মাছি মারা কেরানি ও জনতার দায়

সম্প্রতি নগর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা বলেন, মশার বংশ বিস্তারের জন্য সাধারণ মানুষই দায়ী৷ তাই তাঁদের পক্ষে এটা রোধ করা সম্ভব নয়৷ কিন্তু ঘরের বাইরের কাজটি কি তাঁরা ঠিকঠাক করছেন? মনে পড়ে যাচ্ছে মাছি মারা সেই কেরানির কথা...৷

অফিসের কর্মকর্তা তাঁর অধীনস্ত এক কেরানিকে একটি কাগজ দিয়ে বলেছিলেন, হুবহু কপি করে আনতে৷ ওই কাগজের ওপর লেগেছিল মরা একটি মাছি৷ হুবুহু লেখাটি কপি করে সেই কেরানি একটি মাছি মেরে সেই কপির ওপর লাগিয়ে দেন৷ এই গল্পের সঙ্গে বাস্তবের অনেক গল্পের মিল খুঁজে হয়ত পাওয়া যাবে৷ কিন্তু সম্প্রতি প্রকোপ বেড়ে যাওয়া রোগ চিকনগুনিয়ার সঙ্গে এই গল্পের খুব একটা মিল নেই৷ কারণ মশক নিধনের দায়িত্বে থাকা সিটি কর্পোরেশনগুলোর একটির বড় কর্তা বলেছেন যে, যতগুলো মশা মারা দরকার তার চেয়ে বেশি তারা মারছেন৷ যদিও আমাদের সঠিক জানা নেই যে কতগুলো মশা মারার কথা ছিল৷ তারপরও যেহেতু তিনি বলছেন, তাই এই গল্প এখানে ব্যর্থ৷ ব্যর্থতার গল্প আসলে জনতার৷ যাঁরা রোগে ভুগছেন৷ এই রোগের রিলে ম্যারাথন যেন থামছেই না৷ ব্যাটন হাতবদল হয়েই চলেছে৷ চলতে থাকুক এই গল্প৷ আমরা বরং অন্য কোনো গল্পে মনোযোগ দিই৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

পরিবেশ

বাসার ফুলের টব

বর্ষাকালে বাড়িতে বা বারান্দায় রাখা ফুলের টবগুলো মশা জন্ম নেওয়ার মোক্ষম জায়গা৷ ফুলের টবে জমে থাকা পানি কয়েকদিন পরিষ্কার না করলে সেখানে সহজেই জন্ম নেয় মশারা৷

পরিবেশ

রেফ্রিজারেটর

নিজেদের অজান্তে বাড়ির মধ্যেই গড়ে উঠতে পারে মশার প্রজননস্থল৷ বাসায় নিত্য ব্যবহার্য রেফ্রিজারেটরের পেছনে জমে থাকা পানিও দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করলে সেখানে মশারা বংশবৃদ্ধি করতে পারে৷

পরিবেশ

শীততাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র

বাসা কিংবা অফিসে ব্যবহৃত শীততাপ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রটিও মশা জন্ম দেওয়ার অন্যতম কারণ৷ বেশিরভাগ অফিস কিংবা বাসার শীততাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রটির পানি সরাসরি বাইরে ফেলা হয়৷ সেসব পানি জমে থাকলে কোথাও কোথাও জন্ম নেয় মশারা৷

পরিবেশ

নোংরা জলাশয়

ঢাকা শহরের ভেতরে আছে অসংখ্য নোংরা জলাশয়, যেগুলো মশা প্রজননের উপযুক্ত জায়গা৷

পরিবেশ

আবর্জনা ফেলার জায়গা

ঢাকা শহরের জলাশয়গুলোতে অবাধে ফেলা হচ্ছে ময়লা বা আবর্জনা৷ ফলে সেখানে সহজেই জন্ম নেয় মশারা৷

পরিবেশ

পরিত্যক্ত ডোবা

ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাসা-বাড়ির আশেপাশে রয়েছে প্রচুর পরিত্যক্ত ডোবা৷ বর্ষার মৌসুমে সেসব ডোবায় পানি জমে থাকায় সেখানেও মশার জন্ম হয়৷

পরিবেশ

ময়লার খাল

ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে এখনো রয়েছে খোলা ময়লার খাল৷ সেসব খালে মশারা জন্ম নিয়ে সেহজেই ছড়িয়ে পড়ে শহরের আনাচে-কানাচে৷

