ফ্যাশন তরঙ্গ

‘ভোগ' এমন একটি ফ্যাশন ম্যাগাজিন, যা ২২টি ভাষায় মাসে মোট তিন কোটি বার বিক্রি হয়৷ এখন চলেছে ব্রিটিশ ‘ভোগ'-এর একশ' বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে লন্ডনের ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারিতে একটি প্রদর্শনী৷

লন্ডনের ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারিতে ভোগ ম্যাগাজিনের গত একশ' বছরের ইতিহাস নিয়ে একটি প্রদর্শনী চলছে৷ মহিলাদের ফ্যাশন ও জীবনধারার এক চটুল, চলমান কাহিনি৷

‘ভোগ ১০০' প্রদর্শনীর কিউরেটর রবিন মুইর বলেন, ‘‘‘ভোগ' তো শুধু জামাকাপড় নিয়ে নয়, ‘ভোগ' হলো মানুষজনকে নিয়ে; যিনি ছবিটা তুলছেন, যার ছবি তোলা হচ্ছে, এদের নিয়ে৷ এডোয়ার্ড স্ট্রাইকেন, সেসিল বিটন, ম্যান রে, লি মিলার, এরউইন ব্লুমেনফেল্ড, আর্ভিং পেন, ‘ভোগ'-এর বড় বড় নামগুলো মডার্ন ফটোগ্রাফির বড় বড় নাম৷ এরা বিংশ শতাব্দীর আলোকচিত্র শিল্পকে গড়ে দিয়েছেন৷ কাজেই প্রদর্শনীটা দেখলে আপনার মনে হবে, বিংশ শতাব্দীর ফটোগ্রাফি কোথায় পৌঁছেছিল – থ্যাংকস টু ‘ভোগ'!''

এখানে যে সব ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে, তাদের কয়েকটিকে ‘ঐতিহাসিক' বললেও ভুল বলা হবে না৷ যেমন মার্কিন আলোকচিত্র শিল্পী ম্যান রে-র প্রখ্যাত করসেট-পরিহিতা নারীর ছবি৷ কিছু ছবি যুগ বদলানোর আভাস দিচ্ছে৷

‘ভোগ’-এর একশ বছর পূর্তিতে প্রদর্শনী

১৯৯০ সালে জার্মানির পেটার লিন্ডব্যার্গ ‘ভোগ' ম্যাগাজিনের হয়ে প্রথম প্রজন্মের সুপার মডেলদের ছবি তোলেন৷ তিন বছর পরে ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার করিন ডে তরুণ কেট মস-কে নিয়ে ছবি তোলেন, যা গ্রাঞ্জ ফ্যাশনের কথা মনে করিয়ে দেয়৷ পরের কয়েক বছর এই গ্রাঞ্জ ফ্যাশনই চালু ছিল দুনিয়ার ফ্যাশন মেট্রোপোলিসগুলোতে৷

মেইনস্ট্রিম হলেও মনে রাখার মতো

জোসেফিন কলিন্স পেশায় ফ্যাশন জার্নালিস্ট; পড়ান লন্ডনের কলেজ অফ ফ্যাশন-এ৷ চার দশকের বেশি সময় ধরে ‘ভোগ'-এর পাঠিকা তিনি৷ জোসেফিন বলেন, ‘‘‘ভোগ' একটা মেইনস্ট্রিম ম্যাগাজিন হলেও, যা কিছু ঘটছে, তার একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করে৷ প্রতিমাসে যা-হোক একটা ইস্যু বের না করে, ওরা সত্যিই ভালো কিছু দেবার চেষ্টা করে৷ সেভাবেই ওরা ওদের মনে রাখার মতো ছবিগুলো বের করতে পেরেছে বলে আমার ধারণা৷ সেটা ওদের কোয়ালিটি আর প্রোডাকশন দেখলে বোঝা যায়৷''

