বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ

ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একদিকে যেমন বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল রেখেছে, সেই সঙ্গে বাড়িয়েছে বিদ্যুতের চাহিদা৷ এই চাহিদা বৃদ্ধির হার বছরে ১১ শতাংশ৷

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংগতি মাথায় রেখে চাহিদা অনুযায়ী যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করাই মূল চ্যালেঞ্জ৷ এই চাহিদা মেটাতে ২০০৯-১০ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত ৫৭ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে৷ সৌরসহ ২০১০ সালে ৫৭ ভাগ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছেন ৭৪ ভাগ মানুষ৷ এখন দেশের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছেন৷ গেল পাঁচ বছরে মূলত রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন৷ এ যাবৎ (জুলাই, ২০১৭) বিদ্যুতের স্থাপিত ক্ষমতা ১৩,৫৯৬ মেগাওয়াট এবং সর্বোচ্চ উৎপাদন ৯৭৪১ মেগাওয়াট (২৭ মে, ২০১৭)৷ ২০০৮ সালে সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ৪০৩৬ মেগাওয়াট৷ সে তুলনায় এই উৎপাদন বৃদ্ধি যে যথেষ্ট তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা

(পিএসএমপি ২০১০) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩৪,০০০ মেগাওয়াট করা হবে৷ এদেশে সবসময়ই বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা স্থাপিত ক্ষমতা এবং উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে বেশি ছিল৷ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, অপ্রত্যাশিতভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জ্বালানির স্বল্পতার কারণে ২০০৬-০৭ সাল থেকে কখনোই সবগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা যায়নি৷ ২০০৮-০৯ থেকে কাগজে-কলমে প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লেও গ্যাস স্বল্পতার কারণে সবসময়ই প্রায় ১০০০ মেগাওয়াট বন্ধ থাকে৷ সবমিলিয়ে সক্ষমতা থাকলেও এখন প্রায় ৪০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না৷ 

সমাজ

১. তেল

লন্ডন ভিত্তিক ‘ওয়ার্ল্ড এনার্জি কাউন্সিল’ এর ‘বিশ্ব জ্বালানি সম্পদ ২০১৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হওয়া জ্বালানি হচ্ছে তেল৷ মোট ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৩২.৯ শতাংশই হচ্ছে তেল৷ আর তেল উৎপাদনে শীর্ষ তিন দেশ হচ্ছে সৌদি আরব (বছরে ৫৬৯ মিলিয়ন টন), যুক্তরাষ্ট্র (বছরে ৫৬৭ মিলিয়ন টন) ও রাশিয়া (বছরে ৫৪১ মিলিয়ন টন)৷

সমাজ

২. কয়লা

২৯ শতাংশ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হওয়া জ্বালানির তালিকায় তেলের পরেই আছে কয়লা৷ তবে নব্বই দশকের পর ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো কয়লা উৎপাদন কমেছে৷ বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪০ ভাগ কাজে কয়লা ব্যবহৃত হয়৷ শীর্ষ তিন উৎপাদনকারী দেশ হচ্ছে চীন (বছরে ২ দশমিক ৬২ হাজার এমটিওই), যুক্তরাষ্ট্র (৫৬৯ এমটিওই) ও ভারত (৪৭৪ এমটিওই)৷ উল্লেখ্য, এমটিওই মানে হচ্ছে এক মিলিয়ন মেট্রিক টন অফ ওয়েল ইকুইভ্যালেন্ট৷

সমাজ

৩. গ্যাস

তিন নম্বরে আছে গ্যাস (প্রায় ২৪ শতাংশ)৷ আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির তালিকায় কয়লার (৪০ শতাংশ) পরে আছে গ্যাস (২২ শতাংশ)৷ শীর্য তিন গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র (বছরে ৬৯১ এমটিওই), রাশিয়া (বছরে ৫১৬ এমটিওই) ও ইরান (বছরে ১৭৩ এমটিওই)৷

