মানসিকতায় পরিবর্তন ছাড়া ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অসম্ভব

ঢাকার রাস্তায় বেড়েই চলেছে যানজট৷ কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের কি সঠিক দায়িত্ব পালন করছি? সরকারেরই বা অবহেলাটা কোথায়? বিভিন্ন উদ্যোগ কেন ভেস্তে যাচ্ছে বারবার?

কোনো দেশে গেলে সেদেশের পুলিশ দেখার, পারলে তাদের সাথে কথা বলার শখ আছে আমার৷ তাঁরা কেমন মিশুক, কতটা বন্ধুসুলভ আচরণ এবং তাঁদের বেশভূষা-আচরণ দেখে সেদেশের সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পাওয়া যায়৷ এটা অবশ্য একেবারেই আমার ব্যক্তিগত মতামত৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

ফলে কয়েক বছর আগে নেপাল গিয়েও রাস্তায় খুঁজছিলাম পুলিশ৷ কিন্তু অবাক কাণ্ড! পুলিশ তো দূরের কথা, রাস্তার মোড়ে ট্রাফিক পুলিশও খুঁজে পাচ্ছিলাম না৷

তবে একদিন আমার সে সৌভাগ্য হলো৷ রাস্তার মোড় থেকে বেশ খানিকটা দূরে, দেখাই যায় না এমন একটা জায়গায় একজন ট্রাফিক পুলিশকে দেখলাম দাঁড়িয়ে আছেন৷ এবং তিনি একজন নারী ট্রাফিক পুলিশ৷ অথচ তাঁর দৃশ্যমান উপস্থিতি ছাড়াই ঠিকঠাক লাল বাতি, সবুজ বাতি মেনে চলছেন পথচারী এবং গাড়ি চালকেরা৷

খুব বেশি দেশ স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য না হলেও যে কয়টি দেশে গিয়েছি, কোনোটিতেই বাংলাদেশের মতো ভয়াবহ অবস্থা দিনের পর দিন চলতে দেখিনি৷

সমাজ-সংস্কৃতি

উলটো পথে চলাচল

ঢাকা শহরে নানা ট্রাফিক অব্যবস্থপনার মধ্যে উলটো পথে চলা অন্যতম৷ বাইকার, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ভিআইপি – অনেকেই নিজের তাড়াতাড়ি যাওয়া নিশ্চিত করতে উলটো পথে গাড়ি ছোটান৷ তাতে আরো বেশি বিড়ম্বনায় পড়েন রাস্তায় নামা সাধারণ মানুষ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বেপরোয়া ড্রাইভিং

এমনিতে হয়ত যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অনেক গাড়িকে৷ তবে রাস্তা ফাঁকা পেলে যেন দেরি সয় না অনেক চালকের৷ বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে দেন তাঁরা৷ এর ফলে অনেক সময়ই প্রাণ যায় মানুষের৷ প্রিয়জন হারানোর আহাজারিতে ভারী হয় আকাশ বাতাস৷ কেবল ঢাকার রাস্তাতেই প্রতি বছর কয়েক শত মানুষের প্রাণ যায়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

যত্রতত্র পার্কিং

ঢাকা মহানগরের সড়কগুলো আর যাই হোক, বিপুল পরিমাণ মানুষ আর যান বাহনের চাপ সামলানোর মতো নয় বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত৷ সরু সেই সব রাস্তার অবস্থা আরো করুণ হয়ে যায়, যখন যত্রতত্র পার্কিংয়ে এই রাস্তা আরো সরু হয়ে যায়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

অননুমোদিত ড্রাইভিং

গত মে মাসে এক স্কুলছাত্র এই গাড়িটি নিয়ে বের হয়ে পড়ে রাস্তায়৷ অননুমোদিত এই ড্রাইভিংয়ে আহত হয় আরেক শিশু৷ অবৈধ ড্রাইভিংয়ে কেবল শিশু নয়, বড়রা জড়িয়ে পড়েন৷ লাইসেন্স ছাড়াই অনেকে নেমে পড়েন রাস্তায়৷ লাইসেন্স থাকলেও মাদক গ্রহণের পর, শারিরীক বা মানসিকভাবে অনুপযুক্ত অবস্থায়ও গাড়ি চালানো আইনে নিষেধ৷ সড়কে বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো, রেসে অংশ নেয়াও নিষিদ্ধ৷ বীমার বাধ্যবাধকতাও অনেকে মানেন না৷

