‌রাষ্ট্রীয় নজরদারির বিরুদ্ধে

ই-মেল থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া, সর্বত্র নজরদারি চালাতে চায় মোদী সরকার৷ কিন্তু বাদ সেধেছেন পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক মহুয়া মৈত্র৷

জর্জ অরওয়েলের উপন্যাসে আছে এমন রাষ্ট্রের কথা, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের প্রতিটি কাজকর্মের ওপর নজর রাখে প্রশাসন৷ কমিউনিস্ট-শাসিত সোভিয়েত রাশিয়ার কঠোর নজরদারির কথা মাথায় রেখে সেই উপন্যাস লিখেছিলেন অরওয়েল৷ যদিও একা রাশিয়া নয়, অ্যামেরিকাও সমান নিন্দিত হয়েছে একসময়, স্বদেশে এবং বিদেশে তাদের বে-এক্তিয়ার গোয়েন্দাগিরির জন্য৷ রাশিয়ার যেমন গুপ্তচর সংস্থা কেজিবি, অ্যামেরিকার তেমনি সিআইএ৷ ভারতেও সম্ভবত সেরকমই কর্তৃত্ব কায়েম করার কথা ভাবছেন কেন্দ্রের  বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী৷ প্রথমে তথ্য সম্প্রচার আইন বদলে, তারপর ভারতীয় নাগরিকদের শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ‘‌আধার'‌-এর নিয়ামক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তারা দেখতে চাইল, সোশ্যাল মিডিয়ায়, ব্যক্তিগত ই-মেলে সরকারবিরোধী কোনো কথাবার্তা, কাজকর্ম হচ্ছে কিনা৷ তারপর নির্দেশিকা এলো, দেশের ১০টি তদন্তকারী সংস্থাকে যে কোনো নাগরিকের কম্পিউটার খুলে দেখার, একাধিক কম্পিউটারের মধ্যে চালু হওয়া ই-মেল ও অন্যান্য বার্তা তল্লাশি করে দেখার ছাড়পত্র দেওয়া হবে৷

বিতর্কিত এই বিধি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে বিস্তর বিতর্ক হলো৷ চায়ের আড্ডায়, সোশাল মিডিয়ায় তুফান উঠল৷ কিন্তু কাজের কাজটা করেছেন  পশ্চিমবঙ্গের করিমপুরের তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক মহুয়া মৈত্র৷ তিনি সোজা সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে এক এক করে তিনটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে দিয়েছেন সরকারের বিরুদ্ধে৷ বিষয়টা যে অবাঞ্ছনীয়, সেটা মামলায় হাজির দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের সতর্ক প্রতিক্রিয়াতেই স্পষ্ট৷ কিন্তু তার পরেও পিছু হটছে না সরকার, বরং ঘুরপথে এগিয়ে যেতে চাইছে৷

অডিও শুনুন 05:01
এখন লাইভ
05:01 মিনিট
বিষয় | 11.02.2019

‘সরকারের বিরুদ্ধে কিছু আছে কিনা জানার জন্য প্রতিটি জেলায় বেসর...

