বাংলাদেশের শ্রমশক্তি রপ্তানির নতুন বাজার দরকার

বাংলাদেশে বৈদেশিক মূদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান খাত জনশক্তি রপ্তানি৷ আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই এখনো জনশক্তি রপ্তানির প্রধান টার্গেট৷ গত তিন বছরে এই জনশক্তি রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আয় কমছে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

আয় কমার প্রধান কারণ, জনশক্তি আমাদনীকারক দেশগুলো প্রবাসী শ্রমিকদের আর আগের মতো মজুরি দেয় না৷ দক্ষ শ্রমিকের অভাবও এর একটি কারণ৷

জনশক্তি রপ্তানি বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে জনশক্তি রপ্তানির প্রচলিত বাজার সংকুচিত হয়ে আসছে৷ তাই প্রয়োজন নতুন বাজার৷ তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ডয়চে ভেলের কাছে দাবি করেছেন, ‘পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাচ্ছে৷'

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার, যা সর্বশেষ তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ৷ আর এখন বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে সবচেয়ে বেশি জনশক্তি রপ্তানি করছে৷

১. কুমিল্লা

সবচেয়ে বেশি গেছে এই জেলা থেকে৷ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বলছে, ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কুমিল্লা থেকে মোট ৬ লক্ষ ১৯ হাজার ১৩৮ জন বিদেশ গেছেন, যেটা রপ্তানি হওয়া মোট জনশক্তির প্রায় ১০.৯৪ শতাংশ৷

২. চট্টগ্রাম

সংখ্যা: ৫ লক্ষ ৪১ হাজার ৭০৯; শতাংশের হিসাব: ৯.৫৭

৩. ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া

সংখ্যা: ২ লক্ষ ৯৫ হাজার ৩৮১; শতাংশের হিসাব: ৫.২২

৪. টাঙ্গাইল

সংখ্যা: ২ লক্ষ ৯০ হাজার ৭১৭; শতাংশের হিসাব: ৫.১৪

৫. ঢাকা

সংখ্যা: ২ লক্ষ ৫৩ হাজার ৭৩৪; শতাংশের হিসাব: ৪.৪৮

৬. চাঁদপুর

সংখ্যা: ২ লক্ষ ৩৫ হাজার ৩৩৪; শতাংশের হিসাব: ৪.১৬

৭. নোয়াখালী

সংখ্যা: ২ লক্ষ ২৭ হাজার ৩৪৩; শতাংশের হিসাব: ৪.০২

৮. মুন্সীগঞ্জ

সংখ্যা: ১ লক্ষ ৭৩ হাজার ৪৭৭; শতাংশের হিসাব: ৩.০৬

৯. নরসিংদী

সংখ্যা: ১ লক্ষ ৫৯ হাজার ৩৮৪; শতাংশের হিসাব: ২.৮২

১০. ফেনী

সংখ্যা: ১ লক্ষ ৫৬ হাজার ১৯৯; শতাংশের হিসাব: ২.৭৬

অন্যান্য জেলা

আপনি যদি এই ১০ জেলার না হয়ে থাকেন তাহলে আপনার জেলার তথ্য জানতে উপরে ‘+’ চিহ্ন ক্লিক করুন৷

বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানিতে শীর্ষে থাকা সৌদি আরবের অবস্থান এখন তৃতীয়৷ বাংলাদেশ থেকে তারা পুরুষ শ্রমিক নেয়া বন্ধ রেখেছে৷ আগের চেয়ে বেশি হারে নারী শ্রমিক রপ্তানির কারণেই সৌদি আরব এখন তৃতীয় স্থানে রয়েছে৷

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ৩৯৩ কোটি ডলার, যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪০১ কোটি ডলার৷ সে হিসেবে এই খাতে ৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স কমেছে৷

২০১৫ সালে ওমানে গেছে সর্বোচ্চ সংখ্যক, প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার শ্রমিক, যা মোট জনশক্তি রপ্তানির ২৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ৷ আর দ্বিতীয় স্থানে থাকা কাতারে গেছে প্রায় এক লাখ ২৪ হাজার, যা মোট রপ্তানির ২২ দশমিক ৩০ শতাংশ৷ আর বাংলাদেশ থেকে ৫৮ হাজার ২৭০ কর্মী নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে সৌদি আরব৷

এদিকে মালয়েশিয়ার চেয়েও বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির বড় বাজার হয়ে উঠেছে সিঙ্গাপুর৷ বাংলাদেশের মোট জনশক্তি রপ্তানির শতকরা ১০ ভাগ নিয়ে সিঙ্গাপুর চতুর্থ এবং শতকরা সাড়ে পাঁচ শতাংশ নিয়ে মালয়েশিয়া এখন পঞ্চম স্থানে৷

মালয়েশিয়া বাংলাদশ থেকে ১৫ লাখ কর্মী নেয়ার চুক্তি করলেও তা তাদের নতুন সিদ্ধান্তের কারণে কার্যকর হচ্ছে না৷ দেশটি আপাতত বিদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ রেখেছে৷ আর ইরাক এবং লিবিয়ায় বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক রপ্তানি বন্ধ আছে সেই দুটি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে৷ এছাড়া কয়েকদিন আগে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত লিবিয়ায় বাংলাদেশি নাগরিকদের যাওয়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে৷

জনশক্তি রপ্তানি বিশ্লেষক হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সৌদি আরব, দুবাই এবং কাতারে পুরুষ জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ আছে৷ লিবিয়া এবং ইরাকে পাঠানো যাচ্ছে না সেখানকার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে৷ আর সিঙ্গাপুরে ভালো সম্ভাবনা থাকলেও আইএস সন্দেহে সেখানে কিছু বাংলাদেশি শ্রমিক আটক হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি খারাপের দিকে৷ মালয়েশিয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীায় হলেও তারা এখন শ্রমিক নিচ্ছে না৷ অন্যদিকে কোরিয়া তাদের নির্মাণ খাতে বিপূল সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক নেয়ার কথা বললেও তা এখনো শুরু হয়নি৷'’

তিনি আরো জানান, ‘‘মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে এখন বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা যাচ্ছেন৷ কিন্তু সেখান থেকেও হয়রানি, স্বল্প মজুরি দেয়াসহ নানা অভিযোগের খবর পাওয়া যাচ্ছে৷'’

সৌদি আরব কিছু দিন পুরুষ শ্রমিক না নিলেও বাংলাদেশ সরকার পুরুষ শ্রমিক নেয়ার জন্য সৌদি আরবের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর এখন নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে বলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, তিনি বলেন, ‘‘এখন আর সৌদি আরবে পুরুষ শ্রমিক পাঠাতে বাধা নেই৷'’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা নতুন নতুন বাজার খোঁজার চেষ্টা করছি৷ এরইমধ্যে আমি এ জন্য রাশিয়া, থাইল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া সফর করেছি৷ রাশিয়ায় শ্রমশক্তি পাঠানো হয়েছে৷ অস্ট্রেলিয়াও আমাদের লোক নেবে৷'’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘‘সৌদি আরবে শিগগিরই পুরুষ শ্রমিক যেতে পারবে৷ মালয়েশয়িাও আশা করি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে৷'’

তাঁর মতে, ‘‘এখন বাংলাদেশ থেকে বিদেশে শ্রমিক রপ্তানির পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে৷ রেমিট্যান্স প্রবাহও আশাব্যঞ্জক৷ আমাদের দক্ষ শ্রমিকের হারও বাড়ছে৷'’

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৮ জন কর্মী বিদেশে গেছেন৷ পরের বছর ২০১০ সালে পরিস্থিতি খারাপ হলেও, ২০১১ সালে পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার ও ২০১২ সালে ৬ লাখ ৮ হাজার কর্মী বিদেশে যান৷

দক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিকের অভাব দেখা দিয়েছে কেন? আপনার মতামত জানান, লিখুন নীচের ঘরে৷

আয় কমার প্রধান কারণ, জনশক্তি আমাদনীকারক দেশগুলো প্রবাসী শ্রমিকদের আর আগের মতো মজুরি দেয় না৷ দক্ষ শ্রমিকের অভাবও এর একটি কারণ৷