রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ বন্ধ করবে না সরকার

পরিবেশের মূল্যায়ন করার আগে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ না করতে ইউনেস্কো আহ্বান জানালেও, তাতে কান দিচ্ছে না বাংলাদেশ৷ জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী সোমবার দাবি করেন, ‘‘বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কোনো বাধা নাই৷''

গত মাসে পোল্যান্ডে বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের ৪১তম সভায় সুন্দরবন ও রামপাল নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তা ইউনেস্কোর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় ৩০ জুলাই৷ তাতে বলা হয়, ‘সুন্দরবন এলাকার কৌশলগত পরিবেশ মূল্যায়নের (এসইএ) আগে সেখানে বড় কোনো শিল্প বা অবকাঠামো নির্মাণ না করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে৷' শুধু তাই নয়, পরিবেশগত মূল্যায়নের কাজ যত দ্রুত সম্ভব শেষ করে প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি পর্যালোচনার জন্য হেরিটেজ সেন্টারে পাঠাতেও বলা হয়৷  ইউনেস্কো জানায়, ২০১৯ সালে হেরিটেজ কমিটির ৪৩তম অধিবেশনে এ সব প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হবে৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত সংক্রান্ত ঐ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সুন্দরবন ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে দুই পৃষ্ঠায় মোট ১১টি সিদ্ধান্তের কথা জানান হয়৷

যার মধ্যে চতুর্থ দফায় – ‘বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় স্ট্র্যাটেজিক এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট (এসইএ) সমীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত স্বাগত জানানো হয় এবং এই সমীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঐ অঞ্চলে কোনো বড় আকারের শিল্প বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের অনুমতি না দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়৷ বলা হয় সমীক্ষাটি শেষ হওয়ার পর অপারেশনাল গাইডলাইনের ১৭২ অনুচ্ছেদ মেনে যত দ্রুত সম্ভব তার একটি কপি আইইউসিএন দিয়ে পর্যালোচনার জন্য বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রে পাঠাতে৷

অডিও শুনুন 03:37
এখন লাইভ
03:37 মিনিট
বিশ্ব | 31.07.2017

‘সরকার রামপাল নিয়ে বার বার মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে’

এছাড়া সপ্তম দফায় ‘রামপাল প্রকল্প নিয়ে ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর রিঅ্যাক্টিভ মনিটরিং মিশনের করা অন্যান্য সুপারিশও পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়৷'

দশম দফায় বলা হয়, ‘রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করা হলে সুন্দরবনে পরিবেশগত প্রভাব পড়বে বলে কমিটি উদ্বিগ্ন৷ এতে বায়ু ও পানিদূষণ বাড়বে৷ নৌ-চলাচল ও ড্রেজিং বেড়ে যাবে৷ স্বাদু পানি কমে যাবে৷ এর মধ্যেই সেই অঞ্চলের পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে গেছে৷ বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪১তম অধিবেশনে স্ট্রাটেজিক এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট (এসইএ)-এর অংশ হিসেবে এ সবের প্রভাব নিরূপণ নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশকে৷ ঝুঁকি কমাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে৷ সুন্দরবনের আউটস্ট্যান্ডিং ইউনিভার্সাল ভ্যালুর (ওইউভি) ওপর ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে বাংলাদেশকে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতেও বলা হয়৷

সবশেষে একাদশ দফায় বলা হয়, ‘বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ, সম্পদের সুরক্ষামূলক অবস্থা এবং উপরে যেসব সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বরের মধ্যে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির কাছে জমা দিতে হবে৷ ২০১৯ সালে অনুষ্ঠেয় কমিটির ৪৩তম অধিবেশনে প্রতিবেদনটি যাচাই-বাছাই করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়৷'

রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন সহ আরো কিছু পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে বিগত ৩৯তম সভার ৭ নম্বর সিদ্ধান্ত অনুসারে ২০১৬ সালের ২২ থেকে ২৮ মার্চে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির সদস্যরা সুন্দরবন এলাকা ভিজিট করে একটা প্রতিবেদন জমা দেয়৷

