ম্যার্কেলের উদ্বাস্তু নীতির কড়া সমালোচনা করলেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের উদ্বাস্তু নীতিকে ‘‘বিপর্যয়ের তুল্য ভ্রম'' হিসেবে বর্ণনা করেছেন৷ এর ফলে আরো বেশি দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরিত্যাগ করবে, বলে তাঁর ধারণা৷

ডোনাল্ড ট্রাম্পের যৌথ সাক্ষাতৎকার নেয় জার্মানির ‘‘বিল্ড'' ট্যাবলয়েড পত্রিকা ও ব্রিটেনের ‘‘দ্য টাইমস অফ লন্ডন'' পত্রিকা৷ সাক্ষাৎকারটি রবিবার উভয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়৷

‘‘(ম্যার্কেল) একটি বিপর্যয়ের তুল্য ভুল করেছেন, বলে আমার ধারণা, আর সেটি হলো এই সব বেআইনি (অভিবাসীদের) গ্রহণ করা, যে যেখান থেকে আসুক, সবাইকে নেওয়া'', বলেন ট্রাম্প৷ ‘‘কেউ জানে না, তারা কোথা থেকে এসেছে৷ কাজেই উনি একটি বিপর্যয়ের তুল্য ভুল করেছেন বলে আমার মনে হয়, একটা খুব খারাপ ভুল৷''

বার্লিনে গত ডিসেম্বরের সন্ত্রাসী আক্রমণ থেকে জার্মানি ম্যার্কেলের উদ্বাস্তু নীতির ফলশ্রুতি সম্পর্কে ‘‘একটি স্পষ্ট ধারণা পেয়েছে'', বলেন ট্রাম্প৷

অপরদিকে তিনি যোগ করেন যে, তাঁর ম্যার্কেলের জন্য ‘‘গভীর শ্রদ্ধা আছে'' এবং এই ‘‘দারুণ নেতার'' উপর পূর্ণ আস্থা নিয়েই তিনি তাঁর কর্মকাল শুরু করবেন৷ কিন্তু সেই আস্থা বেশিদিন না-ও টিকতে পারে, এমন আভাস দেন ট্রাম্প৷

ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক

ট্রাম্প এই অভিপ্রায় ঘোষণা করেন যে, তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাজ্যকে একটি বাণিজ্যিক চুক্তির প্রস্তাব দেবেন, যা ব্রেক্সিটকে একটি ‘‘খুব ভালো ব্যাপার'' করে তুলতে সাহায্য করবে৷ ‘‘(বাণিজ্যিক চুক্তিটি) শীঘ্র সম্পাদন করার জন্য আমরা খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করব৷ (চুক্তিটি) দু'পক্ষের জন্যই ভালো হবে'', বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প৷

‘‘আমি (ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে-র) সঙ্গে সাক্ষাৎ করব৷ উনি একটি সাক্ষাতের জন্য অনুরোধ করছেন এবং আমি হোয়াইট হাউসে যাবার পর পরই আমরা সাক্ষাৎ করব ও আমরা খুব শীঘ্র কিছু একটা করে ফেলব, বলে আমার ধারণা'', জানান ট্রাম্প৷

অন্যান্য দেশও ইইউ ছাড়বে

Polen Soldaten stehen bei Brückenbaustelle während NATO Anaconda-16 Übung in Chelmno

অভিবাসনের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অপরাপর দেশও ব্রিটেনের পন্থা নেবে, বলে ট্রাম্প সাবধান করে দেন৷

‘‘এটা খুবই কঠিন বলে আমার ধারণা'', বলেন ট্রাম্প; ‘‘জনতা অথবা দেশ তাদের নিজেদের সত্তা চায় আর যুক্তরাজ্য তাদের নিজেদের সত্তা চেয়েছিল৷''

‘‘ইউরোপের বিভিন্ন অংশে যদি উদ্বাস্তুরা (বিপুল সংখ্যায়) আসতে থাকে....তাহলে (ইউরোপ বা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে) একত্রিত করে রাখা খুব শক্ত হবে, কেননা জনতা (উদ্বাস্তুদের আগমনের ব্যাপারে) ক্রুদ্ধ৷''