সমাজ

৪. পানিবিদ্যুৎ

নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিভিন্ন উৎসের মধ্যে পানি বা জলবিদ্যুতের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি৷ ২০১৫ সালে উৎপাদিত মোট নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের প্রায় ৭১ শতাংশই এসেছে জলবিদ্যুৎ থেকে৷ আর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হওয়া জ্বালানির তালিকায় তেল (৩৩ শতাংশ), কয়লা (২৯ শতাংশ) ও গ্যাসের (২৪ শতাংশ) পরেই আছে পানিবিদ্যুৎ (প্রায় ৭ শতাংশ)৷ শীর্ষ তিন উৎপাদনকারী চীন (বছরে ৯৬.৯ এমটিওই), ব্রাজিল (৩২.৯ এমটিওই) ও ক্যানাডা (৩২.৩ এমটিওই)৷

সমাজ

৫. পরমাণুশক্তি

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হওয়া জ্বালানির তালিকায় পাঁচ নম্বরে আছে এটি (৪ দশমিক ৪ শতাংশ)৷ অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানির একটি উৎস পানিবিদ্যুতের (প্রায় ৭ শতাংশ) চেয়েও এর ব্যবহার কম৷ ইউরেনিয়াম উৎপাদনে শীর্ষ তিন দেশ হচ্ছে কাজাখস্তান (বছরে ২২ দশমিক ৮ হাজার টন), ক্যানাডা (৯ দশমিক ১৪ হাজার টন) ও অস্ট্রেলিয়া (৪ দশমিক ৯৮ হাজার টন)৷

সমাজ

৬. বায়ুশক্তি

বিশ্বের মোট বিদ্যুতের ৭ শতাংশ আসে বায়ুবিদ্যুৎ থেকে৷ ২০১৫ সালে ৪৩২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছিল৷ এর মধ্যে ৪২০ গিগাওয়াট অনশোর (ভূমি) ও ১২ গিগাওয়াট অফশোর, অর্থাৎ সাগরে বসানো টারবাইনের মাধ্যমে উৎপাদিত হয়৷ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হওয়া জ্বালানির তালিকায় ছয়ে আছে এটি (১.৪৪ শতাংশ)৷ শীর্ষ তিন বায়ুশক্তি উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র (বছরে ১৫.৮ এমটিওই), চীন (১৩.৬ এমটিওই) এবং জার্মানি (৪.৯৩ এমটিওই)৷

সমাজ

৭. সৌরশক্তি

২০১৫ সালে সারা বিশ্বে মোট সৌরশক্তি উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২২৭ গিগাওয়াটে৷ ফলে মোট বিদ্যুতের এক শতাংশ এসেছিল সৌরশক্তি থেকে৷ সৌরশক্তি উৎপাদনে শীর্ষ তিন দেশ চীন (৪৩ দশমিক ১ গিগাওয়াট), জার্মানি (৩৯ দশমিক ৬ গিগাওয়াট) ও জাপান (৩৩ দশমিক ৩ গিগাওয়াট)৷

সমাজ

৮. অন্যান্য উৎস

জিওথার্মাল, ই-স্টোরেজ, মেরিন এনার্জি, বর্জ্য থেকে শক্তি, বায়োএনার্জি (যেমন বায়োমাস) ইত্যাদি সহ আরও অনেক উৎস দিয়েও জ্বালানি উৎপাদন করা হয়ে থাকে৷ ছবিতে আইসল্যান্ডের একটি জিওথার্মাল পাওয়ার স্টেশন দেখা যাচ্ছে৷ ডাব্লিউইসি-র প্রতিবেদনটি পড়তে ক্লিক করুন উপরের ‘+’ চিহ্নে৷

আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক আগেই জ্বালানি তেলের দাম দারুণভাবে পড়ে যায়৷ সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ বাজারে এই মূল্য কিছুটা সমন্বয় করা হয়েছে৷ সরকার ২০১৬ সালের এপ্রিলে লিটারপ্রতি ফার্নেস তেল ১৮ টাকা ও ডিজেল ৫ টাকা কমিয়েছে৷ ২০১৪ সালে যখন দেশের বাজারে হাইস্পিড ডিজেল (এইচএসডি) ও হেভি ফুয়েল অয়েল (এইচএফও)-এর দাম যথাক্রমে লিটারপ্রতি ৬৮ ও ৬২ টাকা ছিল তখন এসব তেল দিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ত যথাক্রমে ২৬ ও ১৮ টাকা৷ অসম্ভব রকমের ভর্তুকির সুবিধা পাওয়া দেশীয় গ্যাসে (৮০ টাকা/এমএমসিএফ) বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ে ইউনিটপ্রতি ২ দশমিক ৫৭ টাকা৷ এখন কর মওকুফের সুবিধা নিয়ে ব্যক্তিখাত ফার্নেস তেলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ৭ টাকায়৷ বিভিন্ন জ্বালানির সমন্বয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখন প্রতি ইউনিটে সরকারের গড় খরচ পড়ে ৬ টাকার কিছু বেশি৷

বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সাশ্রয়ী মূল্যে প্রাথমিক জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন জোগান এবং এ খাতের অর্থায়ন৷ সরকার বিদ্যুতের যে উৎপাদন বাড়িয়েছে তা মূলত জ্বালনি তেলভিত্তিক, যদিও এখনো দেশের ৬২ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা গ্যাসনির্ভর৷ ২০০৭ সালে গ্যাসস্বল্পতার বিষয়টি সর্বপ্রথম সামনে আসে৷ তখন থেকে এ পর্যন্ত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ৩০ ভাগ৷ জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার দোদুল্যমান হওয়ায় একইসঙ্গে বিরাট একটা অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে৷ এই ঝুঁকি সম্পর্কে সরকার ভালোভাবেই অবগত৷ তাই বড় আকারের বেসলোড সাশ্রয়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আনার চেষ্টায় নামে তারা, যদিও এক্ষেত্রে তেমন কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি এখনো৷ এর একটি বড় কারণ কয়লা আমদানির সুবিধা সম্বলিত যোগাযোগ অবকাঠামো এবং বন্দরের অভাব৷ পায়রা ও মাতারবাড়ি প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনায় নিজস্ব অবকাঠামো সুবিধা থাকায় তা নিয়ে আশাবাদী সরকার৷ ২০২২ সালে এই প্রকল্পগুলো উৎপাদনে আসার কথা থাকলেও এখনো সম্পূর্ণ অর্থের জোগান নিশ্চিত হয়নি এবং নির্মাণ কাজও তেমন একটা এগোয়নি৷ অন্যদিকে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকেও নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে

বিজ্ঞান | 12.07.2017
M. Tamim

ম তামিম, অধ্যাপক, পিএমআরই বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

সরকারের জন্য আরেকটি বিকল্প হলো এলএনজি আমদানি৷ গ্যাসভিত্তিক বিশাল অবকাঠামোর সুবিধা কাজে লাগাতে সরকারের কাছে এর বিকল্প নেই৷ কিন্তু এখানেও সরকার এখন পর্যন্ত কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি৷ এর আগে ২০১০ সালে দু'বছরের মধ্যে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস আমদানির ঘোষণা দেয় তারা৷ এই সময়সীমা বাড়তে বাড়তে এখন ২০১৮-১৯-এ গিয়ে ঠেকেছে৷ এই বিলম্ব সরকারকে শিল্প প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত, জ্বালানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহ এবং এর যৌক্তিক দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে৷ ফলে গেল কয়েক বছরে যান্ত্রিক দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া শিল্প খাতে তেমন একটা অগ্রগতি দেখা যায়নি৷ এছাড়া উচ্চমূল্যের এলএনজি এলে তার দাম দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে বলে ধারণা করা যায়৷ কিন্তু এই দাম যদি পুরোটা একসঙ্গে সমন্বয় করা হয়, তাহলে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে৷ কারণ, ঐতিহাসিকভাবেই দেশীয় গ্যাসের দাম সারাবিশ্বের তুলনায় এ দেশে অনেক কম৷ 