লন্ডনের প্রদর্শনীটি দিয়ে ব্রিটিশ ‘ভোগ' ম্যাগাজিনের একশো বছর পূর্তি উদযাপন করা হচ্ছে – যদিও আসলে ‘ভোগ' ম্যাগাজিনটি জন্ম নেয় ১৮৯২ সালে নিউ ইয়র্ক শহরে৷ মার্কিন প্রকাশক কন্ডে মন্টরোজ ন্যাস্ট পত্রিকাটি কেনেন ১৯০৯ সালে – শুরু হয় ‘ভোগ'-এর বিশ্বব্যাপী জয়যাত্রা৷

'ফাস্ট ফ্যাশন': প্রদীপের নীচেই অন্ধকার

বিশেষ মূল্য ছাড়ের মূল্য

সব ধরনের পছন্দ আর সবরকম দামের জামাকাপড় সরবরাহ করার জন্য ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি এমন সব দেশে গার্মেন্টস তৈরি করাচ্ছে, যেখানে পরিবেশ সুরক্ষার মান ও পারিশ্রমিক, দুই-ই নীচের দিকে৷ ড্রেসডেনের ‘ফাস্ট ফ্যাশন’ প্রদর্শনীতে ফ্যাশন নামের বিগ বিজনেসের যবনিকার আড়ালে উঁকি মারা হয়েছে৷ প্রদর্শনীটি চলবে ২০১৬ সালের ৩রা জুন অবধি৷

'ফাস্ট ফ্যাশন': প্রদীপের নীচেই অন্ধকার

গ্ল্যামারের অপর পীঠ

শুরু থেকে ‘শ্রেডিং’ বিশেষ দূর নয়৷ পশ্চিমের মানুষ নিত্যনতুন পণ্য চায় ও কেনে – প্রয়োজনের অনেক বেশি৷ ড্রেসডেনের প্রদর্শনীতে দেখতে পাওয়া যাবে এর অর্থনৈতিক, নৈতিক ও পরিবেশগত ফলশ্রুতি৷ পশ্চিমি জীবনধারার ফলে বাংলাদেশের মানুষ কতটা প্রভাবিত হচ্ছেন?

'ফাস্ট ফ্যাশন': প্রদীপের নীচেই অন্ধকার

রিসাইক্লিং, নাকি সস্তায় আবর্জনা সরানো?

ইউরোপে বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা যে সব পুরনো জামাকাপড় সংগ্রহ করেন, তার ৬০ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে পাঠানো হয়৷ ধরন, রং ও ফ্যাশন অনুযায়ী বড় বড় গাঁট বেঁধে, জাহাজে করে সারা পৃথিবীতে রপ্তানি করা হয়৷ ভারতের পানিপথে পুরনো গরম জামাকাপড় আবার রং অনুযায়ী ভাগ করা হয় – তার ফলে নাকি তার দাম বাড়ে৷

'ফাস্ট ফ্যাশন': প্রদীপের নীচেই অন্ধকার

বাঁচাও যায় না, মরাও যায় না

ফাস্ট ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে যেভাবে প্রোডাকশন চলে, তা ইউরোপেও এককালে ছিল৷ ধীরে ধীরে তা পুবদিকে ‘রপ্তানি’ করা হয়েছে: প্রথমে পূর্ব ইউরোপে, তারপর এশিয়ায়৷ মাইনেপত্র এক হিসেবে দারিদ্র্যসীমার নীচে৷ বাংলাদেশে একজন গার্মেন্টস কর্মীর পরিবারের ১১ জন মানুষ একটি ঘরে বাস করছেন, এমনও দেখা যায়৷

'ফাস্ট ফ্যাশন': প্রদীপের নীচেই অন্ধকার

হাজার স্বপ্নের সমাধি

রিনার মা কাঁটাতারের বেড়ার সামনে বসে তাঁর মেয়ের ফেরার অপেক্ষা করছেন – অনর্থক৷ বেড়ার পেছনে সাভারের সেই গার্মেন্টস ফ্যাক্ট্রি, রানা প্লাজা, যা ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল ধসে পড়ে ১,১৩৪ জন মানুষের জীবন নেয়৷ ছবিটি তোলেন তসলিমা আখতার৷

