বাংলাদেশকে সম্মানিত করে ওরা পেল অসম্মান!

এ এমন এক আনন্দ যার ভাগীদার হতে পেরে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াও সমানভাবে গর্বিত৷ বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৬ মেয়েদের দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন দু'জনই৷ কিন্তু এর বাইরে শুধুই অবহেলা আর অপমান জুটেছে তাদের ভাগ্যে !

ঢাকায় এ সপ্তাহেই শেষ হলো এশিয়ার মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবলের গ্রুপ ‘সি'-র বাছাই পর্ব৷ সেখানে ৫ ম্যাচে ২৮ গোল করে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েই চূড়ান্ত পর্ব নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশের মেয়েরা৷ সবাই আনন্দে উচ্ছ্বসিত, গর্বিত৷ কৃষ্ণা, তহুরা, তাসলিমাদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন সবাই৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিনন্দন জানিয়েছেন৷

খেলাধুলা | 25.07.2012

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াও অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে আসা কিছু সুবিধাবঞ্চিত মেয়ের এভাবে দেশের মুখ উজ্জ্বল করার ঘটনায় আপ্লুত৷ ইরান, সিঙ্গাপুর, কিরগিজস্তান, তাইওয়ান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হারিয়ে এশিয়ার সেরা আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের আসন করে নেয়ায় কিশোরী ফুটবলারদের তিনিও অভিনন্দন জানিয়েছেন৷

অভিনন্দনের মিছিলে বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দীনের নামটিও দেখলাম৷ বিদেশ থেকে তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, ‘‘সভাপতি হিসেবে (আমার জন্য) এর চেয়ে বড় খবর আর কী হতে পারে? বাংলাদেশ ফুটবলের সভাপতি হবার পর এটাই আমার কাছে এ যাবতকালের সেরা খবরগুলোর মধ্যে একটি৷ ... যতগুলো ম্যাচ আমি দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে, ওরা বাংলাদেশ ফুটবলের ব্যতিক্রমধর্মী সংঘবদ্ধ একটি দল৷''

কিন্তু দুঃখের বিষয়, সানজিদা, মারিয়া, মৌসুমী, কৃষ্ণা, তাসলিমারা ‘সংঘবদ্ধ দল' হয়ে উঠলেও, বাফুফে এখনো ‘সংঘবদ্ধ', ‘সুশৃঙ্খল' বা অনুকরণীয় ‘কর্মীদল' হতে পারেনি৷ তা যদি হতো, তাহলে সভাপতির কথার সঙ্গে বাফুফের কাজের কিছুটা মিল অন্তত থাকতো৷ সভাপতি অনূর্ধ-১৬-র যে মেয়েদের সাফল্যে গর্বিত, তাদের প্রতি সম্মান, সহানুভূতি বাফুফেও নিশ্চয়ই দেখাতো৷ কিন্তু বাফুফে তা একটুও দেখায়নি৷ এত বড় একটা সাফল্যের পর লোকাল বাসে বাড়ি পাঠিয়ে বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন মেয়েদের বরং অসম্মানই করেছে বাফুফে৷

ঈদের আগে পথেঘাটে যতরকমের দুর্ভোগ থাকে তার চেয়েও বেশি দুর্ভোগ সয়ে মেয়েরা একটু দেরিতে হলেও যার যার বাড়ি পৌঁছেছে৷ বাড়িতেও সবার অভিজ্ঞতা ভালো হয়নি৷ কলসিন্দুর গ্রামে তাসলিমার বাবাকে পিটিয়েছে এক স্কুলশিক্ষক৷ দেশের হয়ে খেলা কলসিন্দুরের সব মেয়েকে ঢাকার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ না দিয়ে স্কুলের হয়ে খেলার আদেশ দিয়েছিলেন সেই শিক্ষক৷ আদেশ অমান্য করার কারণেই নাকি প্রথমে মেয়েকে গালাগাল এবং তারপর বাবাকে মারধর!

বাবার অপমানের বিচার চেয়েছেন তাসলিমা৷ আমরাও চাই৷ চাই অভিযোগ তদন্ত করে দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হোক৷

তবে বাফুফের কর্মকর্তাদেরও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক৷ তাঁরা বলুক, দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনা মেয়েদের ‘অসম্মান' করে অন্যদেরও সেই সুযোগ করে দেয়ার অধিকার তাঁদের কে দিয়েছে?

