‘শরণার্থীদের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে স্যাটায়ার হতে পারে না’

ইউরোপে চলমান শরণার্থী সংকট ফরাসি ব্যঙ্গ পত্রিকা শার্লি এব্দো-কে কিছু প্ররোচনামূলক কার্টুন প্রকাশ করার প্রেরণা দিয়েছে৷ ডয়চে ভেলের গ্রেহাম লুকাস কিন্তু এতে একেবারেই প্রীত হননি৷

শার্লি এব্দো চিরকালই বিতর্ক ঘেঁষা৷ প্রতিষ্ঠা যাবৎ পত্রিকাটি বারংবার বাকস্বাধীনতার সীমা পরখ করে নিয়েছে৷ ব্যঙ্গ এবং ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যের কোনো সীমানা থাকতে পারে না, এই বিশ্বাস নিয়ে শার্লি এব্দো বিভিন্ন ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর যাবতীয় ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, সামাজিক অথবা ধর্মীয় স্পর্শকাতরতার পরোয়া না করে কার্টুন প্রকাশ করেছে৷ পশ্চিমি বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলিতে স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গাত্মক রচনা যে শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, শুধু তাই নয়, সেই স্যাটায়ারের ভিত্তিই হলো এই নীতি৷ স্যাটায়ার বা কার্টুন যেভাবে স্বল্পপরিসরে বিধ্বংসী প্রভাব নিয়ে যে কোনো মতামতকে পরিবেশন করতে পারে অথবা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে, সেটা কোনো সম্পাদকীয়তে করা সম্ভব নয়৷

মা ও সন্তান

রেহান কুর্দির কোলে তাঁর ছোট ছেলে আয়লান৷ কোবানির একটি বাড়িতে এখনো আছে এই ছবি, তবে ছবির দু’জন মানুষ আর নেই৷ সিরিয়া থেকে তুরস্ক হয়ে গ্রিসে যাওয়ার পথেই ফুরিয়েছে তাদের জীবন চলার পথ৷ এ খবর সারা বিশ্বকে জানিয়েছিল অন্য একটি ছবি৷

এ ছবি এখনো কাঁদায়

একটি ছবি হঠাৎ বদলে দিলো ইউরোপে অভিবাসী হতে আগ্রহীদের ভাগ্য৷ আয়লান কুর্দির এই ছবি৷ তুরস্কের উপকুলে এভাবেই পড়ে ছিল ৩ বছরের শিশুটির নিথর দেহ৷ মা-বাবা আর ভাইয়ের সঙ্গে আয়লানও কোবানির বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল নিরাপদ জীবনের খোঁজে৷ এভাবে চিরবিদায় নিতে হয় তাকে!

আয়লান জাগিয়ে গেল

আয়লানের ওই ছবি নাড়িয়ে দেয় বিশ্ববিবেক৷ ইউরোপে আসার পথে যেখানে হাজারো মানুষ শত বাধার মুখে এক সময় হার মানতো, প্রাণ দিতো, সেখানে ধীরে ধীরে অনেকটাই খুলে গেল ইউরোপের দ্বার৷ অভিবাসন প্রত্যাশীরা অবাধে আসতে শুরু করল মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা থেকে৷

যেভাবে বিদায় জানালো জন্মভূমি

দুই সন্তান আর স্ত্রী-কে হারিয়ে নিরাপদ জীবনের প্রতি আগ্রহহারিয়ে ফেলেন আয়লানের বাবা আব্দুল্লাহ কুর্দি৷ তাই গ্রিস হয়ে ইউরোপের উন্নত কোনো দেশে নতুন করে জীবন শুরু করার ইচ্ছে জলাঞ্জলি দিয়ে ফিরে যান সিরিয়ায়৷ তাঁর কোবানির বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় স্ত্রী ও দুই সন্তানের মৃতদেহ৷ জানাযা শেষে ওই শহরেই সমাধিস্থ করা হয় তাদের৷

কান্না আর আহাজারি

আব্দুল্লাহ কুর্দি তাঁর পরিবারের সদস্যদের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরলে কান্নার রোল উঠেছিল কোবানিতে৷ আয়লানদের জন্য কোবানি এখনো কাঁদে৷

আয়লান এখন প্রতিবাদের প্রতীক...