সমাজ-সংস্কৃতি

উলটো পথে চললে চাকা ফুটো

উলটো পথে গাড়ির চলাচল বন্ধ করতে একটি যন্ত্র বসিয়েছিল ট্রাফিক পুলিশ৷ কথা ছিল গাড়ি উলটো পথে চললে তাতে চাকা ফুটো হয়ে যাবে৷ কিছুদিন পর এই যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে যায়৷ ঢাকা শহরের গাড়িকে স্বয়ংক্রিয় সংকেত বাতির উপর নির্ভরশীল করে দিতে সর্বশেষ ২০১৫ সালে একটি উদ্যোগ নেয়া হয়৷ কিন্তু পুলিশের অসহযোগিতায় সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে৷ এই শহরে ট্রাফিক আইন ভাঙা মামলাও হয় গতানুগতিকভাবে, হাতে লিখে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

যত্রতত্র পথচারীদের চলাচল

ঢাকার রাস্তায় আরেক যন্ত্রণা সৃষ্টি করে খোদ পথচারীরাই৷ নির্ধারিত জায়গার পরিবর্তে যেখানে সেখানে রাস্তা পার হয়ে যান তাঁরা৷ রাজধানীতে পথচারীদের আইন না মানার প্রবণতাও এখানকার দুর্ঘটনার একটা কারণ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

আইন প্রয়োগে ফাঁকি

ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে নানা আইন থাকলেও, সেটা প্রয়োগে ফাঁকি রয়েছে৷ প্রায়ই খোদ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনেক সদস্যকেই আইন ভাঙতে দেখা যায়৷ লেগুনা নামের এই ‘আনফিট’ গাড়ি ব্যবহার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য

রাজধানী ঢাকায় যে সব গাড়ি চলে তার অধিকাংশই ব্যক্তিগত৷ এ সব গাড়িকে যত্রযত্র যানজট সৃষ্টির জন্যও দায়ী করা হয়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

গণপরিবহনে নৈরাজ্য

ঢাকার সমস্যা গণপরিবহন ব্যবস্থায় নৈরাজ্য৷ মানসম্মত গণপরিবহনের অভাব তো রয়েছেই৷ যে গাড়িগুলো রয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল৷ যেখানে সেখানে থামিয়ে যাত্রী তোলা যেন নগরীর নিত্যদিনের চিত্র৷

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, বাংলাদেশে আমরা কেন এই চিত্র কল্পনাও করতে পারি না? কারণ হিসেবে অনেকেই বলে ওঠেন, জনসংখ্যা৷ আমি তা সাথে সাথে মেনে নেই এবং পালটা প্রশ্ন করি, তাহলে আমরা অর্থনৈতিক উন্নতি কীভাবে করছি? কীভাবে আমরা নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হলাম? নেপাল কি আমাদের চেয়ে উন্নত দেশ?

দেশের উন্নয়ন মানে কি শুধুই অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিনা তা মনে হয় গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখার সময় এসেছে৷ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ' এখন দেশের সব প্রান্তে জনপ্রিয় একটি স্লোগান৷ সরকারের উদ্যোগের ফলে সত্যিকার অর্থেই এখন অনলাইনে এবং মোবাইলে ব্যাংকিং থেকে শুরু করে নানা ধরনের সেবা গ্রাম থেকেও পাওয়া যায়৷

কিন্তু একবার মিলিয়ে দেখুন তো, অনলাইনে অর্ডার দিলে খাবারদাবার, এমনকি জামা-জুতোও যখন আপনার দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়, তখন দেশের রাস্তাঘাটের অবস্থাটা কী!

