বাংলাদেশে ২৭ জন সমকামী আটক

বাংলাদেশে ২৭ জন সমকামীকে আটক করেছে র‌্যাব৷ তাদের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলা দিয়ে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে৷ র‌্যাবের দাবি, ‘‘স্থানীয়দের দেয়া খবরের ভিত্তিতে তাদের আটক করা হয়৷ তাদের কাছে কিছু মাদক পাওয়া গেছে৷’’

র‌্যাব-১০-এর একটি দল শুক্রবার ভোর রাত তিনটার দিকে ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের আটিবাজার ছায়ানীড় কমিউনিটি সেন্টার থেকে ওই ২৭ সমকামীকে আটক করে৷ এ সময় কমিউনিটি সেন্টারের মালিককেও আটক করা হয়৷

বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকার কাওরান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১০-এর অধিনায়ক জাহাঙ্গীর হোসেন মাতব্বর বলেন, ‘‘২০টি জেলা থেকে সমকামীরা ওই কমিউনিটি সেন্টারে জড়ো হয়েছিল৷ তারা প্রতি দুই মাসে একবার সেখানে জড়ো হয়৷’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে তারা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে৷ এ সময় তাদের কাছ থেকে ৪৫টি ইয়াবা ও ২৫০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়৷’’

তিনি ডয়চে ভেলেকে টেলিফোনে জানান, ধৃতদের ব্যাপারে স্থানীয় লোকজনই তথ্য দিয়েছে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতেই তাদের আটক করা হয়েছে৷

তবে তাদের বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগে কোনো মামলা হয়নি৷ জাহাঙ্গীর হোসেন মাতব্বর জানান, ‘‘আমাদের অভিযানের সময় সমকামিতার কোনো ঘটনা ঘটেনি৷ কিছু মাদক পাওয়া যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দিয়ে কেরানীগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে৷’’

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘বিকেলে র‌্যাব আমাদের কাছে ২৮ জনকে হস্তান্তর করেছে৷ তাদের বিরুদ্ধে গাঁজা ও ইয়াবা দখলে রাখা এবং সেবনের অভিযোগে মামলা হয়েছে৷ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের এই মামলায় কাল (শনিবার) আমরা তাদের আদালতে চালান করব৷’’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘এ ধরনের মামলায় রিমান্ড চাওয়ার কোনো সুযোগ নেই৷ আমরা রিমান্ড চাইব না৷’’

বাংলাদেশে সমকামীদের আটকের ঘটনা এই প্রথম নয়৷ গত বছর ( ২০১৬) পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের দিন ‘রংধনু’ র‌্যালী বের করার চেষ্টাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা এলাকা থেকে ৪ জন সমকামীকে আটক করে পুলিশ৷ তারা তখন একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে এলজিবিটি আন্দোলনের পক্ষে তাদের মতামত দিচ্ছিলেন৷

গত বছরের ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় ঢাকার কলাবাগান এলাকায় বাড়িতে ঢুকে সমকামীদের অধিকার বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘রূপবান’ সম্পাদক সম্পাদক জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব তনয়কে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা৷ সেই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতদের পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি৷

নিহত জুলহাজ মান্নানের ভাই মিনহাজ মান্নান এই হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে গত ২৫ এপ্রিল বলেন, ‘‘আমরা পুরোপুরি হতাশ৷ এখনো হত্যাকন্ডে জড়িত কাউকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি৷ আমাদের তদন্তের কোনো অগ্রগতিও জানায়নি পুলিশ৷’’

২৭ জন সমকামীকে গ্রেপ্তারের পর এলজিবিটি মুভমেন্টের সঙ্গে জড়িত কারো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি৷ তবে নানা পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে এলজিবিটি অধিকার সংক্রান্ত তৎপরতা থমকে গেছে৷ তাদের ওপর পুলিশের নজরদারী এবং চাপও বেড়ে গেছে৷ যারা সক্রিয় ছিলেন, তাদের একাংশ দেশের বাইরে চলে গেছেন৷ আর যারা আছেন, তারা এখন আর প্রকাশ্যে কোনো তৎপরতা চালাচ্ছেন না৷

প্রিয় পাঠক, আপনি কিছু বলতে চাইলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে...

তুরস্ক

১৮৫৮ সালে অটোমান সাম্রাজ্য সমকামিতাকে বৈধতা দেয়৷ এরপর তুরস্ক স্বাধীন হলে সেই আইন বলবৎ রাখে৷ তবে সে দেশের সংবিধানে সমকামীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা না থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে যেমন তেমনি সামাজিকভাবেও সমকামীদের এখনও বৈষম্যের শিকার হতে হয়৷

মালি

পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটির সংবিধানে সমকামী কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়নি৷ তবে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ সমকামিতা পছন্দ করে না৷ তাই বৈধ হলেও মালির সমকামীরা বেশ ভালোই বৈষম্যের শিকার হন৷

জর্ডান

১৯৫১ সালে দেশটিতে সমকামিতাকে বৈধতা দেয়া হয়৷ অন্যান্য মুসলিম প্রধান দেশের তুলনায় সেখানকার সমকামীরা বেশ ভালোই আছে৷ সরকারও আইন করে সমকামীদের ‘অনার কিলিং’-এর হাত থেকে রক্ষা করেছে৷

ইন্দোনেশিয়া

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলমানের বাস এই দেশটিতে৷ সেখানকার আইনে সমকামিতাকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়নি৷ ২০০৩ সালে একবার সেরকম উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটি ব্যর্থ হয়৷

আলবেনিয়া

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের এই দেশটিতে সমকামিতা বৈধ৷ এমনকি আইন করে সমকামীদের বৈষম্যের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছে৷

বাহরাইন

১৯৭৬ সালে সেখানে সমকামিতাকে আইনগত বৈধতা দেয়৷ তবে দেশটিতে এখনও প্রকাশ্যে ছেলেরা মেয়েদের, কিংবা মেয়েরা ছেলেদের পোশাক পরতে পারে না৷

ফিলিস্তিন (পশ্চিম তীর)

পশ্চিম তীরের জর্ডান অংশে ১৯৫১ সাল থেকে সমকামিতা বৈধ৷ তবে গাজাতে নয়৷ মজার ব্যাপার হচ্ছে, গাজায় যে আইনের কারণে সমকামিতা নিষিদ্ধ সেটা বলবৎ হয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে৷

ইরাক

দেশটি সমকামিতাকে বৈধতা দিলেও বিষয়টি এখনও সেখানে ‘ট্যাবু’ হয়েই আছে৷