ভারতে জাতীয়তাবাদের ঢেউ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি

জঙ্গি দমনে পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে ভারতের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালানোর খবরে ভারতজুড়ে জাতীয়তাবাদের যে ঢেউ উঠেছে, সেটিকে আসন্ন নির্বাচনে কাজে লাগাতে চাইছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী৷

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামায় আত্মঘাতী জঙ্গি হামলায় ভারতের আধা-সামরিক সদস্যদের নিহত হওয়ার ঘটনায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে উঠেছিল৷ এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানে ঢুকে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালিয়ে জঙ্গি ঘাঁটিগুলি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে মোদীর সরকার৷ সেটিকে ঘিরেই জেগে উঠেছে  জাতীয়তাবাদের আবেগ৷ তাই আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে জাতীয়তাবাদের এই জোয়ারকে কাজে লাগাতেই প্রচার শুরু করেছে বিজেপি৷

ভারতে গত ১৬ বারের সংসদীয় নির্বাচনে অন্তত আটবার কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি৷ ১৯৮৪ সালে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল কংগ্রেস, তারপর ২০১৪ সালে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে মোদীর হিন্দুত্ববাদি বিজেপি দল৷

১৯৮৪ সালে পাঞ্জাবের শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে কংগ্রেস নেত্রী ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিহত হবার পর গোটা দেশে দেশাত্মবোধের এক জোয়ার এসেছিল৷ সেই জোয়ারে চারশ'রও বেশি আসন নিয়ে কংগ্রেস ফের ক্ষমতায় এসেছিল৷ সীমান্তের ওপার থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং সন্ত্রাসের মোকাবিলা করাই ছিল কংগ্রেসের প্রধান নির্বাচনি ইস্যু৷ কংগ্রেসকে ভোট দেয়া যেন এক দেশাত্মবোধক কাজ, এমনটাই ভোটের প্রচারে তুলে ধরেছিল কংগ্রেস৷

এখন লাইভ
01:31 মিনিট
বিষয় | 12.03.2019

জঙ্গি বিরোধী জাতীয়তাবাদ এমন জায়গায় রয়েছে, যেটাকে নাড়ানোর সাধ...

এখন জম্মু-কাশ্মীরের পটচিত্রটা একই৷ বিজেপি কি এই সুবিধা কাজে লাগাতে পারবে? রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক উদয়ন বন্দোপাধ্যায় ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘জঙ্গিবাদের বিপরীতে দেখা দিয়েছে একটা জাতীয়তাবাদ৷ একটা বার্তা গেছে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের ফলে৷ ভোটে সেটা বাড়তি গুরুত্ব পাবে৷ অবশ্য নির্বাচন কমিশনের আচরণ বিধি অনুসারে নির্বাচনি প্রচারে সেটা তুলে ধরা যাবে না৷ তাই বিজেপির প্রচারে তুলে ধরা হবে ২০১৪ সালে বিজেপি যেসব উন্নয়নের কথা বলেছিল, সেইসব৷ গত পাঁচ বছরে মোদীর বিজেপি সরকার কি করেছে, সম্ভবত তারই ফিরিস্তি থাকবে৷ তবে মূল ইস্যু সেটা হবে না৷ মূল ইস্যু হবে রাজ্যভিত্তিক৷ যেমন, উত্তরপ্রদেশে প্রশাসনিক ইস্যু, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে হয়ত সেটা হবে না৷ ওড়িশায় হবে অন্য ইস্যু৷ দক্ষিণী রাজ্যগুলিতে আলাদা ইস্যু৷ মুশকিল হচ্ছে বিরোধী জোট সুসংহতভাবে এগিয়ে যেতে পারছে না৷''

