‘বছরে ২০ লাখ মানুষকে কাজ দেয়াটাই চ্যালেঞ্জ’

‘‘প্রতি বছর নতুন ২০ লাখ মানুষ কাজের বাজারে আসছে৷ সেই পরিমান কাজ তো সৃষ্টি হচ্ছে না,’’ ডয়চে ভেলেকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন বাংলাদেশ পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর চেয়ারম্যান ড. কাজী খলিকুজ্জমান আহমদ৷

তাঁর কথায়, ‘‘ বাংলাদেশ পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে কৃষির বিভিন্ন খাতে প্রায় ২২ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষি উদ্যোগকে অর্থায়ন করা হচ্ছে৷ এর মধ্যে নতুন ধরনের ফসল ও পণ্য উৎপাদনে যুক্ত হয়েছেন প্রায় তিন লাখ উদ্যোক্তা৷আমরা এখন টাকার ব্যবস্থা করছি, প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করছি, তাদের বাজারজাতকরণে সহায়তা করছি৷ সে কারণে অনেকে এগিয়ে আসছে৷ তবে এখনো অনেক পথ বাকি আছে৷'' 

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

ডয়চে ভেলে : বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণরা এখন কৃষিকাজে এগিয়ে আসছে, বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

অধ্যাপক ড. কাজী খলিকুজ্জমান আহমদ : আমার মনে হয় এটা করা উচিৎ৷ কারণ আমাদের কর্মসংস্থান দরকার৷ তরুণ প্রজন্ম যদি এই কাজে না আসে তাহলে দেশের অগ্রগতি যত তাড়াতাড়ি হওয়া উচিৎ তা হবে না৷ কারণ আমাদের দেশে অর্ধেকেরও বেশি হচ্ছে কম বয়সের ছেলে-মেয়ে৷ অতত্রব এগিয়ে আসছে এটা সুখবর৷ এই এগিয়ে আসার জন্য কিছু কাজ করতে হচ্ছে৷ আগে শিক্ষিত হলে কৃষিতে আসতে চাইত না, এটাই ছিল এখানের মোটামুটি ব্যবস্থা৷ এখন এমন অনেক ছেলে-মেয়ে গ্রামে এমনকি শহরেও আছে যাদের কর্মসংস্থান নেই, বেকারত্ব তাদের উপর চেপে বসছে৷ এ অবস্থায় তারা কিছু কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছে, যেখান থেকে তাদের উপার্জন হতে পারে৷ এই আগ্রহটাকে কাজে লাগাতে হবে৷ আমরা সেটাই করার চেষ্টা করছি৷ আমারা তাদের প্রশিক্ষন দিচ্ছি, অর্থ দিচ্ছি৷ এক সময় অর্থায়নও হতো না৷ টাকা পাওয়া যেত না৷ আমরা এখন টাকার ব্যবস্থা করছি, প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করছি, তাদের পন্য বাজারজাতকরণে সহায়তা করছি৷ সে কারণে অনেকে এগিয়ে আসছে৷ তবে এখনো অনেক পথ বাকি আছে৷

সমাজ

যেভাবে শুরু

একজন শৌখিন, কৃষিমনস্ক প্রকৌশলী শাহীন হাওলাদার ও একজন তরুণ উদ্যোক্তা মিরাজ হোসেনের যৌথ প্রয়াসে ঢাকার বাড্ডায় গড়ে উঠেছে একটি টার্কি খামার৷ খামারে সার্বক্ষনিক চিকিৎসা পরামর্শ দিয়ে থাকেন ফার্মাসিস্ট এনামুল হক৷

সমাজ

দুবাই থেকে ফিরে খামার

মিরাজ হোসেন জানান, দুবাই থেকে আসার পর কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না৷ পরবর্তীতে অনলাইনে টার্কি সম্পর্কে জানতে পারেন৷ তারপর টার্কি পালনের উপর কিছু প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে মাত্র ৬ টি টার্কি নিয়ে খামারটি শুরু করেন৷

সমাজ

‘টার্কি মিরাজ’

