বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানকে বন্ধু করে নিন

সারা বিশ্বে হত্যাকাণ্ড আর অপরাধমূলক কাজ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে এ সবের সাথে তরুণ প্রজন্মের সম্পৃক্ততাও৷ তাহলে কি সন্তান লালন-পালনে কোনো ভুল বা ক্রুটি থেকে যাচ্ছে? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো কারণ?

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

প্রতিটি মা-বাবার কাছে তাঁদের সন্তানের চেয়ে বড় কিছুই নেই৷ আদরের সেই ছোট্ট শিশুটি হাঁটি হাঁটি পা করে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে৷ আর সেই সাথে সন্তানটিকে নিয়ে বাড়তে থাকে মা-বাবার স্বপ্নও৷ কিন্তু সন্তানের এই বড় হওয়ার মাঝখানে একটা বিশেষ সময়ে বাবা-মায়ের কোনো অসাবধানতা কিংবা অসচেতনতার কারণেই সন্তান জড়িয়ে পড়তে পারে অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে, যা ঠিকমতো বোঝার আগেই ভেঙে ফেলতে পারে মা-বাবার বা পরিবারের এতদিনকার স্বপ্ন৷

হ্যাঁ, বলছি ‘বয়ঃসন্ধিকালের' কথা, যা কিনা একজন মানুষের জীবনে বেড়ে ওঠার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ৷ অর্থাৎ কিশোর-কিশোরী থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া৷ সাধারণত ১০ থেকে ১৯ বছর বা টিন-এজটাকেই বয়ঃসন্ধিকাল হিসেবে ধরা হয়৷ মনোবিজ্ঞানীদের কথায়, এই বয়সে মানুষের মস্তিষ্কে চলে ছোট থেকে বড় হওয়ার ভাঙা-গড়া বা মস্তিষ্কের পূণর্গঠন৷ বিশেষজ্ঞরা এ কথাও বলেন যে, এ বয়সে শরীর আর মনের এই পরিবর্তনের কারণে কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের অনুভূতিকে ঠিক ‘কন্ট্রোলে' রাখতে পারে না৷

মায়ের সাথে সম্পর্ক

ছোটবেলায় শিশুরা বেশিরভাগ সময় যে মায়ের সাথেই থাকে – এ কথা ঠিক৷ তাই বলে যে মায়ের সাথে পরেও সম্পর্ক ভালো থাকবে এমন কোনো কথা নেই কিন্তু! সব সময় সম্পর্ক ভালো এবং সুন্দর সম্পর্ক রাখার জন্য অবশ্যই সে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে আর সেটা করতে হবে ছোটবেলা থেকেই৷ কিন্তু কিভাবে?

সম্পর্ক তৈরি

দায়িত্ব পালন এক বিষয়, আর বন্ধুত্বের সম্পর্ক সম্পূর্ণ অন্য একটা বিষয়৷ ছোটবেলা থেকেই শিশুর সাথে খেলাধুলা করুন, বই পড়ুন৷ শিশুর সাথে বসে টিভিতে শিশুদের অনুষ্ঠান দেখুন৷ শিশুকে অন্য শিশুর সাথে মিশতে, খেলতে দিন৷ এতেই বোঝা যাবে আপনার শিশুর পছন্দ, অপছন্দ, ভালো লাগা আর না লাগার কথা৷ শিশুর পছন্দকে গুরুত্ব দিন তবে ওর পছন্দই যেন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব না পায়৷

বাবার দায়িত্ব

সময়ের দাবির কারণে কিছুটা পরিবর্তন এলেও এখনো দেখা যায় যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সন্তানরা বেশিরভাগই মায়ের সাথে যতটা সহজ, বাবার সাথে তেমনটা নয়৷ তাই বাবাও সন্তানের জন্য কিছুটা সময় বের করে সন্তানের সাথে থাকুন৷ জার্মানিতে অনেক বাবাকেই দেখা যায় ছুটির দিনে সন্তানকে নিয়ে পার্কে, মিউজিয়ামে বা অন্য কোথাও ঘুরতে যেতে৷ এর মাধ্যমে বাবার সাথে সন্তানের গড়ে ওঠে ঘনিষ্ঠতা৷

