রোবট যখন ‘মানুষ' হয়ে উঠছে

এখন লাইভ
04:20 মিনিট
10.04.2017

মানুষের জায়গা নেবে রোবট?

রোবট নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই৷ সেই মধ্যযুগ থেকেই মানুষ রোবট বানিয়ে চলেছে৷ প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে ফারাক কমে চলেছে৷ প্রশ্ন হলো, এর পরিণাম কী হবে?

তারা কথা বলতে পারে, মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে পারে৷ মানুষের চেহারা নকল করতে পারে৷ আর কিছু রোবট তো অবিকল মানুষের মতোই দেখতে৷ লন্ডনের বিজ্ঞান মিউজিয়ামে দর্শকরা যান্ত্রিক মানুষের এইসব গুণাগুণ পরখ করে দেখতে পারেন৷ এই অভিজ্ঞতা সত্যি অসাধারণ৷ সেখানে ‘রোবোথেসপিয়ান' নামের অভিনেতা রোবট সবাইকে বলে, ‘‘যান্ত্রিক মানুষের মুখোমুখি হতে চিরকালই একটু ভয় করে৷ কয়েক শতক ধরে প্রত্যেক প্রজন্মের নিজস্ব অভিজ্ঞতা হয়েছে৷ প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধরনের রোবট তৈরি হয়েছে৷ রোবটদের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা না থাকার একটা অস্বস্তি আমাদের, মানে আপনাদের মধ্যে কাজ করে৷''

স্বয়ংক্রিয় অভিনেতা রোবোথেসপিয়ান প্রদর্শনীর প্রধান আকর্ষণগুলির অন্যতম৷ সে মানুষের মতো দেখতে ‘হিউম্যানয়েড' রোবট৷

লন্ডনের বিজ্ঞান মিউজিয়ামে শুধু ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ‘রোবট' নামের একটা আস্ত প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে৷ একশ'রও বেশি রোবট সেখানে উপস্থিত৷ প্রদর্শনীর কিউরেটর অ্যানা ড্যারন বলেন, ‘‘বিশেষ করে বিনোদনের জন্য হিউম্যানয়েড রোবট কাজে লাগানোর তাগিদ দেখা যায়৷ যান্ত্রিক মানুষ তৈরি করার একটা আলাদা আনন্দও বোধহয় আছে৷ প্রযুক্তির উন্নতি তুলে ধরার এটাও একটা উপায়৷ মানুষের শরীর অত্যন্ত জটিল৷ তাই প্রযুক্তির সাহায্যে তার নকল করা চিরকাল মানুষের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল৷''

মানুষের মতো রোবট

হাত মেলায়, কথাও বলে রোবট

এই রোবটটির নাম ‘রোবয়’৷ এর ত্বক এবং মাংসপেশি মসৃণ৷ রোবয় হ্যান্ডশেক করলে মনে হয় যেন কোনো মানুষের সঙ্গেই হাত মেলানো হলো৷ এই রোবট কথা বলতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মতো আবেগও প্রকাশ করে৷

মানুষের মতো রোবট

যে রোবট জানালা পরিষ্কার করে

জার্মানির তৈরি এই রোবটটির নাম ‘জাস্টিন’৷ ওকে তৈরি করা হয়েছিল মহাকাশযানের জন্য৷ ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে পাঁচ বছর ছিল সে৷ পৃথিবীতে ফিরে তাকে মানুষের মতো অনেক কাজই করতে হয়৷ ঘরের জানালা পরিষ্কার করায় সে ওস্তাদ৷

মানুষের মতো রোবট

‘লেখক’ রোবট

‘বায়োস’ নামের এই রোবটটি পেশাদার লেখকদের চেয়েও দ্রুত লিখতে পারে৷ তার বাহুর সঙ্গে লাগানো আছে কলম৷ সেই কলমে প্রয়োজন মতো কালি জোগান দেয়ার ব্যবস্থাও আছে৷ কালি-কলম হাতে সদাপ্রস্তুত ‘বায়োস’ ৮০ মিটার কাগজে মাত্র দশ সপ্তাহে হিব্রুতে ৩ লাখ ৪ হাজার ৮০৫টি অক্ষর লিখে দেখিয়েছে৷

মানুষের মতো রোবট

রেস্তোরাঁয় অর্ডার নেয়ার কাজও রোবটের

চীনের রেস্টুরেন্টে এ ধরনের রোবট ইতিমধ্যে কাজে নেমে পড়েছে৷ কয়েকটি রেস্টুরেন্টে খাবারের ‘অর্ডার’ নেয় এমন রোবট৷

মানুষের মতো রোবট

খাবার পরিবেশনে মানুষের চেয়েও দক্ষ

এই রোবটগুলো রেস্টুরেন্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাবার পরিবেশন করতে পারে৷ ‘ওয়েটার’ মানুষ হলে এক সময় তো ক্লান্ত হয়, কিন্তু রোবট কখনোই ক্লান্ত হয় না৷

মানুষের মতো রোবট

খাবার গরম করে রোবট

রেস্টুরেন্ট বা ঘরে রান্নার কাজটুকু একবার করে দিলে তারপর যতবার খুশি সেই খাবার গরম করতে পারবে রোবট৷ খাবার গরম করার কাজে এই রোবট আসলেই খুব দক্ষ৷

‘রোবটস' মানুষের মতো দেখতে রোবট-দের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী৷ এমনকি মধ্যযুগের শেষের দিকের কিছু প্রাথমিক মডেলও সেখানে শোভা পাচ্ছে৷ যেমন ষোড়শ শতাব্দীর প্রার্থনারত সন্নাসী৷ অ্যানা ড্যারন জানালেন, ‘‘মূলত ঘড়ির যান্ত্রিক কাঠামোর ভিত্তিতেই সেগুলি নড়াচড়া করতো৷ অর্থাৎ, প্রত্যাশা অনুযায়ী একভাবেই চলতো৷ বাস্তব জগতের মতো প্রতিক্রিয়া ছিল না৷ কিন্তু তার ভিত্তিতেই আধুনিক যুগের অনেক রোবট তৈরি হয়েছে৷''

বর্তমানেও রোবট প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের প্রতীক৷ বাস্তবের সঙ্গে আশ্চর্য মিলের কারণে জাপানের রোবট-মেয়ে ‘কোডোমোরয়েড' বিশেষভাবে নজর কাড়ে৷ প্রথমবার সেটি দেশের বাইরে দেখানো হচ্ছে৷ শিল্প থেকে গবেষণা – বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক রোবট কাজে লাগানো হয়৷ কখনো খেলনা হিসেবে, এমনকি মঞ্চের তারকার রূপেও৷ দেখতে অত্যন্ত সহজ মনে হলেও তাদের কাজ রোবট ইঞ্জিনিয়ারদের বহু বছরের পরিশ্রমের ফসল৷ রোবট ইঞ্জিনিয়ার উইল জ্যাকসন বলেন, ‘‘এই রোবটে ১২,০০০ যন্ত্রাংশ রয়েছে৷ আমাদের প্রত্যেকটি তৈরি করতে হয়৷ একটি বিকল হলে কিছুই চলে না৷ তাই বিষয়টি অত্যন্ত জটিল৷''

সব সিদ্ধান্ত নেবে গাড়ি!

চালক ছাড়া ৬০০ মাইল

এ বছরের শুরুর দিকে এই আউডি-৭ গাড়িটি যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি থেকে নিজে নিজেই পৌঁছে যায় ৬০০ মাইল দূরের লাস ভেগাসে৷ সাবধানের মার নেই- ভেবে স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে একজন বসেছিলেন বটে, কিন্তু তাঁকে কিছুই করতে হয়নি৷

সব সিদ্ধান্ত নেবে গাড়ি!

চালকের আসনই নেই!

স্বয়ংক্রিয় গাড়ি কেমন হতে পারে তার একটা নমুনা মার্সিডিজ বেঞ্জের এই এফ০১৫ মডেল৷ গাড়িতে চালকের আসন নেই৷ যাত্রীদের আসনগুলোই মুখোমুখি৷ পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি এ গাড়ি রাস্তায় নামলে ঘণ্টায় ১২৫ মাইল বেগে ছুটতে পারবে৷

সব সিদ্ধান্ত নেবে গাড়ি!

অস্থির লোকদের জন্য নয়

যাঁরা সবসময় শুধু দ্রুতই ছুটতে চান তাঁদের জন্য কিন্তু এই গাড়ি নয়৷ স্বয়ংক্রিয় গাড়ি বিপদ এড়ানোর জন্য প্রয়োজনে যে-কোনো মুহূর্তে গতি মন্থর করবে৷ সামনের গাড়ি বা অন্য কোনো বাহন থেকে নিরাপদ দূরত্বও বজায় রাখবে সবসময়৷

সব সিদ্ধান্ত নেবে গাড়ি!

একে অন্যকে অনুসরণ করবে

মিউনিখে অদ্ভুত এক প্রতিযোগিতায় নেমেছিল জার্মান সেনাবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুটি গাড়ি৷ প্রথমটিকে দ্বিতীয়টি সবসময় পেছন থেকে অনুসরণ করবে- এমন প্রতিযোগিতা৷ পেছনের গাড়িটি কিন্তু একবারও নিয়ম অমান্য করেনি!

