মান্টা রে সংরক্ষণের অভিনব উদ্যোগ

পরিবেশ সংরক্ষণ মানে বিশাল কর্মযজ্ঞ৷ দক্ষিণ অ্যামেরিকার দেশ পেরুতে এক নারী একক প্রচেষ্টায় লুপ্তপ্রায় প্রজাতির সামুদ্রিক মান্টা রে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন৷ এ কাজে শিশুদেরও শামিল করছেন তিনি৷

জায়ান্ট ওশেয়ানিক মান্টা রে বা সামুদ্রিক শঙ্কর মাছ তার পাখা মেলে ধরলে সাত মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে৷ ওজন হতে পারে প্রায় দু'টন৷ মাথার কানকোর কারণে তাকে জার্মান ভাষায় শয়তানও বলা হয়৷ পেরুর কার্স্টিন ফর্সবার্গ ২০১২ সাল থেকে এই প্রজাতির মাছের সংরক্ষণের জন্য সংগ্রাম চালাচ্ছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘গোটা বিশ্বে এই প্রজাতি লুপ্তপ্রায় হয়ে উঠছে৷ কখনো তাদের বেছে বেছে ধরা হয়, কখনো বা জালে উঠে আসে৷ এটা থামাতে কিছু করতে হবে৷ পেরুতে মান্টা রে মাছের কোনো সুরক্ষা নেই৷ তাই এই প্রজাতির সুরক্ষায় আমাদের কাজ শুরু করতে হয়েছে৷''

অন্বেষণ | 26.05.2015

এই জীববিজ্ঞানী বিশ্বের সম্ভবত সবচেয়ে বড় জায়ান্ট ওশেয়ানিক মান্টা রে-র সম্ভার বাঁচাতে চান৷ এই মাছ দেখে মানুষ ভয় পেলেও তারা মানুষের জন্য বিপজ্জনক নয়৷ পেরু ও ইকুয়েডরের উপকূলের মাঝে সমুদ্রে প্ল্যাংকটন বা সামুদ্রিক উদ্ভিদের বিপুল সম্ভার রয়েছে৷ মাছেদের জন্য যা আদর্শ পরিবেশ

সমাজ-সংস্কৃতি

অনুভব করতে পারে মাছ

একসময় মাছকে মনে করা হতো অনুভূতিহীন প্রাণী৷ কিন্তু ধীরে ধীরে বিজ্ঞানীরা জানতে পারছেন যে, মাছেরও আছে নিজেদের সামাজিক জীবন৷ তারা শোক প্রকাশ করে, একসাথে শিকারে যায় এমনকি বিভিন্ন অদ্ভুত রকমের যৌন সম্পর্কেও জড়ায়৷ মাছের এই অজানা জীবন দেখতে হলে যেতে হবে সাগরের গভীরে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

মাছেরও আছে দেহরক্ষী!

মাছেরাও একে অপরকে রক্ষা করে৷ব়্যাবিট ফিশ বা খরগোশ মাছরা দুপুরে একসাথে খেতেও যায়৷ একজন যখন গভীর জলে প্রবালপ্রাচীরে জন্মানো শেওলা খেতে ব্যস্ত, অন্যজনের চোখ তখন শিকারিদের সন্ধানে৷ এভাবে ভাগাভাগি করেই খাবার খায় খরগোশ মাছ৷ এতদিন শুধু উচ্চবুদ্ধির প্রাণীদের মধ্যেই এমন সামাজিকতা দেখা যেতো৷

সমাজ-সংস্কৃতি

ভয়ে জড়োসড়ো

অনেকদিন ধরে মনে করা হতো মাছেরা ভয় পায় না৷ কারণ, ভয় পাওয়ার জন্য মস্তিষ্কের যে অংশ দায়ী, তা মাছের নেই৷ কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, মাছেরাও ভয় পায়৷ শুধু তাই না, ব্যথা এবং চাপ অনুভব করার ক্ষমতাও আছে মাছের৷ এ নিয়ে অবশ্য বিজ্ঞানীদের মধ্যে বেশ বিতর্কও চলছে৷ মৎসকল্যাণ কর্মীরা মাছ শিকার বিষয়ে নতুন করে ভাবার কথাও বলছেন৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বাসা ভাগাভাগি

