ব্রিটেনে মুসলমানরা ‘রাজনীতির ফুটবল', নিউ ইয়র্কে বাঙালিকে পিটুনি

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের একটি মন্তব্য নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে৷ অন্যদিকে নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশিরা আছেন আতঙ্কে৷ দাড়ি আর পাজামা-পাঞ্জাবির কারণে এক বাঙালিকে ‘আইএস' বলে পেটানো হয়েছে৷

যুবকদের পরিচয় জানা যায়নি৷ তবে তাঁরা যে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপে ইসলামি জঙ্গি সংগঠন তথাকথিত আইএস-এর হত্যাযজ্ঞের কারণে মুসলমানবিদ্বেষী হয়ে উঠেছে, তা ব্রিটিশ মিডিয়ায় প্রচারিত খবর পড়েও কিছুটা অনুমান করা যায়৷ নিউ ইয়র্কে ২৫ হাজারের মতো বাংলাদেশির বসবাস৷ এ শহরেরই ব্রঙ্কস এলাকায় বেদম পিটুনির শিকার হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মজিবর রহমান৷

সিলেটে জন্ম নেয়া মজিবর শুক্রবার সন্ধ্যায় ৯ বছর বয়সি ভাগ্নিকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিলেন৷ পথে দুই যুবক শ্মশ্রুমণ্ডিত, পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত মজিবরকে দেখে ছুটে এসে ‘আইএস', ‘আইএস' বলে চিৎকার করে নাকেমুখে কিল-ঘুসি মারতে শুরু করে৷ ৪৩ বছর বয়সি মজিবর রাস্তায় পড়ে যান৷ যুবকেরা তখন লাথি মারতে থাকে৷ মুখ এবং শরীরের অন্য কিছু স্থানে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে মজিবর এখন স্থানীয় এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন৷

আইএস কী, কোথায় এবং কেন?

ইসলামিক স্টেট বা আইএস আসলে কী?

আল কায়েদা থেকে তৈরি হওয়া সুন্নি মুসলমানদের জঙ্গি সংগঠন আইএস৷ সাদ্দাম পরবর্তী সময়ে ইরাকে এবং বাশার আল আসাদের আমলে সিরিয়ায় সুন্নিদের হতাশা থেকেই জন্ম সংগঠনটির৷ আইএস-এর পতাকায় লেখা থাকে, ‘মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর নবী’ এবং ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই৷’

আইএস কী, কোথায় এবং কেন?

আইএস কোথায় সক্রিয়?

শরিয়া আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে এমন রাষ্ট্র, বা ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায় আইএস৷ সিরিয়া এবং ইরাকেই প্রত্যক্ষভাবে সক্রিয় তারা৷ দুটি দেশেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে বেশ বড় অঞ্চল দখল করে নিয়েছে আইএস৷

আইএস কী, কোথায় এবং কেন?

আইএস কেন আলাদা?

মূলত নিষ্ঠুরতার জন্য৷ শত্রুপক্ষ এবং নিরীহ মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়াতে তারা এমন বর্বরতা এবং নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করে যা আগে কেউ করেনি৷ জবাই করে ভিডিও প্রচার, পুড়িয়ে মারা, বাবার সামনে মেয়েকে জবাই করা এবং তার তার ভিডিও প্রচার, মেয়েদের যৌনদাসী বানানো আর পণ্যের মতো বিক্রি করা – এসব নিয়মিতভাবেই করছে আইএস৷ কোনো অঞ্চল দখলে নেয়ার পর সেখানে শাসন প্রতিষ্ঠায় মন দেয় আইএস৷

আইএস কী, কোথায় এবং কেন?

অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক

আইএস যদিও শুধু সিরিয়া এবং ইরাকেই সক্রিয়, তবে বিশ্বের অন্যান্য ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন নয়৷ নাইজেরিয়ার জঙ্গি সংগঠন বোকো হারাম কয়েকদিন আগেই জানিয়েছে, আইএস-কে তারা সমর্থন করে৷ দুটি সংগঠনের মধ্যে একটি জায়গায় মিলও আছে৷ আইএস-এর মতো বোকো হারামও নিষ্ঠুরতা এবং বর্বরতার প্রতিভূ হয়ে উঠেছে৷ অন্য ধর্মের নারীদের প্রতি দুটি সংগঠনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণই মধ্যযুগীয়৷

আইএস কী, কোথায় এবং কেন?

