ভূমধ্যসাগরে ট্র্যাজেডি রোখা সম্ভব

ইউরোপে ক্রমেই আরো বেশি উদ্বাস্তু আসছে, বলে ব্রাসেলসে উদ্বেগ, কিন্তু তা আন্তরিক নয়৷ আসলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশরা চোখ বুঝে রয়েছে; তারা উদ্বাস্তুদের নিতে চায় না – বলে মনে করেন বারবারা ভেজেল৷

ইউরোপে বসন্ত এসেছে, সেই সঙ্গে উদ্বাস্তুদের আগমনও শুরু হয়েছে৷ এ বছরের বসন্তে ভূমধ্যসাগর থেকে যে ধরনের ছবি ও বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে, গত বছরের বসন্তেও ঠিক তাই ছিল৷ শুধু সংখ্যাটাই ক্রমাগত বেড়ে চলেছে৷

২০১৪ সালে মোট দু'লাখ ত্রিশ হাজার শরণার্থী সাগর পেরিয়ে ইউরোপে পৌঁছন; সে তুলনায় এ বছর উদ্বাস্তুদের সংখ্যা বেড়েছে ৬০ শতাংশ৷ আর কতো মানুষ যে সাগরের জলে ডুবে প্রাণ হারাচ্ছেন, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই – লিবিয়ার উপকূলে যেমন ঘটল৷

ইইউ হাত কচলাচ্ছে

ব্রাসেলসের প্রতিক্রিয়াও একই রয়ে গেছে৷ দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিরা তাদের দুঃখ ও শোক প্রকাশ করেছেন এবং মানুষ পাচারকারীদের অশুভ কার্যকলাপের কথা বলেছেন৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বাস্তু কমিশনার দিমিত্রিস আভ্রামোপুলোস বলেছেন, উদ্বাস্তুদের বিপুল সংখ্যায় আসাটাই এবার স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে, কাজেই ইউরোপের তার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত৷

আভ্রামোপুলোস নাকি আগামী মাসে একটি নতুন উদ্বাস্তু নীতি পেশ করবেন – তবে তাতে যে কুলোবে না, তা এখনই বলা চলে৷ এছাড়া ইইউ-এর যাবতীয় সদস্য দেশের তা অনুমোদন করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যাবে – তাও শেষমেষ সেই নীতিকে অনেক জোলো করে৷ কেননা অভিবাসন ও উদ্বাস্তু সংক্রান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ব্রাসেলসে নয়, সদস্য দেশগুলির হাতে৷ এবং সেখান থেকে কোনো উচ্চবাচ্য শোনা যাচ্ছে না৷

জার্মানিতে বাড়ি সমস্যায় অভিবাসীরা

অভিবাসী তুর্কিদের সমস্যা বেশি

জার্মানিতে অভিবাসীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়৷ এগুলোর মধ্যে বাড়ির সমস্যাকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে ধরা যেতে পারে৷ জার্মানিতে অভিবাসীদের মধ্যে তুর্কিদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি প্রায় ৪০ লাখ৷ কাজেই সমস্যাটাও ওদের ক্ষেত্রেই বেশি দেখা যায়৷

জার্মানিতে বাড়ি সমস্যায় অভিবাসীরা

শীতকালে ঠান্ডায় কষ্ট পায়

তুর্কিদের সাধারণত বাসা ভাড়া দেওয়া হয় পুরনো এলাকায় বহু বছরের পুরনো বাড়িগুলোয়৷ সেই সব বাড়িতে হয়ত দরজা ঠিকমতো বন্ধ হয় না বা জানালা দিয়ে বাতাস ঢোকে বা খানিকটা খোলা থাকে৷ অথবা শীতকালে হিটার কাজ করে না, অর্থাৎ ঠান্ডায় কাটাতে হয়৷ বাড়ির মালিককে কয়েকবার বলেও ঠিক করানো যায়নি৷ এভাবেই জানান তিন দশক আগে তুরস্ক থেকে জার্মানিতে আসা আহমেদ খালিফি৷

জার্মানিতে বাড়ি সমস্যায় অভিবাসীরা

বাড়ির অবস্থা অস্বাস্থ্যকর

আহমেদ খালিফির ছেলে আদেলের বাড়িতেও প্রায় একই সমস্যা৷ বাড়িটি ৪০ বছরের পুরনো হওয়ায় খুবই স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার এবং অস্বাস্থ্যকর৷ এ ব্যাপারে অবশ্য বাড়িওয়ালার মাথা ব্যথা নেই, কয়েকবার বলেও কোনো কাজ হয়নি৷

জার্মানিতে বাড়ি সমস্যায় অভিবাসীরা

অবশেষে নিজেই দায়িত্ব নেন

আবদাল ১৫ বছর এ বাড়িতে আছেন, কিন্তু একবারও রঙ করা হয়নি৷ আর সেকথা বাড়ির মালিককে কয়েকবার বলায় তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, প্রয়োজনে তিনি যেন নিজেই এ কাজ করে নেন৷ তাই আবদাল এ কাজ ভালো না জানা সত্ত্বেও নিজেই করছেন৷