আড্ডা তো আমাদের খুবই পছন্দ৷ ছুটির দিনে বন্ধুদের বাসায় নিয়ে এসে গল্প করতে কার না ভালো লাগে৷ ক্লাউন ফিশ বা সং মাছ অবশ্য আড্ডা দেয় কিনা জানা যায়নি৷ তবে তাদের বাসায় কিন্তু বন্ধুবান্ধবের অভাব হয় না৷ বিষাক্ত এক ধরনের জলজ ফুলগাছে বাসা বানায় এই মাছ, যা শিকারিদের দূরে রাখে৷ প্রায়ই এক মাছের বাসায় কয়েকদিন বেড়াতে আসে অন্য কোনো এক মাছ৷

সমাজ-সংস্কৃতি

শিকারি বন্ধু

গ্রাউপার মাছ দেখতেই কেমন বদখত৷ তার মধ্যে আবার মোরে ঈলের সাথে জুটি বেঁধে শিকারে গেলে অন্যদের তো ভয়েই পালানোর কথা৷ গবেষকরা বলছেন, গ্রাউপার মাছ শিকারে যাওয়ার সময় মাথা ঝাঁকায়৷ ঈল সে ইশারা বুঝতে পেরে অন্য মাছের বাসায় ঢুকে পড়ে৷ দুর্ভাগা মাছ হয় বাসার ভেতরেই ঈলের খাবারে পরিণত হয়, নাহলে পালাতে গিয়ে ঢুকে পরে বাইরে হাঁ করে থাকা গ্রাউপারের মুখে৷


প্রতিবার সমুদ্রের নীচে নামলে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা হয়৷ অনেক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানও অর্জন করা যায়৷ কার্স্টিন ফর্সবার্গ বলেন, ‘‘প্রত্যেক স্টিং রে-র পেটের একেবারে নিজস্ব নক্সা রয়েছে, একেবারে আঙুলের ছাপের মতো৷ তাই ডুবুরি হিসেবে আমরা তাদের পেটের ছবি তুলি, যাতে তাদের শনাক্ত করা যায়৷''

পেরুতে কার্স্টিন ফর্সবার্গই প্রথম ব্যক্তি, যিনি জায়ান্ট ওশেয়ানিক মান্টা রে-র সংখ্যা নিয়ে সামগ্রিক গবেষণা করছেন৷ সংগৃহীত তথ্য অত্যন্ত দুশ্চিন্তার কারণ বটে৷ তিনি বলেন, ‘‘এই প্রজাতির বংশবৃদ্ধি করতে অনেক সময় লাগে৷ প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর তাদের বাচ্চা হয়৷ ১০ বছর বয়সে প্রথমবার সন্তান ধারণ করতে পারে তারা৷''

পেরুর রাজধানী লিমা থেকে তিনি তাঁর ‘প্ল্যানেট ওশেন' এনজিও-র মাধ্যমে সমুদ্র ও উপকূলবর্তী এলাকার সংরক্ষণের প্রকল্প চালান৷ এই কাজের জন্য তিনি অনেক স্বীকৃতি ও পুরস্কার পেয়েছেন৷ এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থমূল্যের পুরস্কারটি হলো ‘দ্য রোলেক্স অ্যাওয়ার্ড' – এক লক্ষ সুইস ফ্রাঁ৷

‘প্ল্যানেট ওশেন' এনজিও ৫০টিরও বেশি স্কুলের সঙ্গে কাজ করে৷ কার্স্টিন ফর্সবার্গ সমুদ্র সম্পর্কে শিক্ষার এক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেছেন, যার আওতায় স্কুলের ক্লাসেও সমুদ্র সংরক্ষণ নিয়ে চর্চা হয়৷ তিনি ওয়ার্কশপ আয়োজন করেন এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেন৷ খেলাচ্ছলে শিক্ষায় বিশ্বাস করেন তিনি৷ তিনি বাচ্চাদের বিভিন্ন ভূমিকা দিয়ে নাটকের মতো করে সব শেখান৷ এমনকি বংশবৃদ্ধির খেলাও চলে৷

জেলেরা দ্রুত স্টিং রে ও হাঙর মাছ ধরে ফেলেছে৷ তাদের বংশবৃদ্ধি হওয়া পর্যন্ত তাদের মাঠের গণ্ডীর বাইরে অপেক্ষা করতে হবে৷ সব বাচ্চাই সেটা বোঝে৷

জীবন্ত জায়ান্ট ওশেয়ানিক মান্টা রে- মূল্য মরা মাছের তুলনায় বেশি৷ এভাবে কার্স্টিন ফর্সবার্গ শিশুদের সমুদ্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে দূত হিসেবে গড়ে তুলতে চান৷ এভাবে মান্টা রে প্রজাতিরও উপকার হবে৷ বিশালাকার এই প্রাণীকে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি৷

প্রতিবেদন: বিয়াংকা কপশ/এসবি

আরো প্রতিবেদন...