ভারতে বছরে প্রায় ১৩ লাখ শিশু হারিয়ে যায়

প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমের পাতায় বা টিভির পর্দায় থাকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বাচ্চাদের খবর৷ পরনে ফুল ফুল ফ্রক, মাথায় বিনুনি, রং ফর্সা, বয়স ৯ বছর৷ অথবা বয়স ১০, পরনে হাফ-প্যান্ট, পায়ে চটি, গায়ের রং কালো, নিখোঁজ গত জুলাই মাস থেকে...

ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই যে প্রতি বছর গড়ে ১৩ লাখের মতো ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে হারিয়ে যায়, শেষ পর্যন্ত তাদের গতি কী হয়, কোথায় যায় তারা, এর পেছনে কারা আছে? এ সব বোঝা হয়ত কঠিন নয়৷

এর পেছনে সক্রিয় আছে বিশাল এক চক্র, যার ডালপালা ছড়িয়ে আছে দেশের গ্রামে-গঞ্জে, উপজাতি বা জনজাতি অঞ্চলে৷ এদের কাজে লাগানো হয় সংগঠিত অপরাধমূলক কার্যকলাপে, বেগার শ্রমিক হিসেবে, মাদক পাচার চক্রে এবং যৌন শোষণে বা সোজা কথায় দেহ ব্যবসায়৷

এর জন্য আমি দায়ী করবো দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে৷ দায়ী করবো লিঙ্গ-ভিত্তিক অবিচারকে৷

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, সম্প্রতি এত শিশু হারানোর বিহিত করতে সুপ্রিম কোর্টে আর্জি জানানো হলে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির কাছে জবাবদিহি করার নোটিস জারি করে শীর্ষ আদালত৷

ভারতের নিখোঁজ শিশুরা

ভাগ্যের লিখন

ভারতে ‘শিশু বাঁচাও আন্দোলন’ সংগঠনের একটি সমীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে যে, ভারতে প্রতি ঘণ্টায় ১১ জন শিশু নিখোঁজ হয়ে থাকে৷ এদের মধ্যে কমপক্ষে চারজনকে আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায় না৷

ভারতের নিখোঁজ শিশুরা

বন্দিদশা

দিল্লির একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ১৬ বছর বয়সি মেয়ে পিংকিকে খুঁজে পাওয়া গেছে অপরিচিত একটি বাড়িতে৷ সেখানে ওকে জোর করে ঘরের কাজ করানো হচ্ছে এবং বলা বাহুল্য, কোনো বেতন ছাড়াই৷

ভারতের নিখোঁজ শিশুরা

দেশব্যাপী অনুসন্ধান

ছবিটিতে এক বাবার হাতে তাঁর হারিয়ে যাওয়া ছেলের ছবি আর তাঁর অন্য হাতে একটি বাক্স৷ সে বাক্সে রয়েছে মানুষের সাহায্য করা অর্থ, যে অর্থ দিয়ে এই বাবা তাঁর ছেলেকে খুঁজে বের করতে সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাবেন বলে ঠিক করেছেন৷

ভারতের নিখোঁজ শিশুরা

পালিয়ে যায়

যেসব শিশুরা বাড়ি থেকে নিজের ইচ্ছায় চলে যায় বা পালিয়ে যায়, ওরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরবর্তীতে কাজের ছেলে-মেয়ে হিসেবে বা এ ধরণেরই কোনো কাজ করে থাকে৷ যেমন চায়ের দোকান, পেট্রোল পাম্প বা কার্পেট তৈরি কারখানায়৷ ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লির একটি পেট্রোল পাম্প থেকে এমনই কিছু শিশুকে উদ্ধার করেছে পুলিশ৷

ভারতের নিখোঁজ শিশুরা

ধৈর্য ধরে থাকা

ছেলেটির হাতে ছয় বছর আগে ওর হারিয়ে যাওয়া বোনদের ছবি৷ ওদের খুঁজে পাবে এই আশায় এখনো বুক বেধে আছে ছেলেটির পুরো পরিবার৷ নিখোঁজ বোনদের ফিরে পাওয়ার জন্য পরিবার থেকে মাঝে মাঝেই বোনদের ছবি এবং নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তিসহ প্রচারপত্র বিলি করা হয়৷

ভারতের নিখোঁজ শিশুরা

দীর্ঘ প্রতিক্ষা

নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এই শিশুটিকে খুঁজে পাওয়া গেছে অবশেষে৷ শিশুটি ওর বাবা-মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য ঠিক এ জায়গাতেই অপেক্ষা করছে গত প্রায় এক বছর যাবত৷ কবে শেষ হবে এই অপেক্ষার পালা?

