প্রত্যাহার-বদলিতেই পার পাচ্ছে অপরাধী পুলিশ?

ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার মধ্য দিয়ে পুলিশের অপরাধীর সহযোগী হওয়ার বিষয়টি আবার সামনে এসেছে৷ সামনে এসেছে পুলিশের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার প্রসঙ্গও৷

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন, পুলিশ যদি ঠিক সময় সঠিক ব্যবস্থা নিত তাহলে নুসরাতকে প্রাণ দিতে হতো না৷ দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনকে এরই মধ্যে বদলি করা হয়েছে৷ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পুলিশের আইজি বলেছেন, তার বিরুদ্ধে যদি অপরাধের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে

কিন্তু বিশ্লেষকরা এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বিবেচনা করে বলছেন, সোনাগাজী থানার ওসি দায়িত্বে অবহেলা করেছেন, শুধু এটা বললে তাকে বাঁচিয়ে দেয়া হবে৷ তিনি আসলে সরাসরি অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন৷ অপরাধীদের সহযোগীতে পরিণত হয়েছেন৷ তিনি নুসরাতের যৌন নিপীড়ণকারী ও হত্যাকারীদের সমান অপরাধ করেছেন৷ তাই তাঁরা বলছেন, বদলি বা প্রত্যাহার নয়, এই মামলায় তাকে আসামি করে বিচারের মুখোমুখি করাই হলো আইনের শাসনের দাবি৷

কয়েকটি ঘটনা সামনে আনলেই ওসির অপরাধ সুনির্দিষ্ট করা যায়-

১. গত ২৭ মার্চ নুসরাতকে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা তার অফিস কক্ষে যৌন হয়রানি করেন৷ নুসরাত অভিযোগ করলে থানায় নিয়ে তাকে জেরা করেন ওসি৷ আর সেই জেরায় অনৈতিক প্রশ্ন করেন৷ যার উদ্দেশ্য ছিল নুসরাতের অভিযোগ নাটক বলে চালিয়ে দেয়া৷ এই জেরা তিনি ভিডিওও করেন৷ নুসরাত মুখ ঢেকে কথা বললেও তিনি বার বার মুখ থেকে হাত সরানোর চেষ্টা করেন৷ ওই ভিডিও তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে দিয়েছেন৷

বিশ্লেষকরা বলছেন এর মাধ্যমে তিনি প্রথমত নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনে অপরাধ করেছেন৷ দ্বিতীয়ত, জিজিটাল সিকিউরিটি আইনেও অপরাধ করেছেন৷

২. গত ৬ এপ্রিল সকালে পরীক্ষার আগে নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়৷ আর এটাকে ওসি সরাসরি আত্মহত্যা বলে প্রচার করেন৷ সংবাদ মাধ্যমের কাছেও বলেন৷ এখানেও ওসির উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট৷ এটা অপরাধীদের সহযোগিতা করার অপরাধ৷ যিনি অপরাধ করেছেন তার সমান অপরাধহিসেবেই গণ্য হচ্ছে এটি৷

নুসরাত ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসতালে মারা যান।

এই ঘটনার সঙ্গে আরো অনেকের মতো অপরাধীদের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদ আলম৷ তিনিও অধ্যক্ষকে রক্ষায় শিক্ষার্থীদের দিয়ে অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে মিছিল বের করিয়েছেন৷ ওসির মত তিনিও নুসরাতের শরীরে আগুন দেয়ার ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করেন৷ স্থানীয় সাংবাদিকদের তা লেখার জন্য চাপও দিয়েছেন৷ ফলে শুধু অপরাধীর সহযোগী নয় ওসি রাজনৈতিক ‘সেবা' দেয়ারও চেষ্টা করেছেন৷

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সোনাগাজীর ওসি যা করেছেন সেটাকে দায়িত্বে অবহেলা বললে তার অপরাধ কমিয়ে দেখা হবে৷ তিনি যা করেছেন, তা হলো সরাসরি অপরাধীদের সহযোগিতা করেছেন৷ এটা ফৌজদারী অপরাধ৷ তাকে যদি এই অপরাধে শাস্তির আওতায় আনা না হয় তাহলে ন্যায় বিচার হবে না৷''

তিনি বলেন, ‘‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, পুলিশ প্রশাসনের অনেকেই এখন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থেকে তাদের অনেক অন্যায় সুবিধা দিয়ে থাকেন৷ এর মাধ্যমে তারা নিজেরাও অনৈতিক সুবিধা নেয়৷ আর তারা মনে করে, প্রভাবশালী রাজনীতিকদের সঙ্গে থাকলে তারা যেকোনো অন্যায় এবং অনৈতিক কাজ করে টিকে যাবেন৷ এটি একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা৷ বাংলাদেশে এর কারণে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ না করলে কোনো কাজ হয়না৷''

