রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীনতা ও মিয়ানমারের গণমাধ্যমের রাজনীতি

গত বছরের ৯ অক্টোবর রাখাইন রাজ্যের সীমান্ত সংলগ্ন চেকপোস্টে হামলা করে নয় পুলিশ সদস্যকে মেরে ফেলে রোহিঙ্গারা৷ এরপর পুলিশ ও সেদেশের সেনাসদস্যদের ভয়ংকর সব অভিযান শুরু হয়৷

পত্রপত্রিকায় রোহিঙ্গা সদস্যদের হত্যা, নির্মমভাবে মার খাওয়া এবং আরো অন্যান্য নির্যাতনের খবর আসে৷ দেশটির অভ্যন্তরে এই সংকট সবচেয়ে বিপদে ফেলে প্রতিবেশী বাংলাদেশকে৷ হাজারো রোহিঙ্গা অধিবাসী অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে আসেন এ দেশের দক্ষিণ পূর্ব সীমান্তে৷ কিন্তু এই সংকট একদিনের নয়৷

আপনি কী ভাবছেন?

এখানে ক্লিক করুন ও আলোচনায় যোগ দিন

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ১৯৯৯ সালের রিপোর্ট বলছে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার শুরু হয় ১৯৭৮ সালে৷ সংকটের শুরু অবশ্য ১৯৬২ সালে, যখন দেশটিতে মিলিটারি শাসন শুরু হয়৷ তখন থেকেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা শুরু করেন তাঁরা৷

এ সব অত্যাচার সইতে না পেরে সে দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে তাঁরা বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় শরণার্থী হন৷ বাংলাদেশ সীমান্ত অনেক কাছাকাছি হওয়ায় এখানেই তাঁদের স্রোত সবচেয়ে বেশি৷

২০১৬ সালের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রিপোর্টে দেখা যায়, ৩ থেকে ৫ লাখ নিবন্ধনহীন রোহিঙ্গা আছেন বাংলাদেশে৷ কিছু কিছু পত্রিকার হিসেবে সংখ্যাটি ৮ লাখও হতে পারে৷ 

রাজনীতি

রোহিঙ্গা শরণার্থী

১৯৯১-৯২ সালে আড়াই লক্ষাধিক মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থী সামরিক জান্তার নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়৷ ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছরের অক্টোবর থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আরও ৭৪ হাজার নতুন রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে৷

রাজনীতি

জলবায়ু উদ্বাস্তু: প্রতি সাতজনে একজন

বাংলাদেশের জলবায়ু শরণার্থীদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্লাইমেট রিফিউজি’ বা এসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে ৪৫ জনের মধ্যে ১ জন জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে৷ আর বাংলাদেশে সংখ্যাটা হবে প্রতি সাতজনে একজন৷ পরিবেশ বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, আগামীতে বাংলাদেশের প্রায় তিন কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হবে৷

রাজনীতি

জলবায়ু উদ্বাস্তু: প্রতি বছর ২,০০০ মানুষ আসছে ঢাকায়

আগে কেবল দারিদ্র্যের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় আসত মানুষ৷ আর এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঢাকায় আশ্রয় নিচ্ছে অনেকে৷ প্রতি বছর নতুন করে দুই হাজার মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঢাকায় ঠাঁই নিচ্ছে৷

রাজনীতি

আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু সংস্থা আইওএম-এর রিপোর্ট

বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রতি বছর ঢাকার বাইরে থেকে কমপক্ষে ৪ লাখ মানুষ এই শহরে আসছে৷ আর আইওএম বলছে, ঢাকার বস্তিতে যেসব মানুষ থাকে, তার মধ্যে ৭০ ভাগই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘর-বাড়ি হারিয়ে এই শহরে আশ্রয় নিয়েছে৷

রাজনীতি

ইউরোপে শরণার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বাড়ছে

গত বছরের প্রথম তিন মাসে ইটালিতে গিয়েছিল মাত্র একজন বাংলাদেশি শরণার্থী৷ কিন্তু ২০১৭ সালে সেটা আশ্চর্যজনকভাবে বেড়েছে৷ প্রথম তিন মাসে ইটালিতে বাংলাদেশি শরণার্থী এসেছে ২ হাজার ৮শ’ জন৷ নৌকায় ভূ-মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইটালিতে পৌঁছেছেন তাঁরা৷