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে আয়লান এখন প্রতিবাদের প্রতীক৷ ইউরোপে যেখানেই অভিবাসন প্রত্যাশীদের প্রতিবাদ, সেখানেই থাকে আয়লানের ছবি৷ অভিবাসন প্রত্যাশীদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভের এই ছবিটি প্যারিসের৷

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তরেও আয়লান

ছবির এই নারী আয়লানের আত্মীয়া, নাম ফাতিমা কুর্দি৷ সোমবার ব্রাসেলসে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের বাইরে এক প্রতিবাদ সমাবেশে ছিলেন তিনি৷ ইউরোপের দেশগুলোতে অভিবাসন আইনের সমন্বয়ের দাবিতে আয়োজিত সেই সমাবেশেও ছিল আয়লানের ছবি৷ তবে সেই ছবি নয়, সেই ছবির আদলে হাতে আঁকা একটি ছবি দেখা যায় দেয়ালে৷ সেই ছবির পাশেই দাঁড়িয়ে ফাতিমা কুর্দি৷

হজরত মুহাম্মদের কার্টুন ছাপার কারণে উগ্র ইসলামপন্থিরা শার্লি এব্দোর উপর প্রাণঘাতী আক্রমণ চালায় গত জানুয়ারি মাসে৷ শার্লি এব্দো ব্যঙ্গচিত্রগুলি ছাপিয়েছিল এটা প্রমাণ করার জন্য যে, স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গরচনা কোনো বাধানিষেধ মানে না; যার সমালোচনা করা উচিত, তার সমালোচনা করার অধিকার আছে স্যাটায়ারিস্ট বা কার্টুনিস্টের, এই হলো শার্লি এব্দোর নীতি৷ পশ্চিমে ফ্রি মিডিয়া বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সব দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও, এখানকার মানুষ কোন পত্রপত্রিকা কিনবেন অথবা পড়বেন বা পড়বেন না, তা তাঁরা নিজেরাই ঠিক করেন৷

শার্লি এব্দো আবার বিতর্কের মুখে পড়েছে তার শেষ পাতায় ইউরোপে শরণার্থী সংকট সংক্রান্ত কিছু কার্টুন প্রকাশ করে – বিশেষ করে দু'টি ব্যঙ্গচিত্র৷ উভয়ের বিষয়ই হলো আয়লান কুর্দি, সেই তিন বছরের সিরীয় শিশু, যার মৃতদেহ সমুদ্রসৈকতে ভেসে উঠেছিল৷ আয়লানের সেই স্পন্দনহীন ছোট্ট দেহটির ছবি সারা বিশ্বকে সচকিত করে৷ বলতে কি, ঐ একটি ছবি যেন শরণার্থীদের যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট-বিড়ম্বনার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়৷

শার্লি এব্দোর কার্টুনে আয়লানের মৃতদেহ যে সৈকতে, সেখানেই একটি ফাস্ট-ফুড-চেনের বিজ্ঞাপন: ‘‘পোমোশনাল অফার: কিডস মেনু, একটির দামে দু'টি''৷ ব্যঙ্গচিত্রের ক্যাপশন হলো: ‘‘অভিবাসীদের স্বাগত জানাচ্ছি, অভীপ্স লক্ষ্যের এত কাছে...৷''

শার্লি এব্দো দৃশ্যত পশ্চিমি জীবনযাত্রার ধরন এবং শরণার্থীদের বাসনা-কামনা, উভয়কেই ব্যঙ্গ করতে চেয়েছে৷ অপর কার্টুনটিতে যিশুখ্রিষ্ট জলের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, বাইবেলে যেমন আছে৷ কার্টুনের ক্যাপশন: ‘‘খ্রিষ্টানরা জলের ওপর দিয়ে হাঁটে; মুসলিম শিশুরা ডুবে মরে৷'' অর্থাৎ খ্রিষ্টান ইউরোপের নৈতিকতা এবং ভণ্ডামির দিকেই ইঙ্গিত করা হচ্ছে এই ব্যঙ্গচিত্রে৷