সমান দায়িত্ব

সন্তানদের সাথে ভালো এবং মধুর সম্পর্ক গড়া মা-বাবার সমান দায়িত্ব তাই দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে সব বিষয়ে কথা বলুন৷ এতে ছেলে-মেয়েরা সহজ হয়ে ওদের দুঃখ, কষ্ট ও সমস্যার কথা জানাতে দ্বিধা করবে না৷ শিশুদের ভয় দেখিয়ে কখনো কাছে আনা যায় না৷ওরা কোনো অপরাধ করলে তা নিয়ে সরসরি আলোচনা করতে হবে৷ ছোটবেলায় সন্তনকে ভয় দেখিয়ে কাজ হলেও, বড় বয়সে কিন্তু আর সে সম্পর্ক সুন্দর থাকে না৷ তাই সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে হবে৷

সম্পর্কে দূরত্ব আনে প্রযুক্তির ব্যবহার

আজকাল প্রায়ই দেখা যায় একদিকে মা, একদিকে বাবা, আর অন্যদিকে সন্তান – যে যার মতো ব্যস্ত ফেসবুক, কম্পিউটার বা ট্যাবলেট নিয়ে৷ অর্থাৎ পরিবারের সদস্যদের ভেতর কথাবার্তা তেমন হচ্ছে না৷ তাই প্রয়োজন ছাড়া এই যন্ত্রগুলোকে সরিয়ে রেখে দিয়ে নিজেদের মধ্যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন শিশু-কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ গুন্ডুলা গ্যোবেল৷

সন্তানের সামনে ঝগড়া নয়!

বাবা-মায়ের নিয়মিত ঝগড়া সন্তানদের মনে ভীষণভাবে রেখাপাত করে, যা বড় বয়সেও তারা ভুলতে পারে না৷ শুধু তাই নয়, যারা খুব বেশি ঝগড়া করেন, তাঁদের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ বেশি৷ এই তথ্য পাওয়া গেছে ডেনমার্কের কোপেনহাগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের করা এক গবেষণার ফল থেকে৷ তাছাড়া বাবা-মা সারাক্ষণ ঝগড়া করলে সন্তানরা বিষণ্ণতায় ভোগে, যা পরবর্তিতে তাদের ভেতরে থেকে যায়৷

আলোচনার বিকল্প নেই

পরিবারের সুখ-শান্তি রক্ষায় আলোচনার কোনো বিকল্প নেই৷ তাই ‘‘শিশুকে শিশু না ভেবে একজন সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে গণ্য করে আলোচনায় ওকেও অংশ নিতে নিন৷ শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং ওকে বলার সুযোগ দিন৷ এর মধ্য দিয়ে আপনার সন্তানটিও বুঝবে যে সে পরিবারের একজন সদস্য এবং ওর মতামতেরও মূল্য আছে৷ এতে শিশুর দায়িত্ববোধ এবং অন্যদের প্রতি শ্রদ্ধাও বাড়বে’’, বলেন বিশেষজ্ঞরা৷

বকা বা ভয় দেখাবেন না!

আজকের যুগের জীবনযাত্রা মোটেই সহজ নয়, কিন্তু তারপরও মা-বাবা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের চাপ সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দেবেন না৷ কারণ শিশুদের মন খুবই নরম, ওরা সব বাবা-মায়ের সব কথার উত্তর না দিলেও তা ওদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ভেলে, খুব সহজেই৷ দৈনন্দিন সমস্যার কথাও সন্তানদের সাথে শেয়ার করুন৷ হয়ত ওদের কাছে থেকেই পেয়ে যাবেন সমস্যার সমাধান৷বকাঝকা করে বা ভয় দেখিয়ে সন্তানদের কাছে আনা যায় না৷

স্বপ্ন আর বাস্তব – এক নয়!

প্রতিটি বাবা-মা চান তাঁদের সন্তান সব কিছুতেই ভালো করুক, যা খুবই স্বাভাবিক৷ তবে এটাও মনে রাখা দরকার যে, ‘স্বপ্ন আর বাস্তব’ – এক নয়৷ তাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফল হয়নি বা অন্য কোনো প্রতিযোগিতায় মনের মতো সাফল্য দেখাতে পারেনি বলে তাকে বকাঝকা না করে বরং আরও একটু বেশি যত্ন নিন, সাহস দিন আগামীবারের জন্য৷ তাছাড়া পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়, কখনোই!

