বজ্রপাতের ভবিষ্যদ্বাণী

বজ্রপাত, মানে কয়েক লাখ ভোল্টের একটি কারেন্ট, যা তাপ ৩০ হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা সূর্যের পাঁচগুণ বেশি৷ তাই বিজ্ঞানীরা বজ্রপাতের ভবিষ্যদ্বাণী করার চেষ্টা করেছেন৷

বজ্রপাতের বিনাশ শক্তি অসাধারণ, মানুষের মৃত্যু ঘটানোর ক্ষমতা রাখে৷ গবেষকরা একটি হাই টেনশান ল্যাবোরেটরিতে কৃত্রিম বজ্রপাত সৃষ্টি করে দেখেছেন৷ এ থেকে বজ্রপাতের পরিণাম বোঝা যায়৷

পরীক্ষাগারের বজ্রের শক্তি প্রকৃতির বজ্রপাতের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়: কয়েক লক্ষ ভোল্ট৷ এর ফলে প্রায় ৩০,০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপ সৃষ্টি হয়, যা কিনা সূর্যের উপরিভাগের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি৷

বজ্রপাত গবেষক ভল্ফগাং সিশাঙ্ক বললেন, ‘‘বহু বাড়িতে লাইটনিং কন্ডাক্টর লাগানো থাকে না৷ ফলে প্রায়শই বাজ পড়ে আগুন লাগে৷ হাই টেনশানের ফলে ইলেকট্রনিক জিনিসপত্রের ক্ষতি হতে পারে৷''

বিজ্ঞানীরা বসতবাড়ি ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জামকে বজ্রপাতের হাত থেকে আরো ভালোভাবে রক্ষা করতে চান৷ অনেক সময় কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়লেই ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি পাগলামি করতে শুরু করে – যেমন ইলেকট্রনিক অ্যালার্ম৷

আকাশে ‘শর্ট সার্কিট’

রাতের আকাশে এমন দৃশ্য বিরল নয়৷ বিদ্যুৎ চমকানোর ব্যাপারটি অনেকটা ‘শর্ট সার্কিটের’ মতো ব্যাপার৷ আর একেকটি বিদ্যুৎ চমক ৫০০ মিলিয়ন ভোল্ট পর্যন্ত শক্তিশালী হতে পারে৷ জার্মানিতে প্রতি বছর গড়ে বিশ লাখের বেশি বার বিদ্যুৎ চমকায়৷ এতে অবশ্য ভয়ের কিছু নেই৷ কেননা অধিকাংশই মাটি স্পর্শ করে না৷ বরং মেঘ থেকে মেঘে স্থানান্তর হয়৷

বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায়

ছবিতে থাকা এই মানুষটি বজ্রপাতের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না৷ কেননা তাঁর ধাতব স্যুট বিদ্যুৎ চমক প্রতিরোধে সক্ষম৷ এই স্যুটের নীতি হচ্ছে ‘ফ্যারাডে কেজ’৷ ধাতু বিদ্যুৎ চমক থেকে সৃষ্ট বিদ্যুতের প্রবাহ প্রতিরোধ করতে পারে৷ তাই বিমান কিংবা গাড়িও ‘লাইটনিং বোল্ট’ বা বিদ্যুৎ চমকের আঘাত থেকে নিরাপদ৷

মাটিতে ফিরিয়ে নেয়া

সাধারণত উঁচু জায়গায় বজ্রপাত ঘটে৷ যেকারণে প্রায় সব বড় গির্জা বা বহুতল ভবনে ‘লাইটনিং রড’ রয়েছে, যা আর্থিং হিসেবেও পরিচিত৷ এই ব্যবস্থার ফলে বজ্রপাতের কারণে ভবনের ক্ষতি হয় না৷ বরং বিদ্যুৎ সরাসরি ভূমিতে চলে যায়৷ ১৭৫২ সালে বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন ‘লাইটনিং রড’ আবিষ্কার করেন৷

ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক আচরণ

২০১৩ সালে বজ্রপাতের কারণে জার্মান বিমা সংস্থাগুলোর ২৮০ মিলিয়ন ইউরোর মতো গুনতে হয়েছে৷ তবে সরাসরি ঘরবাড়ির উপর বজ্রপাতের কারণে এটা হয়নি৷ আসলে অনেক সময় বাড়ির কাছাকাছি বজ্রপাত হলে বাড়তি বিদ্যুৎ সাধারণ বৈদ্যুতিক লাইনের মাধ্যমে ঘরের মধ্যে চলে যায়৷ ফলে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নষ্ট হয়৷ তাই পরামর্শ হচ্ছে, বিদ্যুৎ চমকালে টিভি, ফ্রিজের মতো পণ্যের প্লাগ খুলে রাখুন৷

‘বল লাইটনিং’ এর অস্তিত্ব আছে

এটা প্রকৃত ‘বল লাইটনিং’ নয়৷ তবে বাস্তবেও এটা সম্ভব! যদিও এমন বিদ্যুৎ চমকানোর ছবি প্রকৃতি থেকে এখনো তোলা যায়নি, তবে বিজ্ঞানীরা বিষয়টি প্রমাণে সক্ষম হয়েছেন৷

আকর্ষণ এবং আতঙ্কের মাঝামাঝি

গ্রীষ্মের আকাশে বিদ্যুৎ চমকানো দেখে অনেকে রোমাঞ্চ অনুভব করেন৷ তবে কেউ যদি বিদ্যুৎ চমকানোর কথা শুনেই ঘামতে শুরু করেন তাহলে তাকে বলে ‘এস্ট্রাফোবিয়া৷’ বজ্রপাত এবং বিদ্যুৎ চমকানো নিয়ে যাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে তারা এস্ট্রাফোবিয়ায় আক্রান্ত৷

শিল্পীদের প্রেরণা

‘লর্ডস অফ লাইটনিং’ এর মতো শিল্পীরা বজ্রপাতের সৌন্দর্যকে এভাবেই স্টেজে ফুটিয়ে তুলেছেন৷ বিভিন্ন চিত্রকর্মেও বিদ্যুৎ চমকানোর দৃশ্য একেছেন শিল্পীরা৷ নিরাপদ দূরত্বে বসে প্রকৃতির এই খেয়াল উপভোগ্য নয় বৈকি৷

সিশাঙ্ক জানালেন, ‘‘বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎরেখার চারপাশে যে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক আবহ সৃষ্টি হয়, তার ফলে ইলেকট্রনিক সরঞ্জামগুলিতে উচ্চ ভোল্টেজের সৃষ্টি হয়৷ এর ফলে যন্ত্রগুলি আর ঠিকমতো কাজ করে না৷''

ইমেলে ঝড়ের পূর্বাভাস

ইতিমধ্যে এমন অ্যান্টেনা তৈরি হয়েছে, যা বজ্রপাত চিনতে পারে৷ বজ্রপাত সতর্কতা পরিষেবাগুলি সময়মতো আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়ে ইমেল, এসএমএস বা ফ্যাক্সের মাধ্যমে গ্রাহকদের জানিয়ে দেয়৷ এর ফলে কলকারখানা, বিমানবন্দর, হাসপাতাল ইত্যাদি ব্যবস্থা নিতে পারে৷

কম্পিউটারের মাধ্যমে সারা দেশে কোথায় বজ্রপাত হচ্ছে, তার হিসেব ও পরিমাপ রাখা হয়৷ প্রতিবেশি দেশগুলিকেও সেই হিসেবে ধরা হয়৷ ইঞ্জিনিয়ার স্টেফান ট্যার্ন জানালেন, ‘‘অ্যান্টেনা দিয়ে বজ্রপাতের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক সিগনাল রেজিস্টার করা হয়৷ তা থেকে হিসেব করে দেখা যায়, কোথায় বজ্রপাত হয়েছে৷''

কোথায় কোথায় বাজ পড়ছে, তা থেকে ঝড়টা কোনদিকে যাচ্ছে, তা হিসেব করা যায়৷ এভাবেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়া যায়, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা মেঘ করার আগেই বজ্রপাত হতে পারে৷ প্রতি ঘণ্টায় পৃথিবীতে ক'টা ঝড় হয় জানেন? প্রায় দু'হাজার!

সংশ্লিষ্ট বিষয়