Lucas Grahame Kommentarbild App

ডয়চে ভেলের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের প্রধান গ্রেহাম লুকাস

ইউরোপে শরণার্থী সংকট নিয়ে সম্প্রতি যা ঘটছে, তা নিয়ে ব্যঙ্গ করা প্রয়োজনীয় এবং বৈধ তো বটেই৷ কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার বিশ্বাস যে, আয়লান কুর্দির ছবি ব্যবহার করাটা একটা বড় আকারের সম্পাদকীয় প্রমাদ৷ একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি, একটি শিশু ও তার মাত্র কয়েক বছরের বড় সহোদরের মৃত্যু – এক কথায় শরণার্থীদের দুঃখ-কষ্ট-বিড়ম্বনা, এ ধরনের স্যাটায়ারের বিষয় হতে পারে না৷ এটা শুধু অশালীনই নয়, আমার কাছে তা ঘৃণার উপযুক্ত৷ অনেকে হয়ত এ বিষয়ে আমার সঙ্গে একমত হবেন না, এবং স্বভাবতই আমি তাদের মনোভাবকে শ্রদ্ধা করে চলব৷ কিন্তু এ-ও সত্যি যে, আমি শার্লি এব্দোর এই সংস্করণটি কিনব না৷

লাখ লাখ মানুষ প্যারিসের বিভিন্ন রাস্তাসহ, ফ্রান্স এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শহরের রাস্তায় স্বাধীনতা এবং সহনশীলতার পক্ষে জড়ো হয়েছিলেন সপ্তাহান্তে৷ গত সপ্তাহে ফ্রান্সের ব্যঙ্গাত্মক পত্রিকা শার্লি এব্দো এবং একটি সুপারমার্কেটে নিহতদের স্মরণে আয়োজন করা হয় সংহতি সমাবেশের৷

শার্লি এব্দো চিরকালই বিতর্ক ঘেঁষা৷ প্রতিষ্ঠা যাবৎ পত্রিকাটি বারংবার বাকস্বাধীনতার সীমা পরখ করে নিয়েছে৷ ব্যঙ্গ এবং ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যের কোনো সীমানা থাকতে পারে না, এই বিশ্বাস নিয়ে শার্লি এব্দো বিভিন্ন ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর যাবতীয় ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, সামাজিক অথবা ধর্মীয় স্পর্শকাতরতার পরোয়া না করে কার্টুন প্রকাশ করেছে৷ পশ্চিমি বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলিতে স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গাত্মক রচনা যে শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, শুধু তাই নয়, সেই স্যাটায়ারের ভিত্তিই হলো এই নীতি৷ স্যাটায়ার বা কার্টুন যেভাবে স্বল্পপরিসরে বিধ্বংসী প্রভাব নিয়ে যে কোনো মতামতকে পরিবেশন করতে পারে অথবা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে, সেটা কোনো সম্পাদকীয়তে করা সম্ভব নয়৷

মা ও সন্তান

রেহান কুর্দির কোলে তাঁর ছোট ছেলে আয়লান৷ কোবানির একটি বাড়িতে এখনো আছে এই ছবি, তবে ছবির দু’জন মানুষ আর নেই৷ সিরিয়া থেকে তুরস্ক হয়ে গ্রিসে যাওয়ার পথেই ফুরিয়েছে তাদের জীবন চলার পথ৷ এ খবর সারা বিশ্বকে জানিয়েছিল অন্য একটি ছবি৷

এ ছবি এখনো কাঁদায়

একটি ছবি হঠাৎ বদলে দিলো ইউরোপে অভিবাসী হতে আগ্রহীদের ভাগ্য৷ আয়লান কুর্দির এই ছবি৷ তুরস্কের উপকুলে এভাবেই পড়ে ছিল ৩ বছরের শিশুটির নিথর দেহ৷ মা-বাবা আর ভাইয়ের সঙ্গে আয়লানও কোবানির বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল নিরাপদ জীবনের খোঁজে৷ এভাবে চিরবিদায় নিতে হয় তাকে!

