যে আফগানের বিতাড়ন ঠেকাতে চেয়েছিলেন সুইডিশ তরুণী

সম্প্রতি এলিন এরসন নামে সুইডিশ এক তরুণীর ফেসবুক লাইভ ভিডিও ভাইরাল হয়েছে৷ দুই আফগান নাগরিককে সুইডেন থেকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া ঠেকাতে অভিনব এক প্রতিবাদ করেছিলেন ঐ তরুণী৷

বিমান ছাড়ার আগ মুহূর্তে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে যান এবং বলতে থাকেন বিমানে থাকা আফগানদের নামিয়ে না দেয়া পর্যন্ত তিনি বসবেন না৷ উল্লেখ্য, নিয়ম অনুযায়ী বিমানের সব যাত্রী বসে সিটবেল্ট না বাঁধা পর্যন্ত বিমান যাত্রা শুরু করতে পারে না৷

পুরো ঘটনাটি ফেসবুক লাইভে শেয়ার করেন এরসন৷ তাঁর প্রতিবাদের কারণে বিমানে থাকা এক আফগান নাগরিককে নামিয়ে আনা হয়৷ সেই সঙ্গে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল এরসনকেও৷

সুইডিশ এই তরুণী অবশ্য দু'জন আফগান নাগরিকের বিতাড়ন ঠেকানোর পরিকল্পনা করেছিলেন৷ এদের একজনের বয়স ৫০-এর মতো, আরেকজন ২৬ বছর বয়সি ইসমাইল খাওয়ারি৷ তবে বিমানে শুধু ৫০ বছর বয়সি ব্যক্তিটি ছিলেন, ইসমাইল খাওয়ারি ছিলেন না৷

জানা গেছে, খাওয়ারির মা ও দুই বোন সুইডেনে থাকেন৷ তাঁরাই খাওয়ারির বিতাড়ন ঠেকাতে এরসনের সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন৷ এরসন ও তাঁর সহকর্মীরা খবর পেয়েছিলেন যে, দুই আফগান ব্যক্তিকে গথেনবুর্গ বিমানবন্দর থেকে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে প্রথমে ইসতান্বুল, পরে কাবুল পাঠানো হবে৷ সেজন্য এরসন ঐ ফ্লাইটের টিকিট কেটেছিলেন৷ কিন্তু পরে জানা যায়, ইসমাইল খাওয়ারি ঐ ফ্লাইটে ছিলেন না৷ তাঁকে পরদিন স্টকহোম থেকে কাবুল পাঠানো হয়৷

২৬ বছর বয়সি ইসমাইল খাওয়ারি কাবুলে কাউকে চেনেন না৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি জানান, তিনি আফগানিস্তানে জন্মেছেন, কিন্তু কোথায় তা জানেন না৷ কারণ ছয় বছর বয়সে পরিবারসহ তিনি ইরানে পালিয়ে যান৷ সেখানে ছিলেন ২০ বছর৷ এরপর সুইডেনে চলে যান৷ সেখানে তাঁর আশ্রয়ের আবেদন তিনবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে৷ এরপর তিনি জার্মানিতেও এসেছিলেন৷ কিন্তু সুবিধা হবে না ভেবে আবারও সুইডেন ফিরে গিয়েছিলেন৷ সেখানেই বাড়ি থেকে তাঁকে আটক করে পুলিশ৷ এরপর শেষ আটমাস ধরে ছিলেন একটি বিতাড়ন কেন্দ্রে৷ সেখানে আশ্রয় পাওয়াদের সঙ্গে গরুর মতো ব্যবহার করা হতো বলে ডয়চে ভেলেকে জানান ইসমাইল খাওয়ারি৷

কাবুলে কাউকে চেনেন না বলে এখন কোথায় যাবেন তা জানেন না তিনি৷

কাবুলে পৌঁছানোর পর এলিন এরসনের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে পারেন ইসমাইল খাওয়ারি৷ তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও তাঁর উদ্যোগের জন্য এরসনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি৷

