রাষ্ট্র মানে বুলেট! মানবিকতা ঝুলে থাকে কাঁটাতারে

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতার থেকে ঝুলতে থাকা ১৫ বছরের কিশোরী ফেলানী খাতুনের মৃতদেহ এখনও বহু মানুষের চেতনায় এক অস্বস্তিকর প্রশ্নচিহ্নের মতো ঝুলে আছে৷ কেন মারা গিয়েছিল ফেলানী? উত্তর মেলেনি আজও৷

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী কেন অমন নির্মমভাবে তাকে গুলি করে মেরেছিল? কী দোষ ছিল ফেলানীর? এ সব প্রশ্নেরও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি৷ অথচ ফেলানী কিন্তু কোনো সন্ত্রাসবাদী নয়৷ ভারত সীমান্তে কোনো নাশকতা করে সে গা ঢাকা দিচ্ছিল না৷ পেটের ভাত জোগাড়ের জন্য সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে যাওয়াটা যদি অপরাধ হয়, একমাত্র সেই অপরাধটুকু করেছিল ফেলানী, তার পরিবার৷ কিন্তু সেদিন, ২০১১ সালের সেই ৭ জানুয়ারি ফেলানী প্রতিবেশী দেশটিতে অনুপ্রবেশ করছিল না৷ বরং সে তার বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরছিল৷ নিজের দেশে ফিরছিল৷ কারণ আদরের মেয়ের বিয়ের ঠিক করেছিলেন বাবা নূর ইসলাম৷

অডিও শুনুন 02:36
এখন লাইভ
02:36 মিনিট
বিষয় | 12.02.2016

আমার মেয়েটা কেন বিচার পাবে না? – প্রশ্ন ফেলানীর বাবা নূর ইসলা...

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

নূর ইসলাম মই বেয়ে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া টপকে ওদিকে চলে গিয়েছিলেন, পিছনেই ছিল ফেলানী৷ কিন্তু বেড়া টপকাবার সময় তার জামার একটা অংশ আটকে গিয়েছিল কাঁটাতারে৷ ভয় পেয়ে চীৎকার শুরু করেছিল ফেলানী, সচকিত হয়েছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা এবং গুলি চালিয়েছিল৷ বুকে গুলি লেগেছিল ফেলানীর, কিন্তু তখনই সে মরেনি৷ অনেকক্ষণ ঝুলে ছিল ওইভাবে এবং কাতর গলায় ‘জল', ‘জল' করে চেঁচিয়েছিল৷ অথচ মরার আগে পর্যন্ত কেউ তার তেষ্টা মেটায়নি৷ মরে যাওয়ার পরেও ওভাবেই ঝুলে ছিল সে৷ ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা শিকারের ‘ট্রোফি' সাজিয়ে রাখার মতো করে ঝুলিয়ে রেখেছিল মৃত ফেলানীকে, নিজেদের পরাক্রমের প্রমাণ হিসেবে৷

ফেলানীর ছবি সংবাদমাধ্যম মারফত দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ার পর নিন্দা-সমালোচনার ঝড় উঠেছিল দিকে দিকে৷ মামলা হয়েছিল, অভিযুক্ত হয়েছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ৷ ফেলানীর বাবা এবং কাকা কুচবিহারে গিয়ে সেই মামলায় সাক্ষ্যও দিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু ন্যায়বিচার পাননি৷ অভিযুক্ত বিএসএফ কনস্টেবল অমিয় ঘোষ বেকসুর রেহাই পেয়ে যান, তাঁর বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ না থাকার যুক্তিতে৷ পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ, সংক্ষেপে ‘মাসুম' নামে একটি সংগঠন এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করে, যে আইনি লড়াই এখন ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে পৌঁছেছে৷ কিন্তু সেখানে মামলাটি গৃহীত হলেও শুনানির দিন আর আসছে না, জানালেন এই মাসুম সংগঠনের তরফে কিরীটি রায়৷ আর একা ফেলানী নয়, সীমান্তে রক্ষীবাহিনীর নিগ্রহ এবং সন্ত্রাসের এরকম একাধিক ঘটনায় তাঁরা আইনি প্রতিরোধের রাস্তা নিয়েছেন৷ কিন্তু সবই আটকে আছে বিচারব্যবস্থার চিরাচরিত দীর্ঘসূত্রিতায়৷