কৃতী মানুষদের সম্মান জানাতে কোটি টাকার দরকার হয়না৷ সম্মান জানাতে জানতে হয় এবং সম্মান জানানোর সদিচ্ছাটা সাধ্য অনুযায়ী কাজে প্রকাশ করতে হয়৷

Deutsche Welle DW Ashish Chakraborty

আশীষ চক্রবর্ত্তী, ডয়চে ভেলে

বাফুফে যদি দুটো মাইক্রোবাস ভাড়া করেও মেয়েদের বাড়ি পাঠানোর উদ্যোগ নিতো, তাহলেও কিন্তু এত কিছু হয় না৷ মাইক্রোবাস বাড়ি বাড়ি গিয়েও মেয়েদের পৌঁছে দিতে পারতো, গ্রামবাসী দেখত তাদের গ্রামের মেয়েদের দেশ সসম্মান বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে৷ তখন আর লোকাল বাসের দুর্ভোগ, অপমান সইতে হতো না তাসলিমাদের৷ কোনো শিক্ষকও হয়ত ছাত্রীর বাবার গায়ে হাত তোলার স্পর্ধা দেখাতেন না৷

বাফুফে সংবর্ধনা দিতে হয়ত শিখেছে, কিন্তু সম্মান জানাতে শেখেনি৷ সে কারণেই এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাই পর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরই মেয়েদের এত অপমান৷

বাংলাদেশের মতো দেশে মফিজ উদ্দিনের পরিকল্পনা যে সহজে বাস্তবায়িত হওয়ার নয় তা বোধগম্য৷ সেটা হয়ওনি৷ ছিল বাবা-মার কাছ থেকে বাধা, ছিল সামাজিক বাধাও৷ কিন্তু তারপরও কয়েকজন মেয়েকে ফুটবলে নিয়ে আসতে সমর্থ হন তিনি৷

একেবারে বামে যাকে দেখছেন তার নাম তহুরা খাতুন৷ বয়স ১২৷ সবাই তাকে কলসিন্দুরের ‘মেসি’ বলে ডাকে৷ এত সাফল্যের পরও তহুরার দাদার চিন্তা, ফুটবল খেলার জন্য হয়ত তহুরা ভালো কোনো স্বামী পাবে না৷

ঢাকায় এ সপ্তাহেই শেষ হলো এশিয়ার মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবলের গ্রুপ ‘সি'-র বাছাই পর্ব৷ সেখানে ৫ ম্যাচে ২৮ গোল করে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েই চূড়ান্ত পর্ব নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশের মেয়েরা৷ সবাই আনন্দে উচ্ছ্বসিত, গর্বিত৷ কৃষ্ণা, তহুরা, তাসলিমাদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন সবাই৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিনন্দন জানিয়েছেন৷

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াও অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে আসা কিছু সুবিধাবঞ্চিত মেয়ের এভাবে দেশের মুখ উজ্জ্বল করার ঘটনায় আপ্লুত৷ ইরান, সিঙ্গাপুর, কিরগিজস্তান, তাইওয়ান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হারিয়ে এশিয়ার সেরা আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের আসন করে নেয়ায় কিশোরী ফুটবলারদের তিনিও অভিনন্দন জানিয়েছেন৷

অভিনন্দনের মিছিলে বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দীনের নামটিও দেখলাম৷ বিদেশ থেকে তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, ‘‘সভাপতি হিসেবে (আমার জন্য) এর চেয়ে বড় খবর আর কী হতে পারে? বাংলাদেশ ফুটবলের সভাপতি হবার পর এটাই আমার কাছে এ যাবতকালের সেরা খবরগুলোর মধ্যে একটি৷ ... যতগুলো ম্যাচ আমি দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে, ওরা বাংলাদেশ ফুটবলের ব্যতিক্রমধর্মী সংঘবদ্ধ একটি দল৷''

কিন্তু দুঃখের বিষয়, সানজিদা, মারিয়া, মৌসুমী, কৃষ্ণা, তাসলিমারা ‘সংঘবদ্ধ দল' হয়ে উঠলেও, বাফুফে এখনো ‘সংঘবদ্ধ', ‘সুশৃঙ্খল' বা অনুকরণীয় ‘কর্মীদল' হতে পারেনি৷ তা যদি হতো, তাহলে সভাপতির কথার সঙ্গে বাফুফের কাজের কিছুটা মিল অন্তত থাকতো৷ সভাপতি অনূর্ধ-১৬-র যে মেয়েদের সাফল্যে গর্বিত, তাদের প্রতি সম্মান, সহানুভূতি বাফুফেও নিশ্চয়ই দেখাতো৷ কিন্তু বাফুফে তা একটুও দেখায়নি৷ এত বড় একটা সাফল্যের পর লোকাল বাসে বাড়ি পাঠিয়ে বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন মেয়েদের বরং অসম্মানই করেছে বাফুফে৷

ঈদের আগে পথেঘাটে যতরকমের দুর্ভোগ থাকে তার চেয়েও বেশি দুর্ভোগ সয়ে মেয়েরা একটু দেরিতে হলেও যার যার বাড়ি পৌঁছেছে৷ বাড়িতেও সবার অভিজ্ঞতা ভালো হয়নি৷ কলসিন্দুর গ্রামে তাসলিমার বাবাকে পিটিয়েছে এক স্কুলশিক্ষক৷ দেশের হয়ে খেলা কলসিন্দুরের সব মেয়েকে ঢাকার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ না দিয়ে স্কুলের হয়ে খেলার আদেশ দিয়েছিলেন সেই শিক্ষক৷ আদেশ অমান্য করার কারণেই নাকি প্রথমে মেয়েকে গালাগাল এবং তারপর বাবাকে মারধর!