জার্মানি থেকে আফগানিস্তানে বিতাড়ন

বিমানে করে ফেরত পাঠানো

গত ১২ সেপ্টেম্বর ১৫ জন শরণার্থীকে ডুসেলডর্ফ বিমানবন্দর থেকে আফগানিস্তানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা বিমানে তুলে দেয়া হয়৷ প্রত্যেকের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হয়ে গেছে৷ গত মে মাসে কাবুলে জার্মান দূতাবাসের সামনে প্রাণঘাতি গাড়ি বোমা বিস্ফোরণের পর আফগান শরণার্থীদের ফেরত পাঠানো কিছু সময়ের জন্য বন্ধ ছিল৷ এখন আবার শুরু হয়েছে৷ জার্মানির সবুজ দল এবং বামদল এর সমালোচনা করেছে৷

জার্মানি থেকে আফগানিস্তানে বিতাড়ন

একটা সুযোগের আশায় লড়াই

গত মার্চে কটবুসের একদল শিক্ষার্থী গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়৷ তিন আফগান সহপাঠীকে যাতে ফেরত পাঠানো না হয়, সেজন্য প্রচারণা চালিয়েছিল তারা৷ এজন্য তারা বিক্ষোভ করে, স্বাক্ষর সংগ্রহ করে৷ এমনকি আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হওয়া সেই তিন আফগান শিক্ষার্থীর পক্ষে লড়তে একজন আইনজীবী নিয়োগের অর্থও সংগ্রহ করা হয়৷ যে তিন শিক্ষার্থীর জন্য এত আয়োজন, তাদের একজনকে দেখা যাচ্ছে ওপরের ছবিতে৷

জার্মানি থেকে আফগানিস্তানে বিতাড়ন

‘কাবুল নিরাপদ নয়’

‘প্রাণঘাতি বিপদের দিকে যাত্রা’, গত ফেব্রুয়ারি মাসে মিউনিখ বিমানবন্দরে প্রতিবাদস্বরুপ দেখানো এক পোস্টারে একথা লেখা ছিল৷ যেসব বিমানবন্দর থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত পাঠানো হয়, সেসব বিমানবন্দরে মাঝেমাঝেই হাজির হন এমন প্রতিবাদকারীরা৷ গত ডিসেম্বর থেকে মে মাস অবধি অনেক আফগান শরণার্থীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে৷ চলতি বছর এখন অবধি আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়েছে ২৬১ জনকে৷

জার্মানি থেকে আফগানিস্তানে বিতাড়ন

ভ্যুর্ৎসবুর্গ থেকে কাবুল

মধ্য ত্রিরিশে পা দেয়া বাদাম হায়দারিকে সাত বছর জার্মানিতে কাটানোর পর গত জানুয়ারিতে দেশে ফেরত যেতে বাধ্য করা হয়৷ তিনি অতীতে ইউএসএইডে কাজ করেছেন এবং তালেবানের কাছ থেকে বাঁচতে জার্মানিতে এসেছিলেন৷ তালেবানের ভয় এখনো তাড়া করছে হায়দারিকে৷ তিনি আশা করছেন, শীঘ্রই হয়ত আবারো জার্মানিতে ফিরতে পারবেন৷

জার্মানি থেকে আফগানিস্তানে বিতাড়ন

নিগৃহীত সংখ্যালঘু

গত জানুয়ারি মাসে আফগান হিন্দু সমীর নারাংকে কাবুলে ফেরত পাঠানো হয়৷ ফেরত পাঠানোর আগ অবধি তিনি জার্মানির হামবুর্গে পরিবরাসহ ছিলেন৷ জার্মান পাবলিক রেডিওকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘আফগানিস্তান নিরাপদ নয়৷’’ যেসব সংখ্যালঘু রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হওয়ায় আফগানিস্তানে ফেরত যাচ্ছেন, তারা মুসলিমপ্রধান দেশটিতে সংখ্যালঘু হওয়ায় নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন৷

জার্মানি থেকে আফগানিস্তানে বিতাড়ন

অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিরে যাওয়া

পকেটে মাত্র বিশ ইউরো নিয়ে জার্মানি থেকে আফগানিস্তানে ফেরত যান রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে ব্যর্থরা৷ তাঁরা চাইলে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংগঠন আইওএম’এর সহায়তা নিতে পারেন৷ তাছাড়া সে দেশে জার্মান অর্থায়নে তাদের মানসিক চিকিৎসারও ব্যবস্থা রয়েছে৷

আব্দুল বারি হাকিম/জেডএইচ

আমাদের অনুসরণ করুন