‘মানুষ চিন্তা করে চাঁদে যাওয়ার, আমরা চিন্তা করি কে আস্তিক, কে নাস্তিক'

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ঢাকা থেকে সিলেটে ফিরেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল৷ বিমানবন্দরে তাঁর উপর হামলা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের তিনি জানান, হামলাকারীর ওপর রাগ নেই তাঁর৷

গত ৩রা মার্চ সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে এক অনুষ্ঠান চলাকালে ফয়জুল হাসান, ওরফে শফিকুর নামের এক তরুণ ছুরি হাতে লেখক ও অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালায়৷ এতে গুরুতর আহত হন তিনি৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

সেই উগ্রপন্থি তরুণের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ড. জাফর ইকবাল জানিয়েছেন, হামলাকারীর ওপর কোনো রাগ নেই, বরং তাদের মতো তরুণদের জন্য তিনি দুঃখ অনুভব করেন৷ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসা শেষে সিলেটে ফেরার পথে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন জনপ্রিয় এই লেখক৷

তিনি আরও বলেন, ‘‘এত সুন্দর পৃথিবী৷ সেখানে এত সুন্দর সুন্দর কাজ করা সম্ভব৷ তারা সেগুলো না করে এই ধরনের একটা কাজকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে নিয়েছে, সেজন্য তাদের প্রতি আমি দুঃখ অনুভব করি৷'' কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এই শিক্ষক বলেন, ‘‘বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন তরুণরা ভুল পথে না যায়, তারা যেন সাধারণ মানুষের মতো সুন্দর জীবন যাপন করতে পারে৷''

তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠা এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরের বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে৷ সাংবাদিক মাহবুব স্মারক লিখেছেন, ‘‘ড. জাফর ইকবাল স্যার সুস্থ হয়ে সিএমএইচ ছেড়ে গেছেন আজ সকালে৷''

আশরাফুল হক লিখেছেন, ‘‘তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ড. ইকবাল বলেন, ‘তোমরা দেশটাকে ভালোবাসো, দেশও তোমাদের ভালোবাসবে৷''

বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংবাদপত্র দৈনিক প্রথম আলো তাদের ফেসবুক পাতায় লেখকের বক্তব্য পোস্ট করার পর তাতে অনেকেই মন্তব্য করেছেন৷ ইতিবাচক মন্তব্যের পাশাপাশি আছে কিছু নেতিবাচক মন্তব্যও৷

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার ঘটনায় কোনো রাগ-ক্ষোভ নেই, ভয়ও পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল৷ নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি৷ হামলার ঘটনার ভয় পাচ্ছেন কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমি বোকাসোকা মানুষ, আমার ভয়টয় নেই৷ প্রধানমন্ত্রী, আশপাশের মানুষ, আমার ছাত্ররা, সহকর্মীরা, আত্মীয়-পরিজনেরা আছে৷ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তো আছেই৷ এরপর আর অনিরাপদ বোধ করার কোনো কারণ দেখি না৷''

এই খবরে মন্তব্য করেছেন শ্রীকান্ত ঘোষ৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘স্যার, ভালো মানুষ৷ অন্তত নিরস্ত্র মানুষের উপর সশস্ত্র আক্রমণ করেন না৷যারা নিরস্ত্র মানুষের উপর সশস্ত্র আক্রমণ সমর্থন করে, তারা মানুষ নয়, হিংস্র পশু৷''

রাজনীতি

হামলার দিন

শনিবার বিকালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে একটি অনুষ্ঠান চলাকালে এক তরুণ ছুরি নিয়ে অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালায়৷ হামলার পরপরই ফয়জুল নামে ওই তরুণকে ধরে ফেলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা৷ পরে ফয়জুলের মামা, চাচা ও বাবা-মাকেও আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী৷ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা করেছে৷

রাজনীতি

পুলিশ পাহারার মাঝেই হামলা

এ ঘটনায় কর্তব্যরত পুলিশদের ভূমিকা এবং কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে৷ বিশেষ করে ঘটনার সময় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত দুই পুলিশ সদস্যের দূরে দাঁড়িয়ে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকার ছবি (ওপরে) অনেকের মনে হতাশা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে৷ জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ জাফর ইকবাল বিভিন্ন সময়ে হত্যার হুমকি পাওয়ায় ২০১৬ সালে তাঁকে নিরাপত্তা দেয় সরকার৷

রাজনীতি

কারা জড়িত?

ফয়জুল কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত কিনা বা তার সঙ্গে আর কেউ ছিল কিনা এসব বিষয়ে র‌্যাব-পুলিশ এখনও সরাসরি কিছু বলেনি৷ হত্যাচেষ্টার ঘটনায় সিলেটের জালালাবাদ থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে যে মামলা করা হয়েছে, সেখানে ফয়জুলসহ অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে৷

রাজনীতি

ছয়টি জখম

শনিবার হামলার পরই ড. জাফর ইকবালকে বিশেষ হেলিকপ্টারে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে আসা হয়৷ সেখানকার চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের মাথা, পিঠ ও হাতে ছুরির আঘাতের ছয়টি জখম রয়েছে, তবে এখন তিনি আশঙ্কামুক্ত৷ অবশ্য পুরোপুরি সুস্থ হতে আরো কয়েক দিন লাগবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা৷

