যে কারণে স্বাধীন বিচার বিভাগ চাই

বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিনের৷ আইন বিশেষজ্ঞরা এই নিয়ে নানাবিধ মতামত প্রকাশ করছেন৷ পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছেন প্রধান বিচারপতি, প্রধানমন্ত্রী৷ কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি কেমন?

১.

বাংলাদেশে জনসাধারণের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ বর্তমানে ছাত্রলীগের পাতি নেতা থেকে আওয়ামী লীগের বড় নেতা অবধি সবার বিশেষ কদর রয়েছে৷ কোথাও কোনো স্থাপনা নির্মাণ থেকে শুরু করে রাস্তার মুদি দোকানদারদের পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয় স্থানীয় নেতাদের৷ অন্যদিকে বিরোধী দলীয়, মানে বিএনপি এবং জামায়াত-শিবিরের পাতি নেতা বা বড় নেতা অবধি সবাই মোটামুটি আছেন দৌঁড়ের উপর, কার্যত এলাকা ছাড়া৷ 

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত এই মানুষদের বাইরেও একটা বড় অংশ রয়ে গেছে৷ তাঁরা সাধারণ জনতা, যাঁদের অনেকেই কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচত হতে চান না৷ বরং চান সুস্থভাবে, স্বাভাবিকভাবে নিজের উপার্জন দিয়ে বেঁচে থাকতে৷ কিন্তু মাঝে মাঝেই দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিতদের হেনস্থার শিকার হন তাঁরা৷

সমাজ

দক্ষিণ এশিয়ায় চতুর্থ বাংলাদেশ

ডাব্লিউজেপির তালিকা বলছে, আইনের শাসনের দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান চার নম্বরে৷ এই অঞ্চলের ছয়টি দেশের উপর গবেষণা চালিয়েছে মার্কিন ঐ সংস্থাটি৷ অন্য দেশগুলো হচ্ছে, আফগানিস্তান, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা৷ এর মধ্যে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ৷ আর শীর্ষে আছে নেপাল৷

সমাজ

বিশ্বে অবস্থান ১০৩

মোট ১১৩টি দেশের উপর গবেষণা চালিয়েছে ডাব্লিউজেপি৷ এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৩৷ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় জরিপ চালানো হয়৷ এছাড়া আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের তৈরি প্রশ্নমালা দিয়ে বাংলাদেশের কমপক্ষে ৩০০ স্থানীয় বিশেষজ্ঞের উপরও জরিপ চালানো হয়েছে৷ বিশ্ব তালিকায় নেপাল, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের স্থান যথাক্রমে ৬৩, ১০৬ ও ১১১৷

সমাজ

বাকিদের অবস্থান

তালিকায় সবার উপরে আছে ডেনমার্কের নাম৷ অর্থাৎ সেই দেশে আইনের শাসন পরিস্থিতি সবচেয়ে ভাল৷ এরপরে আছে নরওয়ে ও ফিনল্যান্ড৷ জার্মানি অবস্থান ৬৷ আর সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ভেনেজুয়েলা (১১৩) ও কম্বোডিয়ায় (১১২)৷ সারা বিশ্বের প্রায় এক লাখ সাধারণ মানুষ ও প্রায় আড়াই হাজার বিশেষজ্ঞের উপর জরিপের ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে৷

সমাজ

যে বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া হয়েছে

মোট আটটি বিষয়ে জরিপকারীদের কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয়৷ এগুলো হলো সরকারের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা, সরকারি অফিসে দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, প্রয়োগকারী সংস্থা, দেওয়ানি বিচার ও ফৌজদারি বিচার৷

সমাজ

যেখানে বাংলাদেশ সবার নীচে

দক্ষিণ এশিয়ার তালিকায় বাংলাদেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও সরকারের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা এবং মৌলিক অধিকার – এই দু’টি বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে খারাপ৷

সমাজ

নিম্নআয়ের দেশের তালিকা

ডাব্লিউজেপি তাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা ২৮টি দেশকে নিম্নআয়ের দেশ বলে উল্লেখ করেছে৷ এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২৩ নম্বরে৷ বিস্তারিত জানতে উপরে (+) চিহ্নে ক্লিক করুন৷

