বার্লিনালেতে অন্যরকম অভিজ্ঞতা

এ বছর বার্লিনালে শুরু হয়েছে ১৫ ফেব্রুয়ারি৷ কিন্তু অফিসের কাজ থাকায় আসতে হলো ২২ তারিখে৷ ভেবেছিলাম শেষের দিকে নিশ্চয়ই আরো জমজমাট হবে৷ কিন্তু মোটেও তা না৷ তবে পরে এসেও লাভ কম হয়নি৷

এসে দেখি কয়েকটা প্রোগ্রাম শেষ , বড়ো বড়ো তারকারা সব চলে গেছেন৷ কিন্তু তাতে কি বার্লিনালেতে প্রথমবার আসার মজাটা কি নষ্ট হতে দেয়া যায়!  

ফ্লাইট থেকে নেমে বিমান বন্দর থেকেই বার্লিনালের ছোঁয়া, অর্থাৎ এখানে পোস্টার, ওখানে হয়তো ভাল্লুকের লোগো লেখা বার্লিনালে, আর এয়ারপোর্টে এত তরুণ তরুণী বার্লিন বিমানবন্দরে আগে  দেখিনি আমি৷উৎসবে যোগ দিতেই যেন সবার আসা৷

যাই হোক, পটসডামার প্লাৎসে হোটেল ঠিক করা ছিল, কারণ মূল ভেন্যু সেখান থেকে কাছে৷ তাই হোটেলে গিয়ে ব্যাগ রেখে দৌঁড়াতে হলো মূল ভেন্যুর দিকে৷ গ্রান্ড হায়াৎ হোটেলে নিবন্ধন করে প্রেস কার্ড নিয়ে জানলাম কোথায় কি হচ্ছে, আমি কোথায় কোথায় যেতে পারি, কোথায় পারি না৷

মেরিলিন

এছাড়া বলা হলো যেখানে রেড কার্পেট আছে সেখান থেকে সাংবাদিকদের জন্য কিছু জিনিস আছে, সেগুলো সংগ্রহ করতে৷ বার্লিনালে পালাস্টে রেড কার্পেটসহ বিশেষ অনুষ্ঠানগুলো হয়৷

সেখানে গিয়ে জাঁকজমক দেখে কেমন একটা ঘোর লাগলো৷ টিভিতে কত দেখেছি এই রেড কার্পেট, আর এখন তার মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, কেমন যেন একটা অনুভূতি!

ওই ভবনে একটা প্রেস লাউঞ্জ আছে , যেখানে ওয়াইফাই, চার্জার থেকে শুরু করে সব সুবিধা আছে সাংবাদিকদের জন্য৷ দর্শকরা পাগলের মতো এক হল থেকে বেরিয়ে আরেক হলে ঢুকছে, কারো যেন দম  ফেলার সময় নেই৷

মূল রেডকার্পেট ছাড়াও কিন্তু ছোটো ছোটো রেডকার্পেট আছে, সিনেমা হলগুলোর পেছনের দরজার কাছে৷ সিনেমা শেষ হওয়ার ৫ মিনিট আগে সেখানে গাড়ি এসে হাজির হয়৷ ভক্তরা অভিনেতা বা অভিনেত্রীর জন্য তাদের ছবি সম্বলিত কার্ড নিয়ে অপেক্ষা করে অটোগ্রাফের জন্য৷ আর বের হওয়া মাত্রই অটোগ্রাফ আর ফটোগ্রাফ শিকারিরা ঝাঁপিয়ে পড়েন৷ 

‘ইন দি  আইলস'

হায়াৎ হোটেলে প্রেস কার্ড নেয়ার সময় আমার সাথে দেখা হয় তথ্যচিত্র নির্মাতা শাহীন দিল রিয়াজ এর সঙ্গে৷ তিনি থাকায় বেশ সুবিধা হলো৷  কোথায় কি আছে, কোন সিনেমাটা ভালো সেগুলো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেল৷ কেননা উৎসবের সব ছবি মোটামুটি  দেখানো শেষ, সেখান থেকে বেছে কিছু ছবি আবার দেখানো হচ্ছে৷

বার্লিনের  যত সিনেমা হল আছে, প্রায় সবগুলোতেই কিন্তু উৎসবের ছবি দেখানো হচ্ছে৷ ছবিগুলো মূলত ৪টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা৷ প্রধান ভাগ হলো প্রতিযোগিতা, এছাড়া আছে ফোরাম, প্যানারোমা, বার্লিনালে স্পেশাল৷ তবে এর বাইরেও কিছু ছবি দেখানো হয় যেমন বার্লিনালে ক্লাসিকস , জেনারেশন, বার্লিনালে শর্টস, রেট্রোস্পেক্টিভ, হোমএজ, নেটিভ৷

