বাংলাদেশিদের ইউরোপে পাচারে আন্তর্জাতিক চক্র

বাংলাদেশি নাগরিকদের ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাচার করতে ইউরোপেই জালিয়াত চক্র আছে৷ সেই জালিয়াত চক্রের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশিরাও৷

২০১৬ সালের ২৫মে ইউরোপে যাওয়ার ভুয়া কাগজ তৈরির দু’টি চক্রের ১৯ জনকে গ্রিস ও চেক প্রজাতন্ত্রে গ্রেপ্তার করে ইউরোপোল৷ আটকের পর ইউরোপোল জানায়, গ্রিসের এথেন্সভিত্তিক এই দু’টি চক্র জাল ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট তৈরির সঙ্গে জড়িত, যার একটি বাংলাদেশিরা চালায়৷ ইইউ-র জাল পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরি করে প্রতিটি ৩,৬০০ ডলার পর্যন্ত দামে বিক্রি করে তারা৷ কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এ সব জাল কাগজপত্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়৷ ইউরোপোল বলছে, বাংলাদেশিদের চক্রটি ২০১৫ সালে এ সব কাগজপত্রের অন্তত ১২৬টি চালান কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠিয়েছে৷ জালিয়াতিতে জড়িত অন্য চক্রটি সুদানিদের এবং গত বছর তারা কুরিয়ারে পাঠিয়েছে প্রায় ৪৩১টি চালান৷

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, এথেন্সভিত্তিক এই দু’টি জালিয়াত চক্র পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, শেঙেন ভিসা (ইউরোপের ২৬টি দেশে অবাধে চলাচলের অনুমতিপত্র), ড্রাইভিং লাইসেন্স, শরণার্থীদের রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও রেসিডেন্স পারমিট জাল করে৷ 

এখন লাইভ
06:12 মিনিট
বিষয় | 15.05.2018

‘আমাদের দেশে যে চক্রগুলো আছে তারা আন্তর্জাতিক চক্রের লোকাল এজ...

এ দু’টি চক্রের পাশাপাশি চেক প্রজাতন্ত্রে আরেকটি চক্র সক্রিয় থাকার কথা জানিয়ে ইউরোপোল তখন বলেছিল, ঐ চক্রটি প্রথমে চুরি হওয়া বা হারিয়ে যাওয়া পরিচয়পত্র ও ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্র কেনে৷ তারপর এথেন্সের ঐ চক্রগুলোর কাছে সেগুলো পাঠালে তারা তাতে ঘষামাজা করে মক্কেলদের ব্যবহারের উপযোগী করে ফেরত পাঠায়৷ এরপর চেক প্রজাতন্ত্র থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে তা পাঠানো হয়৷ এই চক্রটি ভুয়া শেঙেন ভিসা তৈরিতেও জড়িত বলে জানায় ইউরোপোল৷

বাংলাদেশি চক্র

এবার খোদ বাংলাদেশে কী হচ্ছে তার দিকে একবার নজর দেয়া যাক৷ চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল জাল ভিসা চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ এরা হলো – জিয়াউল হক জুয়েল, মো. জাকারিয়া মাহমুদ, মো. মাহবুবুর রহমান এবং মো. মামুন হোসেনষ৷ পুলিশ তাদের কাছ থেকে শেঙেনভুক্ত দেশ উত্তর সাইপ্রাসে যাওয়ার জাল আমন্ত্রণপত্র, ১৪টি জাল ভিসাযুক্ত পাসপোর্ট, ভিসা তৈরির সরঞ্জাম ও বিপুল পরিমাণ বিএমইটি কার্ড উদ্ধার করে৷

পুলিশ তখন জানায়, চক্রের হোতা মূলত জিয়াউল হক জুয়েল৷ তার সহযোগী হয়ে কাজ করে জাকারিয়া মাহামুদ ও মাহবুবুর রহমান৷ এছাড়া মামুনের কাজ হলো প্রকৃত শেঙেন ভিসার উপর কম্পিউটার গ্রাফিক্সের মাধ্যমে জাল শেঙেন ভিসা তৈরি করে প্রিন্ট করা৷
চক্রটি বিভিন্নভাবে সাইপ্রাস, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শেঙেনভুক্ত দেশগুলোতে বিভিন্ন চাকরি দিয়ে লোক পাঠানোর অফার দেয়৷ এ জন্য তারা ৩ থেকে ১০ লাখ টাকার চুক্তি করে৷