জার্মানিতে বাড়ি সমস্যায় অভিবাসীরা

শীতের কথা ভেবে ভীত

একটি মাত্র ঘর আর সেখানেই বাচ্চাদের নিয়ে থাকেন আলিয়া৷ ঘরে যেসব জিনিসের জায়গা হয় না, সেসব জিনিস স্থান পেয়েছে বাড়ির বারান্দায়৷ কিন্তু শীতের সময় এসব প্রয়োজনীয় জিনিসের কি হবে – তা ভেবে অস্থির আলিয়া৷ এই অবস্থা অবশ্য শুধু আলিয়ার একার নয়৷

জার্মানিতে বাড়ি সমস্যায় অভিবাসীরা

অভিবাসীদের বেশি সন্তান

অভিবাসীদের বাড়ির বড় সমস্যা৷ তার কারণ, তাঁরা বড় শহরগুলোর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করতে পছন্দ করেন৷ তাছাড়া জার্মানদের তুলনায় অভিবাসীরা কম রোজগার করেন এবং তাঁদের সন্তান সংখ্যা বেশি হওয়ায় বাড়ি পেতেও অসুবিধা হয়৷ এছাড়া একই ধরণের বাড়ির জন্য জার্মানদের তুলনায় তাঁদের কাছে বেশি ভাড়াও চাওয়া হয়৷

জার্মানিতে বাড়ি সমস্যায় অভিবাসীরা

বাড়ির অবস্থা করুণ

অভিবাসীদের বাসস্থান সমস্যা অবশ্য নতুন সমস্যা নয়৷ অভিবাসীরা যেসব এলাকায় থাকেন সেই পুরনো বাড়িগুলোকে ঠিকঠাক না করানোয়, দিনদিন সেগুলি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে৷ এই অবস্থা নিদিষ্ট কোনো শহরে নয়, প্রায় শহরেই এই একই অবস্থা৷

জার্মানিতে বাড়ি সমস্যায় অভিবাসীরা

আগুনে পরিবারের আট জনের মৃত্যু

প্রায় চার মাস আগে বাডেন-ভ্যুর্টেমব্যার্গের বাকনাং শহরে একটি বাড়ির বৈদ্যুতিক লাইন ছিল বিপজ্জনক এবং একথা বারবার মালিককে বলার পরও তা ঠিক করা হয়নি৷ যার ফল হয় মর্মান্তিক৷ ঘর গরম বা পানি গরমের জন্য ব্যবহার করা হতো কাঠের চুল্লি৷ ঐ বাড়িতেই আগুন লেগে একজন তুর্কি মা তাঁর সাত সন্তানসহ মারা যান৷ ছবিতে বাকনাং শহরের কিশোর-কিশোরীরা মৃত পরিবারের প্রতি ফুল আর মোমবাতি দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে৷

জার্মানিতে বাড়ি সমস্যায় অভিবাসীরা

বাড়ি মালিকদের মত

বাড়িওয়ালাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, তুর্কি পরিবারগুলো অনেক বড়, সবসময় হৈচৈ লেগে থাকে এবং তেমন পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন নয়৷ আর সেজন্যই তাঁদের বাড়ি ভাড়া দেওয়ার ব্যাপারে কিছুটা আপত্তি থাকে বাড়িওয়ালাদের৷

জার্মানিতে বাড়ি সমস্যায় অভিবাসীরা

তরুণদের ভিন্নমত

বয়স্ক অভিবাসীরা বাসস্থানের ব্যাপারে যতটা বৈষম্যের শিকার হন বলে মনে করেন, এই প্রজন্মের তুর্কিরা তেমনটা মনে করে না৷ সম্ভবত এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা জার্মান ভাষা ভালো জানার কারণেই এমনটা ঘটছে৷

শুধু বিপর্যয় ত্রাণ নয়

কিছু কিছু ত্রাণ সংগঠন এবং সেই সঙ্গে ইউরোপীয় সংসদের কিছু বিধায়ক দাবি করছেন যে, ভূমধ্যসাগরে উদ্বাস্তুদের ত্রাণের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থপুষ্ট প্রকল্পটি পুনরায় চালু করা হোক - যেমন ইটালির ‘‘মারে নোসত্রুম'' কর্মসূচি, যার খরচ ছিল মাসে ৯০ লাখ ইউরো৷