বর্তমানে টার্কি ‘উৎপাদন’ বাংলাদেশেও খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে৷ এক্ষেত্রে বিশেষভাবে অবদান রেখেছে ‘মিরাজের টার্কি ফার্ম’৷ এই ফার্মের কারণে মিরাজ আজ সবার কাছে ‘টার্কি মিরাজ’ নামে পরিচিত৷ ২০১৫ সালের মাঝামাঝিতে মাত্র ৬টি টার্কি দিয়ে এই ফার্মটি শুরু করলেও বর্তমানে খামারে ২-৩ মাস বয়সী ১৫০ টি এবং ৭-৮ মাস বয়সি ৪৬ টি টার্কি রয়েছে৷

সমাজ

টার্কির আকার

পুরুষ টার্কি স্ত্রী টার্কির তুলনায় বড় এবং অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়৷ একটি পুরুষ টার্কির ওজন হয় ১০-১২ কেজি৷ পুরুষ টার্কির তুলনায় স্ত্রী টার্কি আকৃতিতে ছোট এবং ওজনে কম হয়৷ একটি স্ত্রী টার্কি বছরে ৮০-১০০ টি ডিম দেয়৷ (এই ছবিটি ডয়চে ভেলের)

সমাজ

রোগ প্রতিরোধ

অনুকুল পারিপার্শ্বিক অবস্থা, পরিবেশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘর ও নিয়মিত খাবার দিলে টার্কি মুরগি রোগাক্রান্ত হয় না৷ ৪ থেকে ৫ বর্গফুট জায়গা রাখতে হবে একটি টার্কির জন্য৷ নিয়মিত বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেয়া জরুরি৷ এতে রোগ সংক্রমণ কম হয়৷ চারটি ভ্যাকসিনেশন সিডিউল আছে৷ রানীক্ষেতসহ চারটি রোগের জন্য ভ্যাকসিন দিতে হয়৷

সমাজ

বাচ্চা উৎপাদন

ইনকিউবেটরের মাধ্যমে ২৮ দিনে টার্কির বাচ্চা উৎপাদন হয় এবং প্রতিমাসে আমার এখানে ২০০ থেকে ২৫০ টি বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে৷ এছাড়া দেশি মুরগির সাহায্যে সনাতন পদ্ধতিতেও ২৮ দিনে বাচ্চা উৎপাদন করা সম্ভব৷

সমাজ

প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস

দেশের মানুষের প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা পূরনের ক্ষেত্রে পোল্ট্রির পাশাপাশি টার্কি মুরগি বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে বলে খামারিরা আশা করছেন৷

সমাজ

টার্কি ও তিতিরের দাম

টার্কির একমাস বয়সের একটি বাচ্চার দাম তিন হাজার টাকা, তিতিরের বাচ্চার দাম দুই হাজার টাকা৷ বড় একজোড়া টার্কির দাম ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা৷ এছাড়া প্রতিটি ডিম বিক্রি হয় ১৫০ টাকায়৷

সমাজ

উট পাখি

মিরাজ হোসেন উট পাখিও পোষা শুরু করেছেন৷ এ থেকে লাভজনকভাবে উটপাখি উৎপাদন সম্ভব কিনা তা দেখছেন৷ ছবিতে উট পাখির একটি বাচ্চা হাতে নিয়ে আছেন মিরাজ হোসেন৷

সমাজ

কোয়েলের খামার

সাধারণত একটি ভালো জাতের কোয়েল পাখি বছরে ২৫০ থেকে ৩০০ টি ডিম দিয়ে থাকে৷ প্রায় প্রতিটি ডিম থেকেই বাচ্চা হয়৷ এই বাচ্চা পরবর্তী ৬ থেকে ৭ সপ্তাহের মধ্যেই ডিম দেওয়া আরম্ভ করে৷ এই বয়সের কোয়েল পাখির বাজারে প্রচুর চাহিদা৷ অত্যন্ত স্বল্প পুঁজি নিয়ে কোয়েল পাখির খামার করা যায় এবং খুব দ্রুতই লাভ পাওয়া সম্ভব৷

সমাজ

কোয়েলের যত্ন

ঘরের যেখানে পর্যাপ্ত আলো -বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে সেখানেই কোয়েলের খাঁচা রাখা উত্তম৷ তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, বৃষ্টির পানিতে কোয়েলের খাঁচা যেন ভিজে না যায়৷ ভিজে এবং স্যাঁতস্যাতে জায়গায় রাখলে কোয়েলের রোগ ব্যাধি বেশি হয়৷