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের খুঁটিনাটি

আসনসংখ্যা

সাধারণ নির্বাচন মানে ভারতের লোকসভা সদস্যদের নির্বাচন করার পদ্ধতি৷ লোকসভায় মোট আসন সংখ্যা ৫৪৫ হলেও নির্বাচন হয় ৫৪৩টি আসনে৷ বাকি দুটি আসন ভারতের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত৷ তাদের দুই প্রতিনিধি কে হবেন, তা ঠিক করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি৷

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের খুঁটিনাটি

ভোটার সংখ্যা

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৮৩ কোটিরও বেশি, যা বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে বাড়বে এই সংখ্যা৷ নতুন ভোটারের সংখ্যা এবছর প্রায় সাড়ে চার কোটি হতে চলেছে৷

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের খুঁটিনাটি

কয়টি দল?

গত নির্বাচনে মোট ৮,২৫১ জন প্রার্থী নির্বাচনে লড়েছিলেন৷ সেবার মোট ৪৬০টি রাজনৈতিক দল ভোটের ময়দানে নেমেছিল৷ ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশনই জানাচ্ছে এই তথ্য৷

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের খুঁটিনাটি

মোট প্রার্থী

জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, প্রতিটি আসনে গড়ে ১৪ জন প্রার্থী থাকে ভারতে৷ এখন পর্যন্ত একটি আসনে সর্বোচ্চ ৪২ জন প্রার্থী হয়েছেন!

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের খুঁটিনাটি

ভোটকেন্দ্র কতগুলি?

২০১৪ সালের নির্বাচনে মোট ভোটকেন্দ্র ছিল ৯,২৭,৫৫৩টি৷ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি বুথে গড়ে ৯০০ জন ভোটার ভোট দেন৷ উল্লেখ্য, ভারতের নির্বাচনি আইন বলে, যে-কোনো ভোটারের বাসস্থানের দুই কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে অন্তত একটি ভোটকেন্দ্র থাকতে হবে৷

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের খুঁটিনাটি

নির্বাচনি দায়িত্ব পালন

ভারতের সাধারণ নির্বাচন যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, তার দায়িত্ব পড়ে সরকারী কর্মচারীদের ওপর৷ গত নির্বাচনে এই দায়িত্ব পান প্রায় ৫০ লক্ষ আধিকারিক ও নিরাপত্তাকর্মী৷ শুধু তাই নয়, এই কর্মীরা পায়ে হেঁটে, বাসে-ট্রামে-ট্রেনে-নৌকায়, এমনকি হাতির পিঠে চড়েও ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে পৌঁছেছেন বলে জানাচ্ছে নির্বাচন কমিশন৷

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের খুঁটিনাটি

একজন ভোটারের জন্যও রয়েছে বুথ!

২০০৯ সালের নির্বাচনের সময় গুজরাটের গির অঞ্চলের জঙ্গলেও ছিল ভোটগ্রহণ কেন্দ্র৷ এই ভোটকেন্দ্রের আওতায় যদিও ছিলেন মাত্র একজন ভোটার৷ তবুও বুথ চালু রাখা হয় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে৷ (প্রতীকী ছবি)

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের খুঁটিনাটি

ভোটের পর...

২০১৯ সালের নির্বাচন মোট সাতটি পর্যায়ে সম্পন্ন হবে৷ এই প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লেগে যাবে একমাসেরও বেশি৷ ২০১৯ সালের নির্বাচন হবে ১১ এপ্রিল থেকে ১৯ মে পর্যন্ত৷ আগে যদিও ব্যালট পেপারে ভোট হবার ফলে ফলপ্রকাশ হতে কয়েকদিন লেগে যেত, আজকাল ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম আসার ফলে ফলাফল বেরোতে সময় লাগে মাত্র একদিন৷

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের খুঁটিনাটি

কত খরচ?

ভারতের মতো বিশালাকারের দেশের নির্বাচন যে খরচসাপেক্ষ হবে, তা বলাই বাহুল্য৷ নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত তথ্য বলছে, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে খরচ হয় প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার সমান অর্থ, ভারতীয় মুদ্রায় যা দাঁড়ায় ৩,৮৭০ কোটি রুপির কাছাকাছি৷

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের খুঁটিনাটি

কতগুলি ইভিএম?