অনুভূতির আদান-প্রদান

সন্তান এবং বাবা-মায়ের ভেতর এমন সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করতে হবে যেন, একে-অপরকে নির্দ্বিধায় সব কথা বলতে এবং বুঝতে পারা যায়৷

বয়ঃসন্ধিকালের এই ধাপটিতে এতকিছু ঘটে, অথচ আমরা, যারা বাংলাদেশ-ভারতের মতো দেশে সাধারণ পরিবারে বড় হয়েছি, তারা কি এ সম্পর্কে বিশেষ জানতাম? এ সময়টায় নিজেকে শুধু সকলের কাছ থেকে খানিকটা আড়াল করে রাখার প্রবণতা ছিল আমাদের মধ্যে৷ বহুদিন আগের কথা হলেও, আমার বেশ মনে আছে যে তখন আমার ছোটদের সাথে খেলতে ইচ্ছে করতো না৷ আবার অন্যদিকে বড়রাও আমাদের তাঁদের গল্পের মধ্যে অংশগ্রহণ করতে দিত না৷ না ছোট, না বড়৷ তখন যেন কোনো দলেই পড়ি না আমরা৷ কেমন এক অসহায় পরিস্থিতি...৷

এ বয়সে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা তুলনামূলকভাবে কিছুটা সহজ হয় হয়ত বা৷ তারপরও মনে হয় অনেক প্রয়োজনীয় বিষয়ই সে সময় আমাদের অজানা থেকে গিয়েছিল শুধুমাত্র মা-বাবা বা পরিবারের মানুষের সাথে সহজভাবে কথা বলতে না পারার কারণে৷ আর আমার তো মনে হয়, এই একবিংশ শতকে এসেও বাংলাদেশ বা ভারতের ছেলে-মেয়েদের পোশাক বা চলনে-বলনে ইউরোপ-অ্যামেরিকার ছোঁয়া লাগলেও বয়ঃসন্ধিকালের সমস্যাগুলো নিয়ে সরাসরি পরিবারের মধ্যে কথা বলার মতো মানসিকতা আজও হয়নি৷ আজকের টিন-এজ ছেলে-মেয়েদের সাথে কথা বলে আমার অন্তত এই ধারণাই হয়েছে৷

‘বয়ঃসন্ধিকাল' যে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়, তা কিন্তু জার্মানিতে খুবই স্পষ্ট৷ এ বয়সি ছেলে-মেয়েদের যৌনশিক্ষা, মাদক সেবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে স্কুলেই সচেতন করে দেওয়া হয়৷ তাছাড়া আমার সন্তানকে বড় করার মধ্য দিয়েই দেখেছি যে, এ দেশের মা-বাবারা কিন্তু ছেলে-মেয়েদের সাথে খোলাখুলিভাবে আলোচনা করেন, সন্তানের সাথে বন্ধুর মতো মেশেন৷ তা না হলে যে সন্তানের মনের নাগাল পাওয়া কঠিন, সে কথা ভালো করেই জানেন জার্মান বাবা-মায়েরা৷ শুধু তাই নয়, ওদের বন্ধু-বান্ধব কারা সেটার খোঁজও রাখেন তাঁরা৷

সমাজ

মাথায় যা ঘটে

কিশোর-কিশোরীরা কথায় কথায় মেজাজ দেখাচ্ছে, অথবা কেউ ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে রাখছে৷ কেউ চুলে রং করছে বা অসম্ভব জোরে গান শুনছে৷ তার ওপর পড়াশোনায় মনোযোগ একেবারেই নেই! মাথায় যেন তাদের একটাই প্রশ্ন – ‘‘আমার বয়সি, আমার বন্ধুরা কী করছে?’’ এই অনুভূতিকে আয়ত্বে আনা টিন-এজারদের নিজেদের জন্যও কিন্তু খুব কঠিন৷ জানান জার্মনির শিশু-কিশোর বিশেষজ্ঞ ও মনশ্চিকিৎসক রমুয়াল্ড ব্রুনার৷

সমাজ

ভিন্ন আচরণ

টিন-এজাররা গাড়ি চালানোর সময় বড় কেউ পাশে থাকলে স্বাভাবিকভাবে, অর্থাৎ ‘নরমাল’ গতিতেই গাড়ি চালায়৷ তবে সমবয়সিদের সঙ্গে নিয়ে ড্রাইভ করার সময় ওদের আচরণ একেবারে পাল্টে যায় বা ঝুঁকিপূর্ণ কিছু করার আগ্রহ বেড়ে যায়৷ দীর্ঘ দিন ধরে করা এক গবেষণায় জানা গেছে এই তথ্য৷