পুলিশের বক্তব্য

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ উত্তরের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান এই জালিয়াত চক্রটি নিয়ে এ মুহূর্তে তদন্ত করছেন৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘এ রকম আরো অন্তত তিনটি গ্রুপের খোঁজ আমরা পেয়েছি৷ তার তদন্ত করতে গিয়ে দু’টি বিষয় আমরা জেনেছি৷ কিছু লোক আছেন, যারা সরাসরি প্রতারিত হন৷ তাদের কাছ থেকে জাল কাগজপত্র দেখিয়ে গড়ে ৩-৪ লাখ টাকা নেয়া হয়৷ কিন্তু তারা কখনোই দেশের বাইরে যেতে পারেন না৷ আরেকটি গ্রুপ, যাদের প্রতিজনের কাছ থেকে ১০-১১ লাখ টাকা নেয়া হয়, তাদের এই জাল কাগজপত্র দিয়ে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়৷ এই চক্রগুলোর সঙ্গে অনেক প্রভাবশালীরা জড়িত বলে আমরা তথ্য পেয়েছি৷ তাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগও রয়েছে৷ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত কিছু বাংলাদেশি এবং ঐ সব দেশের কিছু নাগরিক পুরো চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে আমরা জানতে পেরেছি৷’’

তিনি জানান, ‘‘ইউরোপের দেশগুলোতে যাওয়ার জন্য অবৈধ কাগজপত্র প্রস্তুতকারী চক্রের সঙ্গে শ্রম ও কর্মসংস্থান ব্যুরো, ইমিগ্রেশনসহ আরো অনেক বিভাগের অসাধু কিছু কর্মকর্তার যোগাযোগের তথ্যও আমরা পেয়েছি৷ এছাড়া টাকার বিনিময়ে বিএমইটি কার্ড সরবরাহ করা হয় বলেও তথ্য পেয়েছি আমরা৷ রাজনৈতিকভাবে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ছেলে এই চক্রকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়৷’’
মশিউর রহমান বলেন, ‘‘জালিয়াত চক্র এখানেই বিদেশি দূতাবাসের কাগজপত্রসহ ওয়ার্ক পারমিট, রেসিডেন্ট পারমিট এবং বিদেশি ব্যাংকে ব্যাংক ব্যালেন্সের ভুয়া ডকুমেন্ট তৈরি করে৷’’

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

তিন ধরনের সুরক্ষা

শরণার্থী, হিউম্যানিটারিয়ান ও সাবসিডিয়ারি – এই তিন ক্যাটাগরিতে আশ্রয় দেয়া হয়ে থাকে৷ যাঁরা শরণার্থী স্ট্যাটাসের যোগ্য নন, কিন্তু দেশে ফিরে গেলে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ার ঝুঁকিতে আছেন, তাঁদের সাবসিডিয়ারি সুরক্ষা দেয়া হয়৷ আর অসুস্থতা ও অভিভাবকহীন শিশুদের মানবিক (হিউম্যানিটারিয়ান) বিবেচনায় আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১৭

বাংলাদেশি নাগরিকদের পক্ষ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গতবছর ১৬,০৯৫টি আশ্রয়ের আবেদন পড়েছে৷ আর একই সময়ে বাংলাদেশিদের করা ২,৮৩৫টি আবেদন সফল হয়েছে৷ শতকরা হিসেবে সেটি ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ৷ জার্মানিতে আবেদন পড়েছে ২,৭২৫টি৷ সফল হয়েছে ৩১৫টি৷ এমনিভাবে অন্য কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান এরকম – যুক্তরাজ্য (আবেদন ১,৬৩০; সফল ৬৫), ইটালি (আবেদন ৫,৭৭৫; সফল ১,৮৮৫) এবং ফ্রান্স (আবেদন ৪,১১৫; সফল ৪৪০)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১৬

বাংলাদেশিরা ১৪,০৮৫টি আবেদন করেছেন৷ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে ২,৩৬৫টি৷ অর্থাৎ সফলতার হার ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ৬৬৫; সফল ১১০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ১,৪০৫; সফল ৮০), ইটালি (আবেদন ৬,২২৫; সফল ১,৬১০) এবং ফ্রান্স (আবেদন ৪,১১০; সফল ৪৪০)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১৫

