1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

ভাইরালের ইঁদুর দৌঁড়ে তথ্য ব্যবসা ও ফেসবুক ট্রায়াল

১৪ আগস্ট ২০২০

২০১৬ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ি মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷

https://p.dw.com/p/3gwjD
Fake News Zeitschriften und Fake News
ছবি: imago images/Steinach

‘বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম করোনা আক্রান্ত হয়ে রাতে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে মারা গেছেন৷ এনিয়ে তিন জন চিকিৎসকের মৃত্যু হলো এই রোগে৷' – গত ৪ মে রাতে নিজের ফেসবুকে এমন তথ্য দিয়েছিলেন বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য সিনিয়র টিভি সাংবাদিক যার ফেসবুকে ফলোয়ারের সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি৷ মুহূর্তের মধ্যে এই তথ্য ভাইরাল হয়ে যায় সামাজিক গণমাধ্যমে৷ পরদিন এক জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিল, ‘আমাকে ফোন করে বললো আমি নাকি মারা গেছি: ডা. নজরুল'৷ একইদিন নারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়র ডা. আইভীর মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে৷ এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক, সরকারী কর্মকর্তাসহ অনেকেই এই তথ্য ছড়ান৷ জুনে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহেরা খাতুনের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগের এক নেতা পোস্ট দেন, ‘সাহারা খাতুন জীবিত আছেন৷ তিনি মারা গেছেন এমন সংবাদ প্রকাশ করা এবং গুজব ছড়ানো খুবই দুঃখজনক'৷ শুধু কভিডকালেই নয়, আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে৷ ২০১৮ সালে অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান ফেসবুকে এবং টেলিভিশনে নিজের মৃত্যু সংবাদ দেখে নিজেই ফেসবুক লাইভে এসে জানিয়েছিলেন, তিনি বেঁচে আছেন৷ তার সাথে এমন ঘটনা চার বার ঘটেছিল৷ যেমনটা মার্ক টোয়েনের সাথে ঘটেছিল তিনবার৷ ১৮৯৭ সালে ভুয়া মৃত্যুর খবরে টোয়েনের প্রতিক্রিয়া নিউ ইয়র্ক জার্নালে ছাপা হয় এভাবে -- ‘‘আমার মৃত্যু সংবাদটি ছিল অতিরঞ্জিত৷''

২০১৬ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ি মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ কভিডকালে বলা হচ্ছে, মহামারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি না, সাথে ইনফোডেমিকের বিরুদ্ধে লড়ছি৷ ভুয়া তথ্য ভাইরাসের চেয়ে দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে৷ প্রথমদিকে ভুয়া তথ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছড়ানো হতো৷ ভুয়া ওয়েব সাইটের মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লাভের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী কয়েকটি নির্বাচনে দেখা গেছে৷ কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ভুয়া খবর এই নির্দিষ্ট লক্ষ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই৷ সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর সাথে শিক্ষিত ও সুশীল গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা এবং মূলধারার গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী রিপোর্টের নামে গল্প বলার প্রবণতা এর প্রভাবকে বাড়িয়ে দিয়েছে৷ পরিতাপের বিষয় হলো, শিক্ষিত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক ফলোয়ার থাকা মানুষ এ ধরনের ভুয়া তথ্য দিচ্ছেন বা শেয়ার করছেন৷ বিশিষ্টজনেরা শেয়ার করছেন বলেই স্বাভাবিকভাবে সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একটি বিরাট অংশ গল্পগুলোকে সত্য ধরে নিয়ে ভাইরাল উৎসবে যোগ দিচ্ছেন৷ ফলে এসব মিথ্যা তথ্যকে এখন শুধু ‘ভুয়া খবর' আখ্যা দিলে সমাজে এগুলোর মারাত্মক প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হয় না৷ বরং এসব কাজকে ‘ভাইরাল প্রতারণা' বলাই শ্রেয়৷ কারণ রাজনৈতিক ফায়দা লাভের জন্য ‘বট' একাউন্টের মাধ্যমে ভুয়া খবর ছড়ানো হলে সেটিকে প্রযুক্তিগতভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব৷ কিন্তু হাজার হাজার ফলোয়ার থাকা একজন সেলিব্রেটি কিংবা বিশিষ্টজনের জীবন্ত একাউন্ট থেকে যখন শেয়ার করা হচ্ছে তখন এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব অনেক গভীর৷ একে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই৷

