বাসযাত্রায় নারী: পুরুষের প্রতিক্রিয়া

সকাল সাড়ে আটটা৷ স্পট: সায়েন্স ল্যাব মোড়৷ পরপর দু'টি গাড়িতে উঠতে পারল না মেয়েটি৷ অতি কষ্টে তৃতীয় গাড়িতে উঠল৷ এটিসিএল-এর গেটে ঝুলে ঝুলে উঠে একটু জায়গা করে দাঁড়ালো মেয়েটি৷

উঠার পর ‘দেইখেন পইড়া যাইবেন' বলতে বলতে মেয়েটিকে ‘নিরাপত্তা' দিতে উনি এগিয়ে আসতে লাগলেন৷ দাঁড়ালেন, মেয়েটিকে ঘেঁষে৷ অন্যদিক থেকে এগিয়ে এলেন আরো দু'জন পুরুষ৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

মেয়েটি একজনকে হাত সরাতে বলে৷ এরপরই উপরে যেতে চায়৷ পুরুষদের একজন বললেন, ‘‘লোকাল বাস, উইঠ্যা এত লাফাঙ্গা আচরণ করেন কেন? আইজ কাইলকার মেয়েগুলা যা হইছে না!''

‘নিরাপত্তা' নিতে অনিচ্ছুক হতবাক মেয়েটি এরপর কিছু বলতেও পারছে না৷

এমন সময় গেটে ঝুলে থাকা অন্য একটি ছেলে বলল, ‘‘ভাই আপনারা একজনকে ঘিরে তিনজন দাঁড়িয়ে আছেন৷ পথ তো পুরো বন্ধ হয়ে গেছে৷ উপরে জায়গা আছে৷ আপনারা যান, নয় তো আমাকে যেতে দেন৷''

এক পুরুষের জবাব, ‘‘এইডা লোকাল বাস৷ এইভাবেই যাইতে হইবো৷ আমরা সামনেই নামবো৷ উপরে যাওন যাইবো না৷''

ছেলেটির জবাব, ‘‘লোকাল বাস মানে কি উপরে জায়গা রেখে গেটে ঝুলে থাকা? অন্যকে উপরে যেতে না দেয়া? আর এটা ঠিক লোকাল বাস না৷ এটা কাউন্টার গাড়ি৷ আপা, চেষ্টা উপরে যাওয়ার চেষ্টা করে দেখেন৷''

DW | Muha Suliman

সুলাইমান নিলয়, সাংবাদিক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

ছেলেটির সঙ্গে ওই তিন পুরুষের ঝগড়া লেগে যায়৷

এক পর্যায়ে মেয়েটি আরেকটু ভেতরে গিয়ে দাঁড়াতে পারে৷ পরে নেমেও পড়ে শাহবাগে৷ সামনে নামতে চাওয়া তিন ‘পুরুষ' তখনো ব্যস্ত খিস্তি খেউরে৷

সেই সময় একজন ‘পুরুষ' হেল্পারকে ডেকে বললো, ‘‘ওই মিয়া, বাস কি তোমার বাপের? এই মাইয়া ভাড়া না দিয়া নাইম্যা গেছে৷ দেইখ্যাই বুঝছিলাম, মাইয়াডা ফালতু...৷''

আবার সরব হলো ছেলেটি, জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে এক পুরুষের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো, ‘‘ভাই আপনি ভাড়া দিছেন?'' 

পুরুষ: হ্যাঁ দিয়েছি৷

ছেলেটি: কার কাছে দিয়েছেন?

পুরুষ: এই যে ওনার কাছে (হেল্পারকে দেখিয়ে)৷ 

ছেলেটি: ভাই, এটা তো কাউন্টার গাড়ি৷ টিকেট করে উঠতে হয়৷ টিকেট করে উঠলে মালিকের কাছে টাকাটা পৌঁছে৷ মালিক মানে বুঝছেন তো? যে ব্যক্তি বাপের টাকায় বা নিজের টাকায় গাড়িটা কিনছে৷ মেয়েটা ঠিকঠাক মতো টিকেট করেই গাড়িতে উঠছিল৷

পুরুষ: আপনি মিয়া বেশি বাড়াবাড়ি করতেছেন৷ (কিছুক্ষণ চুপ থেকে পরে হেল্পারের দিকে দৃষ্টি দিয়ে) এই মিয়া, মাইয়া মানুষ উঠাও কেন পুরুষ মানুষের গাড়িতে?

নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট

নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন রিপোর্ট বলছে, বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অহরহ৷ তার ওপর পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধের যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, সেটাও যথার্থ নয়৷ এছাড়া বিশ্বের মোট নারীর ৭ শতাংশ নাকি জীবনের যে কোনো সময় ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷

উন্নত বিশ্বের নারীরাও রেহাই পান না

ধর্ষণ শব্দটি শুনলেই মনে হয় এ ধরণের অপরাধ হয়ে থাকে শুধু অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে৷ আসলে কিন্তু মোটেই তা নয়৷ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই শতকরা ৩৩ জন মেয়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়৷ এমনকি জার্মানির মতো উন্নত দেশের নারীরাও যৌন নিগ্রহ বা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত৷

ধর্ষিতা নারীরা জানাতে ভয় পান

জার্মানিতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত বা ধর্ষিত নারীদের সঠিক পদ্ধতিতে ‘মেডিকেল টেস্ট’-এর ব্যবস্থা করে, এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত স্ত্রী বিশেষজ্ঞ ডা. সোনিয়া পিলস বলেন, ‘‘ধর্ষণের শিকার নারী লজ্জায় এবং আতঙ্কে থাকেন৷ তিনি পুলিশের কাছে গিয়ে সে অভিজ্ঞতা বা ধর্ষক সম্পর্কে তথ্য জানাতে ভয় পান, কুণ্ঠা বোধ করেন৷ অনেকদিন লেগে যায় ধর্ষণের কথা কাউকে বলতে৷

ধর্ষককে ধরার জন্য দ্রুত ডাক্তারি পরীক্ষা

ধর্ষণের পর নারীদের কী করণীয় – এ বিষয়ে জার্মানির ধর্ষণ বিষয়ক নির্দেশিকায় কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে৷ যেমন ধর্ষণের পর একা না থেকে কারো সাথে কথা বলা৷ গোসল, খাওয়া, ধূমপান, বাথরুমে যাওয়ার আগে, অর্থাৎ ধর্ষণের চিহ্ন মুঝে না যাবার আগে ডাক্তারি পরীক্ষা করানো৷ এ পরীক্ষা করালে ধর্ষক কোনো অসুখ বা এইচআইভি-তে আক্রান্ত ছিল কিনা, তা জানা সম্ভব৷ নারীর শরীরে নখের আচড় বা খামচি থাকলে ধর্ষকের চিহ্ন সহজেই পাওয়া যায়৷

যাঁরা ধর্ষণের শিকার, তাঁদের জন্য জরুরি বিভাগ

ধর্ষক যেসব জিনিসের সংস্পর্শে এসেছে, অর্থাৎ অন্তর্বাস, প্যাড এ সব তুলে রাখুন৷ ছবিও তুলে রাখতে পারেন৷ নিজেকে দোষী ভাববেন না, কারণ যে ধর্ষণের মতো জঘণ্যতম কাজটি করেছে – সেই অপরাধী, আপনি নন৷ জার্মানির বেশ কয়েকটি শহরের হাসপাতালে যৌন নির্যাতন বিষয়ক আলাদা জরুরি বিভাগ রয়েছে৷ তাছাড়া ধর্ষণ সংক্রান্ত নানা প্রশ্নের উত্তর জানতে রয়েছে ‘গেভাল্ট গেগেন ফ্রাউয়েন’, যেখানে ২৪ ঘণ্টাই টেলিফোন করা যায়৷

গ্রুপ থেরাপি

যৌন নিগ্রহ বা ধর্ষণের শিকার নারীদের মানসিক ও শারীরিক সমস্যা সমাধানের জন্য জার্মানিতে রয়েছে গ্রুপ থেরাপি, যার সাহায্যে নারীরা আবার সমাজে সহজভাবে মিশতে পারেন এবং তাঁদের জীবনে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটি সহজে ভুলে যেতে পারেন৷

সবচেয়ে বেশি যৌন অপরাধ হয় বাড়িতেই

ভারতের কোথাও না কোথাও প্রতি ২২ মিনিটে একটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে৷ তাই আদালতের নির্দেশে ভারতের পুলিশ বিভাগ এক সমীক্ষা চালিয়েছিল দিল্লির ৪৪টি এলাকায়৷ চলতি বছরের গত আট মাসে ২,২৭৮টি ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন এবং যৌন অপরাধের তদন্তের ফলাফলে দেখে গেছে: ১,৩৮০টি ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা হলেন পরিবারের লোকজন এবং পরিচিতজনেরা৷ অর্থাৎ নিজের বাড়িতেও মেয়েরা নিরাপদ নয়!

