‘যুদ্ধাপরাধী লালনের' গন্ধ ঝেড়ে ফেলতে হবে বিএনপিকে

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে৷ নির্বাচনের একবছর পূর্তিতে দেশব্যাপী সহিংস আন্দোলনও কঠোর হাতে দমন করেছে সরকারি দল৷ তাদের বিরুদ্ধে বিএনপির আন্দোলন কোনোভাবেই সফল হচ্ছে না৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা, হয়রানি ও পুলিশি নির্যাতনের কারণেই হয়ত এখন আর ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কোথাও আন্দোলন দেখা যাচ্ছে না৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আন্দোলন সীমাবদ্ধ থাকছে সংবাদ সম্মেলন ও বিবৃতির মধ্যে৷ এমন নয় যে বিএনপির তৃণমূলে জনসমর্থন কম৷ তার ওপর সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন জমিয়ে তোলার মতো ইস্যুরও অভাব নেই৷ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি, নির্যাতন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটানোর মতো নানা প্রকল্প গ্রহণ, নিরাপত্তাহীনতা আর জঙ্গিবাদের বিস্তার – এর যে কোনো একটি ইস্যুই যে কোনো সরকারকে টালমাটাল পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে পারে৷ অথচ একটির পর একটি ঘটনা ঘটার পরেও সরকারবিরোধী সফল কোনো অবস্থান নিতে পারছে না বিএনপি৷

বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা যখন এমন দুর্বল, তখন জঙ্গিবাদ বিরোধী জাতীয় ঐক্য গঠনের ঘোষণা দিয়েছে দলটি৷ সিপিবি, বাসদ, গণফোরাম, বিকল্প ধারা, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য এবং কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের মতো দলগুলোকে কাছে টানার জন্য বিএনপি জামায়াত ছাড়তে পারে বলে কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে৷ বিএনপির নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘‘জামায়াত আর বিএনপির সম্পদ নয় বরং বোঝা, তাই খুব দ্রুতই এ বোঝাকে ঘাড় থেকে নামিয়ে দেয়ার কথা চিন্তা-ভাবনা করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া৷ এমনকি সরকার চাইলে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে বলেও তিনি জানান৷''

প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল৷ সে সময় ৩০০ আসনে সরাসরি নির্বাচন হয়৷ আর সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ছিল ১৫টি৷ ঐ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছিল ৭ এপ্রিল, তেজগাঁওয়ে অবস্থিত তখনকার জাতীয় সংসদ ভবনে৷ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টিতে জয়লাভ করে৷ বঙ্গবন্ধু সে সময় ঢাকা-১২ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন৷

দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন, প্রথম নারী সাংসদ

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ হয়৷ সেবার সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ছিল ৩০টি৷ তবে ঐ সংসদেই প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষ ভোটে একজন নারী সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন৷ খুলনা-১৪ থেকে নির্বাচিত হন সৈয়দা রাজিয়া ফয়েজ৷ প্রথম অধিবেশন বসেছিল ২ এপ্রিল৷ নির্বাচনে মাত্র মাস ছয়েক আগে প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি ২০৭টি আর আওয়ামী লীগ ৫৪টি আসন পেয়েছিল৷

তৃতীয় সংসদ নির্বাচন

ভোটগ্রহণ হয় ১৯৮৬ সালের ৭ মে৷ জাতীয় পার্টি ১৫৩টি, আওয়ামী লীগ ৭৬টি আর জামায়াতে ইসলামী ১০টি আসন পায়৷ বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করেছিল৷

চতুর্থ সংসদ নির্বাচন

১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল৷ আওয়ামী লীগ, বিএনপি সহ বেশ কয়েকটি দল এই নির্বাচন বর্জন করেছিল৷ জাতীয় পার্টি আসন পেয়েছিল ২৫১টি৷ সংরক্ষিত মহিলা আসন সংক্রান্ত আইনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এই সংসদে মোট আসন সংখ্যা ছিল ৩০০টি৷

