প্লাস্টিক দূষণ, মহাসাগরে চরম বিপর্যয়

পণ্যের মোড়ক বা ব্যাগ ছাড়াও নানা কাজে ব্যবহার হয় প্লাস্টিক৷ কিন্তু এই প্লাস্টিকের শতকরা ২ ভাগের স্থান হচ্ছে মহাসাগরে৷ জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে, যা থেকে মানুষেরও বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ৷

কাগজ বা কাপড়ের তুলনায় অনেক টেকসই প্লাস্টিক৷ এ কারণেই বিভিন্ন পণ্যের মোড়কে এখনও সবার পছন্দ এই পণ্য৷ কিন্তু এই একই কারণে ‘বন্ধু' প্লাস্টিক এখন পরিণত হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘শত্রু'তে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

এখন প্লাস্টিক ছাড়া একদিনও কল্পনা করা যায় না৷ কিন্তু ইতিহাস বিবেচনায় প্লাস্টিক একেবারেই নতুন একটি পণ্য৷ ১৯৫০ সালেই পুরো পৃথিবীতে প্লাস্টিকের উৎপাদন ছিল মাত্র ২ দশমিক ২ টন৷ ৬৫ বছর পর, ২০১৫ সালে সে পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪৮ মিলিয়ন টনে৷ কল্পনা করা যায়!

পৃথিবীতে এখন প্রতি বছর মাথাপিছু ৬০ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহার হয়৷ উত্তর আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ এবং জাপানের মত শিল্পোন্নত দেশগুলোতে এই পরিমাণ মাথাপিছু ১০০ কেজিরও বেশি৷

বাংলাদেশে এ পরিমাণ বিশ্ব তো বটেই, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায়ও অনেক কম৷ বেসরকারি সংস্থা ওয়েইস্ট কনসার্নের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মানুষ মাথাপিছু ৩ দশমিক ৫ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহার করেছে৷ শ্রীলঙ্কাতে এই পরিমাণ ৬ কেজি৷ কিন্তু ব্যবহার কম হলে যে বাংলাদেশের ক্ষতিও কম হচ্ছে, তা কিন্তু নয়৷

Bangladesch Dhaka Plastikflaschen Müll

প্রথমত, অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক খারাপ৷ ফলে প্লাস্টিক, কাঁচ, কাগজ, কাপড় বা পচনশীল দ্রব্য আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনা না করায় অধিকাংশ প্লাস্টিকের মতো অপচনশীল দ্রব্য মিশছে মাটিতে৷

দ্বিতীয়ত, মানুষের মধ্যে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে সচেতনতা না থাকায় নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট দ্রব্য ফেলার সংস্কৃতি এখনও বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি৷ ফলে দেশের আনাচেকানাচে বিনাবাধায় ছড়িয়ে পড়ছে প্লাস্টিক৷

তৃতীয়ত, নদী-নালা খাল-বিলের দেশ বাংলাদেশ৷ ফলে পানির অবিরাম প্রবাহ দেশের অধিকাংশ প্লাস্টিক বয়ে নিয়ে ফেলছে সমুদ্রে৷

প্লাস্টিকে ব্যবহার ও ক্ষতি নিয়ে নতুন এক গবেষণা বলছে, ১৯৫০ সাল থেকে অপরিশোধিত তেল দিয়ে তৈরি হয়েছে ৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন টন প্লাস্টিক৷ এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ এখনও বাসাবাড়ি, গাড়ি বা কারখানায় ব্যবহার হচ্ছে৷ আরো ১০ শতাংশ প্লাস্টিক পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে গবেষণায়৷

Bangladesch Dhaka Frau sortiert Plastikmaterial

কিন্তু বাকি ৬০ শতাংশ প্লাস্টিকের হদিস মেলেনি এই গবেষণায়৷ এ হিসেবে মাথাপিছু প্রায় ৬৫০ কিলোগ্রাম প্লাস্টিক বর্জ্য কোথাও না কোথাও পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে৷ এই ‘কোথাও না কোথাও'-টা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মহাসগর৷ প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন বলছে উৎপাদিত প্লাস্টিকের শতকরা ২ ভাগেরই স্থান হয় মহাসাগরে৷