রাজনীতি

প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালে

দেশের জনপ্রিয় লেখক এবং শিক্ষক ড. জাফর ইকবালকে দেখতে রোববার সিএমইচে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ জাফর ইকবালের স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমিন হক এবং মেয়ে ইয়েশিম ইকবালও তখন সেখানে ছিলেন৷

রাজনীতি

স্ত্রী ইয়াসমিন হক যা বললেন

অধ্যাপক ইয়াসমিন হক রোববার জানিয়েছেন, জাফর ইকবাল এখন শংকামুক্ত৷ শিগগিরই তিনি সুস্থ হয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে যাবেন বলেও আশা প্রকাশ করেছেন ইয়ামিন হক৷ হামলার জন্য পুলিশের ব্যর্থতাকে দায়ী করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি৷

রাজনীতি

চলছে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ

শাহজালাল বিজ্ঞান প্রুযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে শনিবার থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চলছে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ৷ জাফর ইকবালের সহকর্মীরা সোমবার হামলার প্রতিবাদে কর্মবিরতি পালন করেছেন৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির ডাকে সোমবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এ কর্মবিরতির পালিত হয়৷

রাজনীতি

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিবাদ কর্মসূচি

রোববার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট৷ সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরও সেখানে উপস্থিত ছিলেন৷

রাজনীতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ

ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন বিক্ষোভ, মানববন্ধন করেছে৷

রাজনীতি

শাহবাগে মানববন্ধন

হামলার প্রতিবাদে রোববার শাহবাগে জাতীয় যাদুঘরের সামনে মানববন্ধন করেছে গণজাগরণ মঞ্চ৷

আসাদ রাজীব তাঁর সুস্থ হয়ে কর্মস্থলে ফেরাকে সুসংবাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘আপনিসহ সবাই নিরাপদে থাকি, সুস্থ থাকি এটাই তো চাওয়া৷ কিন্তু আপনার নাম আছে, খ্যাতি আছে, তাই আপনার পাশে পুলিশসহ সবাই আছে, কিন্তু যারা আপনার মতো নামি-দামি খ্যাতিমান নয় কিন্তু বিপন্ন বোধ করে, পুলিশ বা রাষ্ট্রের কাছেও তেমন গুরুত্ব পান না, যাদের উপর বোমা মারলেও গণমাধ্যমের তেমন জোর মনোযোগ পান না, যারা প্রতিনিয়ত বেপরোয়া গাড়ীর চাকার নিচে ভর্তা হয়ে মরছে, তাদের কী হবে?''

রাহুল রায় সাগর লিখেছেন, ‘‘মানুষ চিন্তা করে চাঁদে যাওয়ার, আমরা চিন্তা করি কে আস্তিক কে নাস্তিক তা প্রমাণ করার৷ মেডিকেল, ডেন্টাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এসএসসি, এইচএসসি এসব প্রশ্ন আউট যারা করে, তাদের কেউ কোপায় না কেন?''

প্রবাল চাকমা লিখেছেন, ‘‘সত্যিকারের মানুষ কাকে বলে জাফর ইকবাল স্যার বুঝিয়ে দিলেন এ কথাগুলোর মাধ্যমে ৷''

জাহিদুর রহমান শাকিল অধ্যাপক জাফর ইকবালের উপর হামলার ঘটনাটিকে নাটক বলে উল্লেখ করেছেন৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘যদি জাফর ইকবালকে সত্যি সত্যি আঘাত করা হয়ে থাকে, তবে তার এত তাড়াতাড়ি সুস্থ হওয়ার কথা না৷ যেখানে সাকিব আল হাসানের আঙুলে ৪টা সেলাই শুকাতে কত সময় লাগছে, সেখানে জাফর ইকবালকে নাকি ২৬টা সেলাই করা হয়েছে, তা-ও আবার মাথায়৷ এবারের মেরিল প্রথম আলো অনুষ্ঠানে সেরা অভিনেতা হিসেবে পুরস্কারটি জাফর ইকবালেরই প্রাপ্য৷''

নেতিবাচক কমেন্টগুলোর নীচে মন্তব্য করেছেন জুলফিকার ইসলাম আজাদ৷ তিনি ব্যঙ্গ করে লিখেছেন,‘‘মন্তব্যগুলো পড়লেই বোঝা যায়, এই দেশে সবাই সভ্য৷ শুধু জাফর ইকবাল স্যার অসভ্য, যত দোষ এই ব্যক্তির৷ তা এত সভ্য থাকতে দেশে এত হানাহানি, মারামারি লুণ্ঠন কেন? সভাই এত সভ্য-ধার্মিক হলে সরকার যতই খারাপ হোক, সমাজ তথা রাষ্ট্র এমনিতেই ভালোভাবে চলতো৷ তাই নয় কি ?''

মুত্তাসিন মেহেদী লিখেছেন, ‘‘নাস্তিক কাফের মুশরিক তারাই, যারা পিছন থেকে কাপুরুষের মতো নিরস্ত্র ব্যক্তির উপর হামলা করে৷ এদের নিয়ে ভয়ের কিছু নেই৷ এরা মোটেও মুসলিম না৷ এরা নিজেদের জিহাদি ভাবে৷ মনে করে ইসলাম ধর্ম এরা নিজেরাই রক্ষা করবে৷''

সংকলন: অমৃতা পারভেজ

সম্পাদনা: আশীষ চক্রবর্ত্তী