এখন লাইভ
04:26 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 14.04.2019

‘শাস্তির আওতায় আনা না হয় তাহলে ন্যায় বিচার হবেনা’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে অপরাধী এবং দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে৷ তাদের অনুকম্পা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই৷''

২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর চালু করে ‘আইজিপিস কমপ্লেইন সেল'৷ এই সেলে ফোন করে বা ই-মেইল করে অথবা কুরিয়ারে চিঠি লিখে অভিযোগ জানানো যাবে৷ এই অভিযোগ জানানোর সুযোগ চালুর পর গত তিন সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ২০টি করে অভিযোগ জমা পড়ছে পুলিশ সদর দপ্তরে৷ তবে এর প্রচার না থাকায় নাগরিকরা তেমন জানেন না৷ প্রচার হলে এই অভিযোগের সংখ্যা অনেক বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা৷

পুলিশ সদর দপ্তরে সিকিউরিটি সেলেও অভিযোগ করা যায়৷ পুলিশ সদর দপ্তরের সিকিউরিটি সেলের তথ্য মতে, গত ৫ বছরে পুলিশের বিরুদ্ধে ৭২১টি ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছে৷ এই মামলাগুলোতে ৭৯৮ জন পুলিশ সদস্য আসামি৷ শুধু  ২০১৬ সালেই পুলিশের বিরুদ্ধে ১২৮টি মামলা দায়ের হয়েছে৷

অন্য দিকে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতরে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত পাঠায়৷ ২০১২ সালে ১৫৬টি, ২০১৩ সালের ১০টি, ২০১৪ সালের ৫৩টি, ২০১৫ সালের ৭৩টি এবং ২০১৬ সালর ১৬টি অভিযোগ রয়েছে৷

সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এইসব অভিযোগের মধ্যে সর্বোচ্চসংখ্যক অভিযোগ রয়েছে গুমের৷ এর সংখ্যা ২৭টি৷ ২৪টি অভিযোগ পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের৷ পুলিশি হয়রানির অভিযোগ রয়েছে ২০টি৷ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও ক্রসফায়ারের অভিযোগ রয়েছে ১২টি৷ ৭টি অভিযোগ রয়েছে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর৷ সঠিক তদন্ত না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে ৪টি৷ জমি ও সম্পত্তি দখলের অভিযোগ রয়েছে ৪টি৷ ৪টি অভিযোগ রয়েছে চাঁদাবাজির৷ ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে ২টি করে৷ এছাড়া ঘুষ, অর্থ  আদায়, লুটপাট, গ্রেপ্তারের পর অস্বীকার ও ভূমি দখলের অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে৷

এখন লাইভ
02:40 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 14.04.2019

‘ওসিরা সরাসরি মন্ত্রীদের কাছে গিয়ে বসে থাকেন’

অধ্যাপক মিজানুর রহমান মনে করেন, ‘‘পুলিশের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের সখ্যতা এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেয়ার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে৷''

পুলিশের সাবেক এআইজি এবং মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান সৈয়দ বজলুল করিম বলেন, ‘‘এখন তো ওসিরা সরাসরি মন্ত্রীদের কাছে গিয়ে বসে থাকেন৷ তারা যদি সরাসরি সেখানে যেতে পারেন তাহলে তারা চেইন অব কমান্ড মানবেন কেন৷ তাই তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছেন৷ আমার মনে হয় পুলিশের একটা অংশ এখন অর্থ দ্বারা মোটিভেটেড৷ তারা ন্যায়-নীতি ও দায়িত্ববোধের তোয়াক্কা করে না৷ ফলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে৷''

তিনি বলেন, ‘‘যে দেশের পুলিশিং ভালো সে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো থাকে৷ মানুষ বিপদে পড়ে পুলিশের কাছে যায়৷ সেখানে যদি সঠিক এবং নিরপেক্ষ ট্রিটমেন্ট না পায় তাহলে সে হতাশ হয়৷ আর এই হতাশা তখন রাষ্ট্র ব্যবস্থারও ওপর গিয়ে পড়ে৷ তাই পুলিশ তার দায়িত্বে অবহেলা করলে, দায়িত্ব পালন না করলে এবং অন্যায় আচরণ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হয়৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘ফেনীর ঘটনা আমাকে ব্যথিত করেছে, কষ্ট দিয়েছে৷ পুলিশ যদি শুরু থেকে মেয়েটিকে আইনগত প্রটেকশন দিত তাহলে তার জীবন যেতো না৷ আর এখন যে তথ্য পাচ্ছি, তাতে তো মনে হচ্ছে ওসি অপরাধীদের সঙ্গে যুক্ত৷ তাই ওসির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি হয়ে পড়ছে৷''