দেশের সবকিছু যখন ডিজিটাল হচ্ছে, বা অন্তত ডিজিটাল করার কথা বলা হচ্ছে, তখন অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল তো দূরের কথা, ট্রাফিক পুলিশকেও রাস্তার মাঝখানে হাত-পা ছড়িয়েও গাড়ি থামাতে বেগ পেতে হচ্ছে৷ ঢাকার তুলনায় মানুষ কম হলেও অন্যান্য শহরেও কমবেশি এই চিত্রই দেখা যায়৷

দুই দিক থেকে এই দুরবস্থার কারণ চিহ্নিত করতে হবে৷ প্রথমত পরিকল্পনার অভাব, যাচ্ছেতাইভাবে নগরায়ণের নামে নিজের কবর নিজেই খনন, দ্বিতীয়ত মনেমনে ইউরোপ-অ্যামেরিকার জীবনমান প্রত্যাশা করলেও, রাস্তায় নেমে যতভাবে পারা যায় আইন ভঙ্গ করা৷

গোড়া থেকেই শুরু

বিশাল জনগোষ্ঠীর শহর ঢাকায় যানজটের ফলে যে শুধু সময় নষ্ট হয়, তা নয়৷ ক্ষতি হয় বিপুল পরিমাণ জ্বালানিরও৷ আর এই যানজট শুরু হয় সপ্তাহের একেবারে প্রথম দিনটি থেকেই৷ সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের সকালে তোলা ছবিটি দেখুন৷ রাজধানী ঢাকার কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ-এর যানজট এটি৷

যেখানে-সেখানে ওঠা-নামা

ঢাকার যানজটের কারণগুলোর একটি হলো যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো৷ এক্ষেত্রে চালকদের যেমন সচেতনতার অভাব আছে, তেমনি অসচেতন যাত্রীরাও৷

আরো বেশি যাত্রী!

ঢাকার ব্যস্ততম বিমানবন্দর সড়কের মাঝখানে গাড়িগুলোকে এভাবে আকাবাঁকা করে দাঁড় করানোর আরো একটি কারণ যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতা৷ সাধারণত একই রুটের বাসগুলো বেশি যাত্রী উঠানোর জন্য এরকম প্রতিযোগিতায় নামে৷ ফলে সৃষ্টি হয় যানজট৷

অপ্রতুল পার্কিং স্পেস

ঢাকার প্রগতি সরণীর একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সামনের সড়কের ফুটপাথটি দখল করে রেখেছে গাড়ি৷ এ শহরের বেশিরভাগ ভবনেরই নেই নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা৷ ফলে এ সব ভবনে আসা গাড়িগুলো পার্ক করা হয় ফুটপাথে কিংবা সড়কের ওপর, যেটা যানজটের অন্যতম একটি কারণ৷

সচেতনতার অভাব

ঢাকার যানজটের অন্যতম আরেকটি কারণ যত্রতত্র পথচারী পারাপার৷ এ শহরের বেশিরভাগ বাসিন্দাই ‘ট্র্যাফিক ম্যানার’ জানেন না৷ ব্যস্ততম সড়কে যত্রতত্র পারাপার তাই যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷ অবশ্য ঢাকা শহরে পর্যাপ্ত ওভার ব্রিজ অথবা জেব্রা ক্রসিং না থাকাও এর একটা কারণ৷

জীবনের ভয় নেই?

পর্যাপ্ত ফুট ব্রিজ বা ওভার ব্রিজ না থাকলেও, যে কটি আছে তাও ব্যবহার করতে চান না পথচারীরা৷ ছবিতে দেখুন রাজধানীর প্রগতি সরণীর ওভার ব্রিজের নীচ থেকেই কেমন রাস্তা পার হচ্ছেন পথচারীরা৷ এই দলে আছে বৃদ্ধ থেকে শুরু করে স্কুল শিক্ষার্থীরা৷

কখনও হকার, কখনও ছিনতাইকারী

যেসব পথচারী ওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে চান, তাদের অনেকসময়ই শিকার হতে হয় নানা বিড়ম্বনার৷ দিনেরবেলায় ওভার ব্রিজগুলো হকারদের দখলে চলে গেলেও, দেখার নেই কেউ৷ আর রাতেরবেলা এ সব ওভার ব্রিজে মানুষ উঠতে চান না ছিনতাইকারীর ভয়ে৷

বেপথে গাড়ি

যে কোনো বড় রাস্তারই দু’টো দিক থাকে – গাড়ি আসার একদিক আর যাওয়ার একদিক৷ ঢাকা শহরে যানজটের একটা প্রধান কারণ উল্টো পথে গাড়ি চালানো৷ হ্যাঁ, রাস্তায় ট্র্যাফিক জ্যাম হলে অনেককেই দেখা যায় গাড়ি ঘুরিয়ে ঝট করে উল্টো দিকের চলে যেতে৷ এতে করে যানজট তো বাড়েই, দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও থেকে যায়৷

রাস্তার ভাঙার কারণে জ্যাম

ঢাকার যানজটের অন্যতম একটি কারণ দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তা খোড়াখুড়ি৷ ঢাকার গুলশানের এ সড়কটিতে স্যুয়ারেজের লাইন মেরামতের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে কাজ চলছে৷ ফলে দিনেরবেলায় সড়কটিতে লেগেই থাকছে যানজট৷

সেতু নির্মাণের জন্য...