আইএস-এর অনুসারী কারা?

অনুসারী সংগ্রহের সাফল্যেও আইএস অন্য সব জঙ্গি সংগঠনের চেয়ে আলাদা৷ এ পর্যন্ত অন্তত ২০ হাজার বিদেশী যোদ্ধা আইএস-এ যোগ দিয়েছে৷ তাদের মধ্যে ৪ হাজারই পশ্চিম ইউরোপ এবং উত্তর অ্যামেরিকার৷

আইএস কী, কোথায় এবং কেন?

আইএস-কে রুখতে অন্য দেশগুলো কী করছে?

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বেশ কিছু পশ্চিমা এবং আরব দেশ সিরিয়া ও ইরাকে আইএস ঘাঁটির ওপর বিমান থেকে বোমা হামলা চালাচ্ছে৷ বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সিরিয়ায় ১৪২২ এবং ইরাকে ২২৪২ বার হামলা হয়েছে৷ কোনো কোনো সরকার দেশের অভ্যন্তরেও কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে৷ সিরিয়া ফেরত অন্তত ৩০ জন সন্দেহভাজন জঙ্গির বিচার শুরু করবে জার্মানি৷ গত মাসে সৌদি পুলিশও ৯৩ জন সন্দেহভাজন আইএস জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে৷

দাড়ি আর পাঞ্জাবির কারণে মজিবরকে ‘আইএস' বলে পেটানোর ঘটনায় নিউ ইয়র্কের বাঙালিদের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে৷ প্রবাসি বাঙালিরা হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন৷ নিউ ইয়র্কের পুলিশ জানিয়েছে, হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করার জন্য তাদের ‘হেইট ক্রাইম টাস্ক ফোর্স' কাজ শুরু করেছে৷

ওদিকে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী সে দেশে বসবাসরত মুসলমান, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের খুব তাড়াতাড়ি ইংরেজি শিখতে বলেছেন৷ বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ব্রিটিশ সমাজের মূল স্রোতে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করতে হলে মুসলমানদের অবশ্যই ইংরেজি শিখতে হবে৷ তাঁর মতে, ইংরেজি না শিখলে ব্রিটিশ সমাজের অনেক কিছুই বোঝা প্রায় অসম্ভব৷ এ কারণে একটি সমাজের ভেতরে থেকেও সমাজের অংশ হতে না পারা মানুষদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে বলেও তিনি মনে করেন৷ ক্যামেরন জানান, ব্রিটিশ সরকার সবাইকে ইংরেজি শিখতে উদ্বুদ্ধ করতে ৩ কোটি ১০ লক্ষ ডলারের এক কার্যক্রম শুরু করবে৷ কার্যক্রমটি কবে শুরু হবে তা অবশ্য ক্যামেরন বলেননি৷

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এমন মন্তব্যে ব্রিটেনের মুসলমানদে মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে৷ একাংশ ক্যামেরনের কঠোর সমালোচনা করলেও আরেকটি অংশ মনে করে ইংরেজি শেখা এমনিতেই দরকার, কোনো সমাজের সঙ্গে নিজেকে পুরোপুরি মানিয়ে নেয়ার জন্য সবাই ইংরেজি শিখতেই পারে৷

মুসলমানদের লন্ডনকেন্দ্রিক সংগঠন রমাদান ফাউন্ডেশন মনে করে, ক্যামেরন ‘মুসলমানদের রাজনৈতিক ফুটবল হিসেবে ব্যবহার করছেন৷' অন্যদিকে মুসলিম কাউন্সিল অফ ব্রিটেন ব্যাপারটিকে সেভাবে দেখছে না৷ বরং ক্যামেরনের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে তারা৷

এসিবি/ডিজি (ডিপিএ, ডেইলি নিউজ)

শুধু দাড়ি থাকলে কি কেউ জঙ্গি হয়ে যায়? জঙ্গিবাদ থেকে দূরে থাকার জন্য ইংরেজি শেখা কি জরুরি? জানান আপনার মত, নীচের ঘরে৷

আমাদের অনুসরণ করুন