অডিও শুনুন 01:09
এখন লাইভ
01:09 মিনিট
বিষয় | 15.02.2016

ফেলানীর জন্য যেভাবে কাজ করছে ‘মাসুম’

আর ফেলানী খাতুনদের মতো অসংখ্য মানুষের, অগণিত পরিবারের যে সমস্যা? যারা সীমান্ত বোঝে না, বোঝে শুধু পেটের খিদে, জীবিকার খোঁজ? অপরাধ করতে ভালোবাসে বলে যারা অনুপ্রবেশ করে না, জীবিকার তাগিদে যারা চলে আসে এক দেশ থেকে অন্য দেশে এবং প্রতিদিন নিগৃহীত হয়, শোষিত, অত্যাচারিত হয়, আর তার পর এভাবেই হয়ত একদিন বেঘোরে মারা যায়? তাদের এই মৌলিক সমস্যাটার সমাধানের কি কোনো চেষ্টা হচ্ছে? কিরীটি রায় জানালেন, প্রায় প্রতিমাসেই সীমান্তে এ ধরনের অত্যাচারের ঘটনা ঘটছে এবং তাঁরা প্রতিবাদ করছেন৷ কিন্তু প্রতিবাদই সার, বিচার মিলছে না৷

২০১৫ সালের ১ আগস্টের প্রারম্ভেই ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের মানচিত্রের অংশ হয়ে গেল৷ দিনটিকে উৎসবের আনন্দে উদযাপন করা হয়৷ বাংলাদেশের অংশে ওড়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আর ভারতে ওড়ানো হয় ভারতীয় পতাকা৷ ছবিতে কুড়িগ্রামের দাশিয়ারছরা উপজেলায় বাংলাদেশের পতাকা ওড়াচ্ছেন উপজেলার নির্বাহি কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দীন আহমেদ (মাথায় সাদা টুপি)৷

৬৮ বছরের অবর্ণনীয় কষ্ট থেকে মুক্তির মুহূর্তে পঞ্চগড়ের ছিটমহলবাসীরাও হাতে তুলে নিয়েছিলেন প্রজ্বলিত মোমবাতি৷

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী কেন অমন নির্মমভাবে তাকে গুলি করে মেরেছিল? কী দোষ ছিল ফেলানীর? এ সব প্রশ্নেরও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি৷ অথচ ফেলানী কিন্তু কোনো সন্ত্রাসবাদী নয়৷ ভারত সীমান্তে কোনো নাশকতা করে সে গা ঢাকা দিচ্ছিল না৷ পেটের ভাত জোগাড়ের জন্য সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে যাওয়াটা যদি অপরাধ হয়, একমাত্র সেই অপরাধটুকু করেছিল ফেলানী, তার পরিবার৷ কিন্তু সেদিন, ২০১১ সালের সেই ৭ জানুয়ারি ফেলানী প্রতিবেশী দেশটিতে অনুপ্রবেশ করছিল না৷ বরং সে তার বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরছিল৷ নিজের দেশে ফিরছিল৷ কারণ আদরের মেয়ের বিয়ের ঠিক করেছিলেন বাবা নূর ইসলাম৷

অডিও শুনুন 02:36
এখন লাইভ
02:36 মিনিট
বিষয় | 12.02.2016

আমার মেয়েটা কেন বিচার পাবে না? – প্রশ্ন ফেলানীর বাবা নূর ইসলা...

নূর ইসলাম মই বেয়ে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া টপকে ওদিকে চলে গিয়েছিলেন, পিছনেই ছিল ফেলানী৷ কিন্তু বেড়া টপকাবার সময় তার জামার একটা অংশ আটকে গিয়েছিল কাঁটাতারে৷ ভয় পেয়ে চীৎকার শুরু করেছিল ফেলানী, সচকিত হয়েছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা এবং গুলি চালিয়েছিল৷ বুকে গুলি লেগেছিল ফেলানীর, কিন্তু তখনই সে মরেনি৷ অনেকক্ষণ ঝুলে ছিল ওইভাবে এবং কাতর গলায় ‘জল', ‘জল' করে চেঁচিয়েছিল৷ অথচ মরার আগে পর্যন্ত কেউ তার তেষ্টা মেটায়নি৷ মরে যাওয়ার পরেও ওভাবেই ঝুলে ছিল সে৷ ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা শিকারের ‘ট্রোফি' সাজিয়ে রাখার মতো করে ঝুলিয়ে রেখেছিল মৃত ফেলানীকে, নিজেদের পরাক্রমের প্রমাণ হিসেবে৷

ফেলানীর ছবি সংবাদমাধ্যম মারফত দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ার পর নিন্দা-সমালোচনার ঝড় উঠেছিল দিকে দিকে৷ মামলা হয়েছিল, অভিযুক্ত হয়েছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ৷ ফেলানীর বাবা এবং কাকা কুচবিহারে গিয়ে সেই মামলায় সাক্ষ্যও দিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু ন্যায়বিচার পাননি৷ অভিযুক্ত বিএসএফ কনস্টেবল অমিয় ঘোষ বেকসুর রেহাই পেয়ে যান, তাঁর বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ না থাকার যুক্তিতে৷ পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ, সংক্ষেপে ‘মাসুম' নামে একটি সংগঠন এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করে, যে আইনি লড়াই এখন ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে পৌঁছেছে৷ কিন্তু সেখানে মামলাটি গৃহীত হলেও শুনানির দিন আর আসছে না, জানালেন এই মাসুম সংগঠনের তরফে কিরীটি রায়৷ আর একা ফেলানী নয়, সীমান্তে রক্ষীবাহিনীর নিগ্রহ এবং সন্ত্রাসের এরকম একাধিক ঘটনায় তাঁরা আইনি প্রতিরোধের রাস্তা নিয়েছেন৷ কিন্তু সবই আটকে আছে বিচারব্যবস্থার চিরাচরিত দীর্ঘসূত্রিতায়৷

অডিও শুনুন 01:09
এখন লাইভ
01:09 মিনিট
বিষয় | 15.02.2016

ফেলানীর জন্য যেভাবে কাজ করছে ‘মাসুম’

আর ফেলানী খাতুনদের মতো অসংখ্য মানুষের, অগণিত পরিবারের যে সমস্যা? যারা সীমান্ত বোঝে না, বোঝে শুধু পেটের খিদে, জীবিকার খোঁজ? অপরাধ করতে ভালোবাসে বলে যারা অনুপ্রবেশ করে না, জীবিকার তাগিদে যারা চলে আসে এক দেশ থেকে অন্য দেশে এবং প্রতিদিন নিগৃহীত হয়, শোষিত, অত্যাচারিত হয়, আর তার পর এভাবেই হয়ত একদিন বেঘোরে মারা যায়? তাদের এই মৌলিক সমস্যাটার সমাধানের কি কোনো চেষ্টা হচ্ছে? কিরীটি রায় জানালেন, প্রায় প্রতিমাসেই সীমান্তে এ ধরনের অত্যাচারের ঘটনা ঘটছে এবং তাঁরা প্রতিবাদ করছেন৷ কিন্তু প্রতিবাদই সার, বিচার মিলছে না৷