ঢাকা শহরের যানজটের কারণের মধ্যে আছে দীর্ঘ সময় ধরে উড়াল সেতু নির্মাণও৷ উড়াল সেতু নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখা হচ্ছে সড়কের বেশিরভাগ জায়গায়৷ ফলে তৈরি হচ্ছে যানজট৷ তাছাড়া এ সব উড়াল সেতু নির্মাণে সঠিক পরিকল্পনারও অভাব আছে বাংলাদেশে৷

বাঁধ সাধলো রেল ক্রসিং

ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রেই আছে কমপক্ষে ২০টি রেল ক্রসিং৷ এ সব ক্রসিং থেকে দিনে কমপক্ষে ৭০টিরও বেশি রেলগাড়ি চলাচল করে৷ এক হিসেব মতে, এই ক্রসিংগুলোর কারণে দিনে প্রায় ছয় ঘণ্টা যানবাহন আটকে থাকে ঢাকায়৷

ডাস্টবিনের কারণেও যানজট

ঢাকা শহরের বেশিরভাগ ডাস্টবিনই সড়কের ওপরে৷ এ সব ডাস্টবিনে উপচে পড়া ময়লা আবর্জনা সড়কের ওপরেও ছড়িয়ে পড়ে৷ ফলে সেসব জায়গায় স্লথ গতিতে চলে যানবাহন৷ তাছাড়া রাতেরবেলা ময়লা আবর্জনা পরিষ্কারের নিয়ম থাকলেও তা মানা হয় না৷ যত্রতত্র এ সব ডাস্টবিনের কারণেও যানজটের সৃষ্টি হয় মহানগরীতে৷

সংবাদকর্মী হিসেবে অভিজ্ঞতা এবং কিছু তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণ করে দু'দিক থেকেই সমস্যাটা তুলে ধরার চেষ্টা করছি৷

- বুয়েট-এর এক গবেষণা বলছে, ১৯৫৯ সালের মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে এ শহর গড়ে উঠলেও সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকায় তা মানা হয়নি৷ বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে ওঠা এই নগরীর ৭৩ শতাংশই অপরিকল্পিত বলে তথ্য দেয়া হয়েছে এই গবেষণায়৷ এর প্রভাব স্বভাবতই পড়ছে নাগরিক সেবার ওপর, যানচলাচল যার মধ্যে অন্যতম৷

- শহরবাসী নির্বিঘ্ন যাতায়াতের জন্য মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ সড়কের প্রয়োজন৷ কিন্তু রাজধানীতে রয়েছে মাত্র ৮ শতাংশ সড়ক৷ অকল্পনীয়, তাই না?

- যানজট কমাতে ফ্লাইওভারের মতো দ্বিতল যানচলাচল ব্যবস্থা হাতে নেয়া হয়েছে৷ কিন্তু সেগুলোতেও রয়েছে নানা পরিকল্পনাহীনতার ছাপ৷ কুড়িল-বিশ্বরোড এবং যাত্রাবাড়ীর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার কিছুটা কাজে আসলেও, বাকিগুলো কমানোর বদলে বরং দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে৷

- এর জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ মহাখালী এবং বিজয় সরণি ফ্লাইওভার৷ একই রাস্তা থেকে উঠে, ট্রাফিক ডাইভার্শন ছাড়াই ঐ রাস্তাতেই নেমে যায়, এমন ফ্লাইওভারের উদাহরণ এখনকার পৃথিবীতে বিরল৷

- ডেনমার্ক-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা কোপেনহেগেন কনসেনসাসের তথ্য অনুযায়ী, বাসের চেয়ে ৩৩ গুণ বেশি ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করে ঢাকা শহরে৷ অথচ, নগরবাসীর মাত্র ১৩ ভাগ চড়েন নিজের গাড়িতে৷ ৪৯ ভাগকেই যাতায়াতে নির্ভর করতে হয় বাসের ওপর৷

