মন্ত্রীর মেয়ের ঝলমলে বিয়ে

বিয়ে এখনো উপমহাদেশের বড় এক সামাজিক উৎসব৷ পরিবার, বন্ধু, সহকর্মীদের একসাথে জড়ো করে আনন্দ, উল্লাস, হৈ-হুল্লোড়ে মেতে উঠতে চান সবাই৷ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের এমনই এক বিয়ের অনুষ্ঠান নজরে এসেছে সবার৷

বাংলাদেশের সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও শাহীন আখতার দম্পতির একমাত্র মেয়ে সুপ্রভা তাসনিমের বিয়ের কথা বলছি৷ অভিনেতা ও সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে আসাদুজ্জামান নূরের সুখ্যাতি তো আর নতুন নয়, সেই সাথে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক ইমেজও৷ ফলে পরিবারের বাইরেও মন্ত্রীকন্যার বিয়েতে রাজনীতিবিদ ও শোবিজ তারকারাদের আলো ঝলমলে উপস্থিতি বিরাট এক মিলনমেলা আর আনন্দ-উচ্ছ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল৷

ফটোগ্রাফি ও সিনোমাটোগ্রাফি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘ড্রিম ওয়েভার’-এর তৈরি করা প্রায় তিন মিনিটের এই ভিডিওটিতে দেখা যায়, ব্রিটিশ নাগরিক টিমোথি স্টিফেন গ্রীনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন মন্ত্রীকন্যা৷ ভিডিওতে দেখা মিললো ব্রিটিশ দম্পতি প্যাট্রিসিয়া ও ক্রিস্টেফার গ্রীনকেও৷

৮ই সেপ্টেম্বর বিয়ে হলেও এটি মূলত তার দুই দিন আগে অনুষ্ঠিত গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের ভিডিও৷ পুরো আনুষ্ঠানিকতায় আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল দেখা গেছে আসাদুজ্জামান নূরকে৷ অনুষ্ঠানে উপস্থিত উচ্ছ্বল তরুণ-তরুণীদের সাথে নাচে গানে তালও দিতে দেখা গেছে তাঁকে৷ এটিই মনে হয় এই ভিডিওর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক৷ কারণ, বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ছেলে-মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে এখনও পর্যন্ত বাবা-মায়ের নাচ গানের দৃশ্য খুব একটা নজরে পড়ে না৷

শুধু তাই নয়, বিয়ের পাত্র-কন্যাকেও দেখা গেছে হাসিখুশি৷ তাঁরাও নেচেছেন৷ বিশেষত পাত্র টিমথি স্টিফেন গ্রীনের উল্লাস প্রকাশ ছিল নজরকাড়া৷ উজ্জ্বল রংয়ের বাংলাদেশি সাজপোশাকে ছিলেন বিয়ে অনুষ্ঠানের সবাই৷ বাংলাদেশি কায়দায় ব্রিটিশ নাগরিকদের এভাবে বিয়ে অনুষ্ঠান উদযাপন তাই নজর কেড়েছে সবার৷

এএম/এসিবি

মুসলিম বিয়ে

সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিয়ে পড়ানো হয়৷ দেনমোহর ধার্য করা হয় ছেলের আর্থিক সামর্থ্য ও অবস্থান অনুযায়ী৷ বিয়ের সময় একজন উকিল থাকেন৷ তিনি প্রথমে কনেকে জিজ্ঞাসা করেন, সে বিয়েতে রাজি আছে কিনা৷ কনে রাজি থাকলে বরকেও একই প্রশ্ন করা হয়৷ এরপর দোয়া কালাম করে সম্পন্ন করা হয় বিয়ে৷

হিন্দু বিয়ে

বিয়ে হয় বেশ কিছু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে৷ প্রচলিত নিয়মে প্রথমে বাগদান পর্ব এবং সেখানেই পাটিপত্রে বর-কনের স্বাক্ষর৷ তারপর একে একে আশীর্বাদ, গায়ে হলুদ, তারপর বিয়ের আসর৷ সেখানে দু’টি পর্ব – সাজ বিয়ে ও বাসি বিয়ে৷ সাজ বিয়েতে সাতবার প্রদক্ষিণ শেষে কনে আর বরকে বরণ করে নেয়া হয়৷ হয় মালাবদল৷ আর বাসি বিয়েতে দেবদেবীর অর্চনা শেষে কনের কপালে সিঁদুর দেয় বর৷ তারপর উভয় মিলে সাতবার অগ্নি দেবতাকে প্রদক্ষিণ করেন৷

