বদরুলের যাবজ্জীবন: খাদিজার চাচার আশা রায় বহাল থাকবে

কলেজছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিসের উপর হামলা হওয়ার পাঁচ মাস পাঁচ দিন পর তাকে হত্যা চেষ্টার দায়ে বদরুল আলমের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন সাজার রায় দিয়েছে আদালত৷ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন খাদিজা৷

বুধবার সকালে সিলেটের মহানগর দায়রা জজ আকবর হোসেন মৃধা আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন৷ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি বদরুলকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও দুই মাসের সাজা দেওয়া হয়েছে

সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের স্নাতক (পাস কোর্স) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী খাদিজা গত বছরের ৩ অক্টোবর এমসি কলেজ কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা শেষে বের হয়ে হামলার শিকার হয়েছিলেন৷ হামলকারী বদরুল আলম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ছিলেন৷ তার ধারালো অস্ত্রের আঘাত খাদিজার মাথার খুলি ভেদ করে মস্তিষ্ককেও জখম করেছিল৷ স্কয়ার হাসপাতালে তিন দফা অস্ত্রোপচারের পর এখন অনেকটা সুস্থ খাদিজা৷ গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি সিলেটে তার বাড়ি ফিরে গেছেন৷

খাদিজার উপর হামলার ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল৷

রাজনীতি

অবশেষে বাড়ি ফেরা

সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি) প্রায় তিন মাসের চিকিৎসা শেষ করে শুক্রবার সিলেটে নিজেদের বাড়িতে ফেরেন খাদিজা বেগম৷

রাজনীতি

সেই কালো দিন

২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর বিকেলে এমসি কলেজ পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে বিএ (পাস) পরীক্ষা দিয়ে বের হবার পরই ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলম চাপাতি দিয়ে খাদিজার ওপর হামলা চালায়৷ উপর্যুপরি চাপাতির কোপে মারাত্মক আহত খাদিজা রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন৷

রাজনীতি

গণপিটুনি ও গ্রেপ্তার

হামলার পরই জনতা বদরুলকে ধাওয়া করে ধরে ফেলে৷ স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, জনতা তাকে তখন প্রহার করে এবং তারপর পুলিশের হাতে তুলে দেয়৷

রাজনীতি

প্রতিবাদ ও বিচার দাবি

খাদিজার ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে সারা দেশে্ই তখন বদরুলের বিচারের জোরালো দাবি ওঠে৷

রাজনীতি

খাদিজার চিকিৎসা

সংকটাপন্ন অবস্থায় প্রথমে খাদিজাকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং তারপর ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়৷ অবস্থার অনেকটা উন্নতি হওয়ার পর গত ২৮ নভেম্বর তাকে সিআরপি-তে ভর্তি করা হয়৷ অবশেষে সিআরপি থেকেও ছাড়া পেয়ে খুশি মনে বাড়ি ফিরলেন খাদিজা৷ তবে চিকিৎসা এখনো শেষ হয়নি৷ সিআরপি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে খাদিজাকে আরও কয়েক বছর চিকিৎসা নিতে হবে৷

রাজনীতি

খাদিজারও একই দাবি

শুক্রবার বিমানে করে এম এ জি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান সিলেট মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা৷ বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে করে সিলেট সদর উপজেলার আউশা গ্রামের বাড়িতে যান তিনি৷ বাড়ি ফিরে খাদিজা লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করার পাশাপাশি বদরুলের কঠোর শাস্তিও দাবি করেন৷

সকালে রায়ের পর দুপুরে নিজ বাড়িতে খাদিজা সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘আদালতের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা৷ এই রায়ে আমি সন্তুষ্ট৷ দেশের মানুষের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞতা জানাই৷ আমি আবার লেখাপড়া করতে চাই৷''

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এই রায় পাওয়ায় আরও খুশি তিনি৷ খাদিজা বলেন, ‘‘এ দিনে বাংলাদেশের সকল নারীর প্রতি আমার আহ্বান হলো, আমার মতো যেন আর কেউ এমন পরিস্থিতির শিকার না হয়৷ এ জন্য সবাই যেন সচেতন হন৷''

রায়ের পর্যবেক্ষণেও নারী দিবসের বিষয়টি উঠে এসেছে৷ আদালত বলেছে, ‘‘দেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার নারী৷ সর্বস্তরে যখন নারীরা সাফল্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে তারা অরক্ষিত, নির্যাতিত৷ দেশের অগ্রযাত্রায় নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য৷'' খাদিজার ওপর এমন নৃশংস হামলা প্রমাণ করে নারীরা কতটা অরক্ষিত৷

এদিকে, মামলার বাদী খাদিজার চাচা আব্দুল কুদ্দুসও রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন৷ তবে তাঁর কামনা আইনের ফাঁকে যাতে এ রায় বদল না হয়৷

খাদিজার মা মনোয়ারা বেগমও রায়ে সান্তোষ প্রকাশ করেছেন৷ তবে খাদিজার ভাই শরনান হক শাহীন সাংবাদিকদের জানান, বদরুলের ফাঁসি হলে তিনি সন্তুষ্ট হতেন৷

এই রায় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অনেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন৷ রুবি চৌধুরী মনে করছেন, খাদিজাকে হত্যা চেষ্টা মামলায় বদরুল তার প্রাপ্য সাজাই পেয়েছে৷ তবে শাখাওয়াৎ রাসেল তা মনে করছেন না৷ ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘‘বদরুলরা বারবার বেঁচে যায়, তাই খাদিজারা বারবার কোপান খায়৷'' এদিকে, তোফায়েল সুমনের প্রশ্ন, ‘‘আচ্ছা, যদি খাদিজা মারা যেতেন, তবে কি বদরুল সাহেবের ফাঁসি হতো?''

জেডএইচ/এসিবি (বিডিনিউজ, প্রথম আলো)