ম্যারাথন আলোচনা শেষে চুক্তিতে পৌঁছালেন ইইউ নেতারা

সারা রাত আলোচনা শেষে একটি অভিবাসন চুক্তিতে পৌঁছেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা৷ শুরুতে ইটালি কোনো চুক্তিতে সই না করার হুমকি দিয়েছিল৷ পরে অন্য দেশগুলো তাদের দাবি মেনে নেয়ায় পরিস্থিতি শান্ত হয়৷

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে ব্রাসেলসে একের পর এক বৈঠকে মিলিত হন ইইউ নেতারা৷ জার্মান চ্যান্সেলের আঙ্গেলা ম্যার্কেলের জন্য বৈঠকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷ কারণ, কঠোর অভিবাসন নীতি গ্রহণের মাধ্যমে জার্মানিতে শরণার্থী আসার হার কমাতে তাঁর উপর চাপ ছিল৷ ম্যার্কেলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হর্স্ট সেহোফারের কাছ থেকে এই চাপ ছিল৷

শরণার্থী প্রবেশ ঠেকাতে সেহোফার জার্মানির সীমান্ত কড়া করার পক্ষে৷ কিন্তু ম্যার্কেল এই সমস্যার একটি ইউরোপীয় সমাধানের কথা বলেছিলেন৷ তাঁর এই চাওয়ার জায়গা ছিল বৃহস্পতিবারের ব্রাসেলসের ইইউ বৈঠক৷ সেখানে ইইউ পর্যায়ে একটি চুক্তি সই করতে না পারলে ম্যার্কেলের জোট সরকার টিকিয়ে রাখা কঠিন হওয়ার আশংকা ছিল৷

এই অবস্থায় ইইউ নেতারা একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছেন৷ সেহোফারের দলের এক উচ্চ পর্যায়ের নেতা এই চুক্তিকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন৷

কী আছে চুক্তিতে?

  • ইইউতে পৌঁছানো শরণার্থীদের ভাগ করে নিতে রাজি হয়েছেন নেতারা৷ তবে এটি হবে স্বেচ্ছা ভিত্তিতে৷
  • ইইউতে ‘নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্র' খোলা হবে, যেখান থেকে আশ্রয়ের আবেদন যাচাই করা হবে৷
  • ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার করা নৌকায় থাকা শরণার্থীদেরও বিভিন্ন দেশ স্বেচ্ছাভিত্তিতে নিতে রাজি হয়েছে৷ এটি ইটালির অন্যতম প্রধান দাবি ছিল৷ সম্প্রতি ইটালি শরণার্থী বোঝাই দুটি জাহাজ তাদের উপকূলে ভিড়তে দেয়নি৷ পরে সেগুলোর একটি গ্রহণ করতে রাজি হয় স্পেন, অন্যটি গ্রহণ করে মাল্টা৷
  • অভিবাসীদের ইউরোপগামী জাহাজে চড়তে নিরুৎসাহিত করতে ইইউ'র বাইরে, বিশেষত উত্তর আফ্রিকায় ‘জাহাজ অবতরণ প্ল্যাটফর্ম' স্থাপন করতে সম্মত হয়েছেন ইইউ নেতারা৷
  • ইউরোপে শরণার্থী আসা ঠেকাতে তুরস্ককে আরও তিন বিলিয়ন ইউরো দিতে সম্মত হয়েছেন নেতারা৷ ২০১৬ সালে তুরস্কের সঙ্গে ইইউ একটি চুক্তি সই করেছিল৷ তার আওতায় প্রথমবারও তিন বিলিয়ন ইউরো পেয়েছিল তুরস্ক৷
  • ম্যার্কেল জানিয়েছেন, আশ্রয়প্রার্থীরা যেন নিজেদের ইচ্ছামতো ইইউ'র বিভিন্ন দেশে ঘুরতে না পারেন, সে বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে রাজি হয়েছেন নেতারা৷
প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

গৃহহীন যারা

সহিংসতা, যুদ্ধ ও সংঘাতের ফলে বিশ্বে এখন ৬৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন, অর্থাৎ ৬ কোটি ৮৫ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় আছেন৷ মঙ্গলবার জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক সংস্থা ইইএনএইচসিআর এ কথা জানিয়েছে৷ জাতিসংঘের হিসেব মতে, ২০১৬ সালে সারা বিশ্বে ৬ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছিল৷ সেবছর মূলত মিয়ানমার থেকেই বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল৷ .

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

দু’ সেকেন্ডে একজন

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, গতবছরই ১ কোটি ৬২ লক্ষ মানুষ নতুন করে গৃহহীন হয়েছে৷ এদের মধ্যে যাঁরা প্রথমবার বাধ্য হয়ে ঘর ছেড়েছেন, তাঁরাও যেমন আছেন, তেমনি আছেন যাঁরা আগে থেকেই উদ্বাস্তু, তাঁরাও৷ অর্থাৎ প্রতিদিন ৪৪,৪০০ মানুষ বিতাড়িত হচ্ছেন এবং প্রতি দু'সেকেন্ডে ১ জন করে গৃহহীন হচ্ছেন৷ যুদ্ধ, হিংসা এবং উৎপীড়নের জন্য ৬ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

দেশের মধ্যে

অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ বা হিংসার জন্য দেশের ভেতরেই অনেক মানুষ বাস্তুভিটা ছেড়ে অন্য জায়গায় যেতে বাধ্য হয়৷ তাঁদের বলা হয় আইডিপি (ইন্টারনালি ডিসপ্লেসড পিপল)৷ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বিশ্বে প্রায় ৪কোটি আইডিপি ছিল৷ এই সংখ্যাটা আগের বছরের তুলনায় কমেছে৷ কলম্বিয়া, সিরিয়ায় এদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

সিরিয়ার দুর্দশা

গত ৭ বছর ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার ওপর দিয়ে নানা ঝড় বয়েছে৷ ২০১৭ সালের শেষ অবধি প্রায় ৬৩ লাখ মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল৷ এছাডা়ও সিরিয়াতে প্রায় ৬২ লাখ মানুষ দেশের ভেতরেই উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছে৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

আফগানিস্তান

সিরিয়ার পরেই যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের স্থান৷ প্রচুর মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আফগানিস্তান থেকে পালাচ্ছেন৷ বিশ্বব্যাপী নজিরবিহীনভাবে যুদ্ধ, সহিসংতা ও উৎখাতের কারণে প্রতিদিনই রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে৷ অন্যান্য দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে বিভিন্ন সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরছে যুদ্ধবিধ্বস্ত এসব মানুষ৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

দক্ষিণ সুদানের অবস্থা

দক্ষিণ সুদানে গৃহযুদ্ধ চলছে ২০১৩ সাল থেকে৷ গৃহযুদ্ধের কবলে পড়ে গত কয়েক বছরে দেশটির লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে৷ জাতিসংঘের মতে, এই দেশ সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে আছে৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

তুরস্ক

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুরস্কে প্রচুর শরণার্থী রয়েছে৷ ২০১৭ সালের শেষের দিক পর্যন্ত তুরস্কে প্রায় ৩৫ লক্ষ শরণার্থী ছিল৷ তার মধ্যে অধিকাংশই সিরিয়ার মানুষ৷

প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন ঘরছাড়া

গরিব দেশেও

অ্যামেরিকা আর ইউরোপ যাঁরা পৌঁছচ্ছেন, তাঁরা ছাড়াও অনেক শরণার্থী কম আয় সম্পন্ন বা মধ্যম আয় সম্পন্ন দেশগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছেন৷ জাতিসংঘ শরণার্থী কমিশন (ইউএনএইচসিআর) বলছে, প্রায় ৮৫ শতাংশ শরণার্থী উন্নয়নশীল দেশে আশ্রয় নিচ্ছেন, যাঁরা খুবই দরিদ্র৷ এদের মধ্যে আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, মিয়ানমার, সোমালিয়া, সুদান এবং কঙ্গো, উগান্ডার মানুষই বেশি৷

চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি একটি ‘ভালো সংকেত' বলে মন্তব্য করেছেন ম্যার্কেল৷ তবে এখনও যে মতপার্থক্যগুলো আছে, তা দূর করতে আরও অনেক কাজ করতে হবে বলেও মনে করেন তিনি৷

ইটালির প্রধানমন্ত্রী জুসেপে কন্টে চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন৷ ‘‘ইটালি আর একা নয়,'' বলে মন্তব্য করেছেন তিনি৷

অথচ বৃহস্পতিবার আলোচনার শুরুতে ইটালি জানিয়ে দিয়েছিল যে, ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার হওয়া শরণার্থীদের গ্রহণে অন্য দেশগুলো ইটালিকে সহায়তা না করলে, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইইউ'র কোনো চুক্তিতে সই করবে না তারা৷ পরে ইইউ নেতারা ইটালির দাবি মেনে নেন৷

জেডএইচ/এসিবি (রয়টার্স, এএফপি, এপি, ডিপিএ)

আমাদের অনুসরণ করুন