মোশাহিদা সুলতানা, শিক্ষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালেয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতুর মতে, সুন্দরবনের পাশে এত বড় একটা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করে একে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা কোনোভাবেই ঠিক হবে না৷ তাঁর মতে, সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিকল্প আছে৷

সায়েম ইউ চৌধুরী, পাখি ও বন্যপ্রাণী গবেষক

৪০ বারেরও বেশি সুন্দরবনে গেছেন সায়েম৷ তিনি জানান, সম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি সার কারখানা থেকে অ্যামোনিয়া গ্যাস নিঃসরণ হয়ে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়৷ পুকুরের মাছ, গাছপালা, প্রাণী – সব মারা পড়ে৷ এ রকম ছোট একটা সার কারখানার দুর্ঘটনা থেকে আমাদের পরিবেশ রক্ষা করার সক্ষমতা যেখানে নেই, সেখানে এত বড় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো দুর্ঘটনা হলে আমাদের সরকার কী-ই বা করার থাকবে?

মারুফ বিল্লাহ, স্থানীয় বাসিন্দা

মারুফ বিল্লাহর জন্ম রামপালেই৷ ছোটবেলা থেকেই তিনি সুন্দরবনকে ধ্বংস হতে দেখে আসছেন৷ আর এখন সুন্দরবন ঘেঁষে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করে একে ধ্বংসের আরেক পায়তারা করছে সরকার৷ তিনি জানান, সিডর আর আইলার পরে আমরা দেখেছি ঐ জনপদকে সে যাত্রায় বাঁচিয়েছিল সুন্দরবন৷ এখন যদি আমরাই তাকে মেরে ফেলি, তাহলে জনগণ কোথায় যাবে? তাই তাঁর প্রশ্ন, জীবন আগে, নাকি বিদ্যুৎ আগে?

সাইমুম জাহান হিয়া, শিক্ষার্থী

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইমুম জাহান হিয়া মনে করেন, সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বন৷ এর পাশে বিশাল আকারের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে যে কখনো কোনো দুর্ঘটনা হবে না – এটা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না৷ তাঁর মতে, দেশের উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজন আছে, এটা ঠিক, তবে সেটা সুন্দরবনকে ধ্বংস করে নয়৷

হাসিব মোহাম্মদ, শিক্ষার্থী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসিব মোহাম্মদ কয়েকবার সুন্দরবনে গেছেন৷ আসলে এই বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র তাঁকে সবসময় টানে৷ তাই এ বনের কোনোরকম ক্ষতি করে তিনি এর কাছাকাছি রামপালের মতো কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র চান না৷ গত বছরের কয়েকটি ছোট ছোট জাহাজ সুন্দরবনে ডোবার পর যে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, সে কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি৷ তাঁর আশঙ্কা, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে জাহাজ চলাচল বেড়ে গিয়ে দুর্ঘটনাও বাড়বে৷

মিমু দাস, শিক্ষার্থী

লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র মিমু দাসও মনে করেন, সুন্দরবনের এত কাছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা ঠিক হবে না৷ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার খবর পড়ে তাঁর মনে হয়েছে যে, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করবে৷ মিমু বিদ্যুৎকেন্দ্র চান, তবে সেটা অন্য কোথাও৷

আদনান আজাদ আসিফ, মডেল ও অভিনেতা

মডেল ও অভিনেতা আদনান আজাদ আসিফ একজন ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফারও৷ কয়েক বছর ধরে সময় পেলেই তিনি সুন্দরবনে ছুটে যান৷ বিশ্বের সবেচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসস্থল৷ তাঁর মতে, সুন্দরবন বাংলাদেশের ফুসফুস৷ আর এমনিতেই নানা কারণে এখানে বাঘের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে হ্রাস পেয়েছে৷ তাই এর কাছাকাছি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এমন কোনো প্রকল্প করে এ বনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া ঠিক হবে না৷

আমিনুর রহমান, চাকুরিজীবী

ঢাকার একটি পরিবহন সংস্থায় কাজ করেন আমিনুর রহমান৷ তাঁর মতে, দেশের উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ দরকার৷ তাই বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে দেশের জন্য ভালোই হবে৷ তাছাড়া তিনি শুনেছেন যে, রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে তা সুন্দরবনের কোনো ক্ষতিই করবে না৷