রাজনীতি

১০ হাজার ডলারের বিনিময়ে

দালালদের ১০ হাজার মার্কিন ডলার দিয়ে থাকেন এই শরণার্থীরা৷ প্রথমে যান দুবাই বা তুরস্ক, সেখান থেকে লিবিয়া হয়ে ইটালিতে পৌঁছান তাঁরা৷ এই দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পাড়ি দিতে তাঁদের অনেকের কয়েক বছর লেগে যায়, প্রাণ হারান কেউ কেউ৷

রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর সত্তরের দশক থেকেই এখানে দলে দলে রোহিঙ্গারা আসতে শুরু করেন৷ জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর ২০১৫ সালের হিসেব বলছে, কক্সবাজারের কুতুপালং ও নয়াপাড়া ক্যাম্পে ৩১,৭৫৯ জন নিবন্ধিত শরণার্থী আছেন৷ এর বাইরে প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ রোহিঙ্গা আছেন, যাঁদের কিছু অংশ লেদা ও কুতুপালং মেকশিফট ক্যাম্পে থাকেন৷ বাকিরা আশেপাশের গ্রাম বা শহরে বাঙালিদের সঙ্গে মিশে গেছেন৷ ১৯৯২ সালের পর যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছেন, তাঁদের আর শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি বাংলাদেশ৷ তাই এরপর যাঁরা এসেছেন বাংলাদেশে তাঁরা অবৈধ৷

এ সব অবৈধ মিয়ানমার নাগরিক শুধু মিয়ানমারেই নন, বাংলাদেশেও খুব সহজেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হন৷ তাঁদের অসহায়ত্বের সুযোগ নেন অনেকেই৷

রোহিঙ্গা নারীরা যৌন নিপীড়নেরও শিকার হন৷ নারী পুরুষ উভয়েই জড়িয়ে পড়েন অপরাধ জগতের সঙ্গে৷ বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গেই শুধু জড়িত হন না, তাঁরা রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সংকট তৈরিতেও ব্যবহৃত হন৷

মিয়ানমারের বিভিন্ন সম্প্রদায়

২০০৭ সালে প্রকাশিত বই ‘পলিটিকাল অথরিটি ইন বার্মাস এথনিক মাইনরিটি স্টেটস'-এ লেখক ও গবেষক মেরি পি ক্যালাহান লিখেছেন, মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজ্যে যে সামাজিক-রাজনৈতিক সংকট আছে, তা পরিবর্তনশীল ও জটিল৷ তাঁর মতে, একেক রাজ্যের একেক ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে৷ তিনি মূলত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের তিনটি প্যাটার্ন দেখতে পেয়েছেন৷ প্রথম প্যাটার্নে তিনি দেখেছেন, কোনো কোনো রাজ্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করেন৷ দ্বিতীয় প্যাটার্নে দেখা যাচ্ছে, তাতমাদাও বা বার্মিজ সেনাবাহিনী ও অন্যান্য স্টেট এজেন্সিগুলো রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন৷ রোহিঙ্গা ও রাখাইন অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যও এই প্যাটার্নে পড়ছে৷

সমাজ

স্বামীর খবর জানেন না তিনি

রামিদা বেগমের স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী৷ এরপর তাঁদের বাড়িঘরও পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে৷ তার সপ্তাহখানেক পর পালিয়ে বাংলাদেশে চলে যান তিনি৷ ফলে স্বামীর খবর এখন জানেন না রামিদা৷ ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখে যখন ছবিটি তোলা হয় তখন তাঁর কন্যার বয়স ছিল ১০ দিন৷ তখনও মেয়ের কোনো নাম দেয়া হয়নি রামিদার৷

সমাজ

এই শিশুর বাবাকে হত্যা করা হয়েছে

স্বামীকে মিয়ানমারের সেনারা হত্যা করায় বাবামা-র সঙ্গে বাংলাদেশে চলে যান ১৮ বছরের নূর কায়েস৷ কোলে তাঁর ২৬ দিনের সন্তান, যার এখনও কোনো নাম দেননি তিনি৷ ছবিটি ৯ ফেব্রুয়ারি তোলা৷

সমাজ

সাত দিনের মেয়ে

ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখে যখন ছবিটি তোলা হয় তখন আসমত আরার মেয়ের বয়স ছিল মাত্র সাত দিন৷ মাসখানেক আগে তিনি প্রতিবেশীদের সঙ্গে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে যান৷ বাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার আগে তাঁর শ্বশুরকেও হত্যা করা হয়৷