সমাজ

আরও কয়েকজন

নুরুল হুদা, পার্থ মজুমদার বাপ্পি এবং শরীফ আব্দুল কাইয়ুমও এ ধরণের খামার করছেন৷ কেবল টার্কি নয় তিতির, কোয়েল পাখির খামার গড়েও সফলতা পেয়েছেন৷ শৌখিন পাখি যেমন ঘুঘু,কবুতর,টিয়া ইত্যাদি পাখিও যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের৷

সমাজ

অন্যদের উৎসাহিত করা

মিরাজের ইচ্ছা বাণিজ্যিকভাবে সারা বাংলাদেশে এই খামারের পরিকল্পনা ছড়িয়ে দেওয়া৷ বর্তমানে তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গার মানুষ টার্কি ফার্ম গড়ে তুলছেন৷ মিরাজ হোসেন টার্কি বিপ্লব ঘটানোর স্বপ্ন দেখেন৷ বেকারত্ব দূর করার জন্য এটা একটা ভালো উদ্যোগ বলে মনে করেন তিনি৷ প্রতি শুক্রবার তাঁর খামারটি পরিদর্শনে আসেন অনেক উদ্যোক্তা৷

সরকারের পক্ষ থেকে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে বা সহায়তা দিতে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

সরকারের পক্ষ থেকে তো অনেকগুলো পদক্ষেপ আছে৷ সরকারের পক্ষ থেকে তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে৷ ‘চাকরি না খুঁজে চাকরি দাও-' এই ধরনের একটা স্লোগান সরকারের আছে৷ যারা আসছে, তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে৷ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষনও দেয়া হয়৷ শুধু কৃষি নয়, কৃষির বাইরেও প্রশিক্ষন দেয়া হয়৷ আমি পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান৷ এটাও সরকারি প্রতিষ্ঠান৷ আমরাও সরকারের নীতির আঙ্গিকে কাজ করি৷ আমরা দুটো কাজ করছি, একটা হলো তাদের দক্ষতা দিয়ে কাজ করা আর অপরটি হলো তাদের মানবিক মূল্যবোধ যাতে বিকশিত হয় সেদিকে নজর দেয়া, কারণ, অনেক তরুণ বিপথে যাচ্ছে৷ তাদের যাতে ফিরিয়ে আনা যায়৷ আমরা তাদের দক্ষতা সৃষ্টিতেও নজর দিচ্ছি, যাতে তারা কাজ করে আয়-উপার্জন বাড়াতে পারে৷

এই তরুণদের আপনারা কিভাবে কৃষিতে আনলেন?

একটা উদাহরণ দেই৷ একটা ছেলে এমএ পাশ করে গ্রামে যাচ্ছে৷ সেখানে গিয়ে বেশ কিছুদিন কিছু করার চেষ্টা করেছে৷ এরপর শহরে ফিরে চাকরির চেষ্টা করেছে৷ কিন্তু চাকরি সে পায়নি৷ পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন সরাসরি কাজ করে না৷ আমাদের কিছু সহায়ক এনজিও আছে৷ তাদের মাধ্যমে কাজ করি৷ এমন একটি প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে প্রস্তাব দেয়া হলো, ‘‘তুমি যদি কিছু করতে চাও, আমরা সহায়তা করব৷'' শেষ পর্যন্ত সে রাজি হলো এবং একটি পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করল৷ দুই- তিন বছরের মধ্যে তার অনেকগুলো পুকুর হয়ে গেছে৷ এখন সে স্বচ্ছল৷ গ্রামে আমি দেখেছি, একটা কাজ করে একজন যদি সফলতা পায় তাহলে আরো অনেকেই ওই কাজে আগ্রহী হয়৷ 

তরুণরা এত কাজ থাকতে কেন কৃষিতে আসবে? আপনি কী মনে করেন?