আয়লান জাগিয়ে গেল

আয়লানের ওই ছবি নাড়িয়ে দেয় বিশ্ববিবেক৷ ইউরোপে আসার পথে যেখানে হাজারো মানুষ শত বাধার মুখে এক সময় হার মানতো, প্রাণ দিতো, সেখানে ধীরে ধীরে অনেকটাই খুলে গেল ইউরোপের দ্বার৷ অভিবাসন প্রত্যাশীরা অবাধে আসতে শুরু করল মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা থেকে৷

যেভাবে বিদায় জানালো জন্মভূমি

দুই সন্তান আর স্ত্রী-কে হারিয়ে নিরাপদ জীবনের প্রতি আগ্রহহারিয়ে ফেলেন আয়লানের বাবা আব্দুল্লাহ কুর্দি৷ তাই গ্রিস হয়ে ইউরোপের উন্নত কোনো দেশে নতুন করে জীবন শুরু করার ইচ্ছে জলাঞ্জলি দিয়ে ফিরে যান সিরিয়ায়৷ তাঁর কোবানির বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় স্ত্রী ও দুই সন্তানের মৃতদেহ৷ জানাযা শেষে ওই শহরেই সমাধিস্থ করা হয় তাদের৷

কান্না আর আহাজারি

আব্দুল্লাহ কুর্দি তাঁর পরিবারের সদস্যদের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরলে কান্নার রোল উঠেছিল কোবানিতে৷ আয়লানদের জন্য কোবানি এখনো কাঁদে৷

আয়লান এখন প্রতিবাদের প্রতীক...

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে আয়লান এখন প্রতিবাদের প্রতীক৷ ইউরোপে যেখানেই অভিবাসন প্রত্যাশীদের প্রতিবাদ, সেখানেই থাকে আয়লানের ছবি৷ অভিবাসন প্রত্যাশীদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভের এই ছবিটি প্যারিসের৷

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তরেও আয়লান

ছবির এই নারী আয়লানের আত্মীয়া, নাম ফাতিমা কুর্দি৷ সোমবার ব্রাসেলসে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের বাইরে এক প্রতিবাদ সমাবেশে ছিলেন তিনি৷ ইউরোপের দেশগুলোতে অভিবাসন আইনের সমন্বয়ের দাবিতে আয়োজিত সেই সমাবেশেও ছিল আয়লানের ছবি৷ তবে সেই ছবি নয়, সেই ছবির আদলে হাতে আঁকা একটি ছবি দেখা যায় দেয়ালে৷ সেই ছবির পাশেই দাঁড়িয়ে ফাতিমা কুর্দি৷

হজরত মুহাম্মদের কার্টুন ছাপার কারণে উগ্র ইসলামপন্থিরা শার্লি এব্দোর উপর প্রাণঘাতী আক্রমণ চালায় গত জানুয়ারি মাসে৷ শার্লি এব্দো ব্যঙ্গচিত্রগুলি ছাপিয়েছিল এটা প্রমাণ করার জন্য যে, স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গরচনা কোনো বাধানিষেধ মানে না; যার সমালোচনা করা উচিত, তার সমালোচনা করার অধিকার আছে স্যাটায়ারিস্ট বা কার্টুনিস্টের, এই হলো শার্লি এব্দোর নীতি৷ পশ্চিমে ফ্রি মিডিয়া বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সব দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও, এখানকার মানুষ কোন পত্রপত্রিকা কিনবেন অথবা পড়বেন বা পড়বেন না, তা তাঁরা নিজেরাই ঠিক করেন৷

শার্লি এব্দো আবার বিতর্কের মুখে পড়েছে তার শেষ পাতায় ইউরোপে শরণার্থী সংকট সংক্রান্ত কিছু কার্টুন প্রকাশ করে – বিশেষ করে দু'টি ব্যঙ্গচিত্র৷ উভয়ের বিষয়ই হলো আয়লান কুর্দি, সেই তিন বছরের সিরীয় শিশু, যার মৃতদেহ সমুদ্রসৈকতে ভেসে উঠেছিল৷ আয়লানের সেই স্পন্দনহীন ছোট্ট দেহটির ছবি সারা বিশ্বকে সচকিত করে৷ বলতে কি, ঐ একটি ছবি যেন শরণার্থীদের যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট-বিড়ম্বনার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়৷

