ভূমধ্যসাগরে শতাধিক শরণার্থীর মৃত্যুর আশঙ্কা

লিবিয়া ও মরক্কো থেকে ছেড়ে আসা দুটি নৌকা ডুবে যাওয়ার ঘটনায় অন্তত ১৭০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে৷ ইটালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাতারেল্লা এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন৷

ইটালিয়ান নৌবাহিনী শুক্রবারে ডুবে যাওয়া একটি নৌকায় থাকা তিন জনকে উদ্ধার করতে পেরেছে৷ উদ্ধার হওয়াদের কাছ থেকে জানা গেছে, নৌকাটিতে ১২০ জন যাত্রী ছিলেন৷ বিশিরভাগ যাত্রীই পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অধিবাসী ছিলেন বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)৷

ইন ফোকাস
সমাজ | 16.04.2019

লিবিয়ার গাসর গারাবুল্লি থেকে বৃহস্পতিবার ছেড়ে আসে নৌকাটি৷ ১০-১২ ঘণ্টা চলার পর ডুবতে শুরু করে নৌকা৷ আইওএমের মুখপাত্র ফ্লাভিও ডি জিয়াচ্চিনো জানিয়েছেন, নৌকায় ১০ জন নারী ও দুই শিশুও ছিল৷

উদ্ধার হওয়া তিনজনকে ইটালির দ্বীপ লাম্পেদুসায় হাইপোথার্মিয়ার চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে৷ দেশটির নৌবাহিনী জানিয়েছে, এই তিন জনকে উদ্ধারের সময় তারা সাগরে তিনটি মরদেহ ভাসতে দেখেছে

ব্যর্থ অভিযান

ইটালিয়ান নৌবাহিনীর একটি টহলবিমান শুক্রবার নৌকাটিকে ডুবতে দেখে৷ দেশটির রাইনিউজ টোয়েন্টিফোরকে রিয়ার অ্যাডমিরাল ফাবিও আগোস্টিনি জানিয়েছেন, জ্বালানি একেবারে শেষের দিকে থাকায় বিমানটি উদ্ধার তৎপরতা না চালিয়ে ফেরত আসতে বাধ্য হয়৷

লিবিয়াও উদ্ধারকাজে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ পাঠিয়েছিল৷ কিন্তু কাউকে খুঁজে না পেয়ে সেটি ফেরত যায়৷

জার্মান সহায়তা সংস্থা সি ওয়াচ শনিবার ৪৭ শরণার্থীকে উদ্ধারের কথা জানিয়েছে৷ কিন্তু তাঁরা ডুবে যাওয়া নৌকাটিতেই ছিলেন কিনা, তা না জানার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

গৃহহীন যারা

সহিংসতা, যুদ্ধ ও সংঘাতের ফলে বিশ্বে এখন ৬৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন, অর্থাৎ ৬ কোটি ৮৫ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় আছেন৷ মঙ্গলবার জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক সংস্থা ইইএনএইচসিআর এ কথা জানিয়েছে৷ জাতিসংঘের হিসেব মতে, ২০১৬ সালে সারা বিশ্বে ৬ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছিল৷ সেবছর মূলত মিয়ানমার থেকেই বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল৷ .

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

দু’ সেকেন্ডে একজন

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, গতবছরই ১ কোটি ৬২ লক্ষ মানুষ নতুন করে গৃহহীন হয়েছে৷ এদের মধ্যে যাঁরা প্রথমবার বাধ্য হয়ে ঘর ছেড়েছেন, তাঁরাও যেমন আছেন, তেমনি আছেন যাঁরা আগে থেকেই উদ্বাস্তু, তাঁরাও৷ অর্থাৎ প্রতিদিন ৪৪,৪০০ মানুষ বিতাড়িত হচ্ছেন এবং প্রতি দু'সেকেন্ডে ১ জন করে গৃহহীন হচ্ছেন৷ যুদ্ধ, হিংসা এবং উৎপীড়নের জন্য ৬ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