সেবছর সফলতার হার ছিল ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ৷ আবেদন পড়েছিল ১১,২৫০টি৷ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ১,৭৮৫টি৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ২৬৫; সফল ৩৫), যুক্তরাজ্য (আবেদন ১,০১৫; সফল ১২০), ইটালি (আবেদন ৫,০১০; সফল ১,২২৫) এবং ফ্রান্স (আবেদন ৩,৫৬০; সফল ৩১৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১৪

আবেদন ৭,৫৮০টি৷ সফল ৭৮৫৷ শতকরা হার ১০ দশমিক ৩৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ৪৬৫; সফল ৫০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ৭০০; সফল ৭৫), ইটালি (আবেদন ৭৩৫; সফল ৩১৫) এবং ফ্রান্স (আবেদন ৩,৮৭০; সফল ২৬৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১৩

সফলতার হার ৭ দশমিক ১ শতাংশ৷ আবেদন ৮,৩৩৫৷ সফল ৫৯৫৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ২৫০; সফল ২০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ৮৩০; সফল ৫৫), ইটালি (আবেদন ৫৯০; সফল ৩০০) এবং ফ্রান্স (আবেদন ৩,৬১৫; সফল ১৪৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১২

সফলতার হার ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ১৯০; সফল ১০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ৮০০; সফল ৫০), ইটালি (আবেদন ১,৪১০; সফল ১,০৪৫) এবং ফ্রান্স (আবেদন ৩,৭৫৫; সফল ৮৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১১

সফলতার হার ২ দশমিক ৮ শতাংশ৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ১১০; সফল ০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ৪৮০; সফল ৪০), ইটালি (আবেদন ৮৬৫; সফল ৬৫) এবং ফ্রান্স (আবেদন ৩,৭৭০; সফল ৪৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০১০

সফলতার হার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ১০৫; সফল ০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ৪৬০; সফল ৫৫), ইটালি (আবেদন ২১৫; সফল ৪০) এবং ফ্রান্স (আবেদন ২,৪১০; সফল ২৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০০৯

সফলতার হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ৪০; সফল ০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ৩৭৫; সফল ৪৫), ইটালি (আবেদন ৮৮৫; সফল ৮৫) এবং ফ্রান্স (আবেদন ১,৭৮০; সফল ৩৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

২০০৮

সফলতার হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ৷ কয়েকটি দেশের পরিসংখ্যান – জার্মানি (আবেদন ৪০; সফল ০), যুক্তরাজ্য (আবেদন ৩৯৫; সফল ৯৫), ইটালি (আবেদন ৯৫০; সফল ৫০) এবং ফ্রান্স (আবেদন ১,৬৬০; সফল ৩৫)৷

ইউরোপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় পাওয়ার হার বাড়ছে

৩২ দেশের হিসাব

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮ সদস্যরাষ্ট্র এবং ‘ইউরোপিয়ান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ বা ইএফটিএ-এর অন্তর্ভুক্ত আইসল্যান্ড, লিখটেনস্টাইন, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের পরিসংখ্যান অন্তর্ভুক্ত করেছে ইউরোস্ট্যাট৷ আরও পরিসংখ্যান জানতে উপরে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশে লোক পাঠানোর নামে যে জালিয়াতি হয়, এটা সবাই জানে৷ তাই ইউরোপের দেশগুলোকে এখন টার্গেট করেছে জালিয়াত চক্র৷ সাধারণ মানুষ যাতে সহজে বুঝতে না পারেন৷’’ তিনি বলেন, ‘‘আমরা যে চক্রটিকে আটক করেছি, তারা ঢাকা থেকে প্রথমে তুরস্ক বা সাইপ্রাস নিয়ে, সেখান থেকে ইউরোপের অন্য দেশে মানুষ পাচার করত৷’’
সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি

যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট গত বছরের মে মাসে ইউরোপে মানবপাচারের ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে৷ তাতে বলা হয়, সাগরপথে ইউরোপে বেশি মানুষ পাচার হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) পরিসংখ্যান দিয়ে পত্রিকাটি জানায়, ‘‘২০১৭ সালের প্রথম তিন মাসে লিবিয়া থেকে অন্তত ২ হাজার ৮৩১ জন বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইটালিতে যায়৷ ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র একজন৷ আর ২০১৪ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে বাংলাদেশের ৯ হাজার ৯১৫ জন নাগরিককে উদ্ধারের বিষয়টি ইটালি সরকার বাংলাদেশকে জানিয়েছে৷’’ 
তাদের খবর অনুযায়ী, জাহাজে করে ইউরোপ, বিশেষ করে ইটালিতে পাড়ি দেয়া লোকজনের মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকই সবচেয়ে বেশি৷ দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে লিবিয়ায় বাংলাদেশের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স এম মোজাম্মেল হক তখন জানান, বাংলাদেশের নাগরিকরা ঢাকা থেকে দুবাই অথবা জর্ডান বা মিশর অথবা তুরস্ক বা টিউনিসিয়া হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান৷ এরপর তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সাগরপথে পাড়ি জমান ইউরোপে, বিশেষ করে ইটালিতে৷ ঐ সময়ে লিবিয়ায় চলমান সংঘাতের কারণে অর্থনৈতিক বিপর্যয় অব্যাহত থাকায় শ্রমবাজারে ধস নেমেছিল৷ ফলে বাংলাদেশের লোকজন লিবিয়া থেকে পাড়ি জমান ইটালিতে৷

ঢাকা থেকে দুবাই কিংবা তুরস্ক হয়ে লিবিয়া পৌঁছানোর জন্য দালালকে ১০ হাজারের বেশি ডলার দিতে হয় প্রত্যেককে৷ লিবিয়া থেকে ইটালিতে কাজ দেওয়ার শর্তে দালালরা প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে তিন থেকে চার হাজার ডলার নেয়৷ আইওএম-এর এক মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশ থেকে উড়োজাহাজে চড়ে দুবাই, তুরস্ক হয়ে লিবিয়ায় আসেন অনেকে৷ বিমানবন্দরে নামার পর এ সব লোকের নিয়োগকারীরা তাদের সব কাগজপত্র নিয়ে নেন৷ আইওএম-এর তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে সাগরপথে পাড়ি দিতে প্রত্যেককে ৭০০ ডলার করে দালালকে দিতে হয়৷
২০১৭ সালে ইউরোপে যাওয়ার পথে সাগরে ডুবে, দম বন্ধ কিংবা জাহাজে গাদাগাদির কারণে প্রায় ১,১০০ লোক প্রাণ দিয়েছেন৷

প্রত্যাবর্তন

২০১৬ সালের শুরু থেকে ২৮ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অবৈধ বাংলাদেশিদের ঐ সব দেশ থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিতে জোর দেয়৷ সে বছরের এপ্রিলে ঢাকা সফরের সময় ইইউ প্রতিনিধিদল ইউরোপে ৮০ হাজার অবৈধ বাংলাদেশির উপস্থিতির কথা জানায়৷ ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাট-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আট বছরে ৯৩ হাজার ৪৩৫ জন বাংলাদেশি ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন৷

এই অবস্থায় ইউরোপ থেকে অনিয়মিত বাংলাদেশিদের ফেরত আনতে গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ৷

গোয়েন্দা কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ‘‘আমরা চাইছি, যে সব বাংলাদেশি নাগরিক ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত আসছেন, তাদের আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার (আইওএম) প্রতিনিধিদের সামনে জিজ্ঞাসাবাদ করে আন্তর্জাতিক চক্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে৷’’
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলি বাংলাদেশিদের জন্য প্রায় ২৬ হাজার, ২০১৫ সালে প্রায় ২১ হাজার এবং ২০১৬ সালে প্রায় ২৫ হজার রেসিডেন্ট পারমিট ইস্যু করেছে৷ তবে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ইস্যু করেছে মাত্র ৪ হাজার ১০০ পারমিট৷

ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাজ্য বাদে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য ২৭টি দেশে প্রায় দুই লাখ বৈধ ভিসাধারী বাংলাদেশি অবস্থান করছেন, যাদের সেখানে থাকার এবং কাজ করার অনুমতি আছে৷