বাবার অপমানের বিচার চেয়েছেন তাসলিমা৷ আমরাও চাই৷ চাই অভিযোগ তদন্ত করে দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হোক৷

তবে বাফুফের কর্মকর্তাদেরও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক৷ তাঁরা বলুক, দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনা মেয়েদের ‘অসম্মান' করে অন্যদেরও সেই সুযোগ করে দেয়ার অধিকার তাঁদের কে দিয়েছে?

কৃতী মানুষদের সম্মান জানাতে কোটি টাকার দরকার হয়না৷ সম্মান জানাতে জানতে হয় এবং সম্মান জানানোর সদিচ্ছাটা সাধ্য অনুযায়ী কাজে প্রকাশ করতে হয়৷

Deutsche Welle DW Ashish Chakraborty

আশীষ চক্রবর্ত্তী, ডয়চে ভেলে

বাফুফে যদি দুটো মাইক্রোবাস ভাড়া করেও মেয়েদের বাড়ি পাঠানোর উদ্যোগ নিতো, তাহলেও কিন্তু এত কিছু হয় না৷ মাইক্রোবাস বাড়ি বাড়ি গিয়েও মেয়েদের পৌঁছে দিতে পারতো, গ্রামবাসী দেখত তাদের গ্রামের মেয়েদের দেশ সসম্মান বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে৷ তখন আর লোকাল বাসের দুর্ভোগ, অপমান সইতে হতো না তাসলিমাদের৷ কোনো শিক্ষকও হয়ত ছাত্রীর বাবার গায়ে হাত তোলার স্পর্ধা দেখাতেন না৷

বাফুফে সংবর্ধনা দিতে হয়ত শিখেছে, কিন্তু সম্মান জানাতে শেখেনি৷ সে কারণেই এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাই পর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরই মেয়েদের এত অপমান৷

হতাশা দিয়ে শুরু

না, এখানে কলসিন্দুরের মেয়েদের হতাশার কথা বলা হচ্ছে না৷ বলা হচ্ছে মফিজ উদ্দিনের কথা৷ স্থানীয় ছেলেরা কোনো কাপ জিততে না পারায় একরকম হতাশ হয়েই ২০১১ সালে মেয়েদের দিয়ে ফুটবল খেলানোর চিন্তা শুরু করেছিলেন ফুটবল কোচ মফিজ উদ্দিন৷

পথটা মসৃণ ছিল না

বাংলাদেশের মতো দেশে মফিজ উদ্দিনের পরিকল্পনা যে সহজে বাস্তবায়িত হওয়ার নয় তা বোধগম্য৷ সেটা হয়ওনি৷ ছিল বাবা-মার কাছ থেকে বাধা, ছিল সামাজিক বাধাও৷ কিন্তু তারপরও কয়েকজন মেয়েকে ফুটবলে নিয়ে আসতে সমর্থ হন তিনি৷

সুযোগ যখন এলো

২০১১ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন মেয়েদের ফুটবলের আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতার আয়োজন করে৷ মফিজ উদ্দিন এই সুযোগটা কাজে লাগান৷ স্থানীয় স্কুলের সহযোগিতায় তিনি একটি দল গঠন করেন, যেটা স্থানীয় পর্যায়ে সফলতার পর জাতীয় পর্যায়েও সেরা হয়৷

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা

শুধু জাতীয় পর্যায়ের সফলতা নিয়ে থেমে থাকেনি কলসিন্দুরের মেয়েরা৷ চলতি বছর নেপালে অনুষ্ঠিত এএফসি অনুর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক ফুটবল প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে তারা৷ প্রতিযোগিতার ফাইনালে উঠলেও নেপালে ভূমিকম্পের কারণে খেলাটা এখনও অনুষ্ঠিত হয়নি৷

কলসিন্দুরের ‘মেসি’

একেবারে বামে যাকে দেখছেন তার নাম তহুরা খাতুন৷ বয়স ১২৷ সবাই তাকে কলসিন্দুরের ‘মেসি’ বলে ডাকে৷ এত সাফল্যের পরও তহুরার দাদার চিন্তা, ফুটবল খেলার জন্য হয়ত তহুরা ভালো কোনো স্বামী পাবে না৷

বুট তুলে রেখেছে রুমা

তহুরার সঙ্গে খেলতো ১৩ বছরের রুমা আক্তার৷ কিন্তু বাবার আপত্তির কারণে খেলা ছেড়ে দিতে হয়েছে তাকে৷ তার বাবা মনে করেন, রুমা ফুটবল খেলে পরিবারের অসম্মান ডেকে এনেছে৷ কিন্তু বার্তা সংস্থা এএফপিকে রুমা জানিয়েছে, ‘‘আমি চাই মানুষ আমাকে আমার মেধার জন্য চিনুক৷ আমি আমার মায়ের মতো শুধু গৃহিনী হয়ে কিংবা স্বামীর দয়ার উপর জীবন কাটাতে চাই না৷’’