ভুয়া তথ্য নিয়ে গবেষণা করা ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডান কাহান ও ডর্টমাউথ কলেজের ব্রেন্ডন নাইহান বলেছেন, সেলিব্রেটিদের খবরগুলো সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় লাগে, তাই শেয়ারের হারও বেশি৷ বিবিসি করোনা মহামারীর সময়ে কয়েকশ ভুয়া তথ্য নিয়ে তদন্ত করে বলেছে, যে সাত ধরনের মানুষ ভুয়া তথ্য ছড়ায় তার মধ্যে তারকা বা সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের প্রভাব বেশি৷

‘Fact খুঁজি' ও ‘BD FactCheck' নামে দুটি ফ্যাক্ট চেক প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজের তথ্য থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশে কমবেশি প্রতিদিন কোন না কোন ভুয়া তথ্য ভাইরাল হচ্ছে৷ এগুলো যেমন বিশিষ্টজনেরা শেয়ার করছেন তেমনি অনেক প্রতিষ্ঠিত মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন পোর্টাল সংবাদ হিসেবে প্রকাশ/প্রচার করে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিচ্ছেন৷ কভিড আক্রান্ত হওয়া এবং চিকিৎসা নিয়ে ক্রিকেটার মাশরাফিকে দুইবার পোস্ট দিয়ে জানাতে হয়েছে ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে৷ সিগারেটসহ সব ধরনের তামাক পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধের নির্দেশ; পাপুলের পর মানবপাচারে এবার বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত গ্রেফতার কুয়েতে; ৭৮০০ বাংলাদেশিসহ সারা বিশ্বের ১১ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীকে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের নির্দেশ; ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার পদপ্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি, একেকজন বাংলাদেশি একেকটা ভাইরাস বোমা -- এমন অনেক ভুয়া খবর বিশিষ্টজনদের ফেসবুক পেজে দেখা গেছে৷ অনেকগুলো আবার সংবাদমাধ্যমে ‘খাঁটি' খবর বলে প্রকাশিত হয়েছে৷ যেমন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মাদ নাসিমের একটি ফেইক ফটো ব্যবহার করে বাংলাদেশের একটি ইংরেজি দৈনিক নিউজ প্রকাশ করে৷ চীনের হুয়ান শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রুগীর ছবি ফটোশপ করে আওয়ামী লীগ নেতার এই ফেইক ছবিটি বানানো হয়৷

বাংলাদেশের মাটির উর্বরতার একটি সুখ্যাতি আছে৷ ডিজিটাল ক্ষেত্রের উর্বরতা কিন্তু কম নয়৷ ফেসবুক ব্যবহারকারী বৃদ্ধির গতি দেশটির জন্মহারের সমান৷ আর এই উর্ধ্বগতি ভাইরাল ফোবিয়া নামে নতুন উপসর্গের জন্ম দিচ্ছে৷ অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, অনেক বিশিষ্টজন ও গণমাধ্যম ‘ভাইরাল ফোবিয়া'য় ভুগছেন৷ পোস্ট এবং খবরে লাইক, শেয়ায় এবং কমেন্টের চাহিদা থাকতেই পারে৷ এটি দোষের কিছু নয়৷ কিন্তু তা ভুয়া তথ্য দিয়ে হবে কেন? এই ভাইরাল ফোবিয়ার বাজারে সবশেষ সংযোজন হলো মেজর (অব) সিনহা রাশেদ হত্যার ঘটনা৷ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলমকে মেজর (অব) সিনহা রাশেদ হত্যা মামলার তদন্তভার দেয়া হয়েছে এমন একটি ভুয়া খবর সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হতে না হতেই ফেসবুকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নতুন সংযোজন ঘটেছে৷ বিশ্বে এমন একটি উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে কোনো সাংবাদিক তার অনুসন্ধানী রিপোর্টটি নিজের প্রতিষ্ঠানে প্রকাশের আগে নিজের ফেসবুকে ওয়ালে প্রকাশ করেন৷ তেমন একটি অনন্য নজির আমরা পাই বাংলাদেশে৷ প্রচার সংখ্যার শীর্ষে থাকা একটি দৈনিক ‘ইয়াবা তদন্তে প্রদীপের সঙ্গে কথা বলাই কাল হলো সিনহার' শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশ করে ১০ আগস্ট৷ তার একদিন আগেই সংশ্লিষ্ট রিপোর্টার অপ্রকাশিত রিপোর্টটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট বলে নিজের ফেসবুক ওয়ালে প্রকাশ করেন, যা এখন অবধি ৪ হাজার ৮০০ বারেরও বেশি শেয়ার হয়েছে৷ অনেক সাংবাদিকসহ বিশিষ্টজনেরা এই পোস্টটি শেয়ার দিয়েছেন অনুসন্ধানী খবর হিসেবে৷