সঠিক বিচার চাই

২০১৩ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দিল্লিতে গণধর্ষণ ঘটনার পর, ভারতে ঘটা করে বিচার বিভাগীয় কমিশন বসিয়ে ধর্ষণ, যৌন নিগ্রহ দমনে আইন-কানুন ঢেলে সাজানো হয়৷ শাস্তির বিধান আরো কঠোর করা হয়৷ কিন্তু তাতে যৌন অপরাধের সংখ্যা না কমে বরং বেড়েছে৷

বাংলাদেশে ধর্ষণের শিকার

বাংলাদেশে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১১ সালে ৬২০ জন, ২০১২ সালে ৮৩৬ জন, ২০১৩ সালে ৭১৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত, অর্থাৎ মাত্র ছ’মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৪৩১টি এবং এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮২ জন৷ তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণ করে ধর্ষণ এবং পরে হত্যার ঘটনাও অনেক বেড়েছে৷

নারীর পোশাকই কি ধর্ষণের জন্য দায়ী?

বাংলাদেশের একজন পুলিশ কর্মকর্তা একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘‘বাংলাদেশের নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেপরোয়াভাবে, বেপর্দায় চলাফেলার কারণে ধর্ষণের শিকার হন৷’’ পুলিশের কর্মকর্তার দাবি, ধর্ষণের দায় প্রধানত নারীদের৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘বখাটে ছেলেরা তো ঘোরাফেরা করবেই৷’’ এ কথা শুধু পুলিশ কর্মকর্তার নয়, ভারত-বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থাই এরকম৷ ধর্ষণ বন্ধ করতে এই মধ্যযুগীয় চিন্তা, চেতনার পরিবর্তন প্রয়োজন৷

ছোট বেলা থেকে সচেতন করতে হবে

ধর্ষণ সম্পর্কে ছোটবেলা থেকে সঠিক ধারণা দিলে স্বাভাবিকভাবে ধর্ষণের সংখ্যা কমবে৷ তাছাড়া পাঠ্যপুস্তকেও বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া উচিত৷ ধর্ষিতা নারীকে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হতে হয়, সে সম্পর্কেও সচেতনতা দরকার৷ অনেকে যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন৷ গোটা সমাজও নারীকেই দোষ দিয়ে থাকে৷ ডাক্তারি বা মনস্তাত্ত্বিক সাহায্য ছাড়াও প্রয়োজন পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও সমাজের বন্ধুবৎসল আচরণ৷

ছেলেটি: ভাই, আপনি যাবেন, তারা যাবে না? আর গাড়িটা কেমনে পুরুষের হইলো? নারীদেরকে না নিলে তারা কিভাবে যাবে, কী করবে?

পুরুষ: তারা পরের গাড়িতে আসবে৷ গাড়ির কি অভাব?

ছেলেটি: এখন তো অফিস টাইম৷ সব গাড়িতেই ভীড়৷ এত কিছু না বলে পুরুষরা ভালো হয়ে গেলেই তো হয়৷

পুরুষ: ভিড় থাকলে বাসা থেকে তাড়াতাড়ি বের হবে৷ তাইলেই তো সমাধান৷

ছেলেটি: ভাই, বাসায় কি আপনি রান্না করেন, নাকি ভাবি? বাচ্চাকে স্কুলে কে নেয়? রাতে ফিরে আবার রান্না, সংসার, বাচ্চা-কাচ্চা; আপনিই সামলান? পুরুষরা এত ভালো হয়ে গেছে?

পুরুষ: আরে ভাই, আপনি আরো ফালতু৷ উল্টাপাল্টা কতা কন৷ ভালো হইতে কন! পুরুষ না আপনে? জানেন না যে, না চাইলেও বাসে মেয়েদের গায়ে হাত-পা লেগে যায়!

ছেলেটি: হিসাবটা তাহলে এই৷ ঠিকই কইছেন, আপনারই তাহলে হাত পা লেগে গিয়েছিল৷

সুলাইমান নিলয়ের লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