এত কাজ নেই তো৷ ব্যাপারটা হচ্ছে, কাজ পাওয়া যায় না বলেই তো আসছে৷ প্রতি বছর নতুন ২০ লাখ মানুষ কাজের বাজারে আসছে৷ সেই পরিমান কাজ তো সৃষ্টি হচ্ছে না৷ আর এখন তো কৃষি মানে শুধু ধান আর গম না৷ মাছ চাষ, গাভী পালা, মুরগি পালা এ সবই কিন্তু কৃষির মধ্যে৷ সবগুলোতেই তারা আসছে৷ এখানে আমরা প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করছি, অর্থায়ন হচ্ছে৷ কখনও কখনও আমরা অনেককে নিয়ে একসঙ্গে প্রশিক্ষন দেই৷ যে যেটা নিতে চায়, কেউ কৃষিতে যেতে চায়, কেউ মাছ চাষ করতে চায়, যে যেটা করতে চায় আমরা সেদিকে তাকে প্রশিক্ষন দেই৷

কৃষির চেয়ে শিল্প বা প্রযুক্তিতে প্রবৃদ্ধি বেশি৷ তাদের যদি  সেদিকে নিতে পারলে তো রাষ্ট্রের লাভ, নাকি?

অবশ্যই৷ দেশের লাভ, ওদের নিজেদের লাভ, সমাজের লাভ, এমনকি ওদের পরিবারেরও লাভ৷ একজন পিছিয়ে পড়া মানুষ, যার আয়-উপার্জন নেই, তার যদি আয়-উপার্জন বাড়ে, তাহলে তার নিজের উন্নতি হয়, পরিবারের উন্নতি হয় এবং জাতীয় আয়েও সংযোজিত হয়৷ এতে আরেকটা কাজ হয়, সেটা হলো বৈষম্য কিছুটা কমে আসে৷

তরুণরা কৃষিকাজ করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা ও কারিগরিসহায়তা কি পাচ্ছে?

প্রয়োজনীয় বলব না, কারণ পাচ্ছে, কিন্তু সেটা আরো বাড়ানো দরকার৷ আমি তো পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের কথা বললাম, আরো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও করছে৷ এটা আগাচ্ছে, তবে আরো সময় লাগবে৷ এখনো বেকারত্ব অনেক ব্যাপক৷

যে তরুণের অর্থ নেই, জমি নেই, কিন্তু শিক্ষিত, সে কিভাবে কৃষিতে সম্পৃক্ত হবে?

অর্থ তো বললাম আমরা পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন থেকে দেই, অন্য প্রতিষ্ঠানও দেয়, আমরা প্রশিক্ষনও দেই৷ সুতারাং তার যদি জমি না-ও থাকে, আগে যে উদাহরণ দিলাম যে পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করেছে, সেটা করা সম্ভব৷ সবার যে ধান করতে হবে তা না৷ সবজি করাও তো কৃষি৷ বিভিন্নজন বিভিন্ন রকমের কাজ করছে৷ মাছটা বেশ ব্যাপক আকারে হচ্ছে৷ একটা ভুল ধারণা হয়েছে, কৃষি বললে মানুষ মনে করে ধান৷ শুধু এটা না, অন্যসবও কৃষি৷

বাংলাদেশের কোন কোন এলাকায় তরুণদের আপনারা কৃষিতে সম্পৃক্ত করতে পেরেছেন?

অনেক এলাকায়৷ আমাদের তো সারাদেশে কাজ আছে৷ প্রতিটি উপজেলায় কাজ আছে৷ বিশেষ করে ১৫০টি ইউনিয়নে আমরা কাজ করছি৷ যেমন উপকূলীয় এলাকা আছে, যেখানে খরা আছে সেখানেও কাজ আছে৷ লালমনিরহাটসহ সব এলাকায়ই আমাদের কাজ আছে৷ ফলে এক জায়গায় না সবজায়গাতেই কিছু কিছু কাজ হচ্ছে৷ অনেক এলাকা বাকি আছে৷ আমাদের আরো অনেকদূর যেতে হবে৷

সমাজ

বিষমুক্ত খাবারের অঙ্গীকার

বাংলাদেশে ফসলের ক্ষেতে প্রতি মিনিটে ৭২ কেজি ‘বিষ’ ছিটানো হয় বলে জানান দেলোয়ার জাহান৷ এতে মাটির যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করে যে ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর৷ এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রাকৃতিক উপায়ে কৃষিকাজ পদ্ধতিকে উৎসাহিত করছেন দেলোয়ার ও তাঁর সঙ্গীরা৷

