বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের দ্বন্দ্ব কেন?

বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে দ্বন্দ্ব এখন স্পষ্ট৷ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বরাবরই বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ করে আসছেন৷ অন্যদিকে, খোদ প্রধানমন্ত্রী বলছেন বিচার বিভাগ স্বাধীন৷

তবে দ্বন্দ্বের কথা কখনো কখনো প্রধানমন্ত্রীর কথাতেও প্রকাশ পায়৷ বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালানার তিনটি অঙ্গ আইন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ৷ রাষ্ট্র বনাম মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে ২০০৭ সালের পহেলা নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথক করা হলেও এখনো বিচার বিভাগের জন্য আলাদা কোনো সচিবালয় হয়নি৷ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়নি বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি৷ আর বিচারপতিদের অভিশংসন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানি চলছে৷ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়া হয়৷ হাইকোর্ট তা বাতিল করে দেয়া পর রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছে৷ দ্বন্দ্বের নেপথ্যে আরো অনেক ইস্যু থাকলেও এখন প্রধান ইস্যু এই তিনটি৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

দ্বন্দ্বটি গোপনে নয়, প্রকাশ্যে চলে এসেছে৷ রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী মানে প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি এখন এ নিয়ে প্রকাশ্যেই কথা বলছেন৷ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা অব্যাহতভাবে বলে আসছেন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা হচ্ছে৷ গত বছর থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়েও তিনি এ নিয়ে অনেক প্রকাশ্য মন্তব্য করেছেন৷ তার দু-একটি নমুনা উল্লেখ করলেই পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হবে৷

১০ জানুয়ারি, ২০১৬

বিচার বিভাগের ক্ষমতা নিয়ে যেতে চায় নির্বাহী বিভাগ:

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে আইন বইমেলা উদ্বোধনের সময় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘‘নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের কাছ থেকে সব ক্ষমতা নিয়ে যেতে চাচ্ছে৷ অতীতে দেখা গেছে, যখনই এ ধরনের কিছু হয়েছে, তখনই আইনজীবীরা সোচ্চার হয়েছেন৷ কিন্তু এখন বিচার বিভাগের দিকে আইনজীবী মহল, নির্বাহী বিভাগ, বিচারপ্রার্থী – সবদিক থেকে যদি আঘাত আসতে থাকে, তাহলে বিচার বিভাগকে রক্ষা করবে কে?''

১৮ মার্চ, ২০১৭

বিচার বিভাগ নিয়ে সরকারকে ভুল রিপোর্ট দেয়া হচ্ছে: 

বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) কমিশনের অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম'– এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘‘বিচার বিভাগ নিয়ে একটি মহল সরকারকে ভুল রিপোর্ট দিচ্ছে৷ বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হলে, তাতে সরকারই ক্ষতিগ্রস্ত হবে৷'' 

২৫ এপ্রিল  ২০১৭

প্রশাসন চায়না বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে চলুক:

হবিগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘‘সব সরকারের আমলেই বিচার বিভাগের ওপর বিমাতাসূলভ আচরণ চলে আসছে৷ প্রশাসন কোনো সময়ই চায় না বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে চলুক৷ অথচ বিচার বিভাগ প্রশাসনেরও নিরাপত্তা দিয়ে থাকে৷ কিন্তু আমলাতন্ত্র সব সময় বিচার বিভাগকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে৷''

প্রধান বিচারপতির এ রকম আরো অনেক কথার জবাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আইনমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার আরো অনেকে যোগ দিয়েছেন বাহাসে৷

২৮ এপ্রিল ২০১৭ 

ক্ষমতা কারও কিন্তু কম নয়: প্রধানমন্ত্রী

রাজধানীর কাকরাইলে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের জন্য আবাসনস্থল উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘পারস্পরিক দোষারোপের পথে না হেঁটে সংসদ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগকে সমঝোতার মাধ্যমে আরও সচেতনতার সঙ্গে কাজ করতে হবে৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘ক্ষমতা কারও কিন্তু কম নয়৷ এখন কে কাকে সম্মান করবে, কে কাকে করবে না, কে কার সিদ্ধান্ত নাকচ করবে, কে কাকে মানবে, না মানবে; এই দ্বন্দ্বে যদি আমরা যাই, তাহলে কিন্তু একটি রাষ্ট্র সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে না৷'' একই অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘‘একটি মহল সব সময় সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে দূরত্ব তৈরির অপচেষ্টায় লিপ্ত৷ এ রকম ভুল বোঝাবুঝির কারণে সাধারণ জনগণের কাছে ভুল বার্তা চলে যায়৷''

৮ মে ২০১৭

প্রধান বিচারপতি কীভাবে বলেন বিচার বিভাগ স্বাধীন নয় : প্রধানমন্ত্রী

সংসদে প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘‘প্রধান বিচারপতি কীভাবে বললেন দেশে আইনের শাসন নেই, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নেই৷ বিচার বিভাগ যে স্বাধীন তার একটাই তো প্রমাণ আছে৷ একজন নেত্রীর একটা মামলায় যদি ১৪০ দিন সময় দেওয়া হয়, বিচার বিভাগ স্বাধীন বলেই তো এতদিন সময় দেওয়া হয়েছে৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘বিচার বিভাগ স্বাধীন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত৷ সরকার কোনো মামলার বিচারে হস্তক্ষেপ করেনি৷''

১ মে  ২০১৭

প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন বিচার বিভাগ হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ আমলে: আইনমন্ত্রী

চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির অভিষেক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘‘দেশে বিচার বিভাগ স্বাধীন হয়ে থাকলে সেটা প্রথম হয়েছিল ১৯৭২ সালে৷ মৃত্যু হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫ সালে হত্যার মধ্য দিয়ে৷ তারপর যদি আবার স্বাধীন হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে তা হয়েছে ১ নভেম্বর ২০০৭ সালে (মাসদার হোসেন মামলার ঐতিহাসিক রায়ের দিন)৷ আমরা অনেক স্বাধীনতার কথা মুখে শুনেছি৷ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন বিচার বিভাগ হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ আমলে৷''

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী

বিচার বিভাগের সঙ্গে  নির্বাহী বিভাগের দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী৷ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এখন সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হবে কি হবে না তা নিয়ে শুনানি চলছে৷ সেখানে আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাটর্নি জেনারেল ওই সংশোধনী  বহাল রাখার পক্ষে কথা বলছেন৷ আদালত এর বাইরে এমিকাস কিউরি হিসেবে বিশিষ্ট আইনজীবীদের বক্তব্য শুনছেন৷ 

সমাজ

দক্ষিণ এশিয়ায় চতুর্থ বাংলাদেশ

ডাব্লিউজেপির তালিকা বলছে, আইনের শাসনের দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান চার নম্বরে৷ এই অঞ্চলের ছয়টি দেশের উপর গবেষণা চালিয়েছে মার্কিন ঐ সংস্থাটি৷ অন্য দেশগুলো হচ্ছে, আফগানিস্তান, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা৷ এর মধ্যে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ৷ আর শীর্ষে আছে নেপাল৷

সমাজ

বিশ্বে অবস্থান ১০৩

মোট ১১৩টি দেশের উপর গবেষণা চালিয়েছে ডাব্লিউজেপি৷ এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৩৷ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় জরিপ চালানো হয়৷ এছাড়া আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের তৈরি প্রশ্নমালা দিয়ে বাংলাদেশের কমপক্ষে ৩০০ স্থানীয় বিশেষজ্ঞের উপরও জরিপ চালানো হয়েছে৷ বিশ্ব তালিকায় নেপাল, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের স্থান যথাক্রমে ৬৩, ১০৬ ও ১১১৷

সমাজ

বাকিদের অবস্থান

তালিকায় সবার উপরে আছে ডেনমার্কের নাম৷ অর্থাৎ সেই দেশে আইনের শাসন পরিস্থিতি সবচেয়ে ভাল৷ এরপরে আছে নরওয়ে ও ফিনল্যান্ড৷ জার্মানি অবস্থান ৬৷ আর সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ভেনেজুয়েলা (১১৩) ও কম্বোডিয়ায় (১১২)৷ সারা বিশ্বের প্রায় এক লাখ সাধারণ মানুষ ও প্রায় আড়াই হাজার বিশেষজ্ঞের উপর জরিপের ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে৷

সমাজ

যে বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া হয়েছে

মোট আটটি বিষয়ে জরিপকারীদের কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয়৷ এগুলো হলো সরকারের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা, সরকারি অফিসে দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, প্রয়োগকারী সংস্থা, দেওয়ানি বিচার ও ফৌজদারি বিচার৷

সমাজ

যেখানে বাংলাদেশ সবার নীচে

দক্ষিণ এশিয়ার তালিকায় বাংলাদেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও সরকারের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা এবং মৌলিক অধিকার – এই দু’টি বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে খারাপ৷

সমাজ

নিম্নআয়ের দেশের তালিকা

ডাব্লিউজেপি তাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা ২৮টি দেশকে নিম্নআয়ের দেশ বলে উল্লেখ করেছে৷ এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২৩ নম্বরে৷ বিস্তারিত জানতে উপরে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের কাছে ছিল৷ ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে অর্পণ করা হয়৷ পরে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা দেয়া হয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে৷ ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা পুনরায় সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়৷

কিন্তু  ২০১৬ সালে ৫ মে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে অর্পণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট৷ রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরুদ্ধে আপিল করায় এখন তার শুনানি চলছে৷

ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ও বাতিলের রায়ে হাইকোর্ট তখন বলেন, ‘‘বলতে দ্বিধা নেই, ষোড়শ সংশোধনী একটি কালারেবল লেজিসলেশন (কোনো কাজ সংবিধানের মধ্যে থেকে করার সুযোগ না থাকলে আইনসভা যখন ছদ্ম আবরণে ভিন্ন প্রয়োজনের যুক্তি দেখিয়ে একটি আইন তৈরি করে) যা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, আইন সভা থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ নীতির লঙ্ঘন৷''

বৃহস্পতিবার শুনানিতে এমিকাস কিউরি হিসেবে অংশ নেয়ার পর ব্যরিস্টার আমীর উল ইসলাম বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক যে আইন কানুন জাতিসংঘ থেকে শুরু করে কমনওয়েলেথের দেশসমূহ যে রুলস রেগুলেশন মানে, সব জায়গায় জুডিশিয়ারির দক্ষতা, নিয়োগ বা যে কোনো ধরণের ব্যবস্থা নিতে হলে সেটা জুডিশিয়ারিই করে৷ আমাদের এখানেও সেরকম পদ্ধতি চালু আছে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল, তারাই বিষয়টি দেখবে৷ পার্লামেন্টারি রিম্যুভাল কোনো দেশেই কার্যকর হতে পারছে না৷ বেশিরভাগ দেশই এটা থেকে সরে আসছে৷'' 

ব্যরিস্টার আমীর উল ইসলাম আরো বলেন, ‘‘দুনিয়াজোড়া যে অবস্থান দেখছি, সেখানে ‘সেলফ ডিসিপ্লিণ্ড অ্যাণ্ড সেল্ফ মনিটরিং-'এর কথাই বলা হচ্ছে৷ জুডিশিয়ারি অসদাচরণ হয়েছে মনে করলে জুডিশিয়ারিই সেটা ঠিক করবে৷'' 

আরেকজন এমিকাস কিউরি ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘‘সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে কীভাবে বিচারপতি অপসারণ করা হবে– এমন প্রশ্ন রেখেছেন আপিল বিভাগ৷ আদালত বলেন, এখন না হয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, কিন্তু কোনো সময় যদি না থাকে, যদি হ্যাঙ্গিং পার্লামেন্ট হয়, তাহলে কী হবে? কীভাবে অপসারণ করা হবে? তখন তো একটা ভ্যাকুয়াম (শূন্যতা) সৃষ্টি হবে৷''

সমাজ

ব্লগার হত্যা

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি টিএসসির সামনে দুর্বৃত্তরা মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করে৷ এরপর একে একে হত্যার শিকার হন ব্লগার নীলাদ্রী নিলয়, অনন্ত বিজয় দাশ, ওয়াশিকুর বাবু, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন৷ এ সব হত্যাকাণ্ডের কোনোটির বিচারে ‘উল্লেখযোগ্য’ অগ্রগতি না হওয়ায় সম্প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান৷

সমাজ

সাংবাদিক দম্পতি হত্যা

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ভাড়া বাসায় সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনিকে হত্যা করা হয়৷ গত চার বছরে এই মামলার তদন্ত থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ হয়ে র‌্যাব-এর হাতে পৌঁছেছে৷ গত মে মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক সময়ে আমরা প্রত্যেক হত্যাকাণ্ড তদন্তের মাধ্যমে তার বিচার করতে পেরেছি৷ সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড অন্য কথা৷ ওটা এখানে না আসাই ভালো৷’’

সমাজ

ধর্ষণের বিচার

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে ৬৬০ জন নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ অথচ কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি৷

সমাজ

ত্বকী হত্যা

নারায়ণগঞ্জ গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তা রফিউর রাব্বির ছেলে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে ২০১৩ সালের ৬ মার্চ হত্যা করা হয়৷ হত্যার দুদিন পর শীতলক্ষ্যার একটি খালে তার লাশ পাওয়া যায়৷ রাষ্ট্রের অনিহা থাকায় এই হত্যাকাণ্ডের বিচার থমকে আছে বলে সম্প্রতি অভিযোগ করেন রফিউর রহমান রাব্বি৷ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাংসদ শামীম ওসমানের পরিবারের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে৷

সমাজ

তনু হত্যা

চলতি বছরের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর মৃতদেহ পাওয়ার পর দেশব্যাপী প্রতিবাদ উঠেছিল৷ দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি উঠেছিল৷ কিন্তু এখনও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি৷ তবে তদন্তকাজ চলছে৷

সমাজ

শিল্প কারখানায় দুর্ঘটনা

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে সাভারের রানা প্লাজা ধসে এগারশ’র বেশি মানুষের প্রাণ যায়৷ এর মধ্যে বেশিরভাগই পোশাক শ্রমিক ছিল৷ তিন বছরেরও বেশি সময় পর গত জুলাইতে এই ঘটনায় করা হত্যা মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়৷ ঢাকার এক অনলাইন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ বছরে উল্লেখ্যযোগ্য শিল্প দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৮টি৷ এর কোনোটিরই বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি৷ প্রতিবেদনটি পড়তে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

সমাজ

চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা

১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর বনানীর ১৭ নম্বর রোডের আবেদীন টাওয়ারে ট্রাম্পস ক্লাবের নীচে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করা হয়৷ ঘটনার দিনই তাঁর ভাই গুলশান থানায় হত্যা মামলা করেছিলেন৷ এই অভিনেতা খুন হওয়ার পর চলচ্চিত্র প্রযোজক ও ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও এখনও মামলার বিচার শুরু করা যায়নি৷ আরও তথ্য জানতে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

সমাজ

সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা

২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে আওয়ামী লীগের জনসভা শেষে ফেরার পথে গ্রেনেড হামলায় মারা যান সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াসহ পাঁচজন৷ এ ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক মামলা – দু’টিই হবিগঞ্জে দায়ের হলেও পরে সিলেটে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়৷

সমাজ

হতাশ রামুর ক্ষতিগ্রস্তরা

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজারের রামু উপজেলায় কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে বৌদ্ধপল্লীতে হামলা চালিয়ে ১২টি বৌদ্ধ মন্দির ও ৩০টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে একদল লোক৷ ঐ ঘটনার চার বছর পরও মামলা গতিশীল না হওয়ায় হাতাশা প্রকাশ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা৷ পিপি মমতাজ আহমদ সম্প্রতি বলেন, এই হামলার ঘটনায় দায়ের করা ১৯টি মামলায় ইতোমধ্যেই অভিযোগ গঠন করা হয়েছে৷ আরও তথ্য জানতে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

সমাজ

নারী নির্যাতনের মামলা ৫,০০৩টি, রায় ৮২০টির

২০১৫ সালে প্রকাশিত মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক জরিপ বলছে, গত নয় বছরে দেশের নয়টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২২,৩৮৬ জন নারী ধর্ষণসহ বিভিন্ন নির্যাতনের ঘটনায় চিকিৎসা নেন৷ এই ঘটনাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়ায় দেখা গেছে এ সব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৫,০০৩টি৷ রায় ঘোষণা হয়েছে ৮২০টি, শাস্তি হয়েছে ১০১ জনের৷ শতকরা হিসাবে রায় ঘোষণার হার ৩.৬৬ এবং সাজা পাওয়ার হার ০.৪৫ শতাংশ৷


তিনি আরো বলেন, ‘‘এ দেশের সংসদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সংসদ তুলনা করলে হবে না৷ এ দেশে পুলিশ, নির্বাহী বিভাগের সদস্যরা অসদাচরণ করলে তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়৷ তাহলে জুডিশিয়ারিতে কেন সংশোধন৷ যদি এই সংশোধন বহাল হয় তাহলে বেঞ্চ গঠন ছাড়া বিচার বিভাগের কোনো কাজ নেই৷ রায় হলে তখন সংসদে আলোচনা হবে৷''

বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘দেশের নিম্ন আদালত এখনো স্বাধীন নয়৷ এখানে প্রশাসনের প্রভাব মাসদার হোসেন মামলার রায় অনুযায়ী গেজেট করে পুরো বিচার ব্যবস্থা এবং বিচার প্রশাসনকে আলাদা করা হয়নি৷ এরপর যদি সংসদের হাতে সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতা যায়, তাহলে তারা রাজনীতিবিদদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়তে পারেন৷ কোনো রাজনীতিবিদের কোনো মামলার রায় যদি তার বিপক্ষে যায়, তাহলে ওই বিচারক প্রতিশোধের মুখে পড়তে পারেন৷''

ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন জানান, ‘‘আমি মনে করি, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসন মুখোমুখি অবস্থানে নেই৷ একটা তীব্র বিতর্ক হচ্ছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে৷ আশা করি, ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে আপিলের রায়ে এই বিতর্কের অবসান ঘটবে৷''

বিচার বিভাগ আলাদা করা হলেও বাংলাদেশে নিম্ন আদালতের বিচারকদের এখনো নিয়ন্ত্রণ করে আইন মন্ত্রনালয়৷ তাদের বদলি, পোস্টিং আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে৷ বিচার বিভাগের সুপারিশ উপেক্ষা করার অভিযোগ আছে৷ এ মাসেই আইন মন্ত্রণালয় সুপ্রিমকোর্টকে না জানিয়ে ১৭ জন বিচারককে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিল৷ কিন্তু সুপ্রিমকোর্ট তা জানতে পেরে গত ২৩ মে তাদের বিদেশ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে৷

আদেশে হুঁশিয়ার করে বলা হয়েছে, ‘‘এই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করা হলে সংশ্লিষ্ট বিচারকেরা বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত হবেন৷''

নিষেধাজ্ঞা দেওয়া বিচারকদের মধ্যে ১৪ জনই প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার জন্য তিন মাসের কোর্সে ২৭ মে অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন৷

অন্যদিকে নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা গেজেট এখনো প্রকাশ করা হয়নি৷ মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে আপিল বিভাগ শৃঙ্খলাবিধি তৈরি করে দেয়ার পরও তা দেড় বছরেও গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়নি৷ এটা হলে নিম্ন আদালতের বিচারকরা পুরোপুরি বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে৷ আর সুপ্রিমকোর্ট চায় বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয়, যা পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে৷

প্রশাসনিক ম্যাজিস্ট্রেটদের মোবাইল কোর্ট পারিচালনা নিয়েও আছে জটিলতা৷ গত ১১ মে হাইকোর্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অবৈধ ঘোষণা করে৷ পরে অবশ্য আপিলে এই আদেশ স্থগিত করা হয়৷

এছাড়া  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তর, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সুপ্রিম কোর্টের ডিজিটাল ডকুমেন্টশন প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার পক্ষের আপত্তি এবং সর্বশেষ সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে ভাস্কর্য স্থাপনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের দ্বন্দ্ব প্রকাশ পায়৷

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের জন্য রিটকারী আইনজীবী মনজিল মোরশেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মূল সমস্যা করছে আইন মন্ত্রণালয়৷ তারা নানা কৌশলে নিম্ন আদালতের ওপর কর্তৃত্ব বহাল রাখার চেষ্টা করছে৷ ফলে একটার পর একটা জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে৷ উচ্চ আদালতে তেমন কোনো সমস্যা নেই৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘আইন মন্ত্রণালয় নিম্ন আদালতের বদলি, পোস্টিং বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে৷ বিচার বিভাগের সুপারিশ তেমন আমলে নেয় না৷ এ কারণেই মাসদার হোসেন মামলার রায় মেনে বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধি তারা গেজেট আকারে প্রকাশ করছে না৷ আইন মন্ত্রণালয়ের কারণেই বিচার বিভাগের সঙ্গে প্রশাসনের এক ধরণের দ্বন্দ্ব দেখা দিচ্ছে৷''

মনজিল মোরশেদ জানান, ‘‘আমরা রিটটি করেছি সংবিধান অনুযায়ী বিচার বিভাগকে স্বাধীন রাখতে৷ কিন্তু  যারা বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদকে দিতে আইন করেছিলেন, তারা চাচ্ছেন ক্ষমতা সংসদের হাতেই থাক৷ দুই পক্ষই এখন এ নিয়ে কথা বলছে৷ আর সংবাদ মাধ্যম তা প্রকাশ করছে৷ ফলে মনে হচ্ছে বড় একটি দ্বন্দ্ব হচ্ছে৷ আসলে  এগুলো যার যার আর্গুমেন্ট৷''

প্রসঙ্গত, সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতের বিচারকদের সহায়ক জনবল সংক্রান্ত দুই হাজার ৪৬৮টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব, ৯১টি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত গঠন, ২১টি অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত গঠন, জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমি গঠনের প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সরিয়ে নেওয়াসহ অধিকাংশ বিষয় সুপ্রিম কোর্টের প্রস্তাব গত দুই বছরেও কার্যকর হয়নি৷''

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