পঞ্চম সংসদ নির্বাচন

তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা করে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি, আওয়ামী লীগ ৮৮টি আর জাতীয় পার্টি ৩৫টিতে জয়লাভ করে৷ এছাড়া নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ৩০ জন মহিলাকে সাংসদ নির্বাচিত করা হয়৷ অবশ্য তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি সংবিধানের অংশ ছিল না৷ পরের সংসদে সেই বিল পাস হয়েছিল৷

ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন

অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি৷ আওয়ামী লীগ সহ অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দল নির্বাচনটি বর্জন করেছিল৷ ফলে মোট ভোট গৃহীত হয়েছিল মাত্র ২১ শতাংশ৷ ৩০০টি আসনের মধ্যে বিএনপি ২৭৮টিতে জয়লাভ করেছিল৷ মাত্র চার কার্যদিবসে সংসদ বসার পর তা বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়৷ এই সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস হয়৷

সপ্তম সংসদ নির্বাচন

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬, বিএনপি ১১৬ ও জাতীয় পার্টি ৩২টি আসনে জয়লাভ করে৷ পরে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী করে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ৷

অষ্টম সংসদ নির্বাচন

ভোটগ্রহণ হয় ২০০১ সালের ১ অক্টোবর৷ অষ্টম সংসদের মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ৩০০টি৷ কারণ সংরক্ষিত মহিলা আসন সংক্রান্ত আইনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় শুরুতে কোনো মহিলা আসন ছিল না৷ পরে আইন করে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ এ উন্নীত করা হয়৷ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩ আর আওয়ামী লীগ ৬২টি আসনে জয়ী হয়েছিল৷

নবম সংসদ নির্বাচন

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত সবশেষ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর৷ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার পেয়েছিল ২৬৩টি আসন৷ আর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পায় ৩৩টি আসন৷

দশম সংসদ নির্বাচন

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি৷ ফলে ১৫৩ জন সাংসদ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই সাংসদ নির্বাচিত হন৷

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীও এমাজউদ্দিনের মতোই বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার জন্য বিভিন্ন সময় পরামর্শ দিয়েছেন৷

কিন্তু খোদ বিএনপির মধ্যেই জামায়াত নিয়ে রয়েছে হাজারো দোটানা৷ এমাজউদ্দিনের এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, ‘‘জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার বিষয়ে ড. এমাজউদ্দিন যে বক্তব্য দিয়েছেন তা তার একান্ত নিজস্ব, তার সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই৷''

এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি-জামায়াত জোটের ভবিষ্যত নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে৷ বিএনপি দাবি করে জামায়াতের সাথে তার জোট আদর্শগত নয়, বরং নির্বাচনে জয়লাভ এবং রাজপথে আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনের জন্য কৌশলগত জোট গঠনের প্রয়োজনে তারা জামায়াতের সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছে৷ বিএনপির মধ্যে অনেকেই মনে করেন জামায়াতের একটি শক্তিশালী ভোটব্যাংক রয়েছে যা বেশ কিছু আসনে বিএনপিকে নির্বাচনে জিততে সাহায্য করে৷ তাছাড়া জামায়াতের অর্থ ও সাংগাঠনিক সক্ষমতা রাজপথের আন্দোলনকে বেগবান করে৷ মূলত এ দু'টি কারণের জন্যই বিএনপির জামায়াতকে দরকার৷

বাংলাদেশের রাজনৈতিক জোট: আদর্শগত না কৌশলগত?