প্রতিযোগিতার ছবিগুলো বেশিরভাগই ভালো৷ তবে ফোরাম এর সিনেমাগুলো বেশিরভাগ মাথার উপর দিয়ে যায়৷ এটা আমার কথা না, বললেন শাহীন দিল রিয়াজ৷

তার মতে, প্রতিযোগিতা আর ফোরাম এর মাঝামাঝি যেগুলো, অর্থাৎ যেসব সিনেমাকে এ দুটোর কোনোটাতে ফেলা  যাবে না, সেগুলো থাকে প্যানোরামাতে৷ তবে তার কথার সত্যতা পেলাম, যখন এই তিনটি ক্যাটাগরির মুভি দেখলাম৷

৬৮তম বার্লিনালে: ফিরে দেখা ভাইমার যুগের চলচ্চিত্র

হারিয়ে যাওয়া রত্ন

এবারের ‘রেট্রোস্পেক্টিভ বিভাগে’ এমন সব চলচ্চিত্র দেখানো হয়েছে, যেগুলো বহুদিন কোথাও প্রচার হয়নি৷ ড্যানিশ পরিচালক উরবান গাদের ‘ক্রিস্টিয়ান ভানশাফে’ এমন একটা ছবি, যেখানে একজন শিল্পপতির বখে যাওয়া ছেলের কাহিনি বলা হয়েছে৷ দুই পর্বের এই ছবিটির প্রথম পর্ব ‘ওয়ার্ল্ড আ ফায়ার’ প্রকাশ পায় ১৯২০ সালে এবং ১৯২১ সালে ‘দ্য স্কেপ ফ্রম দ্য গোল্ডেন প্রিজন’ নামে৷ প্রায় একশ’ বছর পর আবারও সিনেমাটি দেখতে পেলো দর্শক৷

৬৮তম বার্লিনালে: ফিরে দেখা ভাইমার যুগের চলচ্চিত্র

যুদ্ধের ভয়াবহতা

লেখক ও চলচ্চিত্র পরিচালকদের কাছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ হাইনৎস পলের স্বল্প পরিচিত যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র ‘দ্য আদার সাইড’ হলো ১৯৩০ সালের মার্কিন চলচ্চিত্র ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’-এর জার্মান সংস্করণ৷

৬৮তম বার্লিনালে: ফিরে দেখা ভাইমার যুগের চলচ্চিত্র

রঙিনের অগ্রদূত

এই বিভাগে কেবল যে সাদা-কালো বা আংশিক রঙিন চলচ্চিত্র দেখানো হয়েছে তা কিন্তু নয়, যেসব পরিচালক চলচ্চিত্রে রঙের প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা করেছেন, তাদের চলচ্চিত্রও স্থান পেয়েছে এতে৷

৬৮তম বার্লিনালে: ফিরে দেখা ভাইমার যুগের চলচ্চিত্র

রূপালি পর্দায় বিমূর্ত শিল্প

‘ভাইমার এরা’ চলচ্চিত্র ধীরে ধীরে বর্নিল, পরীক্ষামূলক এবং সাহসী হয়ে উঠেছে৷ নাৎসি শাসনের অধঃপতনকে এসব চলচ্চিত্রে বিমূর্ত শিল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে৷

৬৮তম বার্লিনালে: ফিরে দেখা ভাইমার যুগের চলচ্চিত্র

একটি বিয়োগান্তক প্রেমের গল্প

এরিক ভাসনেকসের ‘ডকস অফ হামবুর্গ’ চলচ্চিত্রটি ১৯২৮ সালে মুক্তি পায়৷ একজন নাবিকের গল্প এটি, যেখানে এক নারীর সঙ্গে প্রেমের পর, সেই নারীর প্রোরোচনায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে সে৷

৬৮তম বার্লিনালে: ফিরে দেখা ভাইমার যুগের চলচ্চিত্র

এবং আরেকটি বিয়োগান্তক প্রেমের গল্প

‘দ্য ডেভিয়াস পাথ’ স্বল্প পরিচিত একটি চলচ্চিত্র৷ ধারণা করা হয়েছিল ৯০ এর দশকে এটি খোয়া গেছে৷ ১৯২৮ সালের এই চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্র এক দম্পতির, যারা বৈবাহিক সংকটের মধ্য দিয়ে যায়৷

৬৮তম বার্লিনালে: ফিরে দেখা ভাইমার যুগের চলচ্চিত্র

লেনি রিফেনস্টালের অভিষেক

নাৎসিদের পক্ষে প্রচারণামূলক চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লেনি’র নাম৷ ত্রিশের দশকে তিনি এমন বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছিলেন৷ এবারের উৎসবে তার পরিচালিত ‘দ্য ব্লু লাইট’ চলচ্চিত্রটির প্রদর্শন হয়েছে, যা ১৯৩২ সালে মুক্তি পায়৷