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ২০১৬ পর্যন্ত প্রায় ১৭ হাজার ৩০০ বাংলাদেশি ইউরোপে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন এবং এর মধ্যে প্রায় ১১ হাজার ৮০০ জনের আবেদন খারিজ করা হয়েছে৷ বাকি প্রায় ৬,০০০ আবেদনের অধিকাংশ খারিজ হবার সম্ভাবনা রয়েছে৷ খারিজ হওয়া এই আবেদনকারীদের ইউরোপে অবস্থান করার কোনো অধিকার নেই এবং নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের প্রেক্ষিতে তাদের সবাইকে ফেরত নিয়ে আসা হবে৷

এদিকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ইউরোপে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলি অনিয়মিত বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত আসার জন্য প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ট্র্যাভেল পারমিট ইস্যু করেছে৷ 

ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তির আওতায় গত ছ’মাসে ইউরোপ থেকে ৬৪ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে৷ তাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিশ্চিত হতে ন্যাশনাল আইডি কার্ড, পাসপোর্ট ও হাতের ছাপ ব্যবহার করা হয়েছে৷ 

এখন লাইভ
05:00 মিনিট
বিষয় | 15.05.2018

‘‘কিছু লোক আছেন, যারা সরাসরি প্রতারিত হন’’

বিশেষজ্ঞ মত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি রিচার্স মুভমেন্ট ইউনিটের (রামরু) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সি আর আবরার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ইউরোপের দেশগুলোতে মানবপাচারে জড়িত আর্ন্তজাতিক চক্রগুলো সক্রিয়৷ কিন্তু তাদের ব্যাপারে আমরা কোনো তথ্য বা ব্যবস্থা নেয়ার মতো খবর পাচ্ছি না৷ এরা কিন্তু বাংলাদেশের নয়৷ এরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের৷ যারা ঐ চক্রের খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হন, তারা প্রলোভনের ফাঁদে পড়েন৷ এ সব দেশের উন্নত জীবন সম্পর্কে তাদের কাছে তথ্যও রয়েছে৷ এর বাইরে মধ্যপ্রাচ্যে কিছু বাংলাদেশি আছেন, যারা বেশ ধনি৷ সেখানেও চক্র গড়ে উঠেছে, যারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে তুরস্ক হয়ে ইউরোপে মানবপাচার করে৷ আরো উন্নত জীবনের বা ভালো অবস্থার প্রলোভন দেখিয়ে এ কাজ করে তারা৷’’

তিনি বলেন, ‘‘আমাদের দেশে যে চক্রগুলো আছে তারা আন্তর্জাতিক চক্রের লোকাল এজেন্ট৷ আমার কথা হলো, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে যারা প্রতারিত হয়ে শুধু বাংলাদেশ নয় আরো অনেক দেশে ফেরত যাচ্ছেন, তাদের টেস্টিমনির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চক্রকে চিহ্নিত করা ও ব্যবস্থা নেওয়া৷’’

আরেক প্রশ্নের জবাবে সি আর আবরার বলেন, ‘‘ইউরোপসহ উন্নত বিশ্বে অভিবাসন এখন অনেক কড়াকড়ি হয়ে গেছে৷ কিন্তু ঐ সব দেশে কি শ্রমিকের কাজ নেই? তাই শ্রমিক বৈধ অভিবাসনের সুযোগ না পেলে প্রতারকরা এর সুযোগ নেয়৷ তারা অবৈধ অভিবাসনের ফাঁদ পাতে৷ অনেকে অবৈধ জেনেও উন্নত বিশ্বে পাড়ি দেয়৷ কারণ তাকে তো কাজ পেতে হবে৷’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘ইউরোপের কয়েকটি দেশ অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত যেতে আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে৷ কিন্তু এটা কোনো সমাধান নয়৷ কারণ পাঁচ হাজার ফেরত আসলে নতুন যে পাঁচ হাজার যাবে না, তার নিশ্চয়তা কী?’

সি আর আবরার বলেন, ‘‘দেশ থেকে বিদেশে অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে আমাদের কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে৷ নাগরিকদের অবৈধ অভিবাসন বিষয়ে সতর্ক করতে হবে৷ আর ইউরোপসহ উন্নত বিশ্বকে মূল মানবপাচার চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে৷ এর সঙ্গে বৈধ অভিবাসনকে কঠোর না করে প্রয়োজনীয় অভিবাসনের সুযোগ দিতে হবে৷’’

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

আমাদের অনুসরণ করুন