ব্রাসেলসের পক্ষে ‘‘মারে নোস্ট্রুম''-এর অর্থসংস্থান করা অসম্ভব ছিল না, যদি না তাতে ইংল্যান্ড ও জার্মানির মতো দেশের আপত্তি থাকতো৷ ইটালির ঐ ত্রাণ অভিযানের ফলে নাকি উদ্বাস্তুরা ইউরোপে আসার প্ররোচনা পায় এবং মানুষ পাচারকারীদেরও সুবিধা হয়৷ এমনকি জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেমেজিয়ের সে সময় ‘‘ভরতুকি'' দেওয়ার কথাও বলেছিলেন৷

ইটালি কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপেই ‘‘মারে নোস্ট্রুম'' বন্ধ করেছে৷ সরকার নাগরিকদের বোঝাতে পারেননি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে সাহায্য না পাওয়া সত্ত্বেও নৌবাহিনী ক্রমেই আরো বেশী শরণার্থীকে দেশে নিয়ে আসছে কেন৷

ওদিকে ‘‘মারে নোসত্রুম'' চলাকালীনই তিন হাজারের বেশি উদ্বাস্তু ইউরোপে আসার প্রচেষ্টায় প্রাণ হারান৷ ইইউ-এর পরবর্তী প্রকল্প ‘‘ট্রাইটন''-ও উদ্বাস্তুদের প্রাণ বাঁচানোর কাজ করে চলেছে৷ ইটালির নৌবাহিনী আগের মতোই লিবিয়ার উপকূলে টহল দিচ্ছে – বিগত কয়েকদিনে যেমনটা দেখা গেছে৷ অপরদিকে এও বলতে হয়, আরো বেশি মানুষকে সাগর থেকে উদ্ধার করার চেয়ে লিবিয়া থেকে ইউরোপ অভিমুখে ফেরি চলাচলের ব্যবস্থা করলেই তো হয়: সেই পন্থায় অন্তত মানুষ পাচারকারীদের মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা বন্ধ করা যাবে এবং উদ্বাস্তুদের আরো বেশি নিরাপত্তা দেওয়া যাবে৷

উদ্বাস্তু নিয়ে ইউরোপীয় বিতর্ক ফাঁকি

ইউরোপীয় উদ্বাস্তু সমস্যার মুশকিল এই যে, সকলেরই পেটে এক, মুখে এক৷ সিরিয়া, ইরিট্রিয়া, মালি, নাইজেরিয়া, ইয়েমেনের মানুষরা গৃহযুদ্ধ, হত্যা, নিপীড়নের হাত থেকে পালাচ্ছেন – অন্যদিকে ইউরোপের দেশগুলি তাদের নিতে রাজি নয়৷ সে ক্ষেত্রে জার্মানিকে আদর্শ বলা চলতে পারে৷

ইউরোপে বসন্ত এসেছে, সেই সঙ্গে উদ্বাস্তুদের আগমনও শুরু হয়েছে

জার্মানি নীরবে আরো বেশি উদ্বাস্তু নেওয়া শুরু করেছে এবং এ দিক থেকে আজ ইউরোপীয় দেশগুলির শীর্ষে – যদিও এখানেও উগ্র দক্ষিণপন্থি গোষ্ঠীগুলি জনসাধারণকে উদ্বাস্তুদের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করছে৷ প্যারিস কিংবা লন্ডনের সরকারবর্গ তো স্বদেশে দক্ষিণপন্থিদের পালে হাওয়া দেখে আপাতত মুখ খুলতেই নারাজ৷ ওদিকে ইটালি এবং গ্রিসের মতো যে সব দেশে উদ্বাস্তুরা সর্বাগ্রে পদার্পণ করে, তারাও তাদের স্বভাবসিদ্ধ পন্থায় প্রতি মাসে হাজার হাজার উদ্বাস্তুকে উত্তরমুখে পাঠিয়ে যাচ্ছে৷

ইউরোপে উদ্বাস্তু শিবির?

বাস্তব হল, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এ সমস্যার কোনো সমাধান নেই৷ উত্তর আফ্রিকার যে সব দেশ হয়ে আজ উদ্বাস্তুরা আসে, তাদের বিশেষ সাহায্য দিয়েও কোনো লাভ নেই, কেননা লিবিয়ার মতো বস্তুত অরাজক ‘‘ব্যর্থ রাষ্ট্র'' থেকে উদ্বাস্তুদের আগমন রোখা একমাত্র সামুদ্রিক অবরোধের মাধ্যমে সম্ভব৷

সেক্ষেত্রেও উদ্বাস্তুরা আসবে মিশর কিংবা টিউনিশিয়া হয়ে৷ স্বয়ং তুর্কি সরকার এ ব্যাপারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সহযোগিতা করতে রাজি নন৷ কাজেই উদ্বাস্তুদের স্রোত আটকানো সম্ভব না হলে এবং ইইউ দেশগুলি তাদের নিতে রাজি না থাকলে হয়তো শেষমেষ দক্ষিণ ইউরোপে উদ্বাস্তু শিবির সৃষ্টিই একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়াতে পারে৷

আমাদের অনুসরণ করুন