ভারতে সাংবাদিক খুন, বইছে প্রতিবাদের ঝড়

মুক্তচিন্তার সাংবাদিক ছিলেন গৌরী৷ উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন৷ বেঙ্গালুরুতে নিজের বাসভবনের সামনে তাঁর বুকে পর পর তিনটি গুলি বিঁধে দেয় আততায়ীরা৷ সারা দেশে নিন্দার ঝড় বইছে৷ গৌরীর খুনিরা শাস্তি পাবে?‌

বিজেপি ও সংঘ পরিবারের আদর্শের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই নেমে আসছে আক্রমণ৷ এমনকি হত্যাও করা হচ্ছে৷ বেঙ্গালুরুর রাজারাজেশ্বরী নগরে নিজের বাসভবনে খুন হয়েছেন ‘‌লঙ্কেশ প্রত্রিকা’-র সম্পাদক গৌরী লঙ্কেশ৷ মোটর বাইকে করে তিনজন দুষ্কৃতি সামনে থেকে গুলি করে পালায়৷ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই মৃত্যু হয় তাঁর৷ বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

সাপ্তাহিক ট্যাবলয়েডে সংঘ পরিবারের কট্টর সমালোচনা করতেন তিনি৷ ভয়, ডর উপেক্ষা করে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে বারবার কলম ধরেছেন৷ গৌরী হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়েছে বেঙ্গালুরুসহ গোটা দেশে৷ গৌরীর ছবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন বহু মানুষ৷ গোটা দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে৷ বিভিন্ন শহরে সাংবাদিকরা প্রতিবাদ সভার ডাক দিয়েছেন৷

তিনি ছিলেন বিখ্যাত কবি ও সাংবাদিক পি লঙ্কেশের কন্যা৷ পি লঙ্কেশের সম্পাদনাতেই শুরু হয়েছিল সাপ্তাহিক ট্যাবলয়েড লঙ্কেশ৷ পরে সম্পাদক হন গৌরী৷ তার জেরেই এই হত্যাকাণ্ড বলে প্রাথমিক অনুমান৷ ঠিক যে কায়দায় অধ্যাপক কালবুর্গিকে হত্যা করা হয়েছিল, সেই আদলেই খুন হন গৌরী৷ দাভোলকর, পানসারে হত্যার মতোই আরও একটা হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী থাকল দেশ৷ এ নিয়েই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর৷ রাহুল গান্ধী সরাসরি কাঠগড়ায় তুলেছেন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে৷ ‘‌‘‌হিন্দুত্ব রাজনীতিতে দক্ষ প্রধানমন্ত্রী৷ তিনি মুখে যা বলেন, আর কাজে যা করেন, তার মধ্যে বিস্তর ফারাক৷’’

গৌরী লঙ্কেশ হত্যার পর এভাবেই চাঁচাছোলা ভাষায় আক্রমণ শাণিয়েছেন কংগ্রেস সহসভাপতি রাহুল গান্ধী৷ পুরো ঘটনার নিন্দা করে গৌরীর খুনীদের বিরুদ্ধে কড়া শাস্তির দাবি জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি৷

কারা এই খুনের সঙ্গে জড়িত, সে সম্পর্কে এক্ষুনি কিছু বলতে পারছেন না বেঙ্গালুরুর ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ৷ ‌সংবাদ বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘দ্য হুট’-এর একটি প্রতিবেদন (মে, ২০১৭) অনুযায়ী, ১৬ মাসে ভারতে ৭ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন৷ ২৫টি হুমকির ঘটনা পুলিশের খাতায় নথিভুক্ত হয়েছে৷ এই সময়কালে সাংবাদিক নির্যাতনের ৫৪টি ঘটনা ঘটেছে৷ যদিও বাস্তবে এর চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে৷ ২০১৬ সালে ৬ জন সাংবাদিক খুনের ঘটনায় পুলিশ মাত্র তিনটি ক্ষেত্রে পেশার জন্য খুন বলে রিপোর্ট দিয়েছে৷ ২০১৬ সালে আরও ১৭টি হুমকি এবং ২০১৭ সালের প্রথম তিন-চার মাসের মধ্যে আরও দু’টি হুমকি আসে সাংবাদিকের ওপর৷ সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, সবচেয়ে বেশি হুমকি আসে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের ওপর৷