এই তো সর্বশেষ বনানী ধর্ষণকাণ্ডে ভুক্তভোগী দুই তরুণী, যাঁদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় জানা যায়নি, আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছের হিসেবে পরিচিত কয়েক যুবকের কাছে নির্যাতিত হয়েও মুখ খোলার সাহস করেননি কয়েক সপ্তাহ৷ যখন মুখ খুলেছেন, তখন সন্দেহভাজন ধর্ষকদের রাজনৈতিক, আর্থিক শক্তির প্রকাশ দেখা গেছে৷ পুলিশ শুরুতে মামলা নিতে চায়নি৷ আর মামলা নেয়ার পর যাদের বিরুদ্ধে মামলা তাদের সমর্থনে কাজ করেছে রাজনৈতিক শক্তিও৷ ইতোমধ্যে এক সন্দেহভাজন ধর্ষকের রাজনৈতিক পরিচয়ও প্রকাশ হতে শুরু করেছে, যিনি নাম বদলে ঢাকার ‘এলিট সোসাইটি'-তে জায়গা করে নিয়েছেন রাজনীতিকে কাজে লাগিয়ে৷

বলছি না, রাজনীতি করা খারাপ কিছু৷ বরং রাজনীতি মানুষের অধিকার৷ কিন্তু বিপত্তি ঘটে যখন রাজনীতি থেকে প্রাপ্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়৷ আর তখন সাধারণ মানুষের আদালতের মুখাপেক্ষী হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না৷ বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা আছে বটে, কিন্তু রাজনীতি বা আর্থিক প্রভাবের কারণে ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা সেখানে অনেক কম৷

২.

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আরেকটি অশুভ চর্চা আছে৷ আর তা হচ্ছে কোনো একজন মানুষকে হেনস্থা করার জন্য তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করে যাওয়া৷ গতবছরের কথাই ধরুন৷ ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম এক টেলিভিশন টকশোতে আত্মসমালোচনা করতে গিয়ে তাঁর সম্পাদকীয় নীতিমালার এক ভুলের কথা স্বীকার করেছেন৷ তা ছিল এমন এক ভুল যা সেসময় অনেক পত্রিকার সম্পাদকই করতে বাধ্য হয়েছিলেন৷ যদিও তাঁরা কেউই তা কখনো প্রকাশ্যে স্বীকার করেননি৷

মাহফুজ আনাম স্বীকার করার পর খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কড়া সমালোচনা করলেন৷ আর তাতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উৎসাহ পেয়ে দেশব্যাপী ৮৪টি ক্ষতিপূরণ এবং মানহানী মামলা দায়ের করেন মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে৷ বিচার বিভাগও যদি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উৎসাহ পেতেন, তাহলে হয়ত এতদিনে নির্ঘাত কারাগারে কাটাতে হতো আনামকে৷ বরং হাইকোর্ট ঢালাওভাবে করা সেসব মামলার উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে

শুধু সাংবাদিক মাহফুজ আনাম নয়, অনেক রাজনীতিবিদও এরকম ঢালাও মামলার শিকার৷ কখনও কখনও দেখা যায় যে, এক মামলায় জামিন পেলেও আরেক মামলায় আটকে থাকতে হয় তাঁদের৷ তখন একসঙ্গে অনেক মামলার জামিন না পেলে জেলমুক্তির আর উপায় থাকে না তাঁদের৷ মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণের এটা এক মাধ্যম বটে৷ তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকায় এখনো কিছুটা হলেও রেহাই মিলছে৷

Arafatul Islam Kommentarbild App

আরাফাতুল ইসলাম, ডয়চে ভেলে

৩.

এবার বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের কথাই ধরি৷ বিএনপি পরিস্থিতি মনোঃপুত না হওয়ায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালো, ফলে কিছু আসনে নামমাত্র নির্বাচণের পাশাপাশি ১৫৩টি আসনে কোনোরকম ভোটাভুটি ছাড়াই নির্বাচিত হলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা৷ সংসদে বিরোধী দলের কার্যত কোনো অস্তিত্ব নেই৷ এরকম এক পরিবেশে আইনপ্রণেতারা চাইলে যে কোনো কিছুই অনুমোদন করিয়ে নিতে পারেন৷ সেটা দৃশ্যত বৈধ উপায়েই৷ এখন যদি কোনো বিচারপতির সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে যায়, তাহলে সেই বিচারপতিকে কি চাইলে এমন সংসদ সহজেই অপসারণ করতে পারেন না?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ রাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা যাতে স্বেচ্ছাচারী হয়ে না পড়েন, ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকারা যাতে একনায়কতান্ত্রিক মানসিকতা প্রদর্শন করতে না পারেন, সেজন্য বিচারবিভাগের সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ থাকা জরুরি৷ তাঁরা যাতে সাংসদদের হাতে হেনস্থার শিকার না হন, তাঁদের যাতে কারো ভয়ে ভীত হয়ে রায় দিতে না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি৷ একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এটাই আমার অনুরোধ৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন মন্তব্যে৷