Anupam Deb Kanunjna DW-Bengali Service

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ, ডয়চে ভেলে

ঢাকায় এখন যান চলাচলের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার৷ তবে যানবাহনের সংখ্যা এই হারে বাড়তে থাকলে ২০৩৫ সালে এই গতি ঘণ্টায় ৪ দশমিক ৭ কিলোমিটারে নেমে আসতে পারে বলে আশংকা করা হয়েছে গবেষণায়৷ স্বাভাবিক একজন মানুষের হাঁটার গতি ঘণ্টায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার৷

- বাংলাদেশের ট্রাফিক আইনকে শিথিল বললেও কম বলা হয়৷ মাঝেমাঝে মোড়ে মোড়ে সার্জেন্টকে দেখা গেলেও, তাদের কাজ মূলত লাইসেন্স পরীক্ষা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ৷ কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাস্তার ওপর পার্কিংয়ের জন্য জরিমানা করা হয় ঠিকই৷ কিন্তু উলটো পথে গাড়ি চলাচল, ট্রাফিক সিগন্যাল না মানা, পথচারীদের যেখানে সেখানে ইউটার্ন নেয়ার মতো বড় ধরনের আইনভঙ্গকেও কঠোর হাতে দমন করার সামর্থ্য আমাদের পুলিশের নেই৷

জনবল এবং যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা, এবং ক্ষমতাধরদের রাস্তায় অবাধ চলাচলকে অধিকার মনে করা ট্রাফিক পুলিশকে করেছে আরো অসহায়৷

- গণপরিবহনের মালিক-শ্রমিকদের নেতৃত্বে যাঁরা আছেন, তাঁদের অন্যায় আবদারে মাঝমধ্যেই সরকারকে মাথা নোয়াতে হয়৷ ভাড়া নির্ধারণ থেকে শুরু করে কী হবে দেশের পরিবহন নীতি, সেটাও নির্ধারণ করার ক্ষমতা রাখেন তারা৷ শীর্ষ কয়েকজন পরিবহন নেতা একই সাথে সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা ক্ষমতাসীন দলের নেতা হওয়ায়, সরকারও পড়ে বিপাকে৷

- এবার আসি আমাদের নিজেদের কথায়৷ আমরা দেশটাকে জীবনমানে সবচেয়ে উন্নত দেশগুলোর কাতারে দেখতে চাই৷ কিন্তু সেজন্য কি আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত?

সিগন্যাল থাকুক বা নাই থাকুক, রাস্তা পেরোতে হবে, ওভারব্রিজ, আন্ডারপাস থাকলেও সেগুলোতে কোনোভাবেই চড়া যাবে না, নিজেকে ১ সেকেন্ড হলেও আগে যেতে হবে, তাতে অন্য কেউ মারা পড়লেও সমস্যা নেই৷ গাড়িতে থাকলে দোষ দিবো পথচারীকে, হাঁটার সময় গালমন্দ করবো গাড়ির চালককে৷


এই মানসিকতার কারণেই আমরা পিছিয়ে আছি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাতে৷ পরিকল্পনার অভাব থাকলেও চলাচল এতটা দুর্বিষহ হয়ত হতো না, যদি দেশের প্রচলিত ট্রাফিক আইন আমরা নিজেরা মেনে চলতাম, অন্যকেও উৎসাহিত করতাম৷

ফলে একই সাথে সরকারকে যেমন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি দমনে ও আইন বাস্তবায়নে কঠোর হতে হবে, গবেষকদের এগিয়ে আসতে হবে অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশে নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা নিয়ে, তেমনি নাগরিকদেরও সচেতনতার দিক দিয়ে অগ্রসর ভূমিকা রাখতে হবে৷

যানজট, শব্দ দূষণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ৷ বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান তলানিতে৷ বাকি শহরগুলোর অবস্থাও যে ক্রমাগত সেদিকে যাবে না, তারও নেই নিশ্চয়তা৷

ফলে শুধু জনসংখ্যার দোহাই দিয়ে নিজের অক্ষমতা ঢাকার সময় কি এখনও আছে? তাহলে তো ‘মানুষ সৃষ্টি সেরা জীব', ছোটবেলায় পড়া এই প্রবাদটিও লিখতে হয় নতুন করে৷ তাই নয় কি?

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