সব সিদ্ধান্ত নেবে গাড়ি!

দুর্ঘটনা এড়ানো

অনেক সময় চালক সামনের পথ না দেখেও যখন দ্রুত গাড়ি চালাতে যান তখনই দুর্ঘটনা ঘটে৷ কুয়াশায় ঢাকা পথ, কিংবা প্রবল বর্ষণের মধ্যে প্রায়ই এমন হয়৷ কিন্তু রোবোটিক গাড়ির বেলায় কখনো এমন হবেনা৷ এ গাড়ি নিজেকে যেমন সামনের গাড়ি থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখবে, তেমনি পেছনের গাড়িকেও সতর্ক করবে৷ ভবিষ্যতে এমন গাড়ি তৈরি করা হবে যে গাড়ি সামনে যে বাধা আছে সে খবর পেছনের গাড়িকেও জানিয়ে দেবে৷

সব সিদ্ধান্ত নেবে গাড়ি!

সব তথ্যের জন্য আলাদা আলাদা সেন্সর

রোবোটিক গাড়ি তার চারপাশের সবকিছু আলাদা আলাদা চোখ দিয়ে দেখে৷ চোখের কাজটা করে সেন্সর৷ গুগল কার-এ থাকে এই ধরণের লেজার সেন্সর যার মাধ্যমে চারপাশের সবকিছুর ত্রিমাত্রিক ছবি ফুটে ওঠে৷

সব সিদ্ধান্ত নেবে গাড়ি!

লেজার স্ক্যানারের চোখে....

জার্মান সেনাবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গাড়িটি কেমন দুর্গম পথ দিয়ে চলছে দেখুন! চলতে কিন্তু সমস্যা হচ্ছেনা৷ লেজার স্ক্যানার চার পাশটাকে স্ক্যান করছে, কম্পিউটার ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করে দিচ্ছে আর তা দেখে দেখে এগিয়ে যাচ্ছে গাড়ি৷

সব সিদ্ধান্ত নেবে গাড়ি!

মেড ইন জার্মানি

ডাইমলারের গবেষকরা নিরাপদ গাড়ি তৈরির জন্য অপটিক্যাল ক্যামেরাও ব্যবহার করছেন৷ উইন্ডশিল্ডের পেছনের সেন্সরটা রাস্তায় কী ঘটছে তা দেখে৷ গাড়ি চালনার এই নিরাপদ ব্যবস্থা ২০১১ সালে জার্মানির সেরা উদ্ভাবনের পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল৷

সব সিদ্ধান্ত নেবে গাড়ি!

পথচারীদের ভাবনা কম

কম্পিউটার গাড়িকে জানায় চারপাশের কোন বস্তু কোন দিকে যেতে পারে৷ গাড়ি সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়৷ ছবির এই গাড়ির সামনের পথচারী ডান দিক থেকে রাস্তা পার হচ্ছেন৷ তাঁকে কমলা রংয়ে আর ডান দিকের গাড়িগুলোকে সবুজ রংয়ে দেখানো হচ্ছে, যার অর্থ, এখন কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই৷

শিল্পীরাও চিরকাল মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে আগ্রহী৷ কল্পবিজ্ঞান ছায়াছবিতে মানুষের স্বপ্ন ও ভয়ের প্রতিফলন দেখা যায়৷ যতই চমকপ্রদ, সুন্দর অথবা ভয়ঙ্কর দেখত হোক না কেন, গবেষণার ক্ষেত্রে একটি দায়িত্ব কাজ করে৷ ভবিষ্যতের রোবট কী করতে পারবে, তা নির্ণয় করতে হয়৷ প্রদর্শনীর কিউরেটর অ্যানা ড্যারন বলেন, ‘‘এই প্রযুক্তি সমাজের উপকার করবে, এছাড়া তার পরিণতি নিয়েও ভাবতে হয়৷ রোবট নিয়ে কেমন ভবিষ্যৎ আমরা চাই, সেটা জানা জরুরি৷ শুধু হিউম্যানয়েড রোবট নয়, সব রোবট প্রযুক্তি নিয়েই সেটা করতে হবে৷''

আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভয় ও স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে রোবট যন্ত্রই থেকে যাবে৷ তবে মানুষ ও রোবটের মধ্যে সীমা কমেই চলেছে৷

গ্যোনা কেটেলস/এসবি

আমাদের অনুসরণ করুন