এ দু'টি ধারণা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে আসলেই বিএনপি-জামায়াত জোট আদর্শগত না কৌশলগত সেটা নিয়ে আলোচনা জরুরি৷ আমার মতে, বাংলাদেশের প্রধান দু'টি রাজনৈতিক দলের কোনোটিই আদর্শ দিয়ে পরিচালিত হয় না৷ আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ ও সেক্যুলারিজমকে নিজেদের আদর্শের কেন্দ্র হিসেবে দেখাতে ভালোবাসে৷ কিন্তু বাস্তবে নির্বাচনে জয়ী হবার জন্য ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উভয়কেই ব্যবহার করে এসেছে এ দলটি৷ আওয়ামী লীগের ভেতরে ওলামা লীগের অস্তিত্ব, খেলাফতে মজলিশের মতো উগ্র-ইসলামপন্থি দলের সাথে সখ্যতা এবং হেফাজতে ইসলামকে কৌশলগত ভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যবহারের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনীতি অনেকটাই বোঝা যায়৷ শাহবাগ আন্দোলনের উত্থান ও পতনের মাধ্যমেও আওয়ামী লীগের কৌশলগত রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নিপুন ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়৷ এর আগে কৌশলগত কারণেই জামায়াতের সাথে জোট বেঁধে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল আওয়ামী লীগ৷ বাংলাদেশের রাজনীতি এমনই জটিল ও চমকে ভরা যে, ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত আবারো জোট বাঁধলে মোটেও অবাক হবো না৷

পিয়ান মুগ্ধ নবীর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষার্থী পিয়ান মুগ্ধ নবীর কাছে ধর্ম বিষয়টা পুরোপুরি ব্যক্তিগত হলেও রাজনীতি ব্যক্তিগত বিষয় নয়৷ তবে ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে তিনি কখনোই সমর্থন করেন না৷

শিবরাজ চৌধুরী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী শিবরাজ চৌধুরী৷ তার মতে, ধর্ম এবং রাজনীতি কখনোই এক হতে পারে না৷ ধর্মের মূল বিষয় মনুষত্ব বা মানুষের মধ্যকার শুভবোধ৷ তবে ধর্মের নামে যদি কখনো মৌলবাদ কিংবা চরমপন্থা চলে আসে, সেটা কখনোই গ্রহনযোগ্য নয়৷

শিহাব সরকার

ঢাকার একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শিহাব সরকার৷ তার মতে, ধর্ম ধর্মের জায়গায় আর রাজনীতি রাজনীতির জায়গায়৷ বলা বাহুল্য, ধর্মের নামে রাজনীতি তিনিও সমর্থন করেন না৷

আসিফ হামিদী

আসিফ হামিদীও মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন৷ তিনিও মনে করেন ধর্ম এবং রাজনীতি কখনোই এক হতে পারে না৷ তাই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ঘোর বিরোধী তিনি৷

মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর

ঢাকার একটি মাদ্রাসা থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করেছেন মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর৷ তাঁর মতেও রাজনীতি ধর্মভিত্তিক হতে পারে না৷ তবে আল্লাহ এবং রাসুলের কিংবা ইসলামের উপর কোনোরকম আঘাত আসলে তার বিরোধীতা করা সব মুসলমানের নৈতিক দ্বায়িত্ব বলে মনে করেন তিনি৷

সাদমান আহমেদ সুজাত

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদমান আহমেদ সুজাত৷ তাঁরও ঐ এক কথা৷ ‘‘ধর্ম এবং রাজনীতি কখনো এক হতে পারে না৷’’ তিনি জানান, ‘‘ধর্ম আমরা সাধারণত জন্মগতভাবে পাই, কিন্তু রাজনীতিকে আমরা অনুসরণ করি৷’’

সাজ্জাদ হোসেন শিশির

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন শিশির৷ তাঁর মতে, রাজনীতি সবসময়ই ধর্ম নিরপেক্ষ হওয়া উচিত৷ তাঁর বিশ্বাস, ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে মিশিয়ে ফেললে তার ফল কখনো ভালো হয় না৷

দাউদুজ্জামান তারেক

ঢাকার আরেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দাউদুজ্জামান তারেক মনে করেন, রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের কখনো মিল হতে পারে না৷ কারণ বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা একই রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসরণও করতে পারেন৷