ট্রাম্প বলেন যে, ২০১৫ সালে উদ্বাস্তুদের ব্যাপক আগমন ছিল ‘‘তেলের শেষ ফোঁটা, যার ফলে পুরো পিপেটাই উপছে পড়ে'' এবং ব্রিটিশ ভোটারদের ২৪শে জুনের গণভোটে ইইউ ত্যাগ করার সপক্ষে ভোট দিতে প্রতীত করে৷

‘‘(ব্রিটেন বা ব্রিটিশরা) যদি সব উদ্বাস্তুদের নিতে বাধ্য না হত, এতজনকে, তার সঙ্গে জড়িত সব সমস্যা সমেত....তাহলে কোনো ব্রেক্সিট ঘটত না, বলে আমার ধারণা৷ ওটাই ছিল সেই শেষ তৃণ, যার চাপে উটের পিঠ ভেঙে যায়'', অন্য একটি প্রবচন ব্যবহার করে বলেন ট্রাম্প৷

সমাজ

যুদ্ধ এবং দারিদ্র্যতা থেকে পালানো

২০১৪ সালের শেষের দিকে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চতুর্থ বছরে পা দেয়ার প্রাক্কালে এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলে তথাকথিত ‘ইসলামিট স্টেট’-এর বিস্তার ঘটার পর সিরীয়দের দেশত্যাগের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়৷ একইসময়ে সহিংসতা এবং দারিদ্র্যতা থেকে বাঁচতে ইরাক, আফগানিস্তান, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া, নিগার এবং কসভোর অনেক মানুষ ইউরোপমুখী হন৷

সমাজ

সীমান্তের ওপারে আশ্রয় খোঁজা

সিরীয় শরণার্থীদের অধিকাংশই ২০১১ সাল থেকে সে দেশের সীমান্ত সংলগ্ন তুরস্ক, লেবানন এবং জর্ডানে আশ্রয় নিতে শুরু করেন৷ কিন্তু ২০১৫ সাল নাগাদ সেসব দেশের শরণার্থী শিবিরগুলো পূর্ণ হয়ে যায় এবং সেখানকার বাসিন্দারা সন্তানদের শিক্ষা দিতে না পারায় এবং কাজ না পাওয়ায় এক পর্যায়ে আরো দূরে কোথাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন৷

সমাজ

পায়ে হেঁটে লম্বা পথ পাড়ি

২০১৫ সালে ১৫ লাখের মতো শরণার্থী ‘বলকান রুট’ ধরে পায়ে হেঁটে গ্রিস থেকে পশ্চিম ইউরোপে চলে আসেন৷ সেসময় ইউরোপের শেঙেন চুক্তি, যার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অধিকাংশ দেশের মধ্যে ভিসা ছাড়াই চলাচাল সম্ভব, নিয়ে প্রশ্ন ওঠে৷ কেননা শরণার্থীরা গ্রিস থেকে ধীরে ধীরে ইউরোপের অপেক্ষাকৃত ধনী রাষ্ট্রগুলোর দিকে আগাতে থাকেন৷

সমাজ

সমুদ্র পাড়ির উন্মত্ত চেষ্টা

সেসময় হাজার হাজার শরণার্থী ‘ওভারক্রাউডেড’ নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে শুরু করেন৷ লিবিয়া থেকে ইটালি অভিমুখী বিপজ্জনক সেই যাত্রায় অংশ নিতে গিয়ে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে সাগরে ডুবে যায় অন্তত আটশ’ মানুষ৷ আর বছর শেষে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় চার হাজার৷

সমাজ

সীমান্তে চাপ

ইউরোপের বহির্সীমান্তে শরণার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় কয়েকটি রাষ্ট্র চাপে পড়ে যায়৷ হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া, ম্যাসিডোনিয়া এবং অস্ট্রিয়া এক পর্যায়ে সীমান্তে বেড়া দিয়ে দেয়৷ শুধু তাই নয়, সেসময় শরণার্থী আইন কঠোর করা হয় এবং শেঙেনভুক্ত কয়েকটি দেশ সাময়িকভাবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে৷

