বাংলাদেশের নদী, নদীর বাংলাদেশ

পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমি গঠিতই হয়েছে পলি মাটি দিয়ে৷ এরপর এই ভূমির উর্বরাশক্তি ধরে রাখতেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ভূমিকা রেখেছে সেই পলি মাটিই৷

নদী ভূমি গঠনের এই পলি বহন করে এনেছে, এখনো আনছে৷ এই ভূমি গঠনের হাজার হাজার বছর পর এখনো সেই নদী মানুষের জীবনে নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রধানতম ভূমিকা রেখে চলেছে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

আদিকাল থেকেই বাংলাদেশের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি৷ সেখানেও মূল ভূমিকায় নদী৷ সাম্প্রতিক সময়ে এই কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি যোগ হয়েছে৷ ব্যবস্থা হয়েছে আধুনিক সেচের৷ এজন্য বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে৷ এর সবগুলোই নদীকে কেন্দ্র করে৷

এক সময় বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডার ছিল দক্ষিণাঞ্চল৷ বিশেষ করে বরিশাল অঞ্চল৷ এক সময় বরিশালকে বলা হতো, ‘ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল'৷ প্রবাদটি প্রচলিত ছিল সারা দেশজুড়েই৷

সমাজ-সংস্কৃতি

দূষণকালো বুড়িগঙ্গা

ভয়াবহ দূষণে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি কুচকুচে কালো৷ ঢাকার প্রাণ বলা হয় এই বুড়িগঙ্গাকে৷ কিন্তু দূষণে জর্জরিত নদীটি দিনে দিনে যেন মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বর্জ্যের নদী

ঢাকার বাবুবাজার এলাকা দিয়ে সরাসরি বর্জ্য মিশ্রিত পানি ফেলা হচ্ছে বুড়িগঙ্গায়৷ ঢাকার বিভিন্ন এলাকার এরকম বেশ কিছু জায়গা থেকে সরাসরি বুড়িগঙ্গায় ফেলা হয় বর্জ্য৷ বুড়িগঙ্গার পানি দূষণের এটি একটি অন্যতম কারণ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

রাসায়নিকের ব্যাগ থেকে...

বুড়িগঙ্গার পানিতে রাসায়নিক বহন করার ব্যাগ পরিস্কার করছেন শ্রমিকরা৷ পুরনো ঢাকার বেশ কয়েকটি স্থানে নিয়মিত রাসায়নিক বহনের ব্যাগ, কন্টেইনার পরিস্কার করার কারণে এ নদীর পানি দূষিত হচ্ছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

নদীতে রাসায়নিক

পুরনো ঢাকার ইসলামবাগ, শোয়ারিঘাট, কামরাঙ্গিরচরসহ বিভিন্ন এলাকায় বুড়িগঙ্গার তীরজুড়ে চলে প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ৷ বিভিন্ন রাসায়নিব দ্রব্য মিশ্রিত এসব প্লাস্টিকের সামগ্রী পরিস্কারের কাজটি সরাসরি করা হয় বুড়িগঙ্গার পানিতে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ফল ব্যবসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া!

বুড়িগঙ্গার পানি দূষণের আরেকটি কারণ ফলে ব্যবহৃত প্লাস্টিক জাতীয় মোড়ক, ফোম ইত্যাদি৷ পুরনো ঢাকার বাদামতলী এলাকায় ঢাকার সবচেয়ে বড় ফলের পাইকারী বাজার থেকে এসব অপচনশীল দ্রব্যাদি সরাসরি ফেলা হয় বুড়িগঙ্গায়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

নদীর আরেক শত্রু ডকইয়ার্ড

বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ডকইয়ার্ড৷ এসব ডকইয়ার্ডের কারণেও দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা৷ ডকইয়ার্ডের জাহাজের তেল আর পোড়া মবিল এ দূষণে ভূমিকা রাখে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