দেশের মধ্যে

অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ বা হিংসার জন্য দেশের ভেতরেই অনেক মানুষ বাস্তুভিটা ছেড়ে অন্য জায়গায় যেতে বাধ্য হয়৷ তাঁদের বলা হয় আইডিপি (ইন্টারনালি ডিসপ্লেসড পিপল)৷ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বিশ্বে প্রায় ৪কোটি আইডিপি ছিল৷ এই সংখ্যাটা আগের বছরের তুলনায় কমেছে৷ কলম্বিয়া, সিরিয়ায় এদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

সিরিয়ার দুর্দশা

গত ৭ বছর ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার ওপর দিয়ে নানা ঝড় বয়েছে৷ ২০১৭ সালের শেষ অবধি প্রায় ৬৩ লাখ মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল৷ এছাডা়ও সিরিয়াতে প্রায় ৬২ লাখ মানুষ দেশের ভেতরেই উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছে৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

আফগানিস্তান

সিরিয়ার পরেই যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের স্থান৷ প্রচুর মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আফগানিস্তান থেকে পালাচ্ছেন৷ বিশ্বব্যাপী নজিরবিহীনভাবে যুদ্ধ, সহিসংতা ও উৎখাতের কারণে প্রতিদিনই রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে৷ অন্যান্য দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে বিভিন্ন সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরছে যুদ্ধবিধ্বস্ত এসব মানুষ৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

দক্ষিণ সুদানের অবস্থা

দক্ষিণ সুদানে গৃহযুদ্ধ চলছে ২০১৩ সাল থেকে৷ গৃহযুদ্ধের কবলে পড়ে গত কয়েক বছরে দেশটির লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে৷ জাতিসংঘের মতে, এই দেশ সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে আছে৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

তুরস্ক

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুরস্কে প্রচুর শরণার্থী রয়েছে৷ ২০১৭ সালের শেষের দিক পর্যন্ত তুরস্কে প্রায় ৩৫ লক্ষ শরণার্থী ছিল৷ তার মধ্যে অধিকাংশই সিরিয়ার মানুষ৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

গরিব দেশেও

অ্যামেরিকা আর ইউরোপ যাঁরা পৌঁছচ্ছেন, তাঁরা ছাড়াও অনেক শরণার্থী কম আয় সম্পন্ন বা মধ্যম আয় সম্পন্ন দেশগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছেন৷ জাতিসংঘ শরণার্থী কমিশন (ইউএনএইচসিআর) বলছে, প্রায় ৮৫ শতাংশ শরণার্থী উন্নয়নশীল দেশে আশ্রয় নিচ্ছেন, যাঁরা খুবই দরিদ্র৷ এদের মধ্যে আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, মিয়ানমার, সোমালিয়া, সুদান এবং কঙ্গো, উগান্ডার মানুষই বেশি৷

মরক্কোর নৌকাডুবি

মরক্কো থেকে ছেড়ে আসা আরেকটি নৌকা ডুবে আরো ৫৩ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যুর শঙ্কা করা হচ্ছে৷ নৌকাটি থেকে উদ্ধার হওয়া এক শরণার্থী এ তথ্য জানিয়েছেন স্পেনের সহায়তা সংস্থা কামিনান্দো ফ্রন্টিয়ার্সকে৷ তিনি জানান, আলবোরান সাগরে অন্য একটি জাহাজের সাথে ধাক্কা লেগে ডুবতে শুরু করে সে নৌকা৷

ইটালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাতারেল্লা ‘ভূমধ্যসাগরে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ' করেছেন৷

প্রধানমন্ত্রী কন্টে জানিয়ছেন, এ ঘটনায় তিনি দুঃখ পেয়েছেন৷ পাশপাশি উত্তর আফ্রিকার মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে তাঁর দেশের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন

তবে ইটালির শরণার্থীবিরোধী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি বলেছেন, শরণার্থীবাহী নৌকা প্রতিহত করার নীতি যে কাজ করছে, এই মৃত্যুর ঘটনা  তার ‘প্রমাণ'৷ তিনি বলেন, ‘‘বন্দরগুলো খুলে দিলে এমন মৃত্যুর ঘটনা আরো বাড়বে৷''

আইওএমের হিসাব মতে, ২০১৯ সালের প্রথম ১৬ দিনে ইউরোপে ৪৪৪৯ জন শরণার্থী প্রবেশ করেছেন৷ গত বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২৯৬৪ জন৷

