ফুডব্যাংকে ‘নাৎসি’ আতঙ্ক

ফুডব্যাংক থেকে বিনামূল্যে খাদ্য পাবেন কেবলমাত্র জার্মান পাসপোর্ট থাকা মানুষেরা৷ নতুন এই নিয়মের মধ্যে ‘নাৎসি’ মনোভাব দেখতে পাচ্ছেন শরণার্থীরা৷ শুরু হয়েছে বিতর্ক৷

আবার ফিরে এলো ‘নাৎসি’ শব্দের প্রয়োগ, যা নিয়ে উত্তাল জার্মানির সমাজ-রাজনীতি৷

ঘটনার সূত্রপাত এসেন শহরে৷ সেখানে উপার্জনহীন মানুষদের জন্য বিনামূল্যে খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা আছে৷ একটি এনজিও'র মাধ্যমে সেই কাজটি করা হয়৷ সাধারণত রেস্তোরাঁ এবং দোকানগুলি থেকে মেয়াদ শেষের তারিখের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া খাবার নিয়ে আসা হয় ওই সংস্থায়৷ তারপর প্রতি সপ্তাহে সেই খাবার বিলি করা হয় সাধারণ মানুষের মধ্যে৷ লক্ষ্য করা গিয়েছে, অধিকাংশ ক্রেতাই সেখানে বয়স্ক জার্মান মানুষেরা৷ বিনামূল্যে খাবার নিয়ে যাঁরা দিন নির্বাহ করেন৷

জার্মানির মতো ধনী দেশে শিশুদের দরিদ্রতা হুমকির মুখে 

সিঙ্গেল বা একক মা-বাবার পরিবার

জার্মানির ব্যার্টেলসমান ফাউন্ডেশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, জার্মানির বহু পরিবারের দারিদ্রতা যা এতদিন ধারণা করা হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি৷ বিশেষ করে সিঙ্গেল বা একক মা-বাবার পরিবারের সন্তানদের ক্ষেত্রে এমনটা বেশি দেখা যায়৷

জার্মানির মতো ধনী দেশে শিশুদের দরিদ্রতা হুমকির মুখে 

সমীক্ষার ফলাফল

জার্মানির বোখুম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা নতুন ও উন্নত পদ্ধতিতে একটি সমীক্ষা চালিয়েছিলেন৷ এই সমীক্ষায় দেখা গেছে যে সিঙ্গেল বাবা-মা’দের দারিদ্রসীমার নীচে চলে যাবার ঝুঁকি ৬৮ শতাংশ, অর্থাৎ যা কিনা আগের সমীক্ষার চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি৷

জার্মানির মতো ধনী দেশে শিশুদের দরিদ্রতা হুমকির মুখে 

দরিদ্রতার চালচিত্র

সমীক্ষা থেকে আরও জানা গেছে যে এক সন্তানসহ দম্পতিরা শতকরা ১৩ শতাংশ গরিব, আর যাদের তিনটি সন্তান, তাদের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যসীমার ঝুঁকি শতকরা ১৮ভাগ৷ আর প্রতি পাঁচজন শিশুর একজনই গরিব৷ তাছাড়াও ‘যে একবার গরীব সে দীর্ঘদিন গরিব থাকে’ – একথা জানা যায় গত বছর প্রকাশিত একটি সমীক্ষায়৷

জার্মানির মতো ধনী দেশে শিশুদের দরিদ্রতা হুমকির মুখে 

পরিবর্তনের আহ্বান

জার্মানি অর্থনীতির দিক থেকে ইউরোপের শক্তিশালী দেশ হলেও এ দেশের সব শিশুরা ভালো নেই৷ তাই ফাউন্ডেশনটি জার্মনির পরিবার এবং সমাজকল্যাণ বিষয়ক নীতিতে পরিবর্তন আনার ডাক দিচ্ছে৷

জার্মানির মতো ধনী দেশে শিশুদের দরিদ্রতা হুমকির মুখে 

প্রতিটি শিশুর জন্য বাড়তি খরচ

গত ২৫ বছরে দেখা গেছে যে সিঙ্গেল বা একক মা-বাবার পরিবারের তুলনায় সন্তানহীন দম্পতির অর্থনৈতিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো ছিলো৷ যাদের সংসারে সন্তানের সংখ্যা যত বেশি, তাদের অর্থনেতিক অবস্থা তত খারাপ৷ সন্তানের সংখ্যা যত বাড়বে, পরিস্থিতি ততটাই খারাপ হবে বলে জানান বার্টেলসম্যান ফাউন্ডেশনের প্রধান ইয়র্গ ড্রেগার৷

জার্মানির মতো ধনী দেশে শিশুদের দরিদ্রতা হুমকির মুখে 

সরকারি সহায়তার আহ্বান

সরকার থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া সত্ত্বেও সন্তানসহ পরিবারের অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয়নি৷ এই পরিস্থিতিতে জার্মানির এক শিশুকল্যাণ সংগঠন পরিবার কল্যাণের সরকারি কাঠামোয় আমূল সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে৷

সমস্যা অন্যত্র৷ গত কয়েকবছরে জার্মানিতে শরণার্থীর সংখ্যা বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে৷ অভিযোগ, শরণার্থীরাও বিনামূল্যের খাবারের জন্য লাইন দিতে শুরু করেছেন৷ এবং সংখ্যায় তাঁরা এতই বেশি যে, বৃদ্ধ জার্মানরা নাকি তাঁদের ভয় পাচ্ছেন এবং সে কারণে তাঁরা আর বিনামূল্যের খাবারের দপ্তরে যেতে চাইছেন না৷

এসব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত হয়েছে, জার্মান পাসপোর্ট না থাকলে কাউকে আর ওই সংস্থা থেকে খাদ্য দেওয়া হবে না৷ আর তার ফলেই দাবানল লেগে গিয়েছে৷ সম্প্রতি ওই সংস্থার দপ্তর এবং গাড়িগুলিতে কে বা কারা লিখে দিয়ে গিয়েছে, ‘নাৎসি’ শব্দটি৷ খাবার না পাওয়ার কারণেই ক্ষোভের এই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে৷ এবং তারপর থেকে সন্ত্রস্ত হয়ে আছে সব পক্ষই৷ সংস্থাটির অন্যতম আধিকারিক জর্জ সারতর জানিয়েছেন, সংস্থার কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে তিনি চিন্তিত৷ কারণ, তাঁদের অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন৷ প্রতিবাদীরা এরপর আরো বড় ঘটনা ঘটাতে পারেন, এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না৷ তবে তাঁদের সংস্থার সঙ্গে ‘নাৎসি’ শব্দটিকে জড়িয়ে দেওয়া নেহাতই বালখিল্য বলে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি৷

এসেন-এর ঘটনার তাপ গোটা জার্মানিতেই লাগছে৷ বামমনস্ক রাজনীতিবিদেরা বলছেন, যে প্রক্রিয়ায় সংস্থাটি শরণার্থীদের বাতিল করেছেন, তা মেনে নেওয়া যায় না৷ বস্তুত, সময় আলাদা করে কিংবা দিন আলাদা করেও সমস্যার মোকাবিলা করা যেতো৷ এর ফলে জার্মান মানুষের সঙ্গে শরণার্থীদের দূরত্ব বাড়বে বলেই তাঁদের বিশ্বাস৷ সব মিলিয়ে নতুন করে ‘নাৎসি' জ্বরে ভুগতে শুরু করেছে জার্মানি৷

এলিজাবেথ শুমাখার/এসজি

আমাদের অনুসরণ করুন