২০১৪ সালের নির্বাচনে আনুমানিক ১৮ লক্ষ ইভিএম ব্যবহৃত হয়েছিল৷ ইভিএম আসায় নির্বাচনের কাজ দ্রুত শেষ করা গেলেও অনেক রাজনৈতিক দল মনে করে যে এখানেও কারচুপি সম্ভব৷ বিভিন্ন মহল থেকে ব্যালট পেপার ফিরিয়ে আনার দাবি থাকলেও আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে তা হবার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ৷

নির্বাচনি প্রচার সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী উদয়ন বন্দোপাধ্যায় ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘কংগ্রেসের বাড়তি কোনো ইস্যু নেই৷ যেসব ইস্যুকে ভিত্তি করে দাঁড়িয়েছিল, যেমন, কৃষক আন্দোলন, বেরোজগারি, মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে আর এগিয়ে যেতে পারছে না কংগ্রেস৷ জঙ্গি বিরোধী জাতীয়তাবাদ এমন একটা জায়গায় রয়েছে, যেটাকে নাড়ানোর সাধ্য নেই কংগ্রেসের৷ অতি সম্প্রতি পাঁচটি রাজ্য বিধানসভার ভোট হয়ে গেল৷ কংগ্রেস রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে ক্ষমতা দখল করেছে ঠিকই, কিন্তু পুলওয়ামার ঘটনার পরে পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পরে ঐ তিনটি রাজ্যের সংসদীয় ভোটে বিজেপি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে৷''

ভোটের সময়সূচিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার খুশি নয় কেন? রমজান মাসে ভোটপর্ব চলবে তাতেও আপত্তি কেন? উত্তরে অধ্যাপক বন্দোপাধ্যায় বললেন, ‘‘সাত দফা ভোট হচ্ছে৷ প্রচুর কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকবে৷ ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর একটা মানসিক চাপ থাকবে৷ দ্বিতীয়ত, তৃণমূলের মধ্যে একটা ডামাডোল তৈরি হয়েছে৷ এ বেরিয়ে যাচ্ছে, ও বেরিয়ে যাচ্ছে৷ জনসমর্থনও পড়তির দিকে৷ ফলে সেটা তৃণমূলের চিন্তার কারণ৷ আর রমজান মাসে ভোটের আপত্তি ধোপে টেকে না একেবারেই৷ রমজান মাসে এর আগেও বহুবার হয়েছে৷ মুসলিম ভোট ব্যাংকের দিকে তাকিয়েই এসব কথা বলছে তৃণমূল৷ রমজান মাসে মুসলিমরা কি কাজ করেন না? সব কাজই করেন৷ বাড়িতে বসে থাকেন না৷ এটা মুসলিমদের একটা বাত্সরিক রীতি, যা তাঁরা পালন করেন৷ কাজেই ভোট দিতে অসুবিধা হবে কেন?''

এক জনমত সমীক্ষায় দেখা গেছে, পাকিস্তানে ঢুকে ভারতের বিমান অভিযানে জঙ্গি ঘাঁটিগুলি গুড়িয়ে দিয়ে মোদী যে পরাক্রম দেখিয়েছেন, তাতে তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েছে৷ ৫১ হাজার ভোটারের মতামত যাচাই করে দেখা গেছে, মোট ৫৪৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি একা পেতে পারে ২২০টি আসন এবং বিজেপি জোট পেতে পারে ২৬৪টি আসন৷ পাশাপাশি কংগ্রেসের ইউপিএ জোট পেতে পারে কমবেশি ১৪১টি আসন৷ কাজেই সরকার গঠনে আঞ্চলিক দলগুলির গুরুত্ব বাড়বে সন্দেহ নেই৷

আমাদের অনুসরণ করুন