সমাজ

‘প্রাকৃতিক কৃষি’ আন্দোলন

দেলোয়ার ও তাঁর সঙ্গীরা প্রাকৃতিক উপায়ে কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত৷ এর মাধ্যমে তাঁরা আশেপাশের কৃষকদের দেখান যে, এভাবেও ফসল উৎপাদন করে লাভ করা সম্ভব৷ এছাড়া কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনায় বসে প্রাকৃতিক উপায়ে কৃষিকাজের নতুন নতুন পদ্ধতি বের করেন তাঁরা৷ ছবিতে দেলোয়ারকে কৃষকদের সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা যাচ্ছে৷

সমাজ

শুরুর কথা

২০১৩ সালে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার আমতলি গ্রামে জমি লিজ নিয়ে গ্রীষ্মকালীন সবজি উৎপাদন শুরু করেন দেলোয়ার ও তাঁর সঙ্গীরা৷ বর্তমানে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার হাজীপুর গ্রামে দেড় একর জমিতে প্রায় ৪০ রকমের সবজি উৎপাদিত হয় বলে জানান তিনি৷ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত দেলোয়ার নিজে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে জড়িত ছিলেন৷ আর তাঁর সঙ্গীদের পরিবারও কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত৷

সমাজ

লেখাপড়ায় ভালো ছিলেন দেলোয়ার

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে অনার্সে দ্বিতীয় ও মাস্টার্সে যৌথভাবে প্রথম হয়েছিলেন দেলোয়ার৷ এরপর সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে চাকরির সুযোগ পেয়েছিলেন৷ কিন্তু মানুষের কল্যাণে কাজ করবেন ভেবে সেখানে যাননি তিনি৷ ‘প্রাকৃতিক কৃষি’র পাশাপাশি ঢাকায় একটি পত্রিকায় কৃষি বিষয়ক সাংবাদিকতা করছেন দেলোয়ার৷

সমাজ

সঙ্গীদের কথা

দেলোয়ারের সঙ্গে আছেন আরও কয়েকজন তরুণ-তরুণী৷ তাঁদের প্রায় সবাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়ালেখা শেষ করেছেন৷ ছবিতে দুজনকে দেখা যাচ্ছে৷

সমাজ

সাফল্যের কথা

দেলোয়ারদের যেখানে খামার আছে, সেই মানিকগঞ্জ ছাড়াও ঝিনাইদহ, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নওগাঁ জেলার অনেক কৃষক বর্তমানে প্রাকৃতিক উপায়ে ফসল উৎপাদন করছেন৷ ছবিতে দেলোয়ারের সঙ্গীদের ফসল তুলতে দেখা যাচ্ছে৷

সমাজ

পণ্যের বাজার

বিভিন্ন জেলার কৃষকদের প্রাকৃতিক উপায়ে চাষ করা সবজি, ফল ঢাকায় কিনতে পাওয়া যায়৷ এজন্য মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডে ‘প্রাকৃতিক কৃষি বিপণন কেন্দ্র’ চালু করা হয়েছে৷ ছবিটি বিপণন কেন্দ্রের সামনে তোলা৷

সমাজ

যা পাওয়া যায়

কী চান? শাক-সবজি, ফল, চাল, ডাল, হাতে ভাজা মুড়ি, মসলা, তেল, ঘি, দুধ, ডিম; বলে শেষ করা যাবে না৷ মাঝেমধ্যে বাসায় চাষের কাজে ব্যবহারের জন্য প্রাকৃতিক সারও পাওয়া যায় ঐ কেন্দ্রে৷ হালনাগাদ তথ্য পেতে ‘প্রাকৃতিক কৃষি’র ফেসবুক পাতা দেখা যেতে পারে৷ এজন্য উপরে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

সমাজ

নিরাপদ ফসল

ঢাকায় প্রাকৃতিক কৃষি বিপণন কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের কিষাণীরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল নিয়ে এসেছেন৷

সমাজ

গ্রামে যাওয়া হয়নি

দেলোয়ার কুষ্টিয়ার ছেলে৷ কিন্তু নিজের গ্রামে না গিয়ে মানিকগঞ্জে কাজ করার কারণ বলতে গিয়ে তিনি জানান, সেটি সম্ভব ছিল না৷ ‘‘যখন পড়ালেখা করতাম তখন গ্রামে গেলে সবাই জানতে চাইতো কতদিন আছি কিংবা কবে যাব? তখনই বুঝতে পারি যে, আসলে গ্রামে ফেরা সম্ভব না,’’ ডয়চে ভেলেকে বলেন দেলোয়ার৷

সমাজ

চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকাজ

বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে কেউ যদি উচ্চশিক্ষার পর চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকাজে জড়িত হয়ে জীবনযাপন করতে চায় তাহলে সেটি সম্ভব বলে মনে করেন দেলোয়ার৷ ‘‘কেউ যদি সমন্বিত খামার করেন, যেখানে মাছ চাষ থাকবে, গরু থাকবে, দুধের জন্য ছাগল থাকবে, হাঁস থাকবে, সবজি থাকবে- তাহলে সম্ভব৷’’

সমাজ

তবে...