'ফাস্ট ফ্যাশন': প্রদীপের নীচেই অন্ধকার

সোয়েটশার্টেই তার প্রমাণ

সস্তায় উৎপাদন আর কাজের পরিবেশের মধ্যে সংযোগসূত্র শুধু ছবি আর ডায়াগ্রামের মাধ্যমেই নয়, গার্মেন্টসের মধ্যে দিয়েও ফুটিয়ে তোলা যায়৷ জার্মান শিল্পী মানু ভাসহাউস চীনে এমন সব সোয়েটশার্ট তৈরি করিয়েছেন, যার উপর রানা প্লাজা বিপর্যয়ের ছবি ছাপানো রয়েছে৷

'ফাস্ট ফ্যাশন': প্রদীপের নীচেই অন্ধকার

স্লো ফ্যাশন

ফ্যাশন কথাটার সঙ্গে ‘ফেয়ার’ – মানে ন্যায্য – কথাটাও যে যোগ করা যায়, তার প্রমাণ এই ধরনের ফ্যাশন৷ এই সব ডিজাইনাররা শ্রমিকদের শোষণ, পরিবেশের পক্ষে হানিকর অথবা জন্তুজানোয়ারের পক্ষে কষ্টদায়ক, এমন কোনো পন্থায় ফ্যাশন সৃষ্টি করতে চান না৷

'ফাস্ট ফ্যাশন': প্রদীপের নীচেই অন্ধকার

এথিক্যাল ফ্যাশন শো

এ বছর বার্লিন ফ্যাশন উইকে টেকসই ফ্যাশন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল৷ ড্রেসডেনের প্রদর্শনীতে তা-ও দেখানো হয়েছে৷ পশ্চিমে এখন ‘সবুজ’ ফ্যাশন আর ‘ফেয়ার ট্রেড’-এর প্রবণতা বেড়েছে৷

'ফাস্ট ফ্যাশন': প্রদীপের নীচেই অন্ধকার

কিন্তু ‘পেপে’?

পাওলো উডস-এর তোলা এই ছবিটি যে ব্যঙ্গাত্মক, তা কাউকে বলে দিতে হবে না৷ ‘আমাকে চুম্বন করো, আমি ব্লন্দিনী’, লেখা রয়েছে টি-শার্টটিতে৷ অথচ যে মেয়েটি এই সেকেন্ড হ্যান্ড টি-শার্ট পরে রয়েছে, সে হাইতির, ইউরোপ বা অ্যামেরিকার নয়৷ দাতব্য হয়ে এই ধরনের সব টি-শার্ট হাইতিতে আসে৷ সেখানে তাদের বলা হয় ‘পেপে’৷

‘ভোগ' আজ বিশ্বের ২১টি দেশে প্রকাশিত হয় – তার মধ্যে আছে চীন, ভারত ও রাশিয়া৷ একটিমাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া সর্বত্রই পত্রিকাটির দায়িত্বে থাকেন একজন নারী৷ জোসেফিন কলিন্স জানালেন, ‘‘‘ভোগ' সারা পৃথিবীতে বিক্রি হয় একই লোগো দিয়ে, একই কোয়ালিটি-তে৷ বিশ্বের যে কোনো জায়গায় ‘ভোগ' দেখলেই চিনতে পারা যায়৷ গোড়া থেকেই এর পেছনে রয়েছে নিউ ইয়র্কের কড়া নিয়ন্ত্রণ৷ ওরা প্রথম থেকেই ‘ভোগ' ব্র্যান্ডটি সম্পর্কে খুব সচেতন৷''

‘দ্য সেপ্টেম্বর ইস্যু' নামের ২০০৯ সালে করা একটি তথ্যচিত্র থেকে ‘ভোগ' ম্যাগাজিন কিভাবে তৈরি হয়, তা জানা যায়৷ ফিল্মটি তথ্যচিত্র হলেও বিপুল সাড়া পাওয়ায় প্রধান সম্পাদিকা অ্যানা উইনটুর তারকা হয়ে ওঠেন৷

লন্ডনের ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারিতে ব্রিটিশ ‘ভোগ' ম্যাগাজিনের একশ' বছর পূর্তি সংক্রান্ত প্রদর্শনী চলবে মে মাসের শেষ পর্যন্ত৷