‘ওয়েইস্ট কনসার্নের' প্রতিবেদন বলছে বাংলাদেশে ৫ লাখ টনেরও বেশি প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার হয়৷ এর মধ্যে রিসাইকেল হয় মাত্র ৯ দশমিক ২ শতাংশ৷

প্লাস্টিক বছরের পর বছর পরিবেশে টিকে থাকতে পারে৷ মহাসাগরে ধীরে ধীরে টুকরো টুকরো হয়ে প্লাস্টিকের পণ্য প্রথমে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়৷ পানি ও অন্য খাদ্যের সাথে একসময় এই মাইক্রোপ্লাস্টিক বিভিন্ন জীবের দেহে প্রবেশ করে৷ একসময় মাছের সাথে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করে এই মাইক্রোপ্লাস্টিক যা ঘটায় চরম স্বাস্থ্য বিপর্যয়৷

Infografik Global Ideas Plastik EN

এছাড়া তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় বেশিরভাগ কাপড়েই সিনথেটিক ফাইবারের ব্যবহারও বেড়েছে৷ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে তৈরি একটি জ্যাকেট একবার ধুলে ১০ লাখেরও বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিকের টুকরো মেশে ওয়াশিং মেশিনের পানিতে৷ সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক গবেষণায় দেখা গেছে ওয়াশিং মেশিন থেকে প্রতি বছর ৩০ হাজার টন সিনথেটিক ফাইবার পানিতে মেশে৷

বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও প্লাস্টিকের ব্যবহার সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে৷ বিভিন্ন পণ্যে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পাটের মতো পচনশীল পণ্যের ব্যবহার উৎসাহিত করছে৷ কিন্তু প্লাস্টিকের ব্যবহার যে হারে ছড়িয়েছে, তাতে এই ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রতুল, বলছেন গবেষকরা৷

বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১২ বিলিয়ন টনে৷ ধেয়ে আসা এই প্লাস্টিক দুর্যোগের ধাক্কা একসময় প্রাকৃতিক উপায়েই কাটিয়ে উঠবে পৃথিবী, কিন্তু মানবজাতি পারবে তো?

টন টন আবর্জনা

প্রতিবছর প্রায় ৮০ লাখ টন প্লাস্টিক আবর্জনা সাগরে গিয়ে পড়ে বলে এলেন ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশনের একটি রিপোর্টে প্রকাশ৷ রিপোর্টে সাবধান করে দেওয়া হয়েছে যে, জরুরিভাবে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ২০৫০ সালের মধ্যে সাগরে মাছের চেয়ে প্লাস্টিক আবর্জনার পরিমাণই বেশি হবে৷ প্রশান্ত মহাসাগরের এক প্রান্তে অবস্থিত মিডওয়ে আইল্যান্ডের সৈকতও আজ আবর্জনামুক্ত নয়৷

প্লাস্টিকের খদ্দের

সবাই যে প্লাস্টিক অপছন্দ করে, এমন নয়৷ প্লাস্টিক ভেঙে ছোট ছোট টুকরো হয়ে গেলে সাগরের প্রাণীরা তাকে খাদ্য বলে ভুল করে৷ উপশালা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, প্লাস্টিক খাওয়ার ফলে মাছের বৃদ্ধি কমে যায়, মৃত্যুহার বাড়ে৷ মজার কথা, কিছু কিছু মাছ যেন প্লাস্টিক খেতেই ভালোবাসে! কিন্তু এভাবে মাছ থেকে মানুষের খাদ্যচক্রেও এসে পড়ে প্লাস্টিক৷

যে প্লাস্টিক খাওয়া যায়

ওসেন কনজারভেন্সি সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৬৯০টি প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী প্লাস্টিক দূষণের কবলে পড়েছে৷ কাজেই কোম্পানিগুলি প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের নানা বিকল্প বের করার চেষ্টা করছে৷ ফ্লোরিডার একটি বিয়ার তৈরির কোম্পানি, ডেলরায় বিচ ক্রাফ্ট ব্রুয়ারি, তাদের ছয় ক্যানের সিক্সপ্যাক বাঁধার রিং, বিয়ার তৈরি থেকে উদ্বৃত্ত গম আর বার্লি দিয়ে বানানোর পরিকল্পনা করছে৷ আগামী অক্টোবরে প্রোডাকশন শুরু হবে৷

বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেজিং

ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক প্যাকেজিং সাগরে প্লাস্টিক আবর্জনার একটা বড় অংশ৷ কোম্পানিরা যার বায়োডিগ্রেডেবল, অর্থাৎ সহজে পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায়, এমন বিকল্প বার করার চেষ্টা করছে৷ পোল্যান্ডের একটি কারখানায় সে কাজে গমের ফ্যান ব্যবহার করা হচ্ছে৷ ইয়ের্জি ভিসোচকি যে বিওট্রেম প্যাকেজিং আবিষ্কার করেছেন, তা ওভেন কিংবা ডিপ ফ্রিজে ব্যবহার করা চলে; ত্রিশ দিনের মধ্যে ক্ষয় পেয়ে যায়; আবার খাওয়াও চলে৷

প্লাস্টিকের বিকল্প বাঁশ

বাঁশগাছ খুব তাড়াতাড়ি বাড়ে, তাই বাঁশ প্লাস্টিকের বিকল্প হতে পারে৷ বাঁশ থেকে টুথব্রাশ, বাথরুমে পর্দা ঝোলানোর ডান্ডা, রান্নার বাসনকোসন, এমনকি কম্পিউটারের পার্টস পর্যন্ত তৈরি করা যায়৷ টংগু জিয়াংকিয়াও ব্যাম্বু অ্যান্ড উড ইনডাস্ট্রি কোম্পানি বাঁশের কি-বোর্ড, মাউস আর মনিটরের কেস তৈরি করা শুরু করে ২০০৮ সালে৷

ওসেন স্কিমার

প্লাস্টিকের বিকল্প দিয়ে প্লাস্টিক আবর্জনার পরিমাণ কমানো যেতে পারে, কিন্তু তা সত্ত্বেও লক্ষ লক্ষ টন প্লাস্টিক বহ শতাব্দি ধরে সাগরের পানিতে ভেসে বেড়াবে ও ধীরে ধীরে ক্ষয় পাবে৷ ওলন্দাজ ওসেন ক্লিনআপ সংস্থা একটি ১০০ কিলোমিটার দৈর্ঘের ভাসমান বাঁধ দিয়ে সেই প্লাস্টিক আবর্জনাকে ধরে রাখবে৷ প্রশান্ত মহাসাগরে ২০২০ সালের মধ্যে এরকম একটি ভাসন্ত বাঁধ নিয়োগ করার কথা৷

আবর্জনা থেকে ফ্যাশন

প্লাস্টিকের একাংশ রিসাইকেল করায় কোনো বাধা নেই: তা দিয়ে ফুলের টব, বাড়িঘরের ইনসুলেশন, এমনকি জামাকাপড় পর্যন্ত তৈরি করা যায় - যেমন স্পেনের ইকোঅ্যাল্ফ কোম্পানির তৈরি জ্যাকেট৷ ২০০টি মাছধরার নৌকো প্রতিদিন ভূমধ্যসাগর থেকে যে পরিমাণ প্লাস্টিক আবর্জনা সংগ্রহ করে, তা গুঁড়ো করে তা থেকে পলিয়েস্টার ফাইবার বানিয়ে, সেই ফাইবার দিয়ে এই সব জ্যাকেট ও অন্যান্য ফ্যাশনেবল জামাকাপড় তৈরি করা হয়৷

প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাও, রিসাইকল করো

প্লাস্টিকের আবর্জনা অপরিবর্তিত রেখেই তা পুনর্ব্যবহার করা চলে৷ ২০১২ সালে রিও ডি জানিরো-য় জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সম্মেলনে রিও-র ওয়াটারফ্রন্টে যে সুবিশাল মাছের ভাষ্কর্য প্রদর্শন করা হয়েছিল, তা ছিল প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে তৈরি৷

কিভাবে রক্ষা পাওয়া যায় এই দুর্যোগ থেকে? অাপনার মন্তব্য লিখুন নীচের ঘরে৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়