প্রযুক্তির এই যুগে একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টের জন্য সাংবাদিকরা ছয়টি হাতিয়ার ব্যবহার করে থাকেন: ইন্টারনেট, ডকুমেন্ট বা নথিপত্র, সাক্ষাৎকার, পর্যবেক্ষণ, জরিপ এবং তথ্য অধিকার আইন৷ কমপক্ষে দুটি হাতিয়ার ব্যবহৃত না হলে বা দুটি হাতিয়ারের মাধ্যমে তথ্য যাচাই-বাছাই করা না হলে কোন প্রতিবেদনকে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলা যায় না৷ সেটি বড়জোর হতে পারে লিক জার্নালিজম৷ এমনকি ঘটনা সত্য হলেও সাংবাদিকের বিবরণটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট বলা যায় না৷ রিপোর্টটিতে ‘প্রত্যক্ষদর্শী ও একাধিক সূত্রে'র কথা বলা হলেও এমন কোন বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের কথা উল্লেখ করা হয়নি যা দিয়ে রিপোর্টটি গল্প নয় সত্য বলে ধরে নেয়া যায়৷ যথাযোগ্য সূত্রবিহীন এমন রিপোর্ট বাংলাদেশের সাংবাদিকতা বিশেষ করে অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিকতার নিম্নমানকে নির্দেশ করে৷ আর সমাজের শিক্ষিত ও বিশিষ্ট জন থেকে শুরু করে গণমানুষ যখন এমন রিপোর্টকে অনুসন্ধানী ট্যাগ দিয়ে ভাইরাল করে তখন বাংলাদেশের মানুষের গণমাধ্যম ও সংবাদ সাক্ষরতা/বোধ (মিডিয়া ও নিউজ লিটারেসি) নিয়ে যথেষ্ট ভাবনার উদ্রেক করে৷ সবশেষ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৭৬ শতাংশ মানুষের নিউজ লিটারেসি খুবই নিম্নমানের৷ বিশ্বব্যাপী ইতিমধ্যে গবেষণায় দেখা গেছে, ভুয়া ও বানোয়াট তথ্য ভাইরালের পেছনে তারাই বেশি ভূমিকা রাখেন যাদের নিউজ লিটারেসি কম৷ আরেকটি মজার তথ্য হলো, অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মূলধারার গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকের পোস্টের মাধ্যমে প্রচার হওয়া ভুয়া তথ্যগুলোই বেশি ছড়িয়ে পড়ে৷ যেমন, করোনা ভাইরাসের বিস্তারের সঙ্গে ফাইভ জি-র যোগাযোগ নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ভিত্তি রয়েছে বলে ব্রিটেনের এক পরিচিত সাংবাদিকের মন্তব্য এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক খবরে ইন্ধন জুগিয়েছিল৷ পরে অবশ্য তিনি স্বীকার করেন তার মন্তব্য ‘অবিবেচকের মতো' ছিল৷

শুধু বাংলাদেশের কিছু সাংবাদিক ‘ভাইরাল ফোবিয়া'য় ভুগছেন এমনটা ভাবার অবকাশ নেই৷ বাইরেও এমন ঘটনা ঘটেছে৷ সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেয়ার কারণে অনেক নামকরা সাংবাদিককে চাকরিও হারাতে হয়েছে৷ যে কারণে গার্ডিয়ান, বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের কর্মীদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আচরণ বিধি করে দিয়েছেন৷ এসব আচরণ বিধিতে স্পষ্টভাবে বলা আছে, একজন সাংবাদিক কোন খবর তার প্রতিষ্ঠানে প্রচার/প্রকাশ হওয়ার আগে কোন ধরনের সামাজিক মাধ্যমে তা প্রকাশ করতে পারেন না৷ কারণ একজন সাংবাদিক শুধু একজন সাংবাদিকই নন, তিনি তার প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডও বটে৷ তিনি যাই কিছু বলুক না কেন তা সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সুনামের সাথে জড়িত৷ বাংলাদেশের সাংবাদিকরা যে হারে নিজেদের নামে ফেসবুক, ইউটিউবে নিজের নামে পেজ/চ্যানেল চালাচ্ছে তা অকল্পনীয়৷ এটির সাথে অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত৷ কিন্তু একজন পেশাদার সাংবাদিক এভাবে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে করতে পারেন না৷ এটি পেশার নৈতিকতার সাথে সাংঘর্ষিক৷

