বৈশ্বিক উষ্ণায়ন: ফুরিয়ে আসছে প্রতিশ্রুতি রক্ষার সময়

দূষণের জন্য দায়ী জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নে লাগাম পরানোর পথ খুঁজতে একটি খসড়া চূড়ান্ত করতে বসেছেন বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী ও সরকারি কর্মকর্তারা৷
বিজ্ঞান পরিবেশ | 02.04.2014

জার্মানির বার্লিনে সোমবার শুরু হওয়া জাতিসংঘের এ বৈঠক চলবে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত৷ এ বৈঠকে ২৯ পৃষ্ঠার একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হবে৷ এতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার শিল্প বিপ্লবের আগের সময়ের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে না দেয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হলে দেশগুলোকে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনতে হবে৷

২০১০ সালে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা কমিয়ে আনার ওই অঙ্গীকারনামায় সই করেছিল প্রায় ২০০ দেশ৷

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ১৯০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বের উষ্ণতা প্রায় ০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে৷ এই ধারা চলতে থাকলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে তা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবে৷

পৃথিবীর স্বর্গ হারানোর পথে

বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে সাগরে পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের ছোট ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো ঝুঁকির মুখে রয়েছে৷ মালদ্বীপ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৫ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত৷ ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে এটি পুরোপুরি তলিয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না বলে আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের৷

বন্যার প্রকট আকার

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকির মুখে রয়েছে বাংলাদেশ৷ নিম্ন ভৌগলিক অবস্থান এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে নানা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে দেশটি৷ সাগরের পানির উচ্চতা মাত্র তিন ফুট বেড়ে গেলেই দেশের অর্ধেক পানির নীচে তলিয়ে যাবে৷

পানিতে নিমজ্জিত সম্পদ

সাগরের পানির উচ্চতা বাড়ার কারণে এরই মধ্যে দ্বীপগুলোর নিম্নাঞ্চল থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে শুরু করেছে অনেকেই৷ প্রশান্ত মহাসাগরীয় কিরিবাটি দ্বীপপুঞ্জের কিছু গ্রাম এরই মধ্যেপানিতে তলিয়ে গেছে৷ ফসলি জমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ায় বেশ চিন্তিত সেখানকার চাষীরা৷

তাপমাত্রা বৃদ্ধি

আইপিসিসি’র রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই শতকে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে ০.৩ থেকে ৪.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস৷ এমনকি শিল্পকারখানা যেখানে বেশি সেখানে গড়ে ০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে৷ ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রে পানির উচ্চতা বাড়বে ২৬ থেকে ২৮ সেন্টিমিটার৷

সমুদ্রপৃষ্ঠের নীচে বসবাস

সমুদ্রের পানি থেকে বাঁচার উত্তম পন্থা জানা আছে ডাচদের৷ প্রায় ১০০০ বছর আগে বন্যার হাত থেকে বাঁচতে তারা প্রথম পরিখা নির্মাণ করেছিল৷ এ কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের নীচে দুই তৃতীয়াংশ মানুষ নির্বিঘ্নে দিন কাটাচ্ছে সেখানে৷ তবে বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়েও ভাবছে ডাচরা৷

ডুবছে বিশ্ব ঐতিহ্য

ইটালির ভেনিস পুরোটাই পানি বেষ্টিত৷ তাই সেখানে বন্যা কোনো আকস্মিত ঘটনা নয়৷ কিন্তু চিন্তা বিষয় হল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহরটি ক্রমেই পানির তলায় তলিয়ে যাচ্ছে৷ ইটালির সরকার ভেনিস রক্ষায় ৯.৬ বিলিয়ন ইউরোর একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে৷ বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষার এই প্রকল্প ২০১৬ সাল নাগাদ শেষ হবে৷

প্রাকৃতিক বিপর্যয়

আইপিসিসি-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এশিয়া ও ইউরোপে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে৷ অন্যদিকে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলিতে পানি সংকট এবং খরা দেখা দেবে বলেও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে৷ এর ফলে ফসল ভালোমত হবে না, দেখা দেবে খাদ্য ঘাটতি৷

কোনো মানুষ রেহাই পাবে না

আইপিসিসি-র সভাপতি রাজেন্দ্র পাচৌরি বলেছেন, বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা যদি ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায় তবে ঝুঁকির পরিমাণও সেই অনুপাতে বাড়বে৷ জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব থেকে বিশ্বের কোনো মানুষই রেহাই পাবেন না৷

স্টকহোম রেজিলিয়েন্স সেন্টারের বিশেষজ্ঞ জন রকস্টর্ম বলেন, ‘‘আমাদের সামনে লক্ষ্য পূরণের সুযোগ খুব দ্রুত কমে আসছে৷ এখন বিতর্কটা হচ্ছে, আমরা ২ এর বদলে ৩ বা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে উষ্ণতা বৃদ্ধির হার বেঁধে রাখার লক্ষ্য ঠিক করব কি না৷''

অবশ্য জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলছে, লক্ষ্য শিথিল করা হলে বন্যা, খরায় খাদ্য ও সুপেয় পানির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে এবং হিমশৈলী গলে যাওয়ার মতো অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে৷

এ কারণে কার্বন গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে৷

২০১০ সালে বিশ্বে যেসব জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছে, তার মধ্যে ১৭ শতাংশ ছিল নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, যা কম মাত্রায় কার্বন গ্যাস নিঃসরণ করে৷ জাতিসংঘ বলছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা কমিয়ে আনতে হলে ২০৫০ সাল নাগাদ এ ধরনের জ্বালানির ব্যবহার তিন বা চারগুণ বাড়াতে হবে৷

খসড়ায় বলা হয়েছে, ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে ২০৩০ সাল নাগাদ গ্রিন হাউস গ্যাস নিসঃরণের মাত্রা ৩০ থেকে ৫০ বিলিয়ন টনে নামিয়ে আনতে হবে৷ ২০১০ সালে এর পরিমাণ ছিল ৪৯ বিলিয়ন টন, আর ১৯৯০ সালে ৩৮ বিলিয়ন টন৷

এই লক্ষ্য পূরণ করতে গেলে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবস্থাপনায় যে খরচ হবে, তাতে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের মোট উৎপাদন গড়ে ২ থেকে ৬ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে বলে মনে করছে জাতিসংঘ সমর্থিত আন্তঃসরকার সংস্থা ইন্টারগভার্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)

জেকে/ এসবি (রয়টার্স)

জার্মানির বার্লিনে সোমবার শুরু হওয়া জাতিসংঘের এ বৈঠক চলবে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত৷ এ বৈঠকে ২৯ পৃষ্ঠার একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হবে৷ এতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার শিল্প বিপ্লবের আগের সময়ের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে না দেয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হলে দেশগুলোকে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনতে হবে৷