পরিবেশ

হাতিরঝিলের অপরিচ্ছন্ন অংশ

রাজধানীর হাতিরঝিলের বিভিন্ন জায়গা এখন মশা প্রজনের অন্যতম জায়গা৷ হাতিরঝিল এলাকায় প্রচুর আবর্জনা থাকায় সেসব জায়গায় মশাদের অবাধ বিচরণ দেখা যায়৷

পরিবেশ

হাতিরঝিলের ডাস্টবিন

হাতিরঝিলে বসানো আধুনিক ডাস্টবিনগুলো পথচারীরা কমই ব্যবহার করেন৷ ফলে বৃষ্টি হলেই ডাস্টবিনের কন্টেইনারগুলোতে পানি জমতে শুরু করে৷, যেখানে জন্ম নিতে পারে মশা৷

পরিবেশ

ছাদে জমে থাকা পানি

বর্ষার মৌসুমে ঢাকা শহরের অনেক বাড়ির ছাদেই পানি জমে৷ সেগুলো দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করলে সেখানেও মশারা জন্ম নেয়৷

পরিবেশ

পরিত্যক্ত ফোয়ারা

সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়ক কিংবা বিপণি বিতানের সামনে বসনো ফোয়ারাগুলো দীর্ঘদিন না চালানোয় সেখানে জমে থাকা পানিও মশা জন্ম নেওয়ার ভালো জায়গা৷

পরিবেশ

ঢাকার বাস স্টেশন

ঢাকা শহরের প্রধান তিনটি বাস স্টেশনের পার্কিং এলাকাতেই বাসগুলো ধোওয়া হয় নিয়মিত৷ ফলে সেখানে জমে থাকে পানি৷ আর সেই পানিতে সহজেই জন্ম নেয় মশারা৷

পরিবেশ

পরিত্যক্ত ডাবের খোশা

ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ফেলে রাখা ডাবের খোশায় বৃষ্টির পানি জমে থাকে, যেখানে জন্ম নেয় মশারা৷

পরিবেশ

ফেলে রাখা প্লাস্টিক

ঢাকার দু’টি সিটি কর্পোরেশনের ময়লা ব্যবস্থাপনা মারাত্মক দুর্বল৷ তাই শহরজুড়ে যত্রতত্র দেখা যায় নানারকম প্লাস্টিকের জিনিস৷ এ সবেও বৃষ্টির পানি জমে সহজেই জন্ম নেয় মশারা৷

পরিবেশ

গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গাড়ি মেরামত করার কারখানাগুলোর আশেপাশে ফেলে রাখা পরিত্যক্ত টায়ারগুলোয় বৃষ্টির পানি জমে মশারা জন্ম নেয়৷

আদিব ক্লাস সিক্সে পড়ে৷ থাকে সরকারি চাকুরে বাবার অস্থায়ী নিবাস ঢাকার মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে৷ সে প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে বিকেলে বাসার পাশের মাঠটিতে ক্রিকেট খেলে বন্ধুদের সাথে৷ অন্য আর দশটা সাধারণ সরকারি কলোনির মতোই এই কলোনিটিরও অবস্থা৷ কালো কালো পানিতে টইটম্বুর ড্রেন আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঝোপঝাড়ের মাঝে মাথা উঁচু করে থাকা দেয়ালের পলেস্তারা খুলে খুলে পড়া কতগুলো দালান৷ যেখানে সেখানে জমে থাকা আবর্জনা৷ মশক দেবতা আড়ালে মুচকি নন, হো হো করেই হাসেন৷ খুশিতে নাচেন ধেই ধেই করে৷ এমন স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশই তো তার চাই৷ ছানাপোনাগুলো বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়ে বেড়ে উঠবে৷ আদিব সেদিন বাড়ি ফিরল৷ রাত নামল কলোনির আকাশে, আর জ্বর উঠল তার কপালে৷ সেই জ্বর যেন আর নামেই না৷ চঞ্চল-উচ্ছ্বল শিশুটির চোখ দু'টো ক্রিকেট বলের মতোই হয়ে গেল৷ শরীরের গিটগুলোতে অসহ্য যন্ত্রণা৷ কয়েক সপ্তাহ নিদারুণ কষ্টে ভুগে অবশেষে মুক্তি পেল আদিব৷ কিছুই বদলায়নি৷ আদিবও আগের মতো মাঠে যায়৷ আর মাঠের মানচিত্রও আগের মতোই৷