একইভাবে বিএনপির জন্ম একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে – যেখানে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের হাত ধরে মূলত মধ্যপন্থি, তার সাথে ডানপন্থি ও বামপন্থি নেতারা জোট বেঁধে প্রথমে জাগদল ও পরবর্তীতে বিএনপি গঠন করে৷ বিএনপির রাজনীতির মূলধারায় মধ্যপন্থি ও বামপন্থি রাজনীতিকদেরই প্রাধান্য, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে যখন বিএনপিকে মধ্য-ডানপন্থি রাজনৈতিক দল হিসেবে অনেকেই বিবেচনা করেন, তখনও দলের নীতি-নির্ধারণে কিন্তু তীব্র ডানপন্থি নেতাদের সংখ্যা নিতান্তই নগন্য৷ বিএনপি একটি ইন্টারেস্টিং রাজনৈতিক দল, কারণ এ দলটির জন্ম ক্যান্টনমেন্ট কেন্দ্রিক৷ কিন্তু বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখা দলও বিএনপি৷ আমি মনে করি, আওয়ামী লীগের মতোই বিএনপির প্রধান উদ্দেশ্য যে কোনোভাবে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় যাওয়া৷ আওয়ামী লীগ যেখানে মুক্তিযুদ্ধ ও সেক্যুলারিজম এই দু'টি ন্যারেটিভের উপর ভিত্তি করে তাদের রাজনীতি পরিচালনা করে, সেখানে বিএনপির ন্যারেটিভ একটাই৷ আর সেটা হলো আওয়ামী-বিরোধিতা৷ বিএনপি যতবারই জনগণের কাছে ভোট পেয়েছে, জনপ্রিয় হয়েছে, তার কারণ ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষোভ ও অসন্তোষ৷ বিএনপির নিজস্ব ন্যারেটিভের অনুপস্থিতি বর্তমান সময়ে দলটির নাজুক অবস্থানের অন্যতম কারণ৷ সেইসাথে এই অনুপস্থিতি আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করে যে, বিএনপির আদর্শগত ন্যারেটিভের অভাব রয়েছে এবং দলটি মূলত ক্ষমতায় লক্ষ্য নিয়েই পরিচালিত হয়৷

মোট কথা আমার মতে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দু'টি রাজনৈতিক দলই ‘রিয়ালিস্ট' বা বাস্তববাদী৷ তাদের মূল লক্ষ্য নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা, নির্বাচনে জয় লাভ করা৷ আদর্শ বা ভাববাদিতার এখানে কোনো স্থান নেই৷ তাই তাদের সাথে যে কোনো দলের জোটই কৌশলগত, কখনই আদর্শগত নয়৷

বিএনপি-জামায়াতের কৌশলগত জোট

আমি এর আগের আলোচনায় উল্লেখ করেছি যে, দু'টি কৌশলগত কারণে বিএনপি জামায়াত জোট বেঁধেছে৷ প্রথমত: নির্বাচনে জামায়াতের ভোটব্যাংক বিএনপির ক্ষমতায় যেতে সাহায্য করে, দ্বিতীয়ত: রাজপথে জামায়াতের শক্ত অবস্থান বিএনপির সরকার বিরোধী আন্দোলনকে জোরদার করে৷

নির্বাচনের ফলাফল ও জামায়াতের রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে এ দু'টি ধারণাই ভুল প্রমাণিত হয়৷ এমনকি জামায়াতকে জোটে নিয়ে বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক সক্ষমতা, সাংগাঠনিক কাঠামো ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা যে দিন-দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে তা-ও স্পষ্ট হয়ে উঠে৷ জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোট গঠনের কারণে যুদ্ধাপরাধীদের লালন ও জামায়াতকে সুসংগঠিত হয়ে উঠার দায়ভারও বিএনপির কাঁধে এসে পড়ে৷ তাই বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক বামপন্থি ও উদারতাবাদীদের দল হওয়া সত্ত্বেও কিছু কট্টর ইসলামপন্থি নেতার কারণে আওয়ামী লীগ বেশ সফলভাবে বিএনপির গায়ে দেশবিরোধী তকমা সেঁটে দিতে সক্ষম হয়৷ যদিও জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় করে তুলতে বিএনপির সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের দায়ভারও কম নয়৷

‘‘জামায়াত একটি সন্ত্রাসী দল’’

বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার (০১.০৮.১৩) বিকেলে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছেন হাইকোর্ট৷ বিচারপতি এম মোয়াজ্জেম হোসেন, ইনায়েতুর রহিম এবং কাজী রেজা-উল-হকের সমন্বয়ে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ তাদের রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেন৷ রায়ে বলা হয়, ‘‘জামায়াতের গঠনতন্ত্র শুধু সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকই নয়, জামায়াত একটি সন্ত্রাসী দল৷’’