সমাজ

সন্তানদের বাঁচাতে বাংলাদেশে

একমাস বয়সি ছেলে সন্তানের সঙ্গে রাজুমা বেগম৷ যখন বাংলাদেশে আসছিলেন তখন গর্ভবতী ছিলেন তিনি৷ সঙ্গে ১১ মাসের আরেকটি সন্তানও ছিল৷ ‘‘আমি বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছি কারণ মিয়ানমারের ভয়ের মধ্যে ছিলাম৷ আমার সন্তানদের বাঁচাতে চেয়েছি আমি’’, রয়টার্সকে বলেন বেগম৷ ছবিটি ১২ ফেব্রুয়ারি তোলা৷

সমাজ

দেশে ফিরতে আগ্রহী সানোয়ারা

৯ ফেব্রুয়ারি তোলা এই ছবিতে ২৫ দিনের কন্যা কোলে ২০ বছর বয়সি মা সানোয়ারা বেগমকে দেখা যাচ্ছে৷ প্রায় আড়াই মাস আগে স্বামীর সঙ্গে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছেন তিনি৷ এখন আছেন কক্সবাজারের কুতুপালাং আশ্রয়কেন্দ্রে৷ মিয়ানমারের পরিস্থিতি ভাল হলে নিজ ঘরে আবারও ফিরে যেতে চান সানোয়ারা৷

সমাজ

বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে

ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখে তোলা এই ছবিতে মারিজানকে তাঁর ২৫ দিন বয়সি কন্যা সন্তান সহ দেখা যাচ্ছে৷ পাশে তাঁর ছেলে৷ মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ঘর পুড়িয়ে দেয়ায় মাসখানেক আগে তাঁরা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছান৷

সমাজ

কন্যার জ্বর

দু’মাস বয়সি মেয়ের জ্বর কিন্তু মা আরাফা বেগম জানেন না ক্লিনিক কোথায়৷ আড়াই মাস আগে স্বামী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে বাংলাদেশে আসেনি তিনি৷

সমাজ

বাচ্চা পর্যাপ্ত বুকের দুধ পাচ্ছে না

মিনারা বেগমের এক মাস বয়সি সন্তান পর্যাপ্ত বুকের দুধ পাচ্ছে না, কারণ তার মা পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার খেতে পান না৷ ফলে স্বাস্থ্যকর না হলেও স্থানীয় বাজার থেকে গুঁড়া দুধ কিনে খাওয়াতে হচ্ছে তাকে৷ ছবিটি ১০ ফেব্রুয়ারি তোলা৷

সমাজ

এলোপাথাড়ি গুলি

১৬ দিনের সন্তান কোলে মা আমিনা৷ ‘‘মাস দেড়েক আগে মিয়ামারের সেনাবাহিনী আমাদের গ্রামে ঢুকে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে৷ আমি কোনোরকমে প্রতিবেশীদের সঙ্গে পালিয়ে বেঁচেছি৷ তারা আমার চাচা আর ছোটভাইকে ধরে নিয়ে গেছে৷ তারা বেঁচে আছে কিনা জানিনা’’, ৮ ফেব্রুয়ারি রয়টার্সকে কথাগুলো বলেন তিনি৷

সমাজ

বয়স মাত্র একদিন

ফাতেমার সন্তানের বয়স মাত্র একদিন৷ ছবিটি ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখে তোলা৷ মিয়ানমারে তাদের ঘর পুড়িয়ে দেয়ায় মাস দুয়েক আগে স্বামীর সঙ্গে বাংলাদেশে চলে আসেন৷ এখন তাঁর স্বামী দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন৷

তৃতীয় প্যাটার্নে দেখা যায়, এ সব রাজ্যে বিভিন্ন কৌশলগত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে৷ যেমন বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন সংগঠন, ধর্মীয় নেতা, এনজিও এবং সরকারি কর্মকর্তারা এ সব রাজ্যে আধিপত্য বজায় রেখেছেন৷

ক্যালাহানের ভাষায়, ‘‘সাধারণভাবে বলতে গেলে, রাজনৈতিক ক্ষমতা তাঁদেরই হাতে, যাঁরা নৈরাজ্য তৈরি করতে সক্ষম, যেমন তাতমাদাও, সরকারবিরোধী সশস্ত্র গ্রুপ, অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রকরা এবং প্যারামিলিটারিরা৷''

মিয়ানমারে ১৩৫টি বিভিন্ন সম্প্রদায় রয়েছে, যাঁরা মূলত আটটি জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত৷ এঁরা হলেন কোচিন, কায়াহ, কায়িন, চিন, বামার, মোন, রাখাইন ও শান৷ এঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতি আছে৷

ভৌগলিভাবে মিয়ানমার সাতটি অঞ্চল ও সাতটি রাজ্যে বিভক্ত৷ অঞ্চলগুলোতে প্রধানত থাকেন বামার বা বার্মানরা৷ আর সাতটি রাজ্য বাকি সাতটি মূল গোষ্ঠীর নামে নামকরণ করা হয়েছে৷ বামার বা বার্মানরা মোট জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ৷ তাঁরাই মিলিটারি ও সরকার নিয়ন্ত্রণ করেন৷

বাকি এক তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই থাকেন সম্পদের আধার সীমান্ত এলাকাগুলোতে৷ যুগ যুগ ধরে এ সব অঞ্চলগুলোতে উন্নয়ন প্রকল্প ও সম্পদ উত্তোলনের নামে এ সমস্ত জনগোষ্ঠীকে বিতাড়িত করা হয়েছে তাঁদের এলাকাগুলো থেকে৷ তাঁরা সরে গেছেন দেশেরই অন্যান্য অঞ্চলে অথবা আশেপাশের দেশে৷

১৩৫টি জনগোষ্ঠীকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও রোহিঙ্গাদের ভাগ্যে তা জোটেনি৷ তাই নিজ দেশে কিংবা আশ্রিত দেশে, রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রহীন, ঘরহীন৷ 

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা

মিয়ানমারের একটি বড় অংশ মনে করেন, রোহিঙ্গারা কখনোই তাঁদের দেশের নন৷ তাঁরা কয়েক যুগ আগে বাংলাদেশ থেকে ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা' উপদ্রপকারী৷ এই তকমা যতটা না ঐতিহাসিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক৷

ব্যাপারটি হলো, সেনানিয়ন্ত্রিত এ অঞ্চলটি সবসময়ই স্বাধীনতাকামী৷ এ রাজ্যের দুই তৃতীয়াংশ বৌদ্ধ রাখাইনরা৷ এই রাখাইনরা যেমন রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে থাকেন, তেমনি এই দ্বন্দ্ব কেন্দ্রের সরকার বা সেনাদের জন্যও অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণ সহজ করে দেয়৷

রাজনীতি

মিয়ানমার থেকে পালানো

মিয়ানমারে গত অক্টোবরে নয় পুলিশ হত্যার অভিযোগ ওঠে এক রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে৷ তারপর থেকে সেদেশে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উপর আবারো দমনপীড়ন শুরু হয়৷ ফলে সত্তর হাজারের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে৷ তারা যেসব ক্যাম্পে বসবাস করেন সেগুলোর একটি এই কুতুপালং৷

রাজনীতি

স্বনির্ভরতা দরকার

কুতুপালং ক্যাম্পের শরণার্থীরা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে নিরাপদ আছে বটে, তবে জীবন সেখানে মোটেই সহজ নয়৷ সেখানে সত্যিকারের কোনো অবকাঠামো নেই, সবই শরণার্থীদের গড়া অস্থায়ী আবাস৷ তারা নিজেদের দেশ ছেড়ে এসেছেন, কেননা, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং অসংখ্য মানুষকে হত্যা, ধর্ষণ করেছে৷ মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে এই তথ্য৷

রাজনীতি

শিশুদের খেলা নয়

আশ্রয়শিবিরটির অধিকাংশ এলাকায় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই৷ কয়েক হাজার শরণার্থী শিশুর খেলোধুলারও কোন ব্যবস্থা নেই৷ ক্যাম্পের লেক থেকে মাটি সংগ্রহ করছে এই শিশুটি৷

রাজনীতি

কুঁড়েঘরে বসবাস

কাদা মাটি এবং সহজলভ্য অন্যান্য উপাদান দিয়ে ঘর তৈরি করে বাস করেন শরণার্থীরা, যাতে মাথার উপরে অন্তত ছাদ থাকে৷

রাজনীতি

সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস

সেই ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই সেদেশে রোহিঙ্গারা নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন৷ তাদেরকে নাগরিকত্ব এবং ভোট দেয়ার অধিকার দিচ্ছে না সরকার৷

রাজনীতি

বাংলাদেশেও বৈষম্যের শিকার?

বাংলাদেশেও বৈষম্যে শিকার হচ্ছেন রোহিঙ্গারা৷ ক্যাম্পে আর জায়গা নেই- বলে বাংলাদেশে জলপথে আশ্রয় নিতে আসা অসংখ্য রোহিঙ্গাকে তাদের নৌকাসহ ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে সীমান্তরক্ষীরা৷ পাশাপাশি কক্সবাজার ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের একটি দুর্গম দ্বীপে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার৷ স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দ্বীপটি বর্ষাকালে অধিকাংশ সময় পানির নীচে তলিয়ে যায়৷

রাজনীতি

নির্জন দ্বীপে সরিয়ে নেয়া

ঠ্যাঙ্গার চর বাংলাদেশের মূল ভূখন্ড থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে মেঘনা নদীর মোহনায় কয়েকবছর আগে জেগে ওঠা এক দ্বীপ৷ শুধুমাত্র নৌকায় করে সেখানে যাওয়া যায় এবং চরটিতে অতীতে একাধিকবার জলদস্যু হানা দিয়েছে৷ এক উন্নয়নকর্মী সম্প্রতি ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন যে দ্বীপটিতে কর্মসংস্থানেরও তেমন কোনো সুযোগ নেই৷

রাজনীতি

প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নেই

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী স্বীকার করেছেন যে, ঠ্যাঙ্গার চরকে বসবাসের উপযোগী করতে আরো অনেক কাজ করতে হবে৷ তিনি বলেন, ‘‘দ্বীপটিতে উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করার পর রোহিঙ্গাদের সেখানে সরিয়ে নেয়া হবে৷’’ তবে সরকার অতীতে এরকম প্রতিশ্রুতি দিলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি৷ কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের তেমন কোন উন্নয়ন সাধন করা হয়নি৷

রাজনীতি

ইতিহাস থেকে মোছার চেষ্টা

নিরাপদ আবাসভূমি না থাকায় রোহিঙ্গাদে ভবিষ্যত ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে৷ অন্যদিকে, মিয়ানমার তাদের অতীত মুছে ফেলতে কাজ করছে৷ দেশটির সংস্কৃতি এবং ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতিহাস বিষয়ক পাঠ্যবই প্রকাশের পরিকল্পনা করেছে যেখানে রোহিঙ্গাদের কথা একেবারেই উল্লেখ থাকবে না৷ গত ডিসেম্বরে মন্ত্রণালয়টি দাবি করেছে, মিয়ানমারের ইতিহাসে কোনো সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীকে কখনো রোহিঙ্গা নামে আখ্যায়িত করা হয়নি৷

তার ওপর অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, সীমান্তের দুই পাড়ে একটি অবৈধ ব্যবসা চক্র গড়ে উঠেছে, যা চালাতে গেলে এ অঞ্চলটি অস্থিতিশীল থাকা দরকার৷ আরো কিছু ‘ফ্যাক্টর' পরবর্তীতে যোগ হয়েছে, যা কিনা এই অঞ্চলের শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাধা দিচ্ছে৷ তবে রোহিঙ্গারা কয়েক যুগ আগে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে গেছেন, সেখানকার জনগোষ্ঠীর এই দাবি একটি ঐতিহাসিক ভুল৷

রোহিঙ্গা নামটি নিজেরাই নিজেদের দিয়েছিলেন দেশটির সবচেয়ে নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠী৷ পঞ্চাশের দশকের দিকে এই নামটি বেশ চালু হয়ে যায়৷ তবে কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, এই নামের উৎস কয়েকশ' বছর আগেকার৷

২০১৪ সালের এশিয়া রিপোর্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ‘রোহাঙ' শব্দটির বুৎপত্তি ‘আরাকান' শব্দটি থেকে এবং ‘গা' বা ‘গিয়া' অর্থ ‘থেকে'৷ অর্থাৎ রোহাঙ্গা বা রাখাঙ্গা অর্থ আরাকান অঞ্চলের মানুষ৷

রাখাইন ইতিহাস বিশ্লেষক জ্যাকুয়েস পি লাইডার তাঁর গবেষণাধর্মী লেখা ‘রোহিঙ্গা: দ্য নেইম, দ্য মুভমেন্ট, দ্য কোয়েস্ট ফর আইডেনটিটি'-তে লিখেছেন যে, ‘রোহিঙ্গা' নামটি রাখাইনের ভারতীয় সংস্করণ, ‘রাখাঙ্গা' থেকেই এসেছে৷

ইন্দো-আর্য ভাষার ঐতিহাসিক ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন, এটি রাখাঙ্গার ফোনোলজিকাল বিকৃতি৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘শব্দটির মানে স্থানীয় মুসলিম ভাষাভাষীদের কাছে রাখাইনই ছিল৷''

আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গাদের আগমন পনেরশ' শতকে৷ সংখ্যায় ছিলেন প্রায় ১০ থেকে ২০ লাখ৷ ঐতিহাসিকভাবেই রাখাইনরা শত বছর ধরে স্বাধীন ছিলেন৷

আরাকানের সবশেষ স্বাধীন শাসক ম্রক-উ পরাজিত হন ১৭৮৪ সালে৷ তাঁর সেনাবহরে মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্ম বর্ণ জাতির সদস্য ছিলেন৷ গবেষণায় দেখা যায়, তাঁর পরাজয়ের পর ২০ হাজারেরও বেশি রাখাইনবাসী চট্টগ্রামের দিকে সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেন এবং আবারো আরাকান রাজ্য জয়ের চেষ্টা করতে থাকেন৷ যখন ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে এবং আস্তে আস্তে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় রাখাইনরা গুরুত্বপূর্ণ পদ পায়৷

এই সীমান্ত এলাকাটিতে সবসময়ই বৌদ্ধ ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মিশ্র জনগোষ্ঠী ছিল৷ তবে এখানে সাম্প্রদায়িক সংকট শুরু হয়, যখন ১৯২০ সালের দিকে ভারতবর্ষ থেকে (মূলত চট্টগ্রাম থেকে) অনেক মুসলিম সেটলারকে নিয়ে যায় ব্রিটিশরা৷ লাইডার মনে করেন, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তখন এ অঞ্চলে তাঁদের কর্তৃত্ব হারানোর শঙ্কায় পড়েন৷

বাংলাদেশ নবম

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর ‘গ্লোবাল ট্রেন্ডস-২০১৩’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলছে, বিশ্বের শরণার্থী আশ্রয়দাতা দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান নবম৷ প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের অর্থনীতির তুলনায় ধারণক্ষমতার দিকে থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর নবম শরণার্থী আশ্রয়দাতা দেশ৷

কতজন শরণার্থী?

দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশে দুটি সরকারি শরণার্থী শিবিরে ৩০ হাজারের মতো মিয়ানমারের (রোহিঙ্গা) শরণার্থী বসবাস করছে বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিবেদন৷ শিবিরের বাইরে আছে আরও দুই থেকে পাঁচ লাখ অনিবন্ধিত ব্যক্তি৷

আশ্রয়প্রার্থী

হ্যাঁ৷ বাংলাদেশেও কেউ কেউ আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন৷ ইউএনএইচসিআর ওয়েবসাইটের বাংলাদেশ পাতায় এমন আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা নয়জন বলে জানানো হয়েছে৷ ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সংখ্যাটা এমন ছিল বলে উল্লেখ করা হয়৷

বাংলাদেশের শরণার্থী

উন্নত জীবনের আশায় বাংলাদেশ থেকে অনেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন৷ অনেকক্ষেত্রে তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর পথে রওনা দেন৷ কেউ গন্তব্যে পৌঁছে গ্রেপ্তার হয়ে ফিরে আসেন৷ কেউ বা শরণার্থী পরিচয় পান৷ বাংলাদেশের এমন শরণার্থীর সংখ্যা ৯,৮৩৯ জন৷

বাংলাদেশের আশ্রয়প্রার্থী

উন্নত বিশ্বে কোনোভাবে ঢুকে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার চল অনেকদিন ধরেই চলছে৷ জাতিসংঘের হিসেবে বাংলাদেশের এমন আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ২২,১২৮ জন৷ সংখ্যাটা ২০১৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রযোজ্য৷

স্বপ্নের শুরু টেকনাফে

বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার মতো দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন অনেক বাংলাদেশি৷ এ জন্য তাঁরা দালালদের অনেক অর্থও দিয়ে থাকেন৷ তাঁদের এই যাত্রা শুরু হয় টেকনাফ থেকে৷

ছোট নৌকা থেকে বড় নৌকায়

টেকনাফ থেকে প্রথমে ছোট নৌকায় যাত্রা শুরু হয়৷ তারপর একসময় মাছ ধরার বড় নৌকা বা কার্গোতে যাত্রীদের তুলে দেয়া হয়৷ সাধারণত অক্টোবর থেকে পরবর্তী পাঁচ মাসকে সমুদ্র যাত্রার জন্য সঠিক সময় বলে বিবেচনা করা হয়৷

খাবার, পানির অভাব

ইউএনএইচসিআর-এর একটি প্রতিবেদন বলছে, যাঁরা সাগর পথে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করেন তাঁদের অনেকে খাবার ও পানির অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ এছাড়া দালালরা অনেক সময় তাঁদের সঙ্গে খারাপ আচরণও করে৷

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিয়ানমারের জাতীয়বাদী নেতা অং সানের বার্মা ইন্ডিডেন্ডেন্স আর্মি ৫ লাখেরও বেশি ভারতীয় সেটেলারকে তাড়িয়ে দেয়৷ ব্রিটিশরা চলে যাবার পর রাখাইন বৌদ্ধ বা মুসলিম গোষ্ঠীদের কেউই অস্ত্র জমা দেয়নি৷ বরং রাখাইন অঞ্চলের কর্তৃত্ব নিয়ে নিজেদের মধ্যে ও রাখাইন রাজ্যের স্বাধীনতার জন্য কেন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়৷ 

তাঁরা সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের অংশ হওয়ার জন্য আন্দোলন করেন৷ ১৯৭৪ এর সংবিধানে অবশেষে আরাকানকে রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং রাজ্যের নাম রাখা হয় ‘রাখাইন'৷

পরবর্তীকালে, বার্মিজ মিলিটারি তাতমাদাও একের পর এক মিলিটারি অপারেশন চালায় রাখাইন রাজ্যে৷ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ১৯৯৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৯২ সালের জুলাই মাস নাগাদ, ২ লাখ ৬০ হাজার মুসলিম রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে যান৷

২০১৬ সালের ‘অক্টোবর অ্যাটাক'

ভোরের আলো ফোটার আগেই গেল ৯ অক্টোবর কয়েকশ' মানুষ বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা পুলিশ চৌকিতে আক্রমণ করেন৷ এতে ন'জন পুলিশ সদস্য মারা যান৷ জঙ্গি সংগঠন হরকাত আল-ইয়াকিন এই আক্রমণের সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হয়৷

আততায়ীদের ধরতে সরকার সেখানে সেনাসদস্য মোতায়েন করে৷ তারা সেখানে অভিযানও শুরু করে৷ অঞ্চলটি সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মীসহ সাধারণের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়৷

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এ সব এলাকায় আগুনের শিখা দেখা যায়৷ অনেক রোহিঙ্গাকে মেরে ফেলা হয়৷ অনেক নারী ধর্ষিতা হন৷ অনেক যুবক নির্যাতনের শিকার হন৷ হাজারো রোহিঙ্গা অধিবাসী সীমান্ত পাড়ি দিয়ে টেকনাফ ও কক্সবাজারে গিয়ে আশ্রয় নেন৷ কয়েকমাস ধরে এমন অবস্থা বিরাজ করে৷ সীমান্ত পাড়ি দেয়া অনেক রোহিঙ্গার মুখে সাধারণ মানুষের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র শোনা যায়৷

সদ্য ‘গণতন্ত্র' ফেরত পাওয়া মিয়ানমারের অবিসংবাদিত নেতা অং সান কন্যা সুচি দাবি করেন, রাখাইন অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়নি৷ আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো পরিস্থিতি দেখার জন্য এ অঞ্চলে যেতে চাইলেও যেতে দেয়া হয়নি৷ গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ৭৫ হাজার রোহিঙ্গা ঘরছাড়া হয়েছেন৷

গণমাধ্যমের ভুমিকা

মিয়ানমারের প্রায় সব গণমাধ্যমই সরকার বা সেনা নিয়ন্ত্রিত৷ ২০১১ সাল পর্যন্ত সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন সংবাদপত্রগুলো সবই সরকার কঠিন নিয়মে আবদ্ধ ছিল৷