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ‘গুলি করে হত্যার’ ঘটনা বেড়েছে

২০১৮ সাল (নভেম্বর পর্যন্ত), ৪০৬ জন

চলতি বছর ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ‘গুলি করে হত্যা’ করা হয়েছে ৪০৬ জনকে৷ নিহতদের মধ্যে ৩২১ জনকে গ্রেপ্তারের আগে এবং ৮৫ জনকে গ্রেপ্তারের পর হত্যা করা হয়েছে৷ রিপোর্টে বলা হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, এদের মধ্যে ২৬১ জন মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত৷ মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয় চলতি বছরের ৪ঠা মে থেকে৷

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ‘গুলি করে হত্যার’ ঘটনা বেড়েছে

২০১৭ সালের চেয়ে তিনগুণ

চলতি বছর তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের সংখ্যা গত বছরের প্রায় তিনগুণ৷ ২০০৫ সালে নিহত হয়েছিল ৩৫৪ জন, যা ছিল গত বছর পর্যন্ত সর্বোচ্চ৷ ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরে নিহতের সংখ্যা ২০০’র নীচে ছিল৷ ২০০৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২০১৩ সালে ‘গুলি করে হত্যা’র ঘটনা ছিল সবচেয়ে কম৷ সে বছর ৪২ জন নিহত হয়েছিলেন৷

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ‘গুলি করে হত্যার’ ঘটনা বেড়েছে

২০১৭ সাল, ১২৬ জন

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ‘গুলি করে হত্যা’ করা হয়েছে মোট ১২৬ জনকে৷ এদের মধ্যে ৯৭ জনকে গ্রেপ্তারের আগে এবং ২৯ জনকে গ্রেপ্তারের পর হত্যা করা হয়৷

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ‘গুলি করে হত্যার’ ঘটনা বেড়েছে

২০১৬ সাল, ১৫৯ জন

২০১৬ সালে ‘গুলি করে হত্যা’ করা হয়েছে মোট ১৫৯ জনকে৷ এদের মধ্যে ১২৩ জনকে গ্রেপ্তারের আগে এবং ৩৬ জনকে গ্রেপ্তারের পর হত্যা করা হয়৷

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ‘গুলি করে হত্যার’ ঘটনা বেড়েছে

২০১৫ সাল, ১৪৬ জন

এ বছর মোট ১৪৬ জনকে ‘গুলি করে হত্যা’ করা হয়েছে৷ এদের মধ্যে ৯৫ জনকে গ্রেপ্তারের আগে এবং ৫১ জনকে গ্রেপ্তারের পর হত্যা করা হয়৷

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ‘গুলি করে হত্যার’ ঘটনা বেড়েছে

২০১৪ সাল, ১২৮ জন

ঐ বছর মোট ১২৮ জনকে ‘গুলি করে হত্যা’ করা হয়েছে৷ তাদের মধ্যে ৭৯ জনকে গ্রেপ্তারের আগে এবং ৪৯ জনকে গ্রেপ্তারের পর হত্যা করা হয়৷

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ‘গুলি করে হত্যার’ ঘটনা বেড়েছে

২০১৩ সাল, ৪২ জন

ঐ বছর মোট ৪২ জনকে ‘গুলি করে হত্যা’ করা হয়েছে৷ ৪০ জনকে গ্রেপ্তারের আগে এবং ২ জনকে গ্রেপ্তারের পর হত্যা করা হয়৷

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ‘গুলি করে হত্যার’ ঘটনা বেড়েছে

২০১২ সাল, ৫৮ জন

ঐ বছর মোট ৫৮ জনকে ‘গুলি করে হত্যা’ করা হয়৷ ৫৭ জনকে গ্রেপ্তারের আগে এবং ১ জনকে গ্রেপ্তারের পর হত্যা করা হয়৷

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ‘গুলি করে হত্যার’ ঘটনা বেড়েছে

২০১১ সাল, ৬২ জন

২০১১ সালে মোট ৫৮ জনকে ‘গুলি করে হত্যা’ করা হয়৷ এদের মধ্যে ৬০ জনকে গ্রেপ্তারের আগে এবং ২ জনকে গ্রেপ্তারের পর হত্যা করা হয়৷

আমাদের অনুসরণ করুন