সব মিলিয়ে ‘ভোগ' ম্যাগাজিনের মাসিক বিক্রি তিন কোটি! অর্থাৎ ‘ভোগ' হলো বিশ্বের এক নম্বর ফ্যাশন ম্যাগাজিন৷ ফটো, পণ্য কিংবা মডেল, সর্বক্ষেত্রেই ‘ভোগ' যে জীবনধারাটি তুলে ধরছে, তা মহিলাদের বিশেষভাবে প্রিয়: লাক্সারি ও লাইফস্টাইল৷

বার্লিনে আবার ফ্যাশন তারকাদের মেলা

লা লা বার্লিন

এমটিভির ‘ডিজাইনারামা’ অনুষ্ঠানের সুবাদে লেইলা পিদায়েশকে সবাই এখন চেনে৷ ইরানি বংশোদ্ভূত লেইলাও আছেন বার্লিন পোশাক উৎসবে৷

বার্লিনে আবার ফ্যাশন তারকাদের মেলা

দাদির প্রিয় নাতনি লেনা

লেনা হশেক ফ্যাশন জগতে এসেছেন মূলত তাঁর দাদির কারণে৷ ১৩ বছর বয়সে নিজের দাদির কাছ থেকেই সেলাই শিখেছিল লেনা৷ কৈশোরে সেলাই শেখা সেই মেয়েটিই এখন ৩৪ বছর বয়সি লেনা হশেক৷

বার্লিনে আবার ফ্যাশন তারকাদের মেলা

‘শপিং কুইন’-এর গিডো মারিয়া ক্রেচমার

বার্লিন ফ্যাশন সপ্তাহ সম্পর্কে যাঁরা জানেন না, তাঁদের অনেকেও গিডো মারিয়া ক্রেচমারকে চেনেন৷ ‘শপিং কুইন’ নামের একটি টিভি অনুষ্ঠানের সুবাদে ফ্যাশন সচেতনদের কাছে বেশি পরিচিত হলেও ক্রেচমার ডিজাইনার হিসেবেও কম যান না৷ ঘরে বসে ডিজাইনিংয়ের কাজ শুরু করা ক্রেচমারের এক সময় হাতে তেমন কাজ ছিল না৷ বিমানের ক্রু’দের পোশাক ডিজাইন করার সুযোগ না পেলে বড় ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্নটা হয়ত হারিয়েই যেত৷

বার্লিনে আবার ফ্যাশন তারকাদের মেলা

সেরা নবাগত থেকে প্রতিষ্ঠিত তারকা

২০১১ সালে বার্লিন ফ্যাশন সপ্তাহের ‘সেরা নবাগত’ হয়েছিলেন হিন লে৷ তারপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে৷

বার্লিনে আবার ফ্যাশন তারকাদের মেলা

পোষাকে কবিতা এবং মাধ্যাকর্ষণ?

পৃথিবীর সব বস্তুতেই তো মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাব আছে বা থাকে৷ সেই হিসেবে প্যারিস ভিত্তিক কোম্পানি ‘অগাস্টিন টেবুল’-এর দাবিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়াই যায়৷ পোশাকের ডিজাইনে কবিতা ও মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব দেখতে এবং দেখাতে চায় চার বছর আগে আনেলি অগাস্টিন এবং অডলি টেবুলের প্রতিষ্ঠা করা এই ডিজাইনিং হাউস৷

বার্লিনে আবার ফ্যাশন তারকাদের মেলা

বার্লিনে ভারতীয় নির্যাস

রেবেকা ব়্যৎসের জন্ম অস্ট্রিয়ায়, লেখাপড়া করেছেন জার্মানির মিউনিখে আর কাজ করেছেন ভারত ও লন্ডনে৷ ভারতীয় সংস্কৃতি পোশাক-পরিচ্ছদের ধরন তাঁর মনে দাগ কাটে৷ তাঁর কাজের মাঝেও লক্ষ্য করা যায় সেই ছাপ৷

আমাদের অনুসরণ করুন