২০০৯ সালের রিটের রায়

রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কয়েকটি সংগঠন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা হাইকোর্টে রিট করেন ২০০৯ সালে৷ রিটে জামায়াতের গঠনতন্ত্র সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করা হয়, জানান ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর৷ সেই রিটের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করলেন আদালত৷

জামায়াতের প্রতিক্রিয়া

আদালতের রায়ের পর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং এই মামলার আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক জানান, রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল করবেন৷ সেজন্য ইতিমধ্যে রায়ের কার্যকারিতার স্থগিতাদেশ চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা হয়েছে৷

স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান

১৯৭১ সালে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর চূড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ৷ বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ‘‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল৷ তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সেদলের কিছু নেতার হত্যা, ধর্ষণ এবং নির্যাতনের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে জামায়াত৷’’

ট্রাইব্যুনালে বিচার

জামায়াত যুদ্ধাপরাধের দায় অস্বীকার করলেও ২০১০ সালে গঠিত ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একের পর এক জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণ হচ্ছে৷ এই ছবিঘর তৈরির দিন (০১.০৮.১৩) অবধি ছয়জনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেছেন ট্রাইব্যুনাল৷ সর্বশেষ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলায় ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছে৷

ট্রাইব্যুনাল নিয়ে বিতর্ক

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১০ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করে৷ তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল বিএনপি মনে করে, সরকার বিরোধী দলকে দুর্বল করতে এই ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করেছে৷ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই ট্রাইব্যুনাল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে৷

জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি

এদিকে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের রায়ের পর দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি আরো জোরালো হয়েছে৷ অধ্যাপক মুনতাসির মামুন জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানালেও সরকার এতটা সাহসী হবে বলে আশা করেন না৷ মুনতাসির মামুনের কথায়, ‘‘জামায়াত একটি যুদ্ধাপরাধী দল৷ ট্রাইব্যুনালের একাধিক রায়ে তা বলাও হয়েছে৷ তাই যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবেও জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব৷’’

ব্লগারদের সতর্ক প্রতিক্রিয়া

বৃহস্পতিবার আদালত রায় ঘোষণার আগেই ফেসবুকে আরিফ জিবতেক লিখেছেন, ‘‘হাইকোর্টের রায়টা কিন্তু জামায়াত নিষিদ্ধ নিয়া মামলা না৷ মামলাটা হচ্ছে নির্বাচন কমিশনে জামায়াত আইনসিদ্ধভাবে নিবন্ধিত হয়েছে কিনা, সেটা নিয়ে বিবেচনা৷’’ এই ব্লগার লিখেছেন, ‘‘যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচার চাই, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন নিয়া আমার মাথাব্যথা নাই৷’’

এই দাবি নতুন নয়

পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৪১ সালে জামায়াত প্রতিষ্ঠার পর মোট তিনবার দলটি নিষিদ্ধ হয়েছে৷ ১৯৫৯ এবং ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানে এবং ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে৷ ১৯৭৯ সালের ২৫শে মে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জামায়াত প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ পায়৷

সহিংস প্রতিক্রিয়া

হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের রায় ঘোষণার পর সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে জামায়াতের কিছু কর্মী৷ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে, ‘‘বৃহস্পতিবার ঢাকায় গাড়ি ভাঙচুর করেছে জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা৷’’ এছাড়া পাবনাতেও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে৷

