যখন কর্মক্ষেত্রে নারীরাও ‘পুরুষ’

শিরোনাম দেখে অনেকেরই চোখ কুঁচকে যেতে পারে৷ নারীবাদের উত্থানের এই যুগে কেউ কেউ হয়তো আগেই কিছু একটা আন্দাজ করে গালি দেয়ার প্রস্তুতিও নিয়ে রাখতে পারেন৷ কিন্তু অপ্রিয় সত্যি কথা কাউকে না কাউকে বলতেই হয়৷

‘নারীর অধিকার’ শব্দগুচ্ছটি ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’র মতোই একটি বিতর্কিত বিষয়৷

ঠিক কোন জায়গায় নিজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শেষ হয়, আর কখন সেটা অন্যের ব্যক্তিগত অনুভূতিতে আঘাত হানে, সে নিয়ে তর্ক দীর্ঘদিনের৷ ঠিক তেমনই, নারীর অধিকার বলতে আসলে নারীকে বেশি সুযোগ দেয়া কি না, এতে সবার সমান যোগ্যতা কখনও বাধাগ্রস্ত হয় কি না, সে নিয়েও বিতর্কের শেষ নেই৷

কিন্তু আজ আর অধিকার নিয়ে কথা বলতে চাই না৷ বলতে চাই, তারচেয়েও বেশি বিতর্কিত বিষয় নিয়ে৷ পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পুরুষের আধিপত্য কমাতে গিয়ে কখনও কখনও নারীদের সুযোগ দেয়া হয়, আর তাঁরাই তখন নিজেরাই সে পুরুষের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন৷

এ প্রসঙ্গে কয়েকটা ঘটনার কথা বলতে চাই৷

ঘটনা-১: একটি বেসরকারি গণমাধ্যম৷ নারীর অধিকার নিয়ে ব্যাপক সোচ্চার গণমাধ্যমের কর্তৃপক্ষ৷ সামান্য হয়রানির ঘটনাকেও অনেক গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়৷ কিন্তু গণমাধ্যমটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত পার্টিতে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ বস পুরুষ কর্মীদের কাজ বাড়িয়ে দিয়ে হলেও নারী কর্মীদের সেখানে উপস্থিত থাকার আদেশ দেন৷

কর্মক্ষেত্রে নারীদের যত চ্যালেঞ্জ

মাকসুদা আক্তার, ব্যাংকার

ব্যক্তিগতভাবে আমার দীর্ঘ ১৫ বছরের কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে দেখেছি তা হলো, একজন পুরুষ সহকর্মীকে বাসায় পৌঁছে তাদের গৃহস্থালির কাজকর্ম বা সন্তানদের সামলানোর বিষয়ে মনোযোগ দিতে হয়না৷ কিন্তু কর্মক্ষেত্রে একজন পুরুষ সহকর্মীর মতো একজন নারী কর্মীকেও সমান সময় অতিবাহিত করতে হয়৷ নারীকর্মীদের কর্মক্ষেত্রে সহনশীল মাত্রার কর্ম ঘণ্টা নির্ধারণ ও তার বাস্তব রূপ দেয়া আমার দাবি৷

কর্মক্ষেত্রে নারীদের যত চ্যালেঞ্জ

ডা. তানজিয়া তামান্না, চিকিৎসক

শিক্ষানবিশ চিকিৎসক হিসেবে একটি সরকারি হাসপাতালে যখন কাজ করেছি তখন নানারকম সমস্যা মোকাবিলা করেছি৷ রোগীর সাথে আসা লোকজন প্রায়শই অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্য ছুড়ে দিত৷ রাতে ডিউটি থাকলে হোস্টেল থেকে হাসপাতাল যেতে এবং ফিরে আসতে সবসময়ই একটা অজানা ভয় কাজ করতো৷ বর্তমানে বাচ্চা নিয়ে অফিস চালাতে গিয়ে প্রতি মুহূর্তে কর্মক্ষেত্রে একটি চিল্ড্রেন্স সেন্টারের প্রয়োজন বোধ করি৷

কর্মক্ষেত্রে নারীদের যত চ্যালেঞ্জ

আফসানা সিয়াম, শিক্ষক

রাস্তায় চলতে ইভটিজিং-এর শিকার হই, অনেকসময় ক্লাসেই কিছু ছাত্রও এ কাজটি করে৷ ম্যাসেঞ্জারে অনেক আজে বাজে টেক্সট পাই৷ আমার মতে, মাতৃত্বকালীন ছুটিটা পর্যাপ্ত দেয়া প্রয়োজন৷ বেশিরভাগ বেসরকারি স্কুলে মাতৃত্বকালীন ছুটি সাধারণত ২ মাস দেয়া হয়৷ এটা বাড়ানো উচিত৷ এছাড়া পরিবার সামলাতে হয়, যেমন ছেলে মেয়ে অসুস্থ হলে ছোট-খাট ছুটি প্রয়োজন হয়৷ কর্মজবীবী নারীদের প্রতি প্রতিষ্ঠানের সহমর্মিতা দেখানো উচিত৷