Bangladesch | Wahlen | Talkshow
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী, সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ছবি: bdnews24.com

এটি ঠিক যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি শক্তি আছে৷ অনেক সময় মূলধারার গণমাধ্যমের আগেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনেক তথ্যের সাহায্যে গণমাধ্যমে খবর বের হয়৷ সিলেটের শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যার দৃশ্য ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর সেই ছবি ব্যবহার করেই প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলোতে সংবাদ প্রচার হয়৷ কিন্তু সাংবাদিকরা সেসব খবর যাচাই-বাছাই করে প্রচার/প্রকাশ করেছিল৷ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার তথ্য বিনা-বাক্যে খবর হিসেবে প্রকাশ করলে দেশের সাংবাদিকতা পেশার সংকট আরো বাড়বে৷ ফেসবুকে যখন একজন শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত মানুষ যার অনেক ফলোয়ার আছে কোন ভুল তথ্য শেয়ার করেন তখন সাধারণ মানুষ সেটির নির্ভুলতা যাচাই করতে যান না৷ সরল বিশ্বাসে তারা সেটি শেয়ার করেন৷ একশ্রেণির অনলাইন সংবাদপত্র সংবাদের মোড়কে সেগুলো প্রকাশ করে৷ তখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি বিরাট প্রশ্নের মুখে পড়ে৷

সাংবাদিকের কাজ তথ্য ব্যবসা নয়৷ ফেসবুক বা সামাজিক মাধ্যম আপনাকে দ্রুত তারকা বানাতে পারে৷ কিন্তু সাংবাদিক বানাতে পারে না৷ তথ্য ব্যবসায় কোন দায়িত্ব নেই, সাংবাদিকতায় দায়িত্ব রয়েছে৷ যে তথ্য বেশি মানুষ পড়বে, শেয়ার করবে সেটি প্রকাশ/প্রচার করাই হলো তথ্য ব্যবসা৷ এতে বস্তুনিষ্ঠতার কোনো দরকার নেই৷ তথ্য ব্যবসার কোনো ব্যাকরণ নেই৷ তথ্য ব্যবসা আর সাংবাদিকতা একাকার হয়ে গেলে অপতথ্যের বাহকের সংখ্যা বাড়বে৷ আমাদের দেশের মানুষের নিউজ লিটারেসি কম হওয়ায় তথ্য ব্যবসার মাধ্যমে তাদেরকে যেকোনো বিষয়ে প্রভাবিত করা বা উসকানি দেয়া সহজ৷ ভাইরাল ফোবিয়ার কারণে নতুন একটি শব্দ উচ্চারিত হচ্ছে, ফেসবুক ট্রায়াল৷ ক্যামেরা ট্রায়াল, মিডিয়া ট্রায়ালের মতোই এটি৷ কোন কিছু প্রমাণের আগেই ফেসবুকে প্রচার করে কাউকে না কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা৷ এই প্রবণতা ব্যাপক হারে বেড়েছে৷

মাদার অব অল ক্রাইসিস বা করোনা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য লকডাউন, কারফিউ কিংবা চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে৷ করোনাকালে অনলাইন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে৷ অনলাইনে পাঠকসংখ্যা বেড়েছে নাটকীয় হারে৷ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভুল তথ্যের বিস্তার৷ কিন্তু মানুষ যখন তার বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে আস্থা রাখার মতো তথ্য ও বিচার-বিশ্লেষণ আশা করে তখন সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে সেই প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকাটাই প্রশ্নের মুখে পড়বে৷ সাংবাদিক এলান সুনের মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে সংবাদ মাধ্যমের জনপ্রিয়তা পাওয়ার ইচ্ছে ভুল প্রমাণিত হবে খুব শিগগিরই৷ দেশের শিক্ষিত সমাজ ও বিশিষ্টজন থেকে শুরু করে মূলধারার গণমাধ্যমকে ‘ভাইরালের ইঁদুর দৌড়ে' লিপ্ত হওয়ার আগে মনে রাখতে হবে -- ‘সত্য তার জুতার ফিতা বাঁধার আগেই মিথ্যা অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে আসে'৷ মজার ব্যাপার হলো, এটি জোনাথন সুইফটের মন্তব্য৷ কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হয় মার্ক টোয়েন আর উইনস্টন চার্চিলের নামে৷