ফেলানীর বাবা নূর ইসলামের গলাতেও সেই একই হতাশা৷ তাঁর মেয়েটাকে ওভাবে গুলি করে মেরে ফেলা হলো, অথচ একটা ন্যায়বিচার হল না৷ পাঁচ বছর আগের ঘটনা, তবু মেয়ের কথা বলতে গিয়ে এখনও কান্নায় ধরে আসে তাঁর গলা৷ প্রশ্ন করেন, বলুন, আমি কেন বিচার পাব না? আমার মেয়েটা কেন বিচার পাবে না? শুনতে শুনতে মনে হয়, সত্যি কি সম্ভব ছিল না কন্যাহারা এক পিতার প্রতি সামান্যতম সহানুভূতি দেখানো? মানুষ বড় হয় কীসে? তার মহত্বে৷ একটা দেশ বিরাটত্ব প্রমাণ করতে পারে কীসে? মহানুভবতায়, ন্যায়নিষ্ঠতায়৷ তা হলে ফেলানীরা বিচার পায় না কেন? কেনই বা নিরন্ন মানুষের চুপসে যাওয়া পেটে লাথি কষায় ফৌজি বুট?

সত্যিই তো, ফেলানীরা বিচার পায় না কেন? আমরা আপনার মতামত জানতে চাই...

সমাজ-সংস্কৃতি

উড়ল পতাকা

২০১৫ সালের ১ আগস্টের প্রারম্ভেই ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের মানচিত্রের অংশ হয়ে গেল৷ দিনটিকে উৎসবের আনন্দে উদযাপন করা হয়৷ বাংলাদেশের অংশে ওড়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আর ভারতে ওড়ানো হয় ভারতীয় পতাকা৷ ছবিতে কুড়িগ্রামের দাশিয়ারছরা উপজেলায় বাংলাদেশের পতাকা ওড়াচ্ছেন উপজেলার নির্বাহি কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দীন আহমেদ (মাথায় সাদা টুপি)৷

সমাজ-সংস্কৃতি

স্মরণীয় মুহূর্ত

জাতীয় পতাকা ওড়ানোর পর শুরু হয় অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা৷ কুড়িগ্রামের দাশিয়াছরার এ নারী জীবনে এই প্রথম উপলব্ধি করলেন স্বাধীন সার্বভৌম দেশের নাগরিক হওয়ার আনন্দ৷ মোমবাতি জ্বালিয়ে উদযাপন করা মুহূর্তটি নিশ্চয়ই তাঁর জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

আগুনের পরশ

বাংলাদেশের পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও নিলফামারী – এই চার জেলায় ভারতের ১৭ হাজার ১৬০ একর আয়তনের ১১১টি ছিটমহল এবং ভারতে বাংলাদেশের ৭ হাজার ১১০ একর আয়তনের ৫১টি ছিটমহলের ৫১ হাজার ৫৪৯ মানুষ এখন স্বাধীন দেশের নাগরিক৷ দাশিয়াছরায় আগুন জ্বালিয়ে মুহূর্তটি উদযাপন করা হয়৷

সমাজ-সংস্কৃতি

পঞ্চগড়ে উৎসব

৬৮ বছরের অবর্ণনীয় কষ্ট থেকে মুক্তির মুহূর্তে পঞ্চগড়ের ছিটমহলবাসীরাও হাতে তুলে নিয়েছিলেন প্রজ্বলিত মোমবাতি৷

সমাজ-সংস্কৃতি

বাড়ল নাগরিক

বাংলাদেশ ও ভারতের অংশের ১৬২টি ছিটমহলের ৫১ হাজার ৫৪৯ জন অধিবাসীর মধ্যে এতদিন ৩৭ হাজার ৩৩৪ জন ‘ভারতীয়’ বাংলাদেশের ছিটমহলগুলোতে এবং ১৪ হাজার ২১৫ জন ‘বাংলাদেশি’ ভারতের ছিটমহলগুলোতে বাস করেছেন৷ এ পর্যন্ত ৯৭৯ জন ভারতে চলে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে৷ তারপরও বাংলাদেশের আয়তন এবং জনসংখ্যা বেড়েছে৷

সমাজ-সংস্কৃতি

‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’ এবং একটি প্রশ্ন

সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন নিঃসন্দেহে দু’দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নিদর্শন৷ তারপরও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পুরোপুরি ‘শান্তিময়’ হবে এমন নিশ্চয়তা কি আছে? ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফ-এর গুলিতে সীমান্তে নিরীহ মানুষ হত্যা কি থামবে? প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে...৷