এর আগে ২০০৮ সালে তাঁর সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের জেরে দুই বিজেপি নেতা গৌরী লঙ্কেশের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছিলেন৷ সেই মামলায় গত বছর নভেম্বরে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিল আদালত৷ সেই সঙ্গে ১০ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা৷ তবে মঙ্গলবার রাতের পর এখনও অধরা প্রখ্যাত সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের আততায়ীরা৷ কর্ণাটকসহ ভারতের একাধিক রাজ্যে আততায়ীদের খোঁজে নজরদারি বাড়িয়েছে পুলিশ৷ গোটা বেঙ্গালুরুতে চলছে পুলিশের কড়া প্রহরা৷ হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে শহরে৷

দিল্লিতে কর্মরত প্রবীন সাংবাদিক শুভেন্দু রায়চৌধুরি বলছেন, ‘‌‘‌দাভোলকর, কালবুর্গির পর এবার গৌরী লঙ্কেশ৷ ভারতে কট্টরবাদীদের হাতে উদারমনা, যুক্তিবাদী বুদ্ধিজীবীদের মৃত্যুমিছিল অব্যহত৷ শুধু লেখক, সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবী সমাজই নয়, দেশের প্রতিটি মানুষকে একযোগে রুখে দাঁড়িয়ে এই হত্যার রাজনীতি বন্ধ করতে হবে৷’’

অডিও শুনুন 01:23
এখন লাইভ
01:23 মিনিট
বিষয় | 06.09.2017

‘ভারতে কট্টরবাদীদের হাতে উদারমনা, যুক্তিবাদী বুদ্ধিজীবীদের মৃ...

গত কয়েক বছরে ভারতে সাংবাদিক হত্যা

অখিলেশ প্রতাপ সিং: ‘তাজা টিভি’র রিপোর্টার অখিলেশ খুন হন ঝাড়খণ্ডের চাতরায়৷ রাজদেব রঞ্জন খুনের ঠিক আগের দিন, অর্থাত্‍‌ ১৩ মে৷ তাঁকেও গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা৷

সন্দীপ কোঠারি: ২০১৫-র জুনে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর সন্দীপ কোঠারি৷ গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল৷ পরে মহারাষ্ট্রের ওয়ার্দা জেলা থেকে কোঠারির দগ্ধ দেহ খুঁজে পাওয়া যায়৷ জব্বলপুরের একটি হিন্দি দৈনিকে কর্মরত ছিলেন৷

রাজদেব রঞ্জন: হিন্দি পত্রিকা ‘হিন্দুস্তান’-এর চিফ অফ ব্যুরো ছিলেন রাজদেব রঞ্জন৷ ২০১৬-র ১৪ মে সন্ধ্যায় বিহারের সিওয়ান রেলস্টেশনের কাছে দুর্বৃত্তরা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে৷

যোগেন্দ্র সিং: উত্তর প্রদেশের এই সাংবাদিকের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল পুলিশ৷ ঘটনার এক সপ্তাহ পরে হাসপাতালে মারা যান যোগেন্দ্র৷ ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৫ সালের জুনের গোড়ায়৷

হেমন্ত যাদব: ২০১৫-র অক্টোবরে খুন হন বছর ৪৫-এর টেলিভিশন সাংবাদিক হেমন্ত যাদব৷ উত্তর প্রদেশের ধীনাতে তাঁকে খুন করা হয়৷ বছর ৪৫ হেমন্তকে লক্ষ করে সোজাসুজি গুলি চালিয়ে মোটর বাইক নিয়ে চম্পট দেয় দুষ্কৃতিরা৷ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন ওই সাংবাদিক৷

শাম্মী হক, অ্যাক্টিভিস্ট, বাংলাদেশ

‘‘বাংলাদেশের মানুষ তাদের মনের কথা বলতে পারেন না৷ সেখানে কোনো বাকস্বাধীনতা নেই এবং প্রতিদিন পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাচ্ছে৷ একজন সামাজিক অ্যাক্টিভিস্ট এবং ব্লগার হিসেবে আমি ধর্ম নিয়ে লেখালেখি করি, যা ইসলামিস্টরা পছন্দ করেনা৷ তারা ইতোমধ্যে ছয় ব্লগারকে হত্যা করেছে৷ ফলে আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হই৷’’