আব্দুল আজীজ ঢালী, মধু চাষি

সুন্দরবনে গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মধু আহরণ করেন সাতক্ষীরার আব্দুল আজীজ ঢালী৷ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এ বনের সঙ্গে থাকতে চান তিনি৷ সুন্দরবনে থাকলেও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পর্কে কিছুই জানেন না আব্দুল আজীজ৷

ভবেন বিশ্বাস, মাছ শিকারি

ভবেন বিশ্বাসের জীবিকার অন্যতম উৎস সুন্দরবন৷ উদবিড়াল দিয়ে এ বনে তিনি মাছ ধরেন ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে৷ তাঁর বাবা ও ঠাকুরদাদার এ পেশা এখনো তিনি ধরে রেখেছেন৷ রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে এ খবর তিনি শুনে থাকলেও, এর ভালো বা খারাপের দিকগুলো – কিছুই জানা নেই তাঁর৷ তবে সুন্দরবনকে তিনি ভালোবাসেন, খুব ভালোবাসেন৷

সেই প্রতিবেদন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া জবাব এবং আরও কিছু তথ্য একত্রিত করে ৩ জুলাইয়ে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ২১ সদস্যের ৪১ তম সভায় সুন্দরবনকে ডেঞ্জার লিস্টে নেওয়া হবে কিনা– তা নিয়ে আলোচনা করা হয়৷ আলোচনা শেষে ১২ জুলাই সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়৷

এর আগে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, ঐ সভায় রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ওপর আপত্তি তুলে নিয়েছে ইউনেস্কো৷ কিন্তু সোমবার বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে ইউনেস্কোর বরাত দিয়ে প্রকৃত সিদ্ধান্ত প্রকাশ হওয়ার পর বিকেলে এক জরুরি প্রেসব্রিফিংয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী৷ তিনি বলেন, ‘‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলবে৷ ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির প্রতিবেদনেও বলা আছে, এই প্রকল্পের কাজে কোনো বাধা নেই৷ সংবাদমাধ্যমগুলো বিভ্রান্তিকর খবর পরিবেশন করছে৷''

বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত এই প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি আরো বলেন, ‘‘ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ছোট ছোট অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাওয়া যাবে৷ তবে এই কেন্দ্রের আশেপাশে বড় আকারে কোনো শিল্প কারখানা বা কোনো ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ রা যাবে না৷''

তাঁর কথায়, ‘‘সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হোক, তা আমরাও চাই না৷ হেরিটেজ কমিটি বাংলাদেশকে এনভায়রনমেন্টাল স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট তৈরি করতে বলেছে৷ আগামী দু'বছরের মধ্যে এই রিপোর্ট তৈরি করা হবে৷ পাশাপাশি আগামী ২০১৮ সালের মধ্যেই আমরা কমিটিকে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেবো৷''

গণমাধ্যমে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, ‘‘রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে হেরিটেজ কমিটির অনুমোদন নেই – গণমাধ্যমে এ বিষয়ে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো বিভ্রান্তিকর৷''

জ্বালানি উপদেষ্টার কথার জবাবে জাতীয় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সরকারের একগুয়েমি এবং প্রতারণার ব্যাপারে আমরা সবাইকে সতর্ক করে আসছি সব সময়৷ এবার আবারো প্রমাণ হলো যে সরকার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বার বার মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে৷ এটা প্রমাণিত এবং ইউনেস্কোও বলেছে সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় হয় রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ করতে হবে, নয় ওখান থেকে সরাতে হবে৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টার মতো একটা পদে থেকে ক্রমাগত প্রকৃত সত্য কীভাবে অস্বীকার করতে পারে, তা আমার কাছে একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার৷ এটা সবাই দেখতে পাচ্ছে৷ লেখা আছে৷ যারা আপত্তিকে অনাপত্তি বলে তারা যে সত্যকে অস্বীকার করবে, এটাই তো স্বাভাবিক৷ আমরা চাই দেশের স্বার্থে দেশের মানুষের স্বার্থে এখনই রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ বন্ধ করা হোক৷ এটা বন্ধে যত দেরি হবে ততই দেশের ক্ষতি৷''

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘পরিবেশের ক্ষতি না করেও কম খরচে কীভাবে দেশের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় তার একটি পরিকল্পনা বা প্রস্তাব আমরা উপস্থাপন করেছি গত সপ্তাহে৷ আশা করছি, সরকার আমাদের প্রস্তাব বিবেচনা করবে৷''

‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে, ধান দিলাম মেপে’

বঙ্গোপসাগরের উপকূল ঘেঁষে সুন্দরবনে বর্ষা আসে মে মাসে আর সেই বর্ষাকাল চলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত৷ অবশ্য জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যভাগ পর্যন্ত এখানে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়৷ সুন্দরবন অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৬৪০-২০০০ মিমি৷ তবে বনের পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে বৃষ্টিপাত তুলনামূলকভাবে বেশি৷

দিনে দু’বার জোয়ার-ভাটা

প্রতিদিন দু’বার করে জোয়ার-ভাটা হয় সুন্দরবনে, যা কিনা বাংলাদেশ ও ভারত – প্রতিবেশী এই দুই দেশের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত৷ এখানে সবচেয়ে বড় জোয়ার হয় পূর্ণিমা ও অমাবস্যায়৷ তবে বর্ষাকালে জোয়ারের উচ্চতা থাকে সবচেয়ে বেশি৷ এ সময় বনের বেশিরভাগ অংশই প্লাবিত হয়, ডুবে যায় সবকিছু৷

খাবারের সন্ধানে হরিণসাবক

জোয়ারের পানিতে সুন্দরবন প্লাবিত হলে হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীরা অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গাগুলোয় আশ্রয় নেয়৷ এরপর জোয়ারের পানি নেমে গেলে খাবারের সন্ধানে নেমে পড়ে তারা৷ আর ঠিক সেই মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করে থাকেন বহু পর্যটক – বন্যপ্রাণী দেখবেন বলে৷

বর্ষার জন্য বিশেষ ‘প্যাকেজ’

বর্ষায় সুন্দরবনে পর্যটকের আনাগোনা বেশ কম৷ এ বনে পর্যটনের মৌসুম মূলত নভেম্বর থেকে মার্চ৷ তবে বর্ষার সুন্দরবনকে দেখতে কিছু কিছু ভ্রমণপিয়াসী মানুষ এখানে আসেন বটে৷ আর সেই সব পর্যটকদের চাহিদার কারণেই সম্প্রতি দু-একটি বেসরকারি ভ্রমণ সংস্থা বর্ষাকালে সুন্দরবন ভ্রমণের ব্যবস্থা করছে, দিচ্ছে বিশেষ ‘প্যাকেজ’৷

তারপরেও পরিত্যক্ত বহু এলাকা

বর্ষা মৌসুমে প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা সুন্দরবনের হাড়বাড়িয়া বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের একটি পর্যটক ট্রেল৷ এ সময়ে পর্যটকের যাতায়াত না থাকায় এই হাঁটা পথের ওপরে জমা হয়েছে বিভিন্ন গাছের ফল৷ আসলে ম্যানগ্রোভ অরণ্য হলেও, বেশ কিছু ফল গাছও আছে সুন্দরবনে৷

সুন্দরী বন সুন্দরবন

জোয়ারের পানিতে সুন্দরবনের এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ভেসে আসে এ বনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী গাছের ফল৷ ভেসে যায় আশেপাশের কোনো এলাকায়৷ তবে সুন্দরী গাছের বন সুন্দরবনে এমন একটা দৃশ্যের দেখা পাওয়া যায় কেবলমাত্র বর্ষাকালে৷

জঙ্গলের বিস্তার, সুন্দরেরও

জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা সুন্দরী ফলের অংশ বিশেষ ভাটার সময় জঙ্গলে থেকে যায়৷ তারপর সেখান থেকেই অঙ্কুর গজায়, গাছ হয়, ফুল ফোটে, ফল দরে৷ এভাবেই বিস্তার ঘটে সুন্দরী গাছ এবং তার সঙ্গে সঙ্গে সুন্দরবনের৷ প্রকৃতির এ নিয়মেই বেড়ে উঠেছে সুন্দরবনের বেশিরভাগ বনাঞ্চল৷

সুন্দরবনের বানর

সুন্দরবনের অন্যতম বাসিন্দা বানর৷ ম্যানগ্রোভ বা শ্বাসমূলীয় এই বনে বেড়াতে গেলে তাই এদের চোখে পড়বেই৷ কখনও একা একা, আবার কখনও দঙ্গল বেধে ঘুরে বেড়ায় এরা৷ তবে বৃষ্টির সময় এদের গাছের ডালেই আশ্রয় নিতে দেখা যায়৷

চলে লুকোচুরির খেলা...

বর্ষাকালে সুন্দরবনে চলে রোদ আর বৃষ্টির লুকোচুরি৷ ঝকঝকে রোদের মধ্যে হঠাৎ করেই আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখা যায় এখানে৷ গাড় হয়ে ওঠে নদীর জল, বনের সবুজে পড়ে ছায়া৷ কখনো কখনো মেঘের ভেতর থেকেই সূর্য উঁকি মারে, অসাধারণ দৃশ্যের অবতারণা হয় বনজুড়ে৷

‘লাল-নীল-সবুজের মেলা বসেছে’

কখনও আবার তুমুল বৃষ্টিপাতের মধ্যে হঠাৎ করেই ঝকঝকে নীলাকাশ দেখা যায় সুন্দরবনে৷ বৃষ্টিধৌত বনে সূর্যের আলো তখন ভিন্ন পরিবেশের সৃষ্টি করে৷ ঝলমল করে ওঠে নদী, বনের গাছ৷ বৃষ্টি একটু ধরলে আস্তে আস্তে নদীর ধারে চড়তে আসে বানর, হরিণ, এমনকি বাঘ মামাও৷

বর্ষার এক ভিন্ন চিত্র

সুন্দরবনের হাড়বাড়িয়া বন্যপ্রাণী অভয়রাণ্যে বৃষ্টিস্নাত এক ‘গ্রেটার ইয়োলোনেইপ’ বা বড় হলদেসিঁথি কাঠঠোকরা৷ নানা রকম পাখির নিরাপদ আবাসস্থল এই সুন্দরবন৷ প্রায় ৪০০ প্রজাতির আবাসিক ও পরিযায়ী পাখি রয়েছে সুন্দরী গাছের এ বনে৷

সুন্দরবনের সুন্দরী হাঁস

সুন্দরবনের কটকা বনাঞ্চলের বড় কটকার খালে চোখে পড়ে ‘মাস্কড ফিনফুট’ বা সুন্দরী হাঁস৷ এর আরেক নাম কালোমুখ প্যারা পাখি৷ বাংলাদেশের সুন্দরবন ও মিয়ানমারে এ হাঁসের বিচরণ সবচেয়ে বেশি৷ সারা পৃথিবীতে বর্তমানে এ পাখির সংখ্যা এক হাজারেরও কম৷ লাজুক স্বভাবের সুন্দরী হাঁসের বৃহত্তম আবাসস্থলও সুন্দরবন৷

জেলেদের জীবন

সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী জয়মনি জেলে পল্লীর পাশে পশুর নদীতে চিংড়ি পোনা সংগ্রহ করছেন জেলেরা৷ সুন্দরবনের পাশে গড়ে ওঠা ভ্রাম্যমাণ এ জেলে পল্লীর জেলেরা সুন্দরবন ও তার আশেপাশে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন৷

ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের পর...

সুন্দরবনের শেলা নদীতে চলছে তেলবাহী ট্যাংকার ও মালবাহী জাহাজ৷ গত ডিসেম্বরে প্রায় ৫৮ হাজার লিটার ফার্নেস অয়েল নিয়ে জাহাজ ডুবির পরও এ রুটে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়নি৷ এছাড়া সাম্প্রতিক বাঘশুমারিতে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার কারণ হিসেবেও এই নৌ-রুটটিকে দায়ী করা হচ্ছে৷