বাংলাদেশ ইস্যুতে বদলে যাচ্ছে ‘ইসলামিক স্টেটের’ নীতি

তথাকথিত ‘ইসলামিক স্টেট’ একসময় সিরিয়ায় গিয়ে জিহাদে অংশ নেয়ার আহ্বান জানাতো৷ সেই আহ্বানে যোগ দিয়ে অনেকে গেছে সিরিয়ায়৷ জঙ্গি গোষ্ঠীটি এখন বলছে ভিন্ন কথা৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর কার্যক্রম নিয়ে গত কয়েকমাস ধরেই চলছে জোর বিতর্ক৷ খোদ আইএস এবং জিহাদিদের প্রতি নজর রাখা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী যখন বলেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীটি বাংলাদেশে বিভিন্ন হামলার সঙ্গে জড়িত, বাংলাদেশ সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনী বলেছে ভিন্নকথা৷ তাদের চোখে ওসব ছিল স্থানীয় জঙ্গি গোষ্ঠীর কাজ৷

ইসলামিক স্টেট বা আইএস আসলে কী?

আল কায়েদা থেকে তৈরি হওয়া সুন্নি মুসলমানদের জঙ্গি সংগঠন আইএস৷ সাদ্দাম পরবর্তী সময়ে ইরাকে এবং বাশার আল আসাদের আমলে সিরিয়ায় সুন্নিদের হতাশা থেকেই জন্ম সংগঠনটির৷ আইএস-এর পতাকায় লেখা থাকে, ‘মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর নবী’ এবং ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই৷’

আইএস কোথায় সক্রিয়?

শরিয়া আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে এমন রাষ্ট্র, বা ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায় আইএস৷ সিরিয়া এবং ইরাকেই প্রত্যক্ষভাবে সক্রিয় তারা৷ দুটি দেশেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে বেশ বড় অঞ্চল দখল করে নিয়েছে আইএস৷

আইএস কেন আলাদা?

মূলত নিষ্ঠুরতার জন্য৷ শত্রুপক্ষ এবং নিরীহ মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়াতে তারা এমন বর্বরতা এবং নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করে যা আগে কেউ করেনি৷ জবাই করে ভিডিও প্রচার, পুড়িয়ে মারা, বাবার সামনে মেয়েকে জবাই করা এবং তার তার ভিডিও প্রচার, মেয়েদের যৌনদাসী বানানো আর পণ্যের মতো বিক্রি করা – এসব নিয়মিতভাবেই করছে আইএস৷ কোনো অঞ্চল দখলে নেয়ার পর সেখানে শাসন প্রতিষ্ঠায় মন দেয় আইএস৷

অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক

আইএস যদিও শুধু সিরিয়া এবং ইরাকেই সক্রিয়, তবে বিশ্বের অন্যান্য ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন নয়৷ নাইজেরিয়ার জঙ্গি সংগঠন বোকো হারাম কয়েকদিন আগেই জানিয়েছে, আইএস-কে তারা সমর্থন করে৷ দুটি সংগঠনের মধ্যে একটি জায়গায় মিলও আছে৷ আইএস-এর মতো বোকো হারামও নিষ্ঠুরতা এবং বর্বরতার প্রতিভূ হয়ে উঠেছে৷ অন্য ধর্মের নারীদের প্রতি দুটি সংগঠনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণই মধ্যযুগীয়৷

আইএস-এর অনুসারী কারা?

অনুসারী সংগ্রহের সাফল্যেও আইএস অন্য সব জঙ্গি সংগঠনের চেয়ে আলাদা৷ এ পর্যন্ত অন্তত ২০ হাজার বিদেশী যোদ্ধা আইএস-এ যোগ দিয়েছে৷ তাদের মধ্যে ৪ হাজারই পশ্চিম ইউরোপ এবং উত্তর অ্যামেরিকার৷

আইএস-কে রুখতে অন্য দেশগুলো কী করছে?

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বেশ কিছু পশ্চিমা এবং আরব দেশ সিরিয়া ও ইরাকে আইএস ঘাঁটির ওপর বিমান থেকে বোমা হামলা চালাচ্ছে৷ বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সিরিয়ায় ১৪২২ এবং ইরাকে ২২৪২ বার হামলা হয়েছে৷ কোনো কোনো সরকার দেশের অভ্যন্তরেও কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে৷ সিরিয়া ফেরত অন্তত ৩০ জন সন্দেহভাজন জঙ্গির বিচার শুরু করবে জার্মানি৷ গত মাসে সৌদি পুলিশও ৯৩ জন সন্দেহভাজন আইএস জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে৷

গুলশানে হামলায় ১৭ বিদেশিসহ কমপক্ষে ২৮ ব্যক্তির প্রাণহানির পরও পুলিশ কিন্তু বিষয়টি সেদিকেই নিতে চেয়েছিল৷ শুরুতে জঙ্গি হামলায় অংশ নেয়া জঙ্গিদের নাম বলেছিল আকাশ, বিকাশ, ডন, বাঁধন ও রিপন৷ কিন্তু ইসলামিক স্টেটের সংবাদসংস্থা ‘আমাক' পুলিশের বক্তব্যকে গুরুত্বহীন করে দিয়েছিল পাঁচ জঙ্গির ছবি প্রকাশ করে৷ সেসব ছবি প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই ফেসবুকে তাদের খুঁজে বের করে ফেলে সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা৷ জানা যায়, গুলশান হামলায় জড়িতদের পরিচয় সম্পর্কে পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিলই নেই৷ বরং বাংলাদেশের পরিচয় ঘটে উচ্চবিত্তের ঘরে বেড়ে ওঠা জঙ্গিদের সঙ্গে, যারা আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর হয়ে কাজ করছে৷

অন্যান্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে ‘ইসলামিক স্টেটের' পার্থক্য হচ্ছে এটির মিডিয়া উইং বেশ চতুর এবং অত্যন্ত সক্রিয়৷ প্রতিটি হামলার আগে, হামলা চলাকালে এবং পরবর্তীতে তারা অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করে যা সেসব হামলা যে সুপরিকল্পিত তা পরিষ্কার করে দেয়৷ ঢাকায় গুলশান হামলার সময়ও গোষ্ঠীটি বিভিন্ন প্রমাণ দিয়েছে৷ জঙ্গিদের ছবি প্রকাশের পর এক ভিডিও প্রকাশ করেছে জঙ্গি গোষ্ঠীটি, যেখানে তিন বাংলাদেশি জঙ্গিকে দেখা গেছে বাংলা, ইংরেজি এবং আরবি ভাষায় বক্তব্য দিতে৷ সেসব বক্তব্যে বাংলাদেশে আরো হামলার হুমকি রয়েছে৷

জিহাদিদের অনলাইন চ্যানেলের দিকে নজর রাখা সাংবাদিক তাসনিম খলিলের সঙ্গে কয়েকদিন আগে কথা হয়েছিল এই বিষয়ে৷ সুইডেনে বসবাসরত খলিল জঙ্গি গোষ্ঠীর বাংলাদেশ বিষয়ক সর্বশেষ ভিডিওটি পর্যালোচনা করেছেন৷ তিনি জানান, ভিডিওতে পরিষ্কার বোঝা গেছে জঙ্গি গোষ্ঠীটি চাচ্ছে বাংলাদেশি জঙ্গিরা সেটির নেতৃত্বে বাংলাদেশেই জিহাদে অংশ নিক৷ অথচ আগে এটি চেয়েছিল বাংলাদেশ বা বিভিন্ন দেশ থেকে সিরিয়াতে গিয়ে জিহাদে অংশ নিক উগ্রপন্থিরা৷

এটাকে জঙ্গি গোষ্ঠীর অবস্থানে একটি পরিবর্তন বলে মনে করেন খলিল৷ ব্লগার আরিফুর রহমানও মনে করেন, জঙ্গি গোষ্ঠীটি চায় গুলশানের মতো আরো হামলা চালাক জঙ্গি গোষ্ঠীটির অনুসারীরা৷

DW Bengali Arafatul Islam

আরাফাতুল ইসলাম, ডয়চে ভেলে

বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে ‘ইসলামিক স্টেট' মাঝেমাঝেই বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করে এটির প্রপাগান্ডা ম্যাগাজিন ‘দাবিক' এবং সংবাদসংস্থা ‘আমাক' এর মাধ্যমে৷ বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উচিত এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করে পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা৷ এজন্য তারা প্রয়োজনে ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ' বা ‘টেরর মনিটর ডটঅর্গ'-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা নিতে পারে৷ এতে করে জঙ্গি গোষ্ঠীটির অশুভ তৎপরতার সম্পর্কে সতর্ক যেমন থাকা যাবে, তেমনি বোঝা যাবে সেটির সঙ্গে বাংলাদেশে সম্পৃক্ত কারা, কীভাবে গোষ্ঠীটি নতুন নতুন জঙ্গি জোগাড় করছে৷

বর্তমান সময়ে অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইনেও জঙ্গি গোষ্ঠীর উপর নজরদারি বাড়ানো ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আর কোনো উপায় নেই৷ গুলশান হামলা ভালোভাবেই তা বুঝিয়ে দিয়েছে৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর কার্যক্রম নিয়ে গত কয়েকমাস ধরেই চলছে জোর বিতর্ক৷ খোদ আইএস এবং জিহাদিদের প্রতি নজর রাখা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী যখন বলেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীটি বাংলাদেশে বিভিন্ন হামলার সঙ্গে জড়িত, বাংলাদেশ সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনী বলেছে ভিন্নকথা৷ তাদের চোখে ওসব ছিল স্থানীয় জঙ্গি গোষ্ঠীর কাজ৷