মিয়ানমার প্রথমে হিন্দু রোহিঙ্গাদের কেন ফেরত নিচ্ছে?

আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু হবে৷ তবে মিয়ানমার ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা শুরুতে মাত্র ৪৫০ জন হিন্দু রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে৷ মিয়ানমারের এই ঘোষণা কেন? এর নেপথ্যেই বা কী?

বুধবার মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী ড. উইন মিয়াত আইয়ি নেপিদোতে মিয়ানমারের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠকে জানিয়েছেন, প্রত্যাবাসনের প্রথম ধাপে, অর্থাৎ ২২ জানুয়ারি ৪৫০ জন হিন্দু শরণার্থীকে বাংলাদেশ থেকে ফেরত নেয়া হবে৷ মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল নিউ লাইটস অফ মিয়ানমার এ খবর দিয়ে বলেছে, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান পুরো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখার তাগিদ দিয়েছেন৷

এদিকে প্রথম দফায় ফেরত পাঠানোর জন্য প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর নাম তালিকাভূক্ত করেছে  বাংলাদেশ৷

এখন লাইভ
01:34 মিনিট
মিডিয়া সেন্টার | 14.12.2017

দেশে ফিরছে হিন্দু শরণার্থীরা

শুক্রবার দুপুরে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ শেষে সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানান, ‘‘আগামী ২২ জানুয়ারির মধ্যে এক লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের ফেরত পাঠানো হবে৷ এ জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার৷ ইতিমধ্যে এর জন্য একটি ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ' গঠন করা হয়েছে৷ ওয়ার্কিং গ্রুপের মাধ্যমে আজ-কালের মধ্যে এক লাখ রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমার সরকারকে হস্তান্তর করা হবে৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘আমরা মনে করি, রোহিঙ্গারা সম্মানের সঙ্গে মিয়ানমারে ফেরত যাবে৷ এ জন্য প্রত্যাবাসন চুক্তি ও ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ' গঠন করা হয়েছে৷ এই দল দ্রুত সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের ফিরিয়ে নেওয়ার কাজ করছে৷ শেখ হাসিনার সরকার যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের নিরাপদে এবং নিজ দেশে ফেরত পাঠাবে৷ সেজন্য জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় কাজ করে যাচ্ছে যৌথ বা ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ'৷''

রাখাইনে নির্যাতনের মুখে ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে ৬ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী এসেছে বাংলাদেশে৷ রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি সই হয় গত ২৩ নভেম্বর৷ সেখানে দু'মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার কথা বলা হয়৷

এখন লাইভ
02:15 মিনিট
মাল্টিমিডিয়া | 29.12.2017

‘২২ জানুয়ারি থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার অবস্থা তৈরি হয়নি’

এছাড়া দু'সপ্তাহের মধ্যে একটি যৌথ ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ' গঠনের কথা বলা হলেও, তা গঠন করতে লেগে যায় তিন সপ্তাহ৷ তারা এখন কাজ করছেন৷ কিন্তু রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে যে ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট' চুক্তি হওয়ার কথা, তা এখনো হয়নি৷ এমনকি মিয়ানমার বা বাংলাদেশের কোনো অংশই ঐ ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ' পরিদর্শন করেনি৷ বাংলাদেশ চাইছে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে যেন এই ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ'-এর বৈঠক হয়৷

মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক ডিফেন্স এটাশে মেজর জেনারেল (অব.) শহীদুল হক ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এখন পর্যন্ত যা কাজ হয়েছে তাতে ২২ জানুয়ারি থেকে প্রকৃত অর্থে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার বাস্তব অবস্থা তৈরি হয়নি৷ তাঁদের নিয়ে কেথায় রাখা হবে, তাঁদের নিরপত্তা ও অধিকার কী হবে – তা কিছুই নিশ্চিত নয়৷ তাই  ২২ জানুয়ারি ৪৫০ জন হিন্দু রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়ার ঘোষণা দিয়ে মিয়ানমার একটা চালবাজি করছে৷ তারা চাইছে আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে৷ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখাতে৷ এখন তো সু চির ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা উঠছে৷ আসলে মুসলিম রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার কোনো ইচ্ছা মিয়ানমারের আছে বলে আমার মনে হয় না৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘এই ৪৫০ জন হিন্দু রোহিঙ্গাদের নিয়েও কোথায় রাখা হবে, তা আমরা জানি না৷ আমার ধারণা, হিন্দুপাড়া সংলগ্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাখা হবে৷ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম যদি খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন যে, নিরাপত্তার কারণে রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ ফেরত যেতে চায় না৷''

এখন লাইভ
01:39 মিনিট
মাল্টিমিডিয়া | 29.12.2017

‘হিন্দু রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে তাঁদের আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ র...

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা হিন্দু রোহিঙ্গাদের বড় অংশটি আশ্রয় নিয়েছে কুতুপালং হরিমন্দির এলকায়৷ ওই এলাকায় মোট ৩৯৭টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে৷ মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক বাবুল শর্মার বাড়ির সামনেও আশ্রয় নিয়েছে ১৮টি পরিবার৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘এখানে আশ্রয় নেয়া হিন্দু রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে তাঁদের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন৷ তাঁরাও নিজস্ব উধ্যোগে তালিকা পাঠাচ্ছেন মিয়ানমারে৷ তাঁরা জানেন যে, হিন্দু রোহিঙ্গাদের আগে ফেরত নেয়া হবে৷ তাঁরা প্রায় সবাই মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান৷''

২৩ নভেম্বরের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, মিয়ানমার ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের ও এ বছরের ২৫ আগস্টের পর যাঁরা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন, তাঁদের ফেরত নেবে৷ মিয়ানমারে ফেরত নেয়ার পর রোহিঙ্গাদের প্রথমে সাময়িক আশ্রয় কেন্দ্রে রাখা হবে৷ স্মারক সই করা হয়েছে ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের চুক্তির আলোকে৷ এবারের সমঝোতা স্মারক মিয়ানমার শেষ পর্যন্ত মানলে বাংলাদেশ থেকে তারা সাত লাখের মতো রোহিঙ্গা ফেরত নেবে৷ কিন্তু বাংলাদেশে এখন রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে সাড়ে ১১ লাখ৷ ২০১৬ সালের আগে আসা চার লাখ রোহিঙ্গা ফেরত নেয়ার কোনো কথা চুক্তিতে নেই৷

মিয়ানমার কি আদৌ সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী কাজ করবে? আপনার মন্তব্য জানান নীচের ঘরে৷

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস

স্বাধীনতার আগে

বর্তমানে মিয়ানমার নামে পরিচিত দেশে ১২ শতক থেকে মুসলমানরা বাস করছে বলে দাবি অনেক ইতিহাসবিদ ও রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর৷ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন বলছে, মিয়ানমার যখন ব্রিটিশ শাসনের অধীন (১৮২৪-১৯৪৮) ছিল তখন বর্তমানের ভারত ও বাংলাদেশ থেকে অনেকে শ্রমিক হিসেবে সেখানে গিয়েছিল৷ তবে তারা যেহেতু ব্রিটিশ আমলে এসেছে তাই স্বাধীনতার পর মিয়ানমার তাদের অবৈধ হিসেবে গণ্য করে৷ প্রতিবেদন পড়তে ‘+’ চিহ্নে ক্লিক করুন৷

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস

রোহিঙ্গা সাংসদ

বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের সংসদকে জানান, বার্মায় ১৯৫১ সালের নির্বাচনে পাঁচজন ও ১৯৫৬ সালে ছ’জন রোহিঙ্গা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন৷ সব মিলিয়ে মিয়ানমার সংসদে মোট ১৭ জন রোহিঙ্গা সাংসদ ছিলেন বলে জানান তিনি৷ এর মধ্যে দুজন ছিলেন নারী৷

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস

অভ্যুত্থান

১৯৬২ সালে বার্মায় সামরিক অভ্যুত্থান হয়৷ এরপর সব নাগরিকদের জাতীয় নিবন্ধন কার্ড করতে বলা হলেও রোহিঙ্গাদের দেয়া হয়েছিল বিদেশি পরিচয়পত্র৷ ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য চাকরি ও পড়াশোনার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়৷ ছবিটি ১৯৬২ সালের ৪ মার্চ তৎকালীন বার্মার রাজধানী রেঙ্গুন থেকে তোলা৷

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস

প্রথমবার বিতাড়ন

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে তাড়াতে ১৯৭৭ সালে নির্যাতন শুরু করা হয়৷ ফলে ১৯৭৮ সালের মে মাসের মধ্যে প্রায় দু’লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়েছিল৷ এরপর জুলাইতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়৷ জাতিসংঘও মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করেছিল৷ ফলে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল মিয়ানমার৷

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস

‘গোপন’ চুক্তি

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হওয়া ঐ চুক্তির উপর ‘সিক্রেট’ অর্থাৎ ‘গোপন’ শব্দটি লেখা ছিল৷ ২০১৪ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়টি চুক্তিটি প্রকাশ করে৷ এতে দেখা যায়, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে যাঁদের পরিবারের একসময় জাতীয় নিবন্ধন কার্ড ছিল তাঁদের মিয়ানমার সরকার ‘বার্মার বৈধ বাসিন্দা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে৷ চুক্তিটি পড়তে উপরে (+) চিহ্ন ক্লিক করুন৷

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস

রাষ্ট্রহীন

১৯৮২ সালে পাস হওয়া নতুন নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের বস্তুত রাষ্ট্রহীন করে দেয়া হয়৷ ঐ আইনে মিয়ানমারের ১৩৫টি জাতিগত গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেয়া হয়, যার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম নেই৷ এই আইনের কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য পড়াশোনা, চাকরি, ভ্রমণ, ধর্মীয় রীতিনীতি পালন, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া ইত্যাদি সীমিত হয়ে যায়৷ এছাড়া রোহিঙ্গাদের ভোটের অধিকারও কেড়ে নেয়া হয়৷

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস

দ্বিতীয় পর্যায়ের বিতাড়ন

১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে আবার রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন শুরু করে মিয়ানমার৷ ফলে প্রায় আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়েছিল৷ এরপর তাদের ফিরিয়ে নিতে দুই দেশ একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছিল৷ বিবৃতিতে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের ‘মিয়ানমারের বাসিন্দা’ এবং ‘মিয়ানমার সমাজের সদস্য’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল৷

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস

সবশেষ ঘটনা

গত আগস্টের এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে অভিযান শুরু করে৷ ইতিমধ্যে এই অভিযানকে ‘জাতিগত নিধন’ বলে আখ্যায়িত করেছে জাতিসংঘ৷ নিপীড়ন থেকে বাঁচতে ছয় লক্ষ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে৷ তবে তাদের ফিরিয়ে নিতে দু’দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে৷

আমাদের অনুসরণ করুন