কয়েকটি নির্দিষ্ট আসন ছাড়া জামায়াতের যে উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক নেই তা নির্বাচনি ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে উঠে৷ পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (১৯৯১) জামায়াত ১৮টি আসন (মোট ভোটের ১২.১ শতাংশ), ৭ম নির্বাচনে (১৯৯৬) ৩টি আসন (৮.৬২ শতাংশ), ৮ম নির্বাচনে (২০০১) ১৭টি আসন (৪.২৮ শতাংশ) ও সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে দু'টি আসন ও ৪ শতাংশেরও কম সমর্থন পায়৷ বিএনপির সঙ্গে জোটে না থাকলে জামায়াত কতটা অসহায়, তা বোঝা যায় ১৯৯৬ সালে৷ অতি-আত্মবিশ্বাসী জামায়াত এ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের সবকটিতে প্রার্থী দেয় ও মাত্র তিনটি আসনে জেতে৷ বিএনপির সমর্থনপুষ্ট জামায়াত ২০০১ সালে ১৭টি আসন নিয়ে শক্ত অবস্থানে ফিরে আসে এবং মন্ত্রিসভায়ও জায়গা করে নেয়৷

বাংলাদেশে বেশ কিছু নির্বাচনি আসন রয়েছে যেখানে প্রধান দুই দলের মধ্যে ১০ বা ১৫ হাজারের মতো অল্প ব্যবধানে জয়ী নির্ধারিত হয়৷ অনেকেই ধারণা করে থাকেন, জামায়াতের সমর্থন এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে৷ কিন্তু একটু ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, জামায়াতের উপর অতি-নির্ভরশীলতা বিএনপির নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারণা ও সংগঠনকে ক্ষয়িষ্ণু ও দুর্বল করে ফেলে৷ এছাড়া, সিদ্ধান্ত না নেয়া সুইং ভোটাররা অনেক সময়ই শুধু জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকার কারণেই বিএনপির বিরুদ্ধে ভোট দেয়৷ জামায়াতের নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক ও জামায়াতবিরোধী সুইং ভোটারদের সংখ্যার মধ্যে তুলনা করলে সুইং ভোটারদের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হওয়ার কথা৷ জামায়াতের নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনশীল ভোটব্যাংক যদি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারকই হতো, তবে ২০০৮ সালে বিএনপির ভরাডুবি ঠেকাতে তা কাজে লাগতে পারত৷ বাস্তবে তা হয়নি৷ কারণ দেশব্যাপী সামগ্রিক বিচারে জামায়াতের সমর্থকদের সংখ্যা বড়ই নগণ্য৷ তাই জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আখেরে বিএনপির কোনো লাভ হয়নি, বরং লাভ যদি কারও হয়ে থাকে তা জামায়াতেরই হয়েছে৷

এবারে আসি রাজপথে আন্দোলনের প্রসঙ্গে৷ শুধু জামায়াতের সাথে জোট বাঁধার কারণে আন্দোলনে বিএনপি যতটুকু জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে, তা বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল৷ সহিংস আন্দোলন, জ্বালাও-পোড়াও বা ভাঙচুরের আন্দোলন যে সরকারের পতন ঘটাতে পারে না তা এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত সত্য৷ লাগাতার হরতাল আর সহিংসতা জনগণকে রাজনৈতিক দল থেকে দূরে ঠেলে দেয়, অসন্তোষ আর ক্ষোভের জন্ম দেয়৷ বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে বিএনপির ‘নিশ্চুপ' নীতি দলটিকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করেছে৷ এমনকি বিএনপি সমর্থকদের অনেকে জামায়াতের রাজনীতির প্রতি ঝুঁকে পড়েছে৷ এছাড়া জামায়াত-শিবিরের সাথে জোট বাধার কারণে সরকারের পক্ষেও বিএনপির বিরুদ্ধে দমন-নিপীড়ন চালানো সহজ হয়েছে৷ জঙ্গিবাদ ইস্যুতে জামায়াত-শিবিরের সাথে জোট থাকার কারণেই বিএনপি বেকায়দায় পড়েছে৷ বিএনপির বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গি তোষণের৷ জামায়াতের সাথে জোট না থাকলে বিএনপির বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের তর্জনী তোলা আওয়ামী লীগের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতো৷