কর্মক্ষেত্রে নারীদের যত চ্যালেঞ্জ

জয়ীতা রায়, আলোকচিত্র সাংবাদিক

আমার কাজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সবসময়ই আমাকে ছেলেদের সঙ্গে কাজ করতে হয়৷ তাই সবসময় আমাকে প্রমাণ করতে হয় আমি তাদের সমানই কাজ করতে পারি৷ এছাড়া দূরে কোথাও বড় কোনো ঘটনা ঘটলে জায়গাটিতে পৌঁছুতে, যেমন কীভাবে যাব কিংবা কার সঙ্গে যাব এরকম অনেক অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয় আমাকে৷ আমি চাই, সব জায়গায় সবসময় মেয়েরা যেন স্বাধীনভাবে সম্মানের সঙ্গে চলার পরিবেশ পায়৷

কর্মক্ষেত্রে নারীদের যত চ্যালেঞ্জ

সানজিদা আফরিন, উন্নয়নকর্মী

কাজের জায়গায় না হলেও দেখা যায় স্টেকহোল্ডারদের সাথে আমরা বিভিন্ন বৈষম্যমূলক আচরণ পাই৷ মেয়েদের কাজের জন্য ওয়ার্ক ফ্রম হোম, চাইল্ড ফ্রেন্ডলি স্পেস রাখা অথবা ফ্লেক্সিবল ওয়ার্কিং রোস্টার, এ ধরনের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে ভালো হয়৷

কর্মক্ষেত্রে নারীদের যত চ্যালেঞ্জ

সাজু বেগম, পোশাক শ্রমিক

তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, যা বেতন পান তা দিয়ে মাসের দিনগুলো পার করা৷ এছাড়া পোশাক শ্রমিক বলে অনেকেই ছোট করে দেখে, যা তাঁকে সবসময়ই কষ্ট দেয়৷ সাজু বেগমের চাওয়া, পোশাক শ্রমিকদের থাকার জন্য কোনো জায়গার ব্যবস্থা করা৷ তাহলেই কেবল স্বল্প বেতনে ভালোভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি৷

কর্মক্ষেত্রে নারীদের যত চ্যালেঞ্জ

শেফালি আক্তার, সরকারি চাকুরে

কর্মজীবী হিসেবে শেফালি আক্তারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অফিস এবং বাড়ি দুটিই সমানভাবে সামলানো৷ এছাড়া কর্মক্ষেত্রে অনেক সময় পুরুষ সহকর্মীরাও তাদের অনেক কাজ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন৷ তাঁর মতে, প্রতিটি সরকারি অফিসে ডে কেয়ার সেন্টার থাকা উচিত৷

কর্মক্ষেত্রে নারীদের যত চ্যালেঞ্জ

আলেয়া বেগম, গৃহকর্মী

গৃহকর্মী হিসেবে আলেয়া বেগম যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন তা হলো নিত্য বকাঝকা ও দুর্ব্যবহার৷ অনেক সময় খুব ছোট ছোট ব্যপারেও গৃহকর্ত্রীরা খুবই দুর্ব্যবহার করেন৷ কোনো ছুটির দিন না থাকাটাও তাঁর কাছে অনেক চ্যালেঞ্জের৷ তাঁর মতে, প্রত্যেক গৃহকর্মীর জন্যই সপ্তাহে অন্তত একটি দিন ছুটি দেয়া উচিত৷

কর্মক্ষেত্রে নারীদের যত চ্যালেঞ্জ

মুক্তা বেগম, দিন মজুর

ইটের ভাটায় দিনমজুরের কাজ করেন মুক্তা বেগম৷ কর্মক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পুরুষদের সমান কাজ করলেও তাঁকে মজুরি দেয়া হয় একজন পুরুষের অর্ধেকের একটু বেশি৷ সকল ক্ষেত্রে মজুরি বৈষম্য দূর করাই তাঁর দাবি৷

কর্মক্ষেত্রে নারীদের যত চ্যালেঞ্জ

কুলসুম আক্তার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী

ব্যবসায় যেহেতু তাঁকে একটু বেশি সময় দিতে হয় তাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিবার সামলানো৷ তাঁর মতে, শিশুদের স্কুলগুলোর সময়সূচি এমন হওয়া উচিত যাতে দিনের বড় একটা সময় সন্তানদের স্কুলে রাখতে পারেন৷ এছাড়া প্রতিটি এলাকায় শিশুদের দেখভালের জন্য পর্যাপ্ত ডে কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলা উচিত সরকারি উদ্যোগেই৷

আপাতদৃষ্টিতে এই আদেশ নারীদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার উদাহরণ মনে হলেও, এর আসল কারণ পার্টিতে আগত বিশেষ বিশেষ অতিথিদের সামনে গ্ল্যামার উপস্থাপন করা৷ নারী সহকর্মীরাও বেশ সম্মানবোধের সাথে সেখানে হাজির হন৷ কিন্তু আসলেই কি সেখানে নারী হিসেবে তাঁদের সম্মানিত করা হয়?