সমাজ

বন্ধ দরজা খুলে দেয়া

জার্মান চ্যান্সেল আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সমালোচকরা মনে করেন, তাঁর ‘ওপেন-ডোর’ শরণার্থী নীতির কারণে বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে অনেক শরণার্থীই ইউরোপে আসতে উৎসাহ পেয়েছেন৷ এক পর্যায়ে অবশ্য অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সীমান্ত পথ নিয়ন্ত্রণ শুরু করে জার্মানিও৷

সমাজ

তুরস্কের সঙ্গে চুক্তি

২০১৬ সালের শুরুতে ইইউ এবং তুরস্কের মধ্যে একটি চুক্তি হয়৷ এই চুক্তির আওতায় গ্রিসে আসা শরণার্থীদের আবারো তুরস্কে ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়৷ তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই চুক্তির বিরোধিতা করে৷ নভেম্বর মাসে অবশ্য তুরস্কের ইইউ-তে প্রবেশের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা স্থগিত ঘোষণার পর, সেই চুক্তি আবারো নড়বড়ে হয়ে গেছে৷

সমাজ

পরিস্থিতি বদলের কোনো লক্ষণ নেই

ইউরোপজুড়ে অভিবাসীবিরোধী মানসিকতা বাড়তে থাকলেও সরকারগুলো সম্মিলিতভাবে শরণার্থী সংকট মোকাবিলার কোনো সঠিক পন্থা এখনো খুঁজে পাননি৷ কোটা করে শরণার্থীদের ইইউ-ভুক্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে৷ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে চলমান সহিংসতার ইতি ঘটার কোনো লক্ষণও নেই৷ ওদিকে, সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে শরণার্থীদের মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে৷

এছাড়া তিনি বলেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘‘জার্মানির পক্ষে একটি যান'', অর্থাৎ বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছে৷

সেকেলে ন্যাটো

ট্রাম্প ন্যাটো জোটকে একটি ‘‘সেকেলে'' সংগঠন বলে বর্ণনা করেন৷

‘‘আমি বহুদিন আগে বলেছি যে, ন্যাটোর নানা সমস্যা আছে৷ তার মধ্যে প্রথমটি হলো, ন্যাটোর নকশা করা হয়েছিল বহু, বহু বছর আগে'', বলেন ট্রাম্প৷

তবে ট্রাম্প পুনরায় বলেন যে, ন্যাটো ‘‘আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ'', কিন্তু কিছু ন্যাটো সদস্যদেশ যথেষ্ট অনুদান দিচ্ছে না, বলে তাঁর অভিমত৷

‘‘দেশগুলোকে রক্ষা করা আমাদের কাজ হওয়ার কথা৷ কিন্তু বহু (সদস্য) দেশ তাদের যে অনুদান দেওয়ার কথা, সেটা দিচ্ছে না, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি খুবই অন্যায় বলে আমি মনে করি'', বলেন ট্রাম্প৷ ‘‘কিন্তু সেটা বলার পরে আমি বলব, ন্যাটো আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ পাঁচটি দেশ তাদের যে অনুদান দেওয়ার কথা, তা দিচ্ছে৷ পাঁচটি (দেশ)৷ খুব বেশি নয়'', ট্রাম্প যোগ করেন৷ প্রসঙ্গত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর খরচের প্রায় ৭০ শতাংশ বহণ করে থাকে৷

বিএমডাবলিউ-এর জন্য কর

জার্মানি গাড়ি নির্মাতা বিএমডাব্লিউ যে মেক্সিকোতে একটি নতুন গাড়ির কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প মেক্সিকোতে তৈরি বিএমডাব্লিউ গাড়ির উপর ৩৫ শতাংশ সীমান্ত কর বসানোর হুমকি দেন৷ পরিবর্তে বিএমডাব্লিউ-কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা তৈরির পরামর্শ দেন ট্রাম্প৷

এসি/ডিজি (ডিপিএ, এএফপি, রয়টার্স)

জার্মানিকে চাই...