Zobaer Ahmed

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

কোনো পত্রিকায় কোনো প্রতিবেদন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না৷ ২০১১ সালের জুনে এই নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হয়৷ গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ও নিবন্ধন বিভাগ বন্ধ করে দেয়া হয়৷ তখন থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারে ৩১টি দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশের অনুমোদন পায়, যার মধ্যে ২৪টি স্থানীয় ভাষায়৷ 

তবে ২০১১ সালের পরও অনেক সাংবাদিককেই জেল জরিমানা গুনতে হয়েছে প্রকাশিত প্রতিবেদনের জন্য৷ অক্টোবরের ঘটনার পর একটি গবেষণায় দুই সপ্তাহ ধরে মিয়ানমারের দু'টি পত্রিকায় প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করা হয়৷ এর একটি হলো গ্লোবাল নিউ লাইট অফ মিয়ানমার, যেটি দেশটির সবচেয়ে পুরোনো পত্রিকা নিউ লাইট অফ মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক সংস্করণ এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত৷

অন্যটি মিয়ানমার টাইমস৷ এটি ব্যক্তিখাতের এবং একমাত্র বিদেশি মালিকানার পত্রিকা৷ এই ঘটনায় এই পত্রিকার রিপোর্ট ব্যাপক আলোচিত হয়েছে৷

গবেষণাটি ছিল, অক্টোবরের ঘটনার পর রোহিঙ্গাদের কিভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে৷ এছাড়া চিত্রায়িত করার সময় কাদের বক্তব্য ব্যবহার করা হয়েছে৷ যদিও রোহিঙ্গাদের চিত্রায়নের জন্য ছয়টি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল, মোটা দাগে ‘ভিক্টিম'  বা ‘অপরাধী' – এই দু'টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে৷

দেখা গেছে, গ্লোবাল নিউ লাইট অফ মিয়ানমার পত্রিকায় যতবার রোহিঙ্গাদের বিষয়টি এসেছে, ততবারই তাঁদের অপরাধী হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে৷ আবার, মিয়ানমার টাইমসে প্রায় ৬০ ভাগ সময় ভিক্টিম হিসেবেই চিত্রায়িত হয়েছেন রোহিঙ্গারা৷

গ্লোবাল নিউ লাইটে এমনও খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, দুষ্কৃতিকারীরা ঘরে আগুন জ্বালিয়ে চলে গেছে৷ তবে সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, পত্রিকাটির যে সব রিপোর্ট গবেষণার আওতায় ছিল, তার কোথাও ‘রোহিঙ্গা' শব্দটি ছিল না৷ এঁদের ‘বাঙালি সেটলার' বলে চিহ্নিত করা হয়েছে৷ এই ‘রাজনীতি' পরিষ্কার৷

বোঝাই যায়, এটা গণমাধ্যমের নীতি নয়, সরকারি নীতি৷ কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ রিপোর্টেই তারা ইরাবতী বা অন্যান্য সরকারি নিউজ এজেন্সির খবর হুবুহু ছাপিয়ে দিচ্ছে৷

অন্যদিকে, মিয়ানমার টাইমস আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধর্ষণের বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা ব্যাপক আলোড়ন জাগায় আন্তর্জাতিক মহলে৷  

তবে মিয়ানমারের ভেতরে এই পত্রিকাটি তেমন কেউ পড়ে না৷ এর কারণ পত্রিকাটি তুলনামূলক নতুন৷ তাই সরকারি ভাষ্যগুলোই অন্যান্য এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছায়৷ গবেষণায় এ-ও দেখা যায়, গ্লোবাল নিউ লাইট প্রায় ৯১ শতাংশ বক্তব্য প্রকাশ করেছে সরকার ও রোহিঙ্গা বিরোধী গোষ্ঠীর৷ অন্যদিকে, মিয়ানমার টাইমসের বেলায় সেটি ছিল ৫৮ শতাংশ৷

গবেষণার সীমাবদ্ধতার জায়গায় গবেষক লিখেছেন যে, বার্মিজ ভাষায় দক্ষতা না থাকায়, সে ভাষার কোনো পত্রিকা বিশ্লেষণ করা যায়নি৷

সরকারি পত্রিকায় যেভাবে ঢালাওভাবে ঘটনাটি প্রকাশ করেছে তা একটি গণতান্ত্রিক দেশে নিতান্তই গণতন্ত্রহীনতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হয়৷ সব মিলিয়ে রাষ্ট্রহীনতার ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক চিত্রই বোধ হয় রোহিঙ্গাদের৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