পলি ঢাকে পলিথিন

পলিথিনের ব্যাগও বুড়িগঙ্গা দূষণের অন্যতম কারণ৷ বাংলাদেশে পলিথিন ব্যবহারে কিছুটা বিধিনিষেধ থাকলেও বাস্তবে সে আইন কোথাও মানা হয় না৷ ফলে ঢাকা শহরের সর্বত্র অবাধে পলিথিন ব্যবহার করা হয় এবং বিভিন্ন ড্রেন হয়ে ব্যবহৃত সব পলিথিন চলে আসে বুড়িগঙ্গায়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

নদী যেন ডাস্টবিন

বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী অনেক এলাকার মানুষই সরাসরি বুড়িগঙ্গায় ময়লা-আবর্জনা ফেলেন৷ এসব ময়লা-আবর্জনা বুড়িগঙ্গার পানিতে মিশে যায়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

নৌ চলাচলও ব্যাহত যখন

বর্ষা মৌসুমে ভাটি থেকে প্রচুর কচুরিপনা এসে বুড়িগঙ্গার পানি ঢেকে ফেলে৷ এ সময়ে এ নদীতে নৌকা ও জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

তীরে ইটভাটা

বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে বিভিন্ন এলাকায় আছে বেশ কিছু ইটভাটা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

তুরাগ দখল

এ ছবি ঢাকার আমিনবাজারের কাছের তুরাগ নদের৷ দখলে জর্জরিত এ নদের দুই পাড়৷ দখলকারীরা মূলত প্রভাবশালী বালু আর পাথর ব্যবসায়ী৷

সমাজ-সংস্কৃতি

গোসল যখন দূষণের কারণ

ঢাকার মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় তুরাগ নদে গবাদি পশু আর মানুষের গোসল চলছে একই সঙ্গে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

শীতলক্ষ্যায় শিল্পের অভিশাপ

নারায়ণগঞ্জের শীতালক্ষ্যা নদীও ভয়াবাহ দূষণের শিকার৷ এ নদীর পানি শীত মৌসুমে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে৷ এ নদী দূষণের অন্যতম কারণ এর দুই তীরের অসংখ্য শিল্প কারখানা৷

সমাজ-সংস্কৃতি

শীতলক্ষ্যার দুরবস্থা

নরসিংদীর পলাশ এলাকায় একটি শিল্প কারাখানা থেকে রাসায়নিক মিশ্রিত বর্জ্য শীতালক্ষায় ফেলা হচ্ছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

মৃতপ্রায় চাক্তাই

চট্টগ্রামের চাক্তাই এখন প্রায় মৃত৷ অথচ এক সময় এই চাক্তাই খাল ছিল চট্টগ্রামের প্রাণ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

দূষণের কবলে সুরমা

সিলেট শহরের পাশে কীন ব্রিজের নিচে দূষণে জর্জরিত সুরমা নদী৷ সিলেট শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে এ নদীতে বর্জ্য ফেলার কারণে মারাত্মক দূষিত এ নদীর পানিও এখন ব্যবহারের অনুপযোগী৷

সমাজ-সংস্কৃতি

গবাদি পশুর মৃতদেহও নদীতে

খুলনা ভৈরব নদীতে ভাসমান মৃত পশুর মাংস খাচ্ছে কাক৷ বাংলাদেশে মৃত গবাদি পশুর বেশিরভাগই সরাসরি ফেলা হয় নদীতে৷ মৃত গবাদি পশু পচে নদীগুলো দূষিত করে৷

এই প্রবাদ নদী এবং খালের সঙ্গে ধান উৎপাদনের সম্পর্ককেও বুঝিয়ে দিচ্ছে স্পষ্টভাবে৷

স্বাধীনতার পর খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ বর্তমানে চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পর্ণ বলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই দাবি করা হয়৷ যদিও সীমিত পর্যায়ে বাংলাদেশ এখনো চাল আমদানি করে৷ 

তবুও পরিসংখ্যান বলছে, স্বাধীনতার পর এ দেশের খাদ্য উৎপাদন তিনগুন হয়েছে৷ তাই জনসংখ্যা দ্বিগুন হলেও খাদ্য ঘাটতি কমেছে৷ এই সময়ে উত্তরাঞ্চলে কৃষির ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছে৷ দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প, তিস্তা সেচ প্রকল্প এই অঞ্চলেই অবস্থিত৷

উত্তরাঞ্চলজুড়ে থাকা এই প্রকল্পে এখন মাঝেমাঝেই পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না৷ তবে এরপরও এই প্রকল্প পুরো অঞ্চলের ফসলের মানচিত্র বদলে দিয়েছে৷ নতুন সেই মানচিত্র ধরেই চলছে এই অঞ্চলের চাষাবাদ৷

বাংলাদেশ পরিসংখান ব্যুরোর ২০১৫ সালের একটি হিসাব বলছে, দেশের মোট ধানের ১০ শতাংশেরও বেশি উৎপাদন হয় কেবল ময়মনসিংহে৷ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে রংপুর৷ কেবল রংপুরই নয়৷ উত্তরবঙ্গের সবুজ বিপ্লবের পেছনে রয়েছে তিস্তা প্রকল্প৷

সাম্প্রতিক সময়েও মঙ্গার জেলা বলে পরিচিত রংপুর আলু উৎপাদনেও শীর্ষ জেলা৷

উত্তরের নদীগুলো যখন যৌবন হারিয়ে পানিশূন্য হয়ে যাচ্ছে, তখনও যে পানি পাওয়া যাচ্ছে, তাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এখানকার কৃষি৷

নদীর এই পানি যত স্বল্পই হোক, তার সঙ্গে আসে পলি৷ এর ফলে নতুন উর্বরা শক্তিতে, বছর বছর নতুন যৌবন ফিরে পায় বাংলাদেশের কৃষিভূমি৷

যে পলি অব্যবহৃত থেকে যায়, তা গিয়ে জমে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মোহনায়৷ সেখানে মহাকালের ধারাবাহিকতায় জেগে উঠছে নতুন নতুন ভূমি৷ সদ্বীপ-হাতিয়া থেকে সুন্দরবন– পুরো এলাকাতেই জাগছে বড় বড় এলাকা৷

ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক

পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলার কুড়িয়ানা হাটে নৌকা নিয়ে যাচ্ছেন কারিগররা৷ স্বরূপকাঠির সন্ধ্যা নদীর শাখা খাল ‘কুড়িয়ানা’-তে সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার বসে এ নৌকার হাট৷ প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জলে ও ডাঙ্গায় বসা এ হাট এই অঞ্চলের ঐতিহ্যেরও ধারক৷

নৌকা তৈরি করা যাঁদের পেশা

স্বরূপকাঠি উপজেলার এগারোটি গ্রামের প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি পরিবারের প্রধান পেশা নৌকা তৈরি করা৷ উপজেলার আটঘর, কুড়িয়ানা, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠি, ইন্দুরকানি, দলাহার, আতাপাড়া, শেখেরহাট, চামির, গাগর, গগন প্রভৃতি গ্রামের নৌকার কারিগররা সারা সপ্তাহজুড়ে ব্যস্ত থাকেন নৌকা তৈরিতে৷ আর তারপর শুক্রবার সেই সব নৌকা নিয়ে বিক্রি করেন কুড়িয়ানা নৌকার হাটে৷

বর্ষায় রবিবারেও বসে হাট

শুক্রবার খুব সকাল থেকেই কারিগররা কুড়িয়ানার হাটে আসতে শুরু করেন৷ ক্রেতা সমাগম বিকেলে হলেও, ক্রেতা আকৃষ্ট করতে ভালো জায়গা দখলের প্রতিযোগিতা থাকে এখানে৷ কুড়িয়ানার হাট সাধারণত সপ্তাহে মাত্র একদিন, অর্থাৎ শুক্রবার বসলেও বর্ষা মৌসুমে চাহিদা বেশি থাকায় রবিবারেও সীমিত আকারে হাট বসান বিক্রেতারা৷

দুর্লভ হয়ে উঠেছে সুন্দরী

আটঘর বাজারে সাধারণত বিক্রি হয় কোষা ও ডিঙ্গি নৌকা৷ এ বাজারের নৌকার কারিগর আশুতোষ জানালেন যে, তাঁর বাপ-দাদারা নৌকা তৈরি করতেন সুন্দরী কাঠ দিয়ে৷ সে সময়ে সুন্দরী কাঠের সবচেয়ে বড় মোকাম ছিল স্বরূপকাঠি৷ তবে দিনে দিনে সুন্দরী কাঠ দুর্লভ হয়ে ওঠায়, তাঁরা এখন নৌকা তৈরি করছেন মেহগনি, চাম্বল, রেইনট্রি, গাব, গুলাব, আমড়া, বাদাম প্রভৃতি কাঠ দিয়ে৷

দু’জন মিলে করি কাজ...