প্রাথমিক জ্বালানির সরবরাহ ছাড়াও এ দেশের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহারের একটি টেকসই পরিকল্পনা করা৷ ২০০৫ সালের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা পুরোপুরি গ্যাসনির্ভর ছিল, যা ২০০৭ সালে গ্যাস স্বল্পতার বিষয়টি সামনে এলে বাতিল হয়ে যায়৷ এমন পরিস্থিতি আগে থেকে আন্দাজ করতে না পারা গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের নীতিনির্ধারকদের একটি বড় ব্যর্থতা৷ এরপর ২০১০ সালে জাইকার সহযোগিতায় বর্তমান মহাপরিকল্পনাটি তৈরি করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড৷ জ্বালানির বহুমুখীকরণ এবং চাহিদা ও জোগানের গ্রহণযোগ্য সমন্বয় পরিকল্পনা ছিল পিএসএমপি ২০১০-এ৷ এতে ২০২০ সালে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭,৩০০ মেগাওয়াট ধরে ৩০ ভাগ বিদ্যুৎ কয়লা দিয়ে উৎপাদনের কথা বলা হয়৷ পাঁচ বছরের মধ্যে সেই পরিকল্পনা বাতিল করে নতুন পিএসএমপি-২০১৫ তৈরি করা হয়, যদিও সেটি এখনো অনুমোদিত হয়নি৷ নতুন মহাপরিকল্পনায় দেখা যায়, ২০২০ সালের সর্বোচ্চ চাহিদার প্রাক্কলন ১৩,০০০ মেগাওয়াটে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং দেশীয় কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি পুরোপুরি বাদ দেয়া হয়েছে৷ দু'টোতেই অবশ্য জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে৷

মোশাহিদা সুলতানা, শিক্ষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালেয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতুর মতে, সুন্দরবনের পাশে এত বড় একটা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করে একে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা কোনোভাবেই ঠিক হবে না৷ তাঁর মতে, সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিকল্প আছে৷

সায়েম ইউ চৌধুরী, পাখি ও বন্যপ্রাণী গবেষক

৪০ বারেরও বেশি সুন্দরবনে গেছেন সায়েম৷ তিনি জানান, সম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি সার কারখানা থেকে অ্যামোনিয়া গ্যাস নিঃসরণ হয়ে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়৷ পুকুরের মাছ, গাছপালা, প্রাণী – সব মারা পড়ে৷ এ রকম ছোট একটা সার কারখানার দুর্ঘটনা থেকে আমাদের পরিবেশ রক্ষা করার সক্ষমতা যেখানে নেই, সেখানে এত বড় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো দুর্ঘটনা হলে আমাদের সরকার কী-ই বা করার থাকবে?

মারুফ বিল্লাহ, স্থানীয় বাসিন্দা

মারুফ বিল্লাহর জন্ম রামপালেই৷ ছোটবেলা থেকেই তিনি সুন্দরবনকে ধ্বংস হতে দেখে আসছেন৷ আর এখন সুন্দরবন ঘেঁষে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করে একে ধ্বংসের আরেক পায়তারা করছে সরকার৷ তিনি জানান, সিডর আর আইলার পরে আমরা দেখেছি ঐ জনপদকে সে যাত্রায় বাঁচিয়েছিল সুন্দরবন৷ এখন যদি আমরাই তাকে মেরে ফেলি, তাহলে জনগণ কোথায় যাবে? তাই তাঁর প্রশ্ন, জীবন আগে, নাকি বিদ্যুৎ আগে?

সাইমুম জাহান হিয়া, শিক্ষার্থী

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইমুম জাহান হিয়া মনে করেন, সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বন৷ এর পাশে বিশাল আকারের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে যে কখনো কোনো দুর্ঘটনা হবে না – এটা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না৷ তাঁর মতে, দেশের উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজন আছে, এটা ঠিক, তবে সেটা সুন্দরবনকে ধ্বংস করে নয়৷

হাসিব মোহাম্মদ, শিক্ষার্থী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসিব মোহাম্মদ কয়েকবার সুন্দরবনে গেছেন৷ আসলে এই বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র তাঁকে সবসময় টানে৷ তাই এ বনের কোনোরকম ক্ষতি করে তিনি এর কাছাকাছি রামপালের মতো কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র চান না৷ গত বছরের কয়েকটি ছোট ছোট জাহাজ সুন্দরবনে ডোবার পর যে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, সে কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি৷ তাঁর আশঙ্কা, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে জাহাজ চলাচল বেড়ে গিয়ে দুর্ঘটনাও বাড়বে৷

মিমু দাস, শিক্ষার্থী

লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র মিমু দাসও মনে করেন, সুন্দরবনের এত কাছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা ঠিক হবে না৷ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার খবর পড়ে তাঁর মনে হয়েছে যে, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করবে৷ মিমু বিদ্যুৎকেন্দ্র চান, তবে সেটা অন্য কোথাও৷