Bangladesch Saimum Parvez

সাইমুম পারভেজ, শিক্ষক ও সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক গবেষক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রচারণার মূল চালিকাশক্তি ছাত্রদল৷ আশির দশকে স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলন ও নব্বইয়ে দল সংগঠিত করতে ছাত্রদল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল৷ ছাত্রলীগের মতোই ছাত্রদলের বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও হত্যার নানা অভিযোগ রয়েছে৷ এছাড়া নামে ছাত্রদল হলেও এটি বয়স্ক ও অ-ছাত্রদের দ্বারা পরিচালিত৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও পাড়ায়-মহল্লায় বিএনপিকে একটি শক্ত প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করাতে ছাত্রদল বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে৷ কৌশলগত কারণে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশ মেনে নিলেও ছাত্রদল কখনওই ছাত্রশিবিরকে মিত্র হিসেবে দেখেনি৷ অধ্যাপক ভুঁইয়া মনোয়ার কবিরের ‘পলিটিক্স অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট অফ দ্য জামায়াত-ই-ইসলামী বাংলাদেশ' গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শুধু মার্চ ১৯৯১ থেকে মে ১৯৯৬ পর্যন্ত ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের মধ্যে ২০টি সংঘর্ষ হয়েছে৷ ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘটিত একটি বড় ধরনের রক্তাক্ত সংঘর্ষের পর খোদ বিএনপি নেতারা ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার জন্য সংসদে দাবি তোলেন৷ বর্তমানে আওয়ামী লীগ জামায়াতের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগলেও দুঃখজনক হলেও সত্যি, নব্বইয়ের দশকে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষের সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে ও শিবিরকে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়৷ যে কারণে পরবর্তীতে, ১৯৯৬ সালে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে দেখা যায়৷ এভাবে প্রধান দু'টি দলই নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বৈধতা দেয়৷ সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রদলের দুর্বলতার পেছনে জামায়াতের সাথে জোট কতটুকু দায়ী, তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে৷

আমার মতে, নির্বাচন ও সরকার-বিরোধী আন্দোলনে জামায়াত বিএনপির জন্য যতটুকু সুবিধা বয়ে এনেছে, তার চেয়ে বেশি গ্লানি ও সংকট নিয়ে এসেছে৷ তাই দলটি আসলেই বিএনপির জন্য একটি বড় বোঝা৷ কৌশলগত কারণে এ জোট গঠন হলে সময় এসেছে বিএনপির নতুন আঙ্গিকে জোট গঠনের৷ বাসদ, সিপিবি, গণফোরাম, বিকল্প ধারা, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য এবং কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের পাশাপাশি বর্তমান জোটের জামায়াত বাদে অন্য ডানপন্থি দলগুলোর সাথে ঐক্য গঠন করতে পারলে বিএনপি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে৷ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি – দু'টি দলই দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির জন্য অভিযুক্ত৷ তাই বিএনপি তার গা থেকে ‘যুদ্ধাপরাধী লালনের' গন্ধ ঝেড়ে ফেলতে পারলে আওয়ামী লীগের মতোই ‘গ্রহণযোগ্যতা' পাবে৷ সঠিক সময়ে এ সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে বিএনপির জন্য বর্তমান সময়ে চাইতেও কঠিন ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে৷

বন্ধু, আপনি কি সাইমুম পারভেজের সঙ্গে একমত? জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷

বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা, হয়রানি ও পুলিশি নির্যাতনের কারণেই হয়ত এখন আর ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কোথাও আন্দোলন দেখা যাচ্ছে না৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আন্দোলন সীমাবদ্ধ থাকছে সংবাদ সম্মেলন ও বিবৃতির মধ্যে৷ এমন নয় যে বিএনপির তৃণমূলে জনসমর্থন কম৷ তার ওপর সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন জমিয়ে তোলার মতো ইস্যুরও অভাব নেই৷ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি, নির্যাতন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটানোর মতো নানা প্রকল্প গ্রহণ, নিরাপত্তাহীনতা আর জঙ্গিবাদের বিস্তার – এর যে কোনো একটি ইস্যুই যে কোনো সরকারকে টালমাটাল পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে পারে৷ অথচ একটির পর একটি ঘটনা ঘটার পরেও সরকারবিরোধী সফল কোনো অবস্থান নিতে পারছে না বিএনপি৷