খ্রিষ্টান বিয়ে

বিয়ের তিন সপ্তাহ আগে পুরোহিতের কাছে বর-কনে নাম লেখান৷ এরপর ‘বান প্রকাশ’ অনুষ্ঠানে বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়৷ বিয়ের আগ পর্যন্ত অপশক্তির নজর থেকে রক্ষার জন্য দুজনকে ‘রোজারি মালা’ পরতে হয়৷ বিয়ের দিন ভোরে কনের বাড়ি গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসা হয়৷ এসময় বরপক্ষ থেকে দেয়া পয়সা ঘরের মধ্যে ছুড়ে দেন কনে৷ এর অর্থ, বাড়ি ছেড়ে গেলেও, বাড়ির লক্ষী ঘর থেকে চলে যাচ্ছে না৷ এরপর গির্জায় বর-কনে দু’জনের মধ্যে আংটিবদল করা হয়৷

বৌদ্ধ বিয়ে

পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের পর সামাজিকভাবে সবাইকে জানিয়ে তারিখ ঠিক করে বৌদ্ধবিহারে পাত্র-পাত্রীকে নিয়ে যাওয়া হয়৷ সেখানে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে বুদ্ধের পূজা করা হয়৷ ত্রি-স্বরণ পঞ্চশীল পূজার মধ্য দিয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুকের আশীর্বাদ গ্রহণের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হয়৷ এরপর একজন গৃহী তাঁদের সামাজিক অনুশাসন প্রদান করে৷

ঢাকাইয়া বিয়ে

‘পানচিনি’ অনুষ্ঠানে ঘটকের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনার পর ‘মোতাসা-রাই’ বা ‘পাকাকথা’ অনুষ্ঠানে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়৷ বিয়ে অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে দুই বাড়িতে আলাদাভাবে ‘হলদি’ বা ‘তেলাই’ অনুষ্ঠান হয়৷ এরপর অবিবাহিত অবস্থায় নিজের বাড়িতে বর বা কনের শেষ খাওয়া হিসেবে দুই বাড়িতে ‘আইবুড় ভাত’ নামের অনুষ্ঠান হয়৷ এরপর হয় মূল বিয়ের অনুষ্ঠান৷

চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিয়ে

চট্টগ্রামের বিয়ে সাধারণত বেশ আড়ম্বরপূর্ণ হয়৷ বিয়ের প্রাথমিক কার্যকলাপ অন্যান্য অঞ্চলের মতোই সম্পন্ন হয়৷ তবে বিয়ের আগে আয়োজন করা হয় ‘বউ জোড়নি’ অনুষ্ঠান৷ বর ও কনের মধ্যে আলাপ করিয়ে দেয়াই এর মূল লক্ষ্য৷ চট্টগ্রামের আরেকটি বিচিত্র আয়োজন হচ্ছে ‘ঘরজামাই বিয়া’৷

রাজশাহী অঞ্চলের বিয়ে

এই অঞ্চলের বিয়েতে থাকে পিঠার জয়জয়কার৷ বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হওয়ার পর আঞ্চলিক গীতের তালে তালে বর-কনেকে নিজ নিজ বাড়িতে মিষ্টিমুখ করানো হয়৷ এই অনুষ্ঠানকে বলা হয় ‘থুবড়া’৷ সাধারণত ক্ষীর ও আন্ধাষা (তেলে ভাজা রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি পিঠাবিশেষ) তৈরি করা হয়৷ এই মিষ্টি সাধারণত পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে তৈরি করে পাঠানো হয় বর-কনের বাড়িতে৷

শেষ কথা

এতক্ষণ রীতির কথা বলা হলো৷ কিন্তু সব মানুষের পক্ষে সব নিয়ম পালন করা সম্ভব হয় না৷ কারণ তাঁদের সেই সামর্থ্য থাকে না৷ আবার এর উলটোটাও ঘটে৷ যাঁদের অনেক সামর্থ্য আছে, তাঁরা রীতির বাইরেও জাঁকজমকভাবে বিয়ের অনুষ্ঠান করে থাকেন৷

আরো প্রতিবেদন...