ঘটনা-২: নারায়ণগঞ্জে সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার হোসেন আরা বেগমকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ওএসডি করা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল কিছুদিন আগে৷ এমনকি এ নিয়ে সংসদেও আলোচনা হয়, ক্ষোভ জানান সংসদ সদস্যরা৷

কিন্তু এমন অনেককিছুই আসে না আলোচনায়৷ আরেকটি বেসরকারি অর্থনৈতিক সংস্থার কয়েকজন নারী কর্মী কাছাকাছি সময়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন৷ ঘটনাচক্রে সংস্থাটির প্রধানও একজন নারী৷ ফলে সে অফিসে নারীদের একটু বেশিই নিরাপদ বোধ করার কথা৷ কিন্তু মাতৃত্বকালীন ছুটি চাইতে গেলে নারী প্রধানের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘‘এখন ছুটি চাইতে এসেছেন কেন? আমাকে বলে কি সন্তান নেয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন?’’

ঘটনা-৩: একটি গবেষণা সংস্থা৷ এক তরুণী কর্মী দীর্ঘদিন ধরে বেশ দক্ষতার সঙ্গে নিজের দায়িত্বে পালন করছেন৷ কিন্তু অনেকদিন ধরে তার পদোন্নতি বা বেতনবৃদ্ধির কোনো খবর নেই৷ এ নিয়ে তার বেশ কিছুদিন ধরে ক্ষোভও ছিলো৷ তা জানতে পেরে, একদিন বস সে কর্মীকে ডাকলেন নিজের রুমে৷ কাঁচুমাচু করে ঢোকার পর যা ঘটলো, তাতে সে কর্মী স্তব্ধ হয়ে গেলেন৷ সে বস পদোন্নতির বিনিময়ে সরাসরি তরুণীকে ডাকলেন নিজের বিছানায়৷ রাগে-ক্ষোভে সেখান থেকে বের হয়ে বসের সেকেন্ড ইন কমান্ড অর্থাৎ, দ্বিতীয় বসের কাছে গেলেন তরুণী৷ দ্বিতীয় বস নারী হওয়ায় সব কথা শেয়ার করতে কোনো দ্বিধা করতে হয়নি তরুণীকে৷ এবার আরো অবাক হওয়ার পালা৷ নারী বস বলে বসলেন, ‘‘কাজে উন্নতি করতে গেলে শুধু মাথা থাকলে হয় না৷ সবকিছুই কাজে লাগাতে হয়৷’’

এমন কিছু ঘটনা কাছের মানুষের সাথে ঘটায় আমি জানতে পেরেছি৷ কিন্তু এমন অধিকাংশ ঘটনা সাধারণত কারো সাথে শেয়ারই করতে পারেন না নারীরা৷ সেই একই কর্মক্ষেত্রে সব অপমান সহ্য করে সেই মানুষদের সাথেই তাঁদের কাজ করে যেতে হয়৷

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ, ডয়চে ভেলে

কখনও কখনও পরিবার বা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করলেও, ‘চেপে থাক, লোকে কি বলবে’ শুনে দমে যেতে হয়৷
এখনও মনে আছে, হেফাজতে ইসলামীর কর্মীদের হাতে নারী সাংবাদিক নাদিয়া যখন লাঞ্ছিত হলেন, প্রথমেই প্রশ্ন উঠেছিল, এমন একটি জায়গায় কেনো একজন নারী সাংবাদিককে পাঠানো হয়েছিল৷ আর সে প্রশ্ন সমান স্বরে পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছিল নারীকণ্ঠেও৷ কেনো কোথাও সাংবাদিক পাঠাতে হলে, নারী না পুরুষ বিবেচনা করতে হবে, সে প্রশ্নটি আর উচ্চারিত হয়নি কোথাও৷

এক সাবেক সহকর্মীকে চিনি, অফিসে যার প্রধান বিনোদন নারী সহকর্মীদের নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে কথা বলা৷ আমার খুব অস্বস্তি হলেও, তার আশেপাশের অন্য সহকর্মীরা তার এই ‘চটুল’ কথাবার্তায় বেশ আনন্দই পান, অথবা আনন্দ পাওয়ার অভিব্যক্তি দেখান৷

মাঝে মাঝে কোনো কনিষ্ঠ নারী সহকর্মী সেটাতে আপত্তি জানালে অন্য নারী সহকর্মীরাই তীব্র প্রতিবাদ জানান, ‘‘আরে, উনি কি কিছু মিন করেছে? উনি তো এমনিই মজা করে বলে৷’’

এমন আরো হাজার হাজার ঘটনা রয়েছে, যেখানে নারীদের নিরাপত্তায় পুরুষদের বুঝে না বুঝে সহযোগী হচ্ছেন নারীরাই৷ ‘দয়া’ বা ‘দান’ হিসেবে পুরুষের সমকক্ষ না হয়ে, বা পুরুষ হওয়ার চেষ্টা না করে নারীরা যতোদিন নারী না হচ্ছেন, ততোদিন কর্মক্ষেত্রে সাম্যাবস্থা মোটেও আসবে না৷

লেখকের মতো আপনার চোখেও কি কোনো ঘটনা ধরা পড়েছে? লিখুন নীচের ঘরে৷ 

আমাদের অনুসরণ করুন