আদনান আজাদ আসিফ, মডেল ও অভিনেতা

মডেল ও অভিনেতা আদনান আজাদ আসিফ একজন ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফারও৷ কয়েক বছর ধরে সময় পেলেই তিনি সুন্দরবনে ছুটে যান৷ বিশ্বের সবেচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসস্থল৷ তাঁর মতে, সুন্দরবন বাংলাদেশের ফুসফুস৷ আর এমনিতেই নানা কারণে এখানে বাঘের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে হ্রাস পেয়েছে৷ তাই এর কাছাকাছি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এমন কোনো প্রকল্প করে এ বনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া ঠিক হবে না৷

আমিনুর রহমান, চাকুরিজীবী

ঢাকার একটি পরিবহন সংস্থায় কাজ করেন আমিনুর রহমান৷ তাঁর মতে, দেশের উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ দরকার৷ তাই বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে দেশের জন্য ভালোই হবে৷ তাছাড়া তিনি শুনেছেন যে, রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে তা সুন্দরবনের কোনো ক্ষতিই করবে না৷

আব্দুল আজীজ ঢালী, মধু চাষি

সুন্দরবনে গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মধু আহরণ করেন সাতক্ষীরার আব্দুল আজীজ ঢালী৷ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এ বনের সঙ্গে থাকতে চান তিনি৷ সুন্দরবনে থাকলেও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পর্কে কিছুই জানেন না আব্দুল আজীজ৷

ভবেন বিশ্বাস, মাছ শিকারি

ভবেন বিশ্বাসের জীবিকার অন্যতম উৎস সুন্দরবন৷ উদবিড়াল দিয়ে এ বনে তিনি মাছ ধরেন ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে৷ তাঁর বাবা ও ঠাকুরদাদার এ পেশা এখনো তিনি ধরে রেখেছেন৷ রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে এ খবর তিনি শুনে থাকলেও, এর ভালো বা খারাপের দিকগুলো – কিছুই জানা নেই তাঁর৷ তবে সুন্দরবনকে তিনি ভালোবাসেন, খুব ভালোবাসেন৷

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এ কথা বলাই যায় যে, ২০২০ সাল নাগাদ সর্বোচ্চ চাহিদা ১৩,০০০ মেগাওয়াটেই সীমাবদ্ধ থাকবে৷ তারপরও ২০২১ সালের মধ্যে ২৪,০০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে৷ ইতিহাস বলছে, পরিকল্পিত প্রকল্পের ৫০ ভাগ পর্যন্তই বাস্তবায়ন করতে পারে পিডিবি৷ এমনকি এই গতিতে এগুলেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির ঝুঁকি থেকে যায়৷ তাই পরিকল্পনায় সরকারকে আরো সতর্ক হতে হবে৷ 

পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সরকারের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন (২৪০০ মেগাওয়াট নিউক্লিয়ারে এক লাখ চার হাজার কোটি, রামপালে ১৬ হাজার কোটি, মাতারবাড়িতে ৩৬ হাজার কোটি এবং অন্যান্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের জন্য আরো ৮০ হাজার কোটি টাকা)৷ এর বাইরে সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো তৈরির খরচ তো আছেই৷ কম করে ধরলেও এর জন্য প্রায় এক লাখ বিশ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন৷ পরিকল্পনা অনুযায়ী, অনেকগুলো প্রকল্প থেকে হাজারো মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে তা সিস্টেমের ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করবে৷ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা তৈরির ধারণাটি পৃথিবীতে নতুন না হলেও বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশে তা বাড়তি চাপ তৈরি করবে৷ সেক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে সমন্বিতত পরিকল্পনা করা দরকার৷

বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো দরকার৷ কিন্তু তাই বলে একের পর এক মেগাপ্রকল্প অনুমোদন দিলেই হবে না৷ যথাযথ গবেষণার মাধ্যমে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ভোক্তাপ্রান্তে জ্বালানি দক্ষতা ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রকৃত চাহিদার প্রাক্কলন করা দরকার৷ এর ফলে সম্পদ বাঁচবে এবং দামও সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে৷ সরকারকেও অতটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে না৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