সমাজ

অপরাধমূলক কাজ

বয়ঃসন্ধিকালে কেউ ধূমপানে আগ্রহী হয়, কেউ আবার মাদকের মতো নেশার দিকে ঝুঁকে পড়ে৷ শুধু তাই নয়, কেউ কেউ জড়িয়ে যায় অপরাধমূলক কোনো কাজের সঙ্গে৷ তাই সন্তানের আচরণ অস্বাভবিক মনে হলে ‘বয়সের দোষ’ না ভেবে বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা৷

সমাজ

ঝুঁকিপূর্ণ কাজেই বেশি আগ্রহী

বয়ঃসন্ধিকালে মস্তিষ্ক গঠনে ওলট-পালটের কারণে কিশোর-কিশোরীরা নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের দিকে এগিয়ে যায়৷ আসলে ভবিষ্যতের চিন্তা না করে দ্রুত ফলাফল দেখতে চায়৷ যতদিন ওদের মস্তিকের গঠন পুরোপুরি না হয়, ততদিন পর্যন্ত এদের কাছে বাস্তবতার চেয়ে আবেগই হয়ে ওঠে বড়৷ কারো কারো ক্ষেত্রে তো মস্তিষ্কের গঠন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো হতে ২৪ বছর লেগে যায়৷ জানান স্নায়ুমনোবিজ্ঞানী ক্যার্স্টিন কনরাড৷

সমাজ

পুনর্গঠন প্রকল্প

টিন-এজ বা কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের ভেতরে চলে পুনর্গঠন প্রকল্প৷ ফলে মা-বাবার বিচ্ছেদ বা পারিবারিক কোনো সমস্যা, শিক্ষক বা অন্যদের অবহেলা, ইন্টারনেটের খারাপ প্রভাব ইত্যাদির কারণে তারা অপরাধমূলক নানা কাজে জড়িয়ে যেতে পারে৷ এ কথা জানান জার্মনির শিশু-কিশোর বিশেষজ্ঞ ও মনশ্চিকিৎসক রমুয়াল্ড ব্রুনার৷

সমাজ

আধুনিক যুগের মা-বাবা

আজকের যুগে চাকরিজীবী মা-বাবা তাঁদের আর্থিক স্বচ্ছলতার কারণে সন্তানের অনেক সাধই মেটাতে সক্ষম হন৷ অন্যদিকে ব্যস্ততার কারণে আদরের সন্তানটিকে সময় দিতে পারেন না তাঁরা৷ অথচ বয়ঃসন্ধিকালেই কিন্তু বাবা-মাকে সন্তানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন৷

সমাজ

সন্তানের বন্ধু-বান্ধবের খোঁজ রাখুন

আপনার সন্তান কাদের সাথে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কতক্ষণ থাকছে, সেখানে সে ঠিক কী করছে – এ সব জানা খুবই জরুরি৷ জার্মান একটি প্রবাদ অনুযায়ী, ‘ফ্যারট্রাওয়েন ইস্ত গুট, কনট্রোলে ইস্ত বেসার’৷ অর্থাৎ বিশ্বাস করা ভালো, তবে নিয়ন্ত্রণ করা উত্তম৷ হ্যাঁ, বাবা-মাকে এই পরামর্শই দিয়েছেন ড. ক্যার্স্টিন কনরাড৷ কারণ সন্তানের দিকে সময়মতো নজর না রাখলে গুলশানের জঙ্গি হামলার মতো ঘটনায় জড়িয়ে যাওয়াটা মোটেই অস্বাভবিক কিছু নয়৷

আর হ্যাঁ, আমার এটাও খুব ভালো লাগে যে, ওরা দিনের অন্তত একটি খাবার পরিবারের সকলের সঙ্গে একসাথে খায়৷ কিছু পরিবারের নিয়ম অবশ্য আরো কড়া৷ অর্থাৎ সেখানে সকলের একই সময়ে খাবার টেবিলে উপস্থিত থাকাটা বাধ্যতামূলক৷ এতে করে হাসি-ঠাট্টার মধ্য দিয়ে সব বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলা যায়৷ আসলে সন্তানের প্রথম শিক্ষক যে মা-বাবা, তা বোধহয় আমাদের কারুরই অস্বীকার করার উপায়ই নেই, তাই না?