সংস্থাটি গত বছর জানিয়েছিল, ১১৬,৯৫৯ জন শরণার্থী সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছিল, আর ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ বা মৃতের সংখ্যা ছিল ২২৯৭ জন৷

মা যখন শরণার্থী

এর্লি মার্সিয়াল ও আলভিন জুনিয়র

গর্ভবতী মা আর্লি মার্সিয়াল হন্ডুরাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে পাড়ি জমান৷ পথিমধ্যে জন্ম হলো আলভিনের৷ নির্ধারিত সময়ের ছয় সপ্তাহ আগেই পৃথিবীর আলো দেখে আলভিন জুনিয়র৷

মা যখন শরণার্থী

হন্ডুরাস থেকে হেঁটে যুক্তরাষ্ট্রে?

তীব্র অর্থকষ্ট ও রাজনৈতিক সহিংসতা এড়াতে হন্ডুরাস থেকে হেঁটে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওয়ানা হন আর্লি মার্সিয়াল৷ এ সময় তিনি ছিলেন আট মাসের গর্ভবতী৷ সেই অবস্থায় মার্সিয়াল তার অন্য দুই সন্তানকেও ছোট ঠেলাগাড়িতে চড়িয়ে ধরে রেখেছেন শক্ত হাতে৷

মা যখন শরণার্থী

রাস্তায় বিশ্রাম

পথিমধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বিশ্রাম নিতেন খোলা আকাশের নীচে, রাস্তার উপর৷ দুই সন্তানকে দুপাশে শুইয়ে দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতেন মার্সিয়াল৷ অনিশ্চিত যাত্রা আর সেই সাথে অনাগত সন্তানকে নিরাপদ রাখার উদ্বেগ৷

মা যখন শরণার্থী

নদীতে গোসল

হন্ডুরাস থেকে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার এ লম্বা পথে সন্তান ও নিজের দায়িত্ব নিতে হয়েছে নিজেকেই৷ পথিমধ্যে যাত্রাবিরতি দিয়ে সেরে নিতেন দৈনন্দিন কর্যক্রম৷ ছবিতে দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ মেক্সিকোর একটি নদীতে বাচ্চাদের গোসল করাচ্ছেন মার্সিয়াল৷

মা যখন শরণার্থী

শরণার্থী দলের সাথে ট্রাকে

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে মার্সিয়াল তাঁর সন্তানদের নিয়ে মিশে গেলেন একটি শরণার্থী দলের সাথে৷ লম্বা এ পথের কিছুটা অংশ একটি ট্রাকে করে পাড়ি দেয় শরণার্থী দলটি৷

মা যখন শরণার্থী

রেড ক্রসের সঙ্গে

মেক্সিকোর পুয়েব্লা এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় একটি রেড ক্রস দলের সন্ধান পান মার্সিয়াল৷ রেড ক্রসের এ দলটি শরণার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকে৷ অনাগত সন্তানের বিষয়ে কিছুটা শঙ্কামুক্ত হন তিনি৷

মা যখন শরণার্থী

অবশেষে শুভক্ষণ

রেড ক্রসের কর্মীরা মার্সিয়াকে নিয়ে যান হাসপাতালে৷ সেখানেই জন্ম হয় আলভিন জুনিয়রের৷ সন্তানকে কোলে নিয়েই মার্সিয়া ভুলে যান লম্বা পথ পাড়ি দেয়ার কষ্ট৷

মা যখন শরণার্থী

যদি মন গলে ট্রাম্পের

মেক্সিকো সীমান্তের বেড়া থামিয়ে দিলো এ পরিবারটিসহ অন্য শরণার্থীদের যুক্তরাষ্ট্র যাত্রা৷ কিন্তু মা মার্সিয়াল বিশ্বাস করেন আলভিনের জন্ম তাঁর জন্য শুভ আর এতেই মন গলতে পারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের৷ ট্রাম্প হয়তো শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেবেন তাঁদের৷

এডিকে/ (রয়টার্স, এপি, এএফপি, ডিপিএ)

আমাদের অনুসরণ করুন