ভারতের নিখোঁজ শিশুরা

খুশির দিন ফিরে এসেছে

নিখোঁজ হয়ে যাওয়া অর্জুন আবারো মায়ের কোলে ফিরে এসে অত্যন্ত আনন্দিত, ভীষণ খুশি৷ অর্জুন ওর মাকে তার কষ্টের কথা জানিয়েছে৷ বলেছে, গত দু’বছর ওকে বেধে রাখা হয়েছিল এবং কাজ করতে বাধ্যও করা হয়েছিল৷ তবে ওর মা কিন্তু অর্জুনকে ফিরে পাবার আশা কখনো ছেড়ে দেয়নি৷

ভারতের নিখোঁজ শিশুরা

অতিরিক্ত সাবধানতা

এই মা তাঁর কয়েকজন শিশুর মধ্যে একজনকে হারিয়েছেন৷ তাঁর কথায়, ‘‘আর কখনো আমি আমার শিশুদের চোখের আড়াল হতে দেব না৷ উল্লেখ্য, ‘শিশু বাঁচাও আন্দোলন’ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে www.bba.org.in ঠিকানায়৷

রাজধানী দিল্লিতেই গত বছর বেমালুম নিখোঁজ হয়ে যায় ২১ হাজার বাচ্চা, এদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশের এখনো কোনো হদিশ পাওয়া যায়নি৷

২০০৭ সালে দিল্লির লাগোয়া উত্তর প্রদেশের নিঠারি এলাকার একটি নির্জন বাড়িতে ঘরের কাজের জন্য পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম থেকে টাকার লোভ দেখিয়ে নাবালিকা মেয়েদের পাচার করে এনে আটকে রাখা হয়৷ তারপর তাঁদের ওপর ঐ বাড়িরই এক বিকৃত কামাতুর ব্যক্তি দিনের পর দিন ঐ সব মেয়েদের ধর্ষণের পর হত্যা করে দেহটাকে টুকরো টুকরো করে কেটে বাড়ির সামনের বড় ড্রেনে ফেলে দেয়৷ শেষ পর্যন্ত সেটা জানাজানি হলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে হৈচৈ শুরু করলে পুলিশ ঐ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে এবং দীর্ঘদিন মামলা চলার পর ঐ ব্যক্তির ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্ট৷ শিশু পাচার রোধে স্থানীয় প্রশাসনের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তোলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন৷ এই নারকীয় ঘটনার পর দাবি ওঠে জাতীয় ভিত্তিতে নিখোঁজ বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের ‘ডেটাবেস' বা ডিএনএ ‘ডেটাব্যাংক' তৈরি করার৷ এটা হলে অন্তত ৪০ শতাংশ নিখোঁজ বাচ্চার হদিশ পাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করা হয়৷ কিন্তু তা আজও হয়নি৷ কেন হয়নি তার কারণ আমি জানতে পারিনি৷

কিন্তু কথা হচ্ছে, প্রতি বছর এত সংখ্যক ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে হারিয়ে যাচ্ছে, অথচ পুলিশ প্রশাসন কেন কিছু করতে পারছে না৷ আমার মতে, বড় বড় রেল স্টেশন, আন্তরাজ্য বাস টার্মিনাসে পাচার করা বাচ্চাদের হস্তান্তর করা হয়৷ পুলিশের নজরদারি কড়া হলে কি তা করতে পারে? তাহলে কি বুঝবো পাচারচক্রের সঙ্গে পুলিশ ও প্রশাসনের গোপন আতাঁত আছে?

ডয়চে ভেলের নতুন দিল্লি প্রতিনিধি অনিল চট্টোপাধ্যায়

তবে একথাও অস্বীকার করা যায় না যে, এর মূল কারণ দূর করতে গেলে দরকার এক ব্যাপক সক্রিয়তা একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে৷ এর মূল কারণ বলতে আমি বুঝি, শিক্ষার সুযোগ সুবিধার অভাব, শিক্ষার পরিবেশের অভাব এবং দারিদ্র৷ পরিস্থিতিটা উপজাতি এলাকায় আরো বেশি৷ যেমন মধ্যপ্রদেশ৷ ঐ রাজ্যে জনজাতি অঞ্চলে ছেলে ও মেয়ের অনুপাত ভালো৷ সেজন্য মধ্যপ্রদেশে নাবালিকাদের শৈশব নিলাম হয়ে যায় সহজেই৷ তারপর গরু ছাগলের মতো পাচার হয়ে যায় দেশে এমনকি বিদেশেও৷ তবে মনে করলে ভুল হবে যে মধ্যপ্রদেশ থেকে শিশু স্রেফ রপ্তানি হয় না, রাজ্যে আমদানিও হয়৷ এক কথায় আন্তরাজ্য পাচার চক্রের মাধ্যমে৷ রাজ্য সরকার চেষ্টা করেও তা পুরোপুরি রোধ করতে পারছে না৷ তবে হ্যাঁ, সম্প্রতি গণিকালয় থেকে উদ্ধার করে এনেছে ৫৭টি নাবালিকাকে৷ আসলে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার এ বিষয়ে আন্তরিক নয়৷ একটা দায় সারা ব্যবস্থা নিয়ে দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলতে চান৷ সেক্ষেত্রে এর শেষ হাতিয়ারটা সম্ভবত নাগরিক সমাজের সচেতনতা৷

আমাদের অনুসরণ করুন