তাছাড়া বয়ঃসন্ধিকালের ছেলে এবং মেয়ে – দু'জনের চাহিদা যে ভিন্ন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷ তাই হয়ত জার্মানদের মধ্যে উঠতি বয়সি মেয়েদের সাথে মায়েরা বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করেন আর ছেলেদের সাথে বাবারা৷ এই বয়সি মেয়েদের কেনা-কাটায় খুব আগ্রহ৷ তাই ছুটির দিনে মা-মেয়েকে আনন্দ করে শপিং করতে যেতে দেখা যায়৷ দেখা যায়, তারা সারাদিন একসাথে সময় কাটাচ্ছে৷ লক্ষ্য একটাই৷ মেয়ের মনের খবর নেওয়া৷ অন্যদিকে বাপ-ছেলে মিলে যায় ফুটবল খেলা দেখতে বা অন্য কোনো অ্যাডভেঞ্চারে৷

DW Programm Hindi Redaktion Nurunnahar Sattar

নুরুননাহার সাত্তার, ডয়চে ভেলে

তাছাড়া এখানকার কম বয়সি ছেলে-মেয়েরা যে শুধু পরিবারের মধ্যে ফ্রিভাবে কথা বলে, তা নয়৷ শিক্ষকদের সাথেও তাদের সম্পর্কটা হয় বেশ বন্ধুবৎসল৷ আমার এক স্কুল শিক্ষিকা জার্মান প্রতিবেশী বলেন, ছেলে-মেয়েরা তার কাছে তাদের রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ, এমনকি মা-বাবার সম্পর্কে টানাপোড়েনের নানা কথাও অকপটে জানিয়ে দেয়৷ তবে বিদ্যালয়ের গণ্ডির মধ্যে নয়, বরং যখন তারা খেলাধুলা বা ভ্রমণে যায়, তখন৷ এর মধ্য দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনায় অমনোযোগিতা বা বিষণ্ণতার কারণগুলো শিক্ষকদের জানা হয়ে যায়৷ প্রয়োজনে শিক্ষকরা বিষয়গুলি ছাত্র-ছাত্রীদের পরিবারের সাথেও শেয়ার করেন৷

মাদকের নেশা থেকে শুরু করে ধর্ষণ, সাইবার ক্রাইম কিংবা জঙ্গিবাদের মতো অপরাধমূলক কাজে যারা জড়িয়ে পড়ে, তাদের বেশিরভাগেরই বয়স টিন-এজের মধ্যে বা তার কিছু বেশি৷ এ সত্য বর্তমান সময়ে রীতিমতো আতঙ্কের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে করা বিভিন্ন সমীক্ষা থেকেও জানা যায় যে, বয়ঃসন্ধিকালে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে ছেলে-মেয়েদের মাথা এতটাই এলোমেলো থাকে যে, তখন নাকি ওদের অনেকেরই মন চায় ‘ঝুঁকিপূর্ণ' কিছু একটা করতে৷

একজন উঠতি বয়সের মানুষের এই ঝুঁকিপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তার মা-বাবাকে, পরিবারকে৷ তাছাড়া পারিবারিক বন্ধনের চেয়ে বড় বন্ধন কি আর কিছু আছে? তাই আমার মনে হয়, দাম্পত্য কলহ এড়িয়ে বাড়ির পরিবেশ সুন্দর রাখা যেমন দরকার, তেমনই দরকার সন্তানের সাথে বন্ধুর মতো মেশার৷ কারণ তার মনের খবর রাখলেই হয়তো সন্তানকে অপরাধমূলক কাজ থেকে দূরে রেখে একজন যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যাবে!

ফিরিয়ে দাও শৈশব

দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক নগরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার মূলমন্ত্র হলো প্রতিযোগিতা৷ একেবারে ছোট বয়স থেকেই তাই চাপের শেষ নেই৷ পড়াশোনা, নাচগান, আঁকা, শরীরচর্চা, খেলাধুলা – সব কিছুতেই সেরা হয়ে ওঠার জন্য শিশুদের উপর চাপ দেওয়া হয়৷ এর পরিণাম কি ভালো হতে পারে?

সন্তান পালনে পেশাদারি সাহায্য

অন্য সব বিষয়ের মতো সন্তান পালনের ক্ষেত্রেও পুরানো অনেক ধ্যানধারণা আজ অচল হয়ে পড়েছে৷ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীরা জার্মানিতে বাবা-মায়েদের এই কাজে দক্ষ করে তোলার চেষ্টা করেন৷ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ভিত্তিতে তারা সন্তান পালন সংক্রান্ত নানা পরামর্শ দেন৷ স্বাস্থ্য বিমা সংস্থাই ধাত্রীর পারিশ্রমিক দেয়৷

বাবা-মা একটু সময় দিলে

জন্মের পর শিশুর জন্য বাবা-মায়ের স্পর্শ, তাদের আদর-ভালোবাসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ কিন্তু তাদের অত সময় আছে কি? জার্মানিতে নানা মডেলের আওতায় বাবা-মা প্রথম বছরে সন্তানের সঙ্গে অনেক সময় কাটানোর সুযোগ পান৷ রাষ্ট্র ও কর্মদাতা প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য সেই ব্যবস্থা করে দেয়৷

পুঁথিগত শিক্ষার প্রস্তুতি

এক থেকে দুই বছর বয়সের মধ্যে জার্মানির শিশুরা সাধারণত কিন্ডারগার্টেনে যাবার সুযোগ পায়৷ কিন্তু সেখানে পুঁথিগত শিক্ষা নিষিদ্ধ৷ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের কাছ থেকে খেলাচ্ছলে জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে নানারকম শিক্ষা পায় কচিকাচারা৷ স্কুলে যাবার আগে এই প্রস্তুতি তাদের খুব কাজে লাগে৷

প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মবোধ

ঢাকা-কলকাতার মতো শহরের কংক্রিটের জঙ্গলে অনেক শিশু সহজে মাটির সংস্পর্শে আসতে পারে না৷ জার্মানিতে শিশুদের প্রকৃতির কোলে যেতে উৎসাহ দেওয়া হয়৷ এমনকি কিছু এলাকায় জঙ্গলের মধ্যেই কিন্ডারগার্টেন রয়েছে৷ গাছপালা ও নানা প্রাণীর সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় হয় তাদের৷

স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক

সাধারণত ৬ বছর বয়সে স্কুলে যায় জার্মানির বাচ্চারা৷ তখনই পড়াশোনা শুরু হয়৷ প্রাথমিক স্কুলশিক্ষা বাধ্যতামূলক৷ স্কুলে আলাদা ইউনিফর্ম নেই৷ প্রথম দিনে কচিকাচাদের উপহারে ভরা এক বিশেষ ঠোঙা দেওয়ার রেওয়াজ আছে৷

পড়ার চাপ

স্কুলের পড়াশোনা স্কুলেই শেখানোর চেষ্টা করা হয়৷ বাড়িতে ফিরে কিছু হোমওয়ার্ক করলেই চলে৷ সাধারণত গৃহশিক্ষক বা কোচিং ক্লাসের প্রয়োজন পড়ে না৷ তবে কিছু ক্ষেত্রে দুর্বলতা দূর করতে বাড়তি সাহায্যের ব্যবস্থা রয়েছে৷ শিক্ষা রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের আওতায় পড়ে বলে জার্মানিতে অনেক সংস্কার আটকে আছে বলে নানা মহলে অভিযোগ ওঠে৷

বন্ধু, ব্লগ পোস্টটি আপনার কেমন লাগলো? জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷

বিজ্ঞান পরিবেশ | 14.05.2014

প্রতিটি মা-বাবার কাছে তাঁদের সন্তানের চেয়ে বড় কিছুই নেই৷ আদরের সেই ছোট্ট শিশুটি হাঁটি হাঁটি পা করে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে৷ আর সেই সাথে সন্তানটিকে নিয়ে বাড়তে থাকে মা-বাবার স্বপ্নও৷ কিন্তু সন্তানের এই বড় হওয়ার মাঝখানে একটা বিশেষ সময়ে বাবা-মায়ের কোনো অসাবধানতা কিংবা অসচেতনতার কারণেই সন্তান জড়িয়ে পড়তে পারে অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে, যা ঠিকমতো বোঝার আগেই ভেঙে ফেলতে পারে মা-বাবার বা পরিবারের এতদিনকার স্বপ্ন৷