৬৮তম বার্লিনালে: ফিরে দেখা ভাইমার যুগের চলচ্চিত্র

প্রথম ‘টিনএজ’ চলচ্চিত্র

এবারের রেট্রোস্পেক্টিভ বিভাগে তিনটি ভাগ ছিল– ইতিহাস, বৈচিত্রমূলক এবং দৈনন্দিন জীবনের গল্প৷ রিচার্ড ওসভাল্ডের ১৯২৯ সালের চলচ্চিত্র ‘স্প্রিং অ্যাওকেনিং’ জার্মান কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যৌনতা এবং বয়ঃসন্ধির ব্যাপারে সচেতনামূলক বিষয় ফুটে উঠেছে৷ ধারণা করা হয়, কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে এটাই প্রথম চলচ্চিত্র৷

৬৮তম বার্লিনালে: ফিরে দেখা ভাইমার যুগের চলচ্চিত্র

উৎসবের জন্য প্রকাশ

রেট্রোস্পেক্টিভ বিভাগে এবার ১৯৩২ সালের চলচ্চিত্র ‘দ্য অ্যানসিয়েন্ট ল’ বিশেষ সম্মান পেয়েছে৷ এবারের উৎসবে এটির নতুন সংস্করণ প্রদর্শিত হয়েছে৷

৬৮তম বার্লিনালে: ফিরে দেখা ভাইমার যুগের চলচ্চিত্র

এখনও সজীব এবং নতুন

ভাইমার সিনেমা জার্মান চলচ্চিত্রের সবচেয়ে ফলপ্রসূ ও প্রভাবশালী সময়কে উপস্থাপন করে বলে মনে করা হয়৷

যেমন, ফোরাম এর একটা মুভি দেখে আর কোনোটা দেখার ইচ্ছে হয়নি৷ বিখ্যাত পরিচালক জেমস বেনিং-এর ‘ইলেভেন বাই ফোরটিন'৷ একটা দৃশ্যের কথা বললেই ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন৷ একটা ছেলে ট্রামে বসে বই পড়ছে, ছেলেটার মুখ দেখা যাচ্ছে না৷ কিন্তু ট্রামটা চলছে, এর যেন শেষ নেই, ১০ থেকে ১৫ মিনিট ধরে চলছে, একসময় হঠাৎ পাশ থেকে নাক ডাকার শব্দ পেয়ে দেখি আমার পাশের তরুণ দর্শক ঘুমিয়ে পড়েছেন৷ তো এই হলো ফোরামের ছবি৷

প্যানোরামার একটা ছবি দেখেছি, যা আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে৷ আর্জেন্টিনার ছবি ‘মেরিলিন'৷ মার্টিন রদ্রিগেজ রেডোনডো এক সমকামী কিশোরের  ঘটনা নিয়ে সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন, যা সত্য ঘটনার উপর ভিত্তি করে নির্মিত৷

সিনেমার প্রতিটি অভিনেতা অসাধারণ অভিনয় করেছেন৷ সিনেমাটির  শেষ দৃশ্যের পর পুরো হলে ছিল পিনপতন নীরবতা, সবার মন এতটাই ছুঁয়ে গেছে৷

অমৃতা পারভেজ, ডয়চে ভেলে

প্রতিযোগিতা ক্যাটাগরিতে তিনটি মুভি দেখেছি , একটি জার্মান, একটি পোলিশ এবং আরেকটি  ইয়াকুশিয়া ভাষায়৷ জার্মান মুভি ‘ইন দি  আইলস' চমৎকার একটি মুভি৷ গল্পটা ভীষণ সুন্দর৷ পোলিশ মুভি ‘মাগ' ভালো লেগেছে সিনেমাটোগ্রাফি আর গল্প দু'টো মিলিয়ে৷ আর সাইবেরিয়ার ইয়াকুশিয়া ভাষার চলচ্চিত্র ‘আগা' আসলে অনেকটা তথ্যচিত্রের মতো৷

বার্লিনালেতে বাংলাদেশের কোনো ছবি নেই, তবে বাংলা ভাষায় আছে৷ কলকাতার নির্মাতা কিউ-এর ছবি ‘গার্বেজ' নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে৷ দেখানো হয়েছে দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের ‘ইয়ে দ্য আদার্স'৷

তবে এই উৎসবে এসে  যে জিনিসটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে, তাহলো কোনো শোতে হল খালি থাকে না৷ সকাল সাড়ে ৯ টায় গিয়েও দেখেছি মানুষের ভিড়৷ এই যে চলচ্চিত্রের প্রতি মানুষের ভালোবাসা এটা  দেখেই তো  মানুষ আরো ভালো ভালো সিনেমা বানানোর অনুপ্রেরণা পায়৷

আমাদের অনুসরণ করুন