ইন্দুরকানি গ্রাম থেকে আসা নৌকা বিক্রেতা আমজাদ মোল্লা জানান যে, দু’জন মিস্ত্রী দিনে একটি ছোট নৌকা তৈরি করতে পারেন৷ আকার আর কাঠের রকম ভেদে একেকটি নৌকা বিক্রি হয় দেড় হাজার থেকে চার হাজার টাকায়৷ তবে নৌকায় গাব, আলকাতরা কিংবা অন্য কোনো কারুকাজ থাকলে দামের তারতম্য তো হয়-ই৷

নামাজের পর জমে ওঠে বাজার

দিনের প্রথমভাগে নৌকা বিক্রেতারা হাটে এসে অলস সময় কাটান৷ এই ফাঁকে কেউ কেউ আবার একটিখানি জিরিয়ে বা ঘুমিয়েও নেন৷ তবে শুক্রবারের জুম্মার নামাজের পর বাজার জমে উঠলে বিক্রেতাদের ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়৷

মুঠোফোনেও হয় লেনদেন

কুড়িয়ানা নৌকার হাটে ক্রেতার অপেক্ষা করছেন বিক্রেতারা৷ তবে সব সময় এ সব বিক্রেতাকে ক্রেতার অপেক্ষায় থাকতে হয় না৷ মোবাইল নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ ও মুঠোফোন সহজলভ্য হওয়ায় অনেক ক্রেতাই আজকাল কারিগরদের কাছে আগাম চাহিদার কথা জানান৷ পরে হাটের দিনে এসে যাচাই বাচাই করে সে নৌকা বুঝে নেন৷

এক নৌকায় দুই মৌসুম

কুড়িয়ানা হাটে ক্রেতারা নৌকা কেনার আগে ভালো করে যাচাই বাচাই করে নেন৷ স্বল্প আয়ের এ সব মানুষদের প্রতিটি নৌকা দিয়ে কমপক্ষে দুটি মৌসুম পার করতে হয়৷ প্রত্যেক ক্রেতাই তাই তাঁদের টাকার সর্বোচ্চ মূল্য পেতে সচেষ্ট থাকেন৷ তারপর নৈকা কিনে আনন্দে ঘরে ফেরেন তাঁরা৷

বৈঠাও বিক্রি হয় বাজারে

নৌকা চালানোর জন্য দরকার বৈঠা৷ কুড়িয়ানা বাজারে কোনো কোনো বিক্রেতা তাই শুধু নৌকার বৈঠা বিক্রি করেন৷ আর ক্রেতারা নৌকা কেনার পর আকার অনুযায়ী বৈঠা কিনে নেন বাজার থেকে৷ কুড়িয়ানা নৌকার হাটে সাধারণত একেকটি বৈঠার দাম ৮০-২০০ টাকা৷ বলা বাহুল্য, কাঠের ধরণ ও আকার অনুযায়ী বৈঠার দামের তারতম্য হয়৷

নানা কাজে ব্যবহৃত হয় নৌকা

কুড়িয়ানা বাজারে বিক্রি হওয়া নৌকাগুলো এ অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন কাজে বহুল ব্যবহৃত হয়৷ সাধরণত মাছ ধরা, কোথাও বেড়াতে যাওয়া, বাজারে পণ্য সরবাহ, পেয়ারা ধরা, হাট-বাজারে যাওয়াসহ নানান কাজে এ সব নৌকার ব্যবহার হয়৷

ভাসমান হাট বেশি দূরে নয়

স্বরূপকাঠির পার্শ্ববতী ঝালকাঠি জেলার ভিমরুলি গ্রামের কৃত্তিপাশা খালে বসে এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ভাসমান হাট৷ বর্ষা ও শরতে এ হাটে শত শত নৌকা বোঝাই পেয়ারা আর আমড়া বিক্রি হয়৷ আর এ সব নৌকার বেশিরভাগেরই যোগান আসে কুড়িয়ানার নৌকার হাট থেকে৷