শার্লি এব্দোর কার্টুনে আয়লানের মৃতদেহ যে সৈকতে, সেখানেই একটি ফাস্ট-ফুড-চেনের বিজ্ঞাপন: ‘‘পোমোশনাল অফার: কিডস মেনু, একটির দামে দু'টি''৷ ব্যঙ্গচিত্রের ক্যাপশন হলো: ‘‘অভিবাসীদের স্বাগত জানাচ্ছি, অভীপ্স লক্ষ্যের এত কাছে...৷''

শার্লি এব্দো দৃশ্যত পশ্চিমি জীবনযাত্রার ধরন এবং শরণার্থীদের বাসনা-কামনা, উভয়কেই ব্যঙ্গ করতে চেয়েছে৷ অপর কার্টুনটিতে যিশুখ্রিষ্ট জলের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, বাইবেলে যেমন আছে৷ কার্টুনের ক্যাপশন: ‘‘খ্রিষ্টানরা জলের ওপর দিয়ে হাঁটে; মুসলিম শিশুরা ডুবে মরে৷'' অর্থাৎ খ্রিষ্টান ইউরোপের নৈতিকতা এবং ভণ্ডামির দিকেই ইঙ্গিত করা হচ্ছে এই ব্যঙ্গচিত্রে৷

Lucas Grahame Kommentarbild App

ডয়চে ভেলের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের প্রধান গ্রেহাম লুকাস

ইউরোপে শরণার্থী সংকট নিয়ে সম্প্রতি যা ঘটছে, তা নিয়ে ব্যঙ্গ করা প্রয়োজনীয় এবং বৈধ তো বটেই৷ কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার বিশ্বাস যে, আয়লান কুর্দির ছবি ব্যবহার করাটা একটা বড় আকারের সম্পাদকীয় প্রমাদ৷ একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি, একটি শিশু ও তার মাত্র কয়েক বছরের বড় সহোদরের মৃত্যু – এক কথায় শরণার্থীদের দুঃখ-কষ্ট-বিড়ম্বনা, এ ধরনের স্যাটায়ারের বিষয় হতে পারে না৷ এটা শুধু অশালীনই নয়, আমার কাছে তা ঘৃণার উপযুক্ত৷ অনেকে হয়ত এ বিষয়ে আমার সঙ্গে একমত হবেন না, এবং স্বভাবতই আমি তাদের মনোভাবকে শ্রদ্ধা করে চলব৷ কিন্তু এ-ও সত্যি যে, আমি শার্লি এব্দোর এই সংস্করণটি কিনব না৷

এই ক'টি অশালীন কার্টুনের জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো চলে না৷ তবুও আমি ফরাসি দার্শনিক, কবি ভলটেয়ার-এর একটি মন্তব্যের উদ্ধৃতি না দিয়ে পারছি না: ‘‘তুমি যা বলছো, তা আমার মনঃপূত না হতে পারে৷ কিন্তু আমি আমার জীবন দিয়ে তোমার এই বাকস্বাধীনতাকে রক্ষা করবো৷''

লাখ লাখ নির্ভীক মানুষের সমাবেশ

লাখ লাখ মানুষ প্যারিসের বিভিন্ন রাস্তাসহ, ফ্রান্স এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শহরের রাস্তায় স্বাধীনতা এবং সহনশীলতার পক্ষে জড়ো হয়েছিলেন সপ্তাহান্তে৷ গত সপ্তাহে ফ্রান্সের ব্যঙ্গাত্মক পত্রিকা শার্লি এব্দো এবং একটি সুপারমার্কেটে নিহতদের স্মরণে আয়োজন করা হয় সংহতি সমাবেশের৷

ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচয়ে বড় সমাবেশ

সংহতি সমাবেশ শুরুর কয়েকঘণ্টা আগেই জনসমুদ্রে পরিণত হয় প্যারিসের ‘প্লাস দ্য লা রিপুবলিক’৷ ফ্রান্সের সকল ইউনিয়ন এবং বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন৷ ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফ্রান্সের ইতিহাসে এটা সর্ববৃহৎ সমাবেশ৷