সেই ছবি৷ বুদাপেস্টে তখন শরণার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে৷ অস্ট্রিয়া বা জার্মানির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করতে না পারায় তাঁরা ক্ষুব্ধ৷ সবাই ছুটছিলেন প্ল্যাটফর্মের দিকে৷ পুলিশ ফিরিয়ে দিলো৷ স্টেশনের বাইরে শুরু হলো বিক্ষোভ৷ কারো কারো হাতে তখন ট্রেনের টিকিট৷ কেউ ক্ষোভ জানালেন কোলের সন্তানকে নিয়ে৷ অনেক শিশুর হাতে দেখা গেল, ‘উই ওয়ান্ট জার্মানি’ লেখা কাগজ৷ ইউরোপে এত দেশ থাকতে কেন জার্মানি?

আছে নব্য নাৎসি, পুড়েছে শরণার্থী শিবির, তবুও...

জার্মানির কোথাও কোথাও শরণার্থীবিরোধী বিক্ষোভ দেখা গেছে৷ অনেক জায়গায় রাতের অন্ধকারে আশ্রয় শিবিরে লেগেছে আগুন৷ তারপরও অভিবাসনপ্রত্যাশীরা জার্মানিকেই বেছে নিতে চায়৷

বড় কারণ ম্যার্কেল এবং...

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ব্যাপারে শুরু থেকেই উদার জার্মানি৷ চ্যান্সেলর ম্যার্কেল সবসময়ই অভিবাসী এবং অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পাশে ছিলেন৷ পেগিডা আন্দোলনের সময়ও সরকারের অভিবাসীদের পাশে থাকার কথা স্পষ্ট করেই বলেছেন ম্যার্কেল৷ পাশে থেকেছেও৷ জার্মানির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষও ছিল তাঁর পাশে৷ এখনও আছে৷ এই বিষয়গুলোও মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মনে জার্মানির প্রতি আরো আস্থাশীল করেছে৷

তোমাদের স্বাগত

অভিবাসনপ্রত্যাশীরা জার্মানিতে পা রেখেই দেখেছে অবাক হওয়ার মতো দৃশ্য৷ এখানে তাঁরা অনাহূত নয়৷ নিজের দেশ থেকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসে জার্মানিতে পাচ্ছেন সাদর সম্ভাষণ!

জার্মানির নেতৃত্বে ম্যার্কেল, ইউরোপের নেতৃত্বে জার্মানি

বৃহস্পতিবার আঙ্গেলা ম্যার্কেল বলেছেন, শরণার্থীদের বিষয়ে জার্মানির ভূমিকা হতে হবে অনুসরণীয়, দৃষ্টান্তমূলক৷ জার্মানির সংসদের নিম্নকক্ষ বুন্ডেসটাগে বক্তব্য রাখার সময় তিনি আরো বলেন, অভিবাসন সংকট মোকাবেলায় ইউরোপকেও সফল হতে হবে৷

শরণার্থীদের পাশে ম্যার্কেল

বৃহস্পতিবার কয়েকদিন আগেই জার্মানিতে আসা অভিবাসন প্রত্যাশীদের দেখতে গিয়েছিলেন আঙ্গেলা ম্যার্কেল৷

শরণার্থীর ‘বন্ধু’ ম্যার্কেল

দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষটিকে শরণার্থীরা নিজেদের একজন হিসেবেই বরণ করে নিয়েছিলেন৷ শরণার্থীদের সঙ্গে বন্ধুর মতোই সময় কাটিয়েছেন ম্যার্কেল৷ কয়েকজন শরণার্থী তাঁর সঙ্গে সেলফি তুলতে চেয়েছিলেন৷ সানন্দে তাঁদের আশা পূরণ করেছেন ম্যার্কেল৷