নদীনালা খালবিল বিধৌত এই বাংলার মাটি, মশককূলের ঘাঁটি হবেই৷ তা কেউ ঠেকাতে পারবে না৷ এখানকার আবহাওয়া জলবায়ু এই ক্ষুদ্র প্রাণীটির বংশবিস্তারের ব্যাপক সহায়ক৷ এমনকি পাহাড়ি প্রকৃতিও এই প্রাণীটির বাউন্ডুলেপনাকে বিশেষ আসকারা দেয়৷ আর তাই চিকনগুনিয়ার মতো রোগ শহরে পৌঁছানোর আগেই পৌঁছে যায় গ্রামাঞ্চলে৷ চিকনগুনিয়ার প্রকোপ এবারই প্রথম নয়৷ ২০১১ সালে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম চিকনগুনিয়া রোগের প্রকোপ দেখা দেয়৷ ২০১১ সালের অক্টোবরে দোহারে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে ঘরে ঘরে৷ ‘‘বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে চিকনগুনিয়ার প্রকোপ'' নামে প্রকাশিত সেই গবেষণার জন্য নভেম্বরের ২ থেকে ২১ তারিখ পর্যন্ত গবেষকরা উপজেলার চর কুশাই গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে এই রোগের বিষয়ে খোঁজ করেন৷ ৩৮৪০ জনের বিষয়ে খোঁজ করে তাঁরা দেখেন, ১১০৫ জনই (২৯ শতাংশ) চিকনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত৷ ২৯ ভাগ ঘরে অন্তত একজনকে কাবু করেছে এই রোগ৷ ১৫ ভাগ ঘরে তিনজন আক্রান্ত৷ প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ৩৮ শতাংশ এবং পুরুষদের ২৫ শতাংশ ভুগেছে এই ধরনের রোগে৷

২০১২ সালেও চিকনগুনিয়া ছড়িয়েছিল৷ ২০১৬ সালে আইসিডিডিআরবির এক গবেষণা বলছে, ২০১২ সালের ২৯ মে থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা থেকে ৬০ মাইল দূরে পালপাড়া গ্রামে অন্তত ১৮ ভাগ মানুষ জ্বর ও গিঁটের ব্যাথায় ভুগেছেন এবং শরীরে ফুসকুড়ি উঠেছে৷ গবেষণা করে তাঁরা নিশ্চিত হন যে চিকনগুনিয়া ভোগা মানুষগুলোর মধ্যে বাড়ির মহিলারাই বেশি ঝুঁকিতে থাকেন৷ কারণ, ঘরের ভেতরেই এই মশা বেশি আক্রান্ত করে৷

এই গবেষণা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, চিকনগুনিয়ার প্রকোপ এবারই প্রথম নয়৷ কিন্তু যেহেতু রাজধানীর মানুষের মাঝে এবার ব্যাপক হারে ছড়িয়েছে, তাই এটি গণমাধ্যমকেও বেশি আকর্ষিত করেছে৷ প্রশ্নও উঠেছে, মশার বংশবিস্তার এবং মশাবাহীত রোগ প্রতিরোধে কতটা পারদর্শিতা দেখাতে পেরেছে কর্তৃপক্ষ৷ বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষও যে বেশ বিরক্ত তা স্পষ্ট বোঝা যায়৷ মানুষের ঘরে মশার বিস্তার ঘটালে তারা তা কীভাবে প্রতিরোধ করবেন – এমন যুক্তি তুলে ধরেছেন তারা৷ সে না হয় ঠিকই আছে৷ জনতার ঘাড়ে দোষ চাপালে বিষয়টা এড়ানো সহজ হয়৷

Zobaer Ahmed

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

আরেকটি গল্প মনে পড়েছে৷ এক ঘুসখোর কর্মকর্তা স্কুলে আরেকজনের পেন্সিল কেড়ে নেয়ায় তার ছেলেটিকে ফোনে বেশ উপদেশ দিচ্ছেন৷ বাবা কখনো অন্যের জিনিস ধরবে না৷ জোর করে কিছু নেবে না৷ তখন এক কর্মচারী শুনে ফেলে কথাটি৷ পরে সে ক্যান্টিনে বসে আরেক কর্মীকে ঘটনাটি বলে বেশ হাসাহাসি করে৷ যদি এজিবি কলোনির রাস্তাঘাট পরিষ্কার থাকত, ড্রেনের পানি চলাচল স্বাভাবিক থাকত, ঝোপঝাড় সব পরিষ্কার করা থাকত, তাহলে আদিবের অসুখের জন্য ঘরের ভেতরে কোন বোতলে ময়লা পানি আছে, তার তদন্ত করা যেত৷ কিন্তু যেহেতু সেটি করা হয়নি, তাহলে দায় কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারেন কি?

আপনার কি লেখককে কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