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ভেনেজুয়েলা

‘‘বাকস্বাধীনতা হচ্ছে এমন এক ধারণা যার অস্তিত্ব আমার দেশে নেই৷ সাংবাদিকরা জরিমানা আর নিজের জীবনের উপর ঝুঁকি এড়াতে সরকারের সমালোচনা করতে চায়না৷ সরকারের সমালোচনা করলে সাংবাদিকদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়৷ এরকম পরিস্থিতির কারণে অনেক সাংবাদিক দেশ ছেড়ে চলে গেছেন৷ দেশটির আশি শতাংশ গণমাধ্যমের মালিক সরকার, তাই সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া৷’’

রোমান দবরোখটভ এবং একাতেরিনা কুজনেটসোভা, সাংবাদিক, রাশিয়া

রোমান: ‘‘রাশিয়ায় সরকার আপনাকে সেন্সর করবে৷ আমাদের ওয়েবসাইটটি ছোট এবং লাটভিয়ায় নিবন্ধিত৷ ফলে আমি সেন্সরশিপ এড়াতে পারছি৷ তা সত্ত্বেও সরকার মাঝে মাঝে আমাদের সার্ভারে হামলা চালায়৷’’ একাতেরিনা: ‘‘রাশিয়ায় বাকস্বাধীনতার কোনো অস্তিত্ব নেই৷ ইউরোপের মানুষ রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে স্বাধীন৷ আমি আশা করছি, রাশিয়ার পরিস্থিতিও বদলে যাবে৷’’

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, সিরিয়া

‘‘বেশ কয়েক বছর ধরেই সিরিয়ায় বাকস্বাধীনতার কোনো অস্তিত্ব নেই৷ এমনকি আসাদের শাসনামল সম্পর্কে অনুমতি ছাড়া মতামতও প্রকাশ করা যায়না৷ এটা নিষিদ্ধ৷ কেউ যদি সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তাহলে খুন হতে পারে৷ আমি যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনামূলক কিছু লিখি, তাহলে বেশিদিন বাঁচতে পারবো না৷’’

আয়েশা হাসান, সাংবাদিক, পাকিস্তান

‘‘পাকিস্তানে ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা’ শব্দ দু’টি খুবই বিপজ্জনক৷ এগুলোর ব্যবহার আপনার ক্যারিয়ার বা জীবন শেষ করে দিতে পারে৷’’

রাবা বেন দউখান, রেডিও সাংবাদিক, টিউনিশিয়া

‘‘আমাদের অভ্যুত্থানের একমাত্র ফল হচ্ছে বাকস্বাধীনতা৷ আমরা এখন আমাদের সরকারের সমালোচনা করার ব্যাপারে স্বাধীন৷ এবং আমি যখন আমাদের অঞ্চলের অন্য দেশের বাসিন্দাদের বাকস্বাধীনতার কথা জিজ্ঞাসা করি, তখন একটা বড় ব্যবধান দেখতে পাই৷ আমাদের দেশে দুর্নীতিসহ নানা সমস্যা আছে সত্যি, তবে বাকস্বাধীনতা কোনো সমস্যা নয়৷’’

খুসাল আসেফি, রেডিও ম্যানেজার, আফগানিস্তান

‘‘বাকস্বাধীনতা আফগানিস্তানে একটি ‘সফট গান৷’ এটা হচ্ছে মানুষের মতামত, যা সম্পর্কে সরকার ভীত৷ এটা চ্যালেঞ্জিং হলেও আমাদের প্রতিবেশীদের তুলনায় আমাদের অবস্থা ভালো৷’’

সেলিম সেলিম, সাংবাদিক, ফিলিস্তিন

‘‘ফিলিস্তিনে সাংবাদিকদের খুব বেশি স্বাধীনতা নেই৷ একটা বড় সমস্যা হচ্ছে, সাংবাদিকরা মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করতে পারে না৷ ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করছে৷ তারা যদি ফেসবুকে তাদের মতামত জানায়, তাহলেও সরকার গ্রেপ্তার করে৷ তবে সিরিয়া বা ইরাকের চেয়ে অবস্থা ভালো৷’’

অনন্য আজাদ, লেখক, বাংলাদেশ

‘‘আমাদের দেশে কোনো বাকস্বাধীনতা নেই৷ আপনি ইসলাম বা সরকারের সমালোচনা করে কিছু বলতে পারবেন না৷ ইসলামী মৌলবাদীরা ঘোষণা দিয়েছে, কেউ যদি ইসলামের সমালোচনা করে, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে৷ আমি একজন সাংবাদিক এবং গত বছর আমাকে ইসলামিস্ট জঙ্গিরা হত্যার হুমকি দিয়েছে৷ ফলে আমাকে দেশ থেকে পালাতে হয়েছে৷’’