দেলোয়ার বলেন, সমস্যা হচ্ছে তরুণরা মনে করে, কৃষিকাজ মানে অচ্ছুতের কাজ৷ তাই এটি কেউ করতে চায় না৷ ‘‘কারণ চারপাশে এত রং, এত প্রত্যাশা জীবনে যে, কেউ আসলে কৃষিকাজ করতে চায় না৷ প্রচুর ছেলেমেয়ে আমাদের কাছে (প্রাকৃতিক কৃষির কাজ দেখতে) আসে৷ যে পরিমাণ আগ্রহ নিয়ে আসে তার দ্বিগুণ পরিমাণ আগ্রহ নিয়ে চলে যায়’’, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানান দেলোয়ার৷

আমাদের দেশে তো হাজার হাজার তরুণ এখনো বেকার৷ তাদের মধ্যে আপনারা যাদের সহযোগিতা করছেন, তাদের বাছাই করছেন কিভাবে?

আমরা ১৫০টি ইউনিয়নের প্রত্যেকটিকে সহায়তা দিচ্ছি৷ এখানে বাছাই করার কোনো ব্যাপার নেই৷ এই ১৫০টি ইউনিয়নে আমরা নিবিড়ভাবে কাজ করছি৷ অন্যান্য জায়গায় তো আমরা সবাইকে দিতে পারি না৷ শুধু যারা উৎসাহিত হয়, তাদের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করি৷ যুব উন্নয়ন অধিদপ্ততর তো সারাদেশেই কাজ করছে৷ তারা বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষন দিচ্ছে৷ সুতারাং প্রশিক্ষন আস্তে আস্তে বাড়ছে৷ প্রশিক্ষন হলে অর্থায়নের ব্যবস্থাও বিভিন্নভাবে হয়৷ আসলে যতটা প্রয়োজন, ততটা এখনো সম্ভব হয়নি৷ আশা করি ভবিষ্যতে অর্থায়ন আরো বাড়বে এবং তরুণরা আরো এগিয়ে আসবে৷

সরকারের কাছে এই মুহুর্তে তরুণদের জন্য আপনার কী চাওয়ার আছে?

আমার কিছু চাওয়ার নেই৷ আমি চেষ্টা করছি৷ সরকারের একটা নীতি আছে৷ সেই নীতির আওতায় যে কাজগুলো হচ্ছে, সেগুলো যেন আরো সঠিকভাবে হয়৷ আমাদের নীতির কোনো সমস্যা নেই৷ সমস্যা হলো যেভাবে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা সেভাবে বাস্তবায়ন হয় না৷ যাদের জন্য এই উদ্দেশ্য তাদের কাছে অনেক সময় এটা পৌঁছায় না৷ সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে যার যেটা প্রাপ্য সেই জায়গায় যদি আমরা ভালো করে কাজ করতে পারি, দেশটা এমনিতেই এগিয়ে যাচ্ছে, তাহলে আরো অনেক বেশি এগিয়ে যাবে৷

তরুণদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

ওদেরকে আমি দুই-তিনটা জিনিস বলি৷ যারা পড়াশোনা করছে, তাদের ভালোভাবে পড়াশোনাটা করতে হবে৷ পড়াশোনা শেষ হলে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা আছে৷ প্রশিক্ষন নিতে হবে এবং সেটা কাজে লাগাতে হবে৷ আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে আমি এই কাজটা করব৷ আর আমি যদি আরেকটা কাজ চাই, কিন্তু পাচ্ছি না, তাহলে কিন্তু হবে না৷ সিদ্ধান্তটা নিতে হবে যে আমি এই কাজটা করব৷ অনেকের সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে৷ কেউ অঙ্গীকার নিয়ে এলে সে ভালো করবে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