সংহতির প্রতীক

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রঁসোয়া ওলঁদ এবং জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল রবিবারের সংহতি সমাবেশের নেতৃত্ব দেন৷ পঞ্চাশজনের মতো বিশ্বনেতা এতে অংশ নেন৷

শোকে বিহ্বল দেশ

গত বুধবার দুই ভাই প্যারিসে শার্লি এব্দোর সম্পাদকীয় কার্যালয়ে হামলা চালায় এবং ম্যাগাজিনটির প্রধান সম্পাদকসহ আরো নয় কর্মীকে হত্যা করে৷ সেসময় দুই পুলিশ সদস্যকেও হত্যা করে তারা৷ শুক্রবার অপর এক হামলায় এক সুপারমার্কেটে চার ব্যক্তিকে হত্যা করে একজন হামলাকারী৷

সংকটকালীন বৈঠক

মার্চ শুরুর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক বৈঠকে মিলিত হন৷ বৈঠকের পর ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্না কাসনোভ জানান, ফ্রান্সে সন্ত্রাসী হামলায় সকল গণতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলেছে৷ সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে ফেব্রুয়ারি মাসে বৈঠকের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র৷

উচ্চ সতর্কাবস্থা

শার্লি এব্দো কার্যালয়ে হত্যাকাণ্ডের পর ফ্রান্সে উচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করা হয়৷ রবিবার সমাবেশের সময়ও নিরাপত্তা কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা গেছে৷ আল কায়দা এবং ‘ইসলামিক স্টেট’ আরো সন্ত্রাসী হামলার হুমকি দিয়েছে৷

ফ্রান্স জুড়ে সমাবেশ

শুধুমাত্র প্যারিসেই নয়, ফ্রান্সের অন্যান্য শহরে সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে৷ ছবিটি মার্সেই শহরে অনুষ্ঠিত সমাবেশের৷

আন্তর্জাতিক সংহতি

প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণে বন, বার্লিন, মাদ্রিদ, লন্ডন, ব্রাসেলসসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় শহরে সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে৷ বার্লিনে ১৮ হাজারের মতো মানুষ সমাবেশে অংশ নেন৷ সমাবেশ অনেকের হাতে ছিল ‘জ্য সুই শার্লি’ বা ‘আমি শার্লি’ স্লোগান৷

শার্লি এব্দো চিরকালই বিতর্ক ঘেঁষা৷ প্রতিষ্ঠা যাবৎ পত্রিকাটি বারংবার বাকস্বাধীনতার সীমা পরখ করে নিয়েছে৷ ব্যঙ্গ এবং ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যের কোনো সীমানা থাকতে পারে না, এই বিশ্বাস নিয়ে শার্লি এব্দো বিভিন্ন ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর যাবতীয় ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, সামাজিক অথবা ধর্মীয় স্পর্শকাতরতার পরোয়া না করে কার্টুন প্রকাশ করেছে৷ পশ্চিমি বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলিতে স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গাত্মক রচনা যে শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, শুধু তাই নয়, সেই স্যাটায়ারের ভিত্তিই হলো এই নীতি৷ স্যাটায়ার বা কার্টুন যেভাবে স্বল্পপরিসরে বিধ্বংসী প্রভাব নিয়ে যে কোনো মতামতকে পরিবেশন করতে পারে অথবা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে, সেটা কোনো সম্পাদকীয়তে করা সম্ভব নয়৷

মা ও সন্তান

রেহান কুর্দির কোলে তাঁর ছোট ছেলে আয়লান৷ কোবানির একটি বাড়িতে এখনো আছে এই ছবি, তবে ছবির দু’জন মানুষ আর নেই৷ সিরিয়া থেকে তুরস্ক হয়ে গ্রিসে যাওয়ার পথেই ফুরিয়েছে তাদের জীবন চলার পথ৷ এ খবর সারা বিশ্বকে জানিয়েছিল অন্য একটি ছবি৷

এ ছবি এখনো কাঁদায়

একটি ছবি হঠাৎ বদলে দিলