বাড়ি বন্ধকি সংকটের ভূত আজও মার্কিনিদের ঘাড়ে

সে আমলে জামানত রাখা বাড়ি ব্যাংকের হাতে ছেড়ে দিয়ে ঋণ শোধ করা থেকে মুক্তি পাওয়া গেল, বলে যাঁরা ভেবেছিলেন, এত বছর পরে তাঁরা আবার ব্যাংকের চিঠি পাচ্ছেন ‘‘ডেফিসিয়েন্সি জাজমেন্টের’’ কপি সহ৷

২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাব-প্রাইম মার্কেট, মানে বাড়ি বন্ধকির বাজার যখন ধসে যায়, তখন হাজার হাজার মার্কিনি তাঁদের বন্ধকি ঋণের কিস্তি শোধ না করতে পারার ফলে ব্যাংকগুলি সেই সব ঋণ ‘ফোরক্লোজ' করতে, অর্থাৎ বন্ধকি বাড়িটি বাজেয়াপ্ত করতে বাধ্য হয়৷ মুশকিল এই যে, বাড়িগুলি বেচে ব্যাংকরা তাদের প্রদত্ত ঋণ সুদে-আসলে ফেরত পায়নি৷ অর্থাৎ হাউজিং সংকটের ফলে অ্যামেরিকার ব্যাংকিং সেক্টরের যে এক ট্রিলিয়ন ডলার পরিমাণ ঋণ বকেয়া হয়ে যায়, তার অনেকটাই উশুল করা সম্ভব হয়নি – অন্তত সে আমলে হয়নি৷

সমাজ সংস্কৃতি | 05.06.2012

এবার কিন্তু ফ্যানি মে এবং ফ্রেডি ম্যাক-এর মতো সরকার-নিয়ন্ত্রিত হাউজিং ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলি – এবং সেই সঙ্গে বন্ধকি ঋণ বাজারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান – দেনদারদের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে, তাদের বহুবছর আগে করা ঋণ শোধ করার জন্য৷ সেজন্য এই ঋণদাতা প্রতিষ্টানগুলি আইনের যে অস্ত্রটি ব্যবহার করছে, তার নাম হলো ‘‘ডেফিসিয়েন্সি জাজমেন্ট ''৷ আদালত থেকে প্রদত্ত এই রায় অনুযায়ী দেনদারকে তার পুরনো দেনা শোধ করতে বাধ্য করা যায়৷

অ্যামেরিকায় দারিদ্র্য

ত্রাণের জন্য আকাশচুম্বী চাহিদা

২০১২ সালে অ্যামেরিকায় দারিদ্র্যের চিত্রটা ছিল ভয়াবহ৷ দারিদ্র্যের কবলে পড়েছিল ৪ কোটি ৭০ লাখ মানুষ, যার মধ্যে ১ কোটি ৩০ লাখ শিশু৷ ২০১০ সালে বিনামূল্যে সরকারের কাছ থেকে খাবার পেত ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ৷ ২০১২ সালে সে সংখ্যাটা অনেক বেড়েছে৷

অ্যামেরিকায় দারিদ্র্য

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই

১৯৬৪ সালের ৮ জানুয়ারি ‘স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে অ্যামেরিকা থেকে দারিদ্র্য দূর করার ঘোষণা দিয়েছিলেন তখনকার প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন৷ তাঁর ঘোষণার ৫০ বছর পরেও বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক ক্ষমতাধর এই দেশ দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে৷

অ্যামেরিকায় দারিদ্র্য

গৃহহীন মানুষের সংখ্যা

দারিদ্র্যের কারণে খাদ্যাভাব দেখা দেয়৷ মার্কিন প্রশাসনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিউইয়র্ক শহরে ২০১৩ সালে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে৷

অ্যামেরিকায় দারিদ্র্য

জরুরি খাদ্য সহযোগিতা

জরুরি খাদ্য সহযোগিতার ব্যাপক চাহিদা৷ নিউইয়র্ক সিটির ফুড ব্যাংক প্রতিদিন শহরের ৪ লাখ মানুষকে বিনামূল্যে খাবার দেয়৷

অ্যামেরিকায় দারিদ্র্য

দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা

মার্কিন পরিসংখ্যান ব্যুরো’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ এবং ২০১১ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে প্রতি তিনজন মার্কিন নাগরিকের একজনের দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা হয়েছে৷

অ্যামেরিকায় দারিদ্র্য

সমস্যাক্রান্ত ২০১৩

অনেক সময়ই এমন হয় মানুষ চাকরি করছে, কিন্তু তার চাহিদা মেটাতে পারছে না৷ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিনের মাথাপিছু আয় গড়ে ৭.২৫ ডলার৷ ২০১৩ সালে গ্যালাপ-এর এক জরিপে দেখা গেছে ২০ ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিককে খাবারের জন্য যুদ্ধ করতে হচ্ছে৷

অ্যামেরিকায় দারিদ্র্য

বিশেষ আয়োজন

এই কুপনটি ‘থ্যাঙ্কসগিভিং ডে’ তে বিনামূল্যে টার্কি খাওয়ার জন্য৷ নিউইয়র্ক সিটির ‘কোয়ালিশন অ্যাগেন্টস হাঙ্গার’ জানিয়েছে, প্রতি ৬ জনের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিক গত বছর পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে দিন কাটিয়েছে৷

অ্যামেরিকায় দারিদ্র্য

ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান

ওয়াশিংটন ডিসিতে বেশ কয়েকটি গরিব পরিবারকে বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করে মান্না ফুড সেন্টার৷ বিশ্বের এই ধনী দেশটির ১ কোটি ৬০ লাখ শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে৷ এই শিশুরা যুক্তরাষ্ট্রের ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানকে সামনে তুলে ধরেছে৷

ফোরক্লোজার থেকে ডেফিসিয়েন্সি জাজমেন্ট

২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের জুন মাস পর্যন্ত ফ্যানি মে প্রায় ছ'লাখ ফোরক্লোজার করে, অর্থাৎ বকেয়া দেনদারদের বাড়ির মালিকানা নিজের হাতে নেয় – এবং তার মধ্যে প্রায় তিন লাখ মামলা ‘ডেট কলেক্টর' বা ঋণ সংগ্রহ সংস্থাদের হাতে দেয়, যা-তে সেই সব সংস্থা আদালতের কাছ থেকে ডেফিসিয়েন্সি জাজমেন্ট নিয়ে ব্যাংকের বকেয়া আদায় করে দিতে পারে – স্বভাবতই নিজেদের কমিশন রেখে৷ দৃশ্যত সরকারি তত্ত্বাবধায়কের তরফ থেকেই ফ্রেডি ম্যাক-কেও অনুরূপ পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে, তাই ফ্লোরিডায় শুধুমাত্র গতবছর দশ হাজার ডেফিসিয়েন্সি জাজমেন্ট-এর মামলা দায়ের করা হয়েছে৷

দেনদাররা স্বভাবতই এককালের সেই নতুন বাড়ি, আজকের পুরনো বাড়ির মামলা প্রায় ভুলেই বসে আছেন – কাজেই হাজার হাজার ডলার ঋণশোধের দাবি দেখে তাঁদের চমকে যাওয়ারই কথা! অথচ এই ঋণ তো নয়, ঋণের ভূত থেকে বাঁচার একমাত্র পন্থা হলো, নিজেকে দেউলিয়া বলে ঘোষণা করা – যা করলে অন্তত দশবছরের জন্য ক্রেডিট কার্ড আটকে থাকবে, গাড়ি কিংবা বাড়ি কেনার ঋণ পাওয়া যাবে না৷ কাজেই অনেক ক্ষেত্রেই দেনদাররা ব্যাংকের প্রস্তাবিত কোনো ঋণ পরিশোধ কর্মসূচি কিংবা আদালত-বহির্ভূত অন্য আপোষে রাজি হয়ে যান৷

ডেফিসিয়েন্সি জাজমেন্ট-এর আরেকটা সুবিধা – এবং দেনদারদের পক্ষে অসুবিধা – হলো এই যে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি ক্ষেত্রবিশেষে ৩৬ বছর অবধি সময় পায়, আদত দেনদারদের খুঁজে বার করে তাদের পাওনা উশুল করার জন্য৷ এছাড়া একবার জাজমেন্ট বা রায় হাতে এলে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি বাদবাকি বকেয়ার উপর বছরে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে সুদ ধরতে পারে – যতদিন না স্ট্যাটিউট অফ লিমিটেশন সে দরজা বন্ধ করছে৷

কাজেই ঋণের বোঝা বেড়েই চলে...

এসি/ডিজি (রয়টার্স)

আমাদের অনুসরণ করুন