পাশেই রয়েছে আরেক হাট

কুড়িয়ানার পাশেই আরেকটি হাট ‘আটঘর’৷ ভাসমান এ হাটেও ছোট ছোট নৌকায় কৃষিপণ্য নিয়ে জড়ো হন বিক্রেতারা৷ এ বাজারেও কুড়িয়ানা হাটের নৌকারই প্রাধান্য৷

নদীর অপর দান মাছ৷ বাংলাদেশে সবচেয়ে সুলভ মাছ ইলিশ৷ বাঙালির ইলিশ নিয়ে, ইলিশের রসনা বিলাস নিয়ে কত গল্প কবিতা হয়েছে, তা কি গুনে শেষ করা যাবে?

সেই ইলিশও এই নদীরই দান৷ বিভিন্ন নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ার পরও পরিকল্পিত উপায়ে প্রজনন মৌসুমে মা মাছকে রক্ষা করে বাংলাদেশ এখনো ‘ইলিশের দেশ-'এর খেতাব ধরে রেখেছে৷ আরও কত মাছ এখানে পাওয়া যায় তার হিসাব করা বড়ই কঠিন৷

কৃষি তথ্য সার্ভিসের মতে, বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, সবজিতে তৃতীয়, মাছে চতুর্থ, ছাগলে চতুর্থ, আলুতে ১০ম স্থানে রয়েছে৷ এসব সফলতার পেছনেও রয়েছে নদী৷

নদী এই দেশে জালের মতো ছড়ানো, এই নদীকে কেন্দ্র করেই মানুষের জীবন গড়ে উঠেছে৷ নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা, প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁওসহ সকল শহর-নগর৷ যাতায়াত মানেই ছিল নদীপথে যাতায়াত৷ সওদাগরী নৌকা পাল তুলে ছুটে যেতো দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে৷

বিভিন্ন নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় গত কয়েক দশকে নদীপথে যাতায়াত কমলেও এরই মধ্যে এর গুরুত্ব বুঝেছে সরকারও৷ এ কারণে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নেয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ৷

এই নাব্যতা সংকটের জন্য উজানে প্রতিবেশি ভারতের বিভিন্ন প্রকল্পকেও অনেকে দায়ী করে থাকেন৷ নদীপথে পূর্বাঞ্চলীয় ৭ রাজ্যের ট্রানজিট সুবিধা পেতে নৌপথ ফেরানোর উদ্যোগে শামিল হয়েছে তারাও৷ এরই মধ্যে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা চুক্তিও সম্পাদিত হয়েছে৷ 

এটা সফল হলে পূর্বের সওদাগরী নৌযানের পাশাপাশি যাত্রী পরিবহণকারী নৌযানও চলবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসাম পর্যন্ত৷

DW | Muha Suliman

সুলাইমান নিলয়, সাংবাদিক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

নদীতে নৌকা চালিয়েও বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে৷

২০১৬ সালকে পর্যটন বর্ষ হিসাবে ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ৷ বিগত কয়েক বছর ধরে সরকার বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে নদীভিত্তিক পর্যটনও পেয়েছে বিশেষ গুরুত্ব৷

পর্যটন কর্পোরেশনের উদ্যোগে তৈরি করা বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্র এবং স্বল্প দৈর্ঘ্যের প্রামাণ্যচিত্রেও এ বিষয়টি ফুটে উঠেছে৷

বাংলাদেশে এখনো শিল্প কারখানা স্থাপনেও গুরুত্ব দেওয়া হয় নদীপথের যোগাযোগকে৷ মালামাল পরিবহণে নদীকে ব্যবহার করা গেলে খরচ কম পড়ে৷ বিশ্ব বাজারে টিকে থাকতে পাওয়া যায় অধিক শক্তি৷

যে নদীর পলিতে বাংলাদেশের জন্ম, সেই নদীকেই ঘিরেই এখনো বেঁচে আছে বাংলাদেশ৷ বাঁচতে হবে আরো বহুদূর৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