিতে যার যতজন অল্পবয়সি স্ত্রী আছে তার সামাজিক মর্যাদা তত বেশি বলে ধরে নেয়া হয়৷

যেসব দেশে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি

দক্ষিণ সুদান (৫২%)

চরম দারিদ্র্য, যুদ্ধ, দেশের অস্থির পরিবেশ, শিক্ষিতের হার কম হওয়া, মেয়েদের শিক্ষার সুযোগের অভাব - এসব নানা কারণে আফ্রিকার সবচেয়ে নবীন দেশটিতে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়া হচ্ছে৷ অল্প বয়সি মেয়ে ও তাদের পরিবার মনে করে, বিয়ে দেয়ার মাধ্যমে দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে৷

যেসব দেশে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি

মোজাম্বিক (৪৮%)

মেয়েদের জন্য বিয়ের বৈধ সর্বনিম্ন বয়স ১৮৷ তবে পরিবারের সম্মতিতে ১৬ বছর বয়সিরাও বিয়ে করতে পারে বা তাদের বিয়ে দেয়া যায়৷

যেসব দেশে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি

ভারত (৪৭%)

মেয়েদের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বয়স ১৮, আর ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১৷ দেশটিতে ১৫ বছরের কম বয়সি মেয়েদের মধ্যে বিয়ের হার প্রায় ১৮ শতাংশ৷ ভারতের অনেক সমাজে মেয়েদের অর্থনৈতিকভাবে বোঝা মনে করা হয়৷ বিয়ে দেয়ার মাধ্যমে সেই বোঝা স্বামীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া যায় বলে মনে করে অনেক পরিবার৷

জেডএইচ/এসিবি (থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন)

আমাদের অনুসরণ করুন