মহুয়া মৈত্র ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, কেন্দ্রের সরকার বিষয়টা নিয়ে কীভাবে ছলচাতুরীর আশ্রয় নিচ্ছে৷ মহুয়া বললেন, ‘‌‘‌প্রথমে এপ্রিল (‌২০১৮)‌ মাসে আমাদের তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রক একটি টেন্ডার প্রকাশ করে তার ওয়েবসাইটে৷ সেই টেন্ডারে তারা দরপত্র চেয়েছিল, সমস্ত নাগরিকের ব্যক্তিগত ই-মেল, ব্যক্তিগত ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, যা-ই হোক, সব ‘‌সোশ্যাল মিডিয়া টুল'‌-এর ওপর প্রতিটি জেলায় তারা একটি বেসরকারি সংস্থা বসিয়ে, সেই সংস্থার কর্মচারীরা সোশাল মিডিয়ায় নজরদারি করবে৷ সরকারের বিরুদ্ধে কিছু আছে কিনা, সেটা জানার জন্য৷ এটা যখন হয়, তখন আদালতে ছুটি চলছিল৷ জুলাই মাসে আমি এটা (‌পিটিশন)‌ ফাইল করি৷ আগস্টে যখন এটা ওঠে, ছুটি শেষ হওয়ার পরে, তখন কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল অফ ইন্ডিয়া কে কে বেণুগোপাল দাঁড়িয়ে বললেন যে, ‘‌না, এটা আমরা চালু করছি না৷ এটা আমাদের মনে হয় যে, যতটা গবেষণা করা উচিত ছিল, আমরা করিনি৷ আমরা এটা আপাতত বন্ধ করে দিচ্ছি, প্রত্যাহার করছি৷'‌ যেদিন উনি দাঁড়িয়ে সেটা প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর আদালতে বললেন যে ‘‌আমরা প্রত্যাহার করছি'‌, ঠিক তক্ষুনি, সেই একই সময়ে ওরা কিন্তু ঠিক একই টেন্ডার আধার কর্তৃপক্ষ, ইউআইডিআই-এর মাধ্যমে একই টেন্ডার আবার ওয়েবসাইটে তুলে দিলো৷ প্রথম পিটিশনের জবাবে ওরা যখন বলল ‘‌আমরা প্রত্যাহার করে নিচ্ছি', আমরা ভাবলাম আমাদের জয় হয়েছে, দেখা গেল যে সেটা খুবই ক্ষণস্থায়ী৷ দুদিনের মধ্যে ওরা আবার একই দরপত্রের আবেদন রাখলো৷ তখন আবার দ্বিতীয় রিট পিটিশন ফাইল করলাম, যেটা অবিকল প্রথম পিটিশনের মতো ছিল৷ সেটার জবাবে কেন্দ্র সরকার বলল, এ ব্যাপারে তোমার কী কী মতামত, সেটা আমরা বিবেচনা করতে রাজি আছি৷ তখন সুপ্রিম কোর্ট বলল, তুমি (‌‌যা যা বলার আছে) হলফনামা দিয়ে বল৷ তখন আমি বললাম যে, একবার যখন কেউ তথ্য দেখে নেয়, সেটা আর ফেরত দেওয়া যায় না৷ এটা একেবারেই সাদা এবং কালো৷ এর মাঝামাঝি কোনো বিষয় নেই৷ সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা চাই যে, এটা প্রত্যাহার করা হোক, এটার কোনো যুক্তি নেই!‌‌'‌'‌

নেতা ও প্রশাসন যখন হাতের নাগালে

সুষমা স্বরাজ

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে টুইট করে হাতেনাতে ফল পেয়েছেন, এমন ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা কম নয়৷ বিদেশের মাটিতে সংকটে পড়া থেকে শুরু করে মধুচন্দ্রিমার ঠিক আগে সদ্যবিবাহিত স্ত্রীর পাসপোর্ট অন্তর্ধান – এমন অনেক পরিস্থিতিতে মুশকিল আসান হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছেন স্বরাজ৷

নেতা ও প্রশাসন যখন হাতের নাগালে

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অ্যাপ

আপদকালীন পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমতাসীন মন্ত্রী বা শীর্ষ আমলার টুইটার অ্যাকাউন্ট মনে রাখা অনেক সময়ে কঠিন হতে পারে৷ তাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিশেষ অ্যাপ চালু করেছে৷ বিদেশে সংকটে পড়লে যে কোনো ভারতীয় নাগরিক এর সাহায্যে নিকটবর্তী দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন৷

নেতা ও প্রশাসন যখন হাতের নাগালে

নরেন্দ্র মোদী

ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়ে নরেন্দ্র মোদী সংবাদমাধ্যমকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে ফেসবুক, টুইটারকেই নিজের বার্তা পৌঁছে দেবার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন৷ পিএমও বা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর প্রায় ২৪ ঘণ্টাই সজাগ থাকে৷ সরাসরি যোগাযোগ করলে অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়৷

নেতা ও প্রশাসন যখন হাতের নাগালে

শশী থারুর

ভারতের রাজনৈতিক জগতে টুইটার ব্যবহারের পথিকৃৎ বলা যেতে পারে সাবেক কূটনীতিক, লেখক ও কংগ্রেস নেতা শশী থারুরকে৷ বিগত সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনিও সরাসরি অনেক মানুষের সহায়তা করতে পেরেছিলেন৷ অন্যদিকে নানা মন্তব্যের কারণে বার বার সমস্যায় পড়েছেন তিনি৷

নেতা ও প্রশাসন যখন হাতের নাগালে

বিপর্যয়ের সময় টুইটার

২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের দক্ষিণে চেন্নাই শহরে ভয়াবহ বন্যায় গোটা শহর বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল৷ সরকার, প্রশাসন ও নৌ-বাহিনী সহায়তা ও ত্রাণ তৎপরতার কাজে টুইটার-কে অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহার করতে পেরেছিল৷ #ChennaiRains এবং #ChennaiRainsHelp হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে বিচ্ছিন্ন জলবন্দি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল৷

নেতা ও প্রশাসন যখন হাতের নাগালে

সরকারি পরিষেবার ‘টুল’

ভারতীয় রেল বিশ্বের অন্যতম বিশাল ও জটিল এক পরিবহণ নেটওয়ার্ক৷ যাবতীয় সদিচ্ছা সত্ত্বেও যাত্রীদের অভিযোগের শেষ নেই৷ ভারতীয় রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু তাই ফেসবুক ও টুইটারের এক সার্বিক প্ল্যাটফর্ম চালু করেছেন৷ এর মাধ্যমে নানা বিষয় নিয়ে সরাসরি রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব৷

নেতা ও প্রশাসন যখন হাতের নাগালে

সজীব ওয়াজেদ জয়

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও তথ্য প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ফেসবুক এবং টুইটারে বেশ সক্রিয়৷ তাঁর ফেসবুক পেজের স্ট্যাটাস প্রায়ই খবর হয়৷ তিনি প্রয়োজন হলে বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা এবং তথ্য দেন সেখানে৷

মহুয়া মৈত্রর বক্তব্য এ ব্যাপারে খুবই স্পষ্ট৷ যখন সামনের দরজা দিয়ে কিছু করা যায় না, তখন লোকে পেছনের দরজা দিয়ে চুপিসারে কাজটা করার চেষ্টা করে৷ এক্ষেত্রেও নরেন্দ্র মোদী সরকার বারবার একই চেষ্টা করে যাচ্ছে৷ সেটা আটকাতে পরপর দুটো জনস্বার্থ রিট পিটিশন মহুয়া করেছেন, যেটার শুনানি সামনেই৷ আর তৃতীয় যে পিটিশনটি মহুয়া করেছেন, সেটা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের একটি নির্দেশিকার বিরুদ্ধে, যেখানে দেশের ১০টি সংস্থাকে যে কোনো নাগরিকের কম্পিউটার হাতড়ে দেখা, ই-মেল, মেসেজ পড়ার ঢালাও ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে৷ মহুয়া বলছেন, সাধারণ মানুষের বাড়িতে যে কম্পিউটার আছে, যেটা বাড়ির লোকজন, বাবা-মায়েরা ব্যবহার করেন, সেটাও বাজেয়াপ্ত করে তল্লাশি করার ছাড়পত্র দিতে তথ্য-প্রযুক্তি আইনে এই বদল করা হচ্ছে৷ মোদী সরকারের যুক্তি হলো, এটা নতুন কিছু নয়, অনেক আগে থেকেই আছে৷ কিন্তু সেই আইন অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তার কারণে এমনটা করা যেতে পারে৷ তার জন্যে পাঁচটা নির্দিষ্ট কারণ বলে দেওয়া আছে৷ কিন্তু কেন্দ্র সরকার ওই কারণগুলো এড়িয়ে গিয়ে ১০টা দপ্তরকে নজরদারির এই একতরফা অধিকার দিতে চাইছে৷ সেই ১০ সংস্থার মধ্যে প্রত্যক্ষ কর বিষয়ক পর্ষদ আছে৷ দিল্লি পুলিশও আছে৷ যদি এটা জাতীয় সুরক্ষার প্রশ্নে হয়, তাহলে কর দপ্তরকেও কেন এই ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে?‌ প্রশ্ন তুলেছেন মহুয়া মৈত্র৷

রাষ্ট্রীয় নজরদারির এই গোটা বিষয়টিই এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারাধীন৷ মহুয়া আশা করছেন, সেখানে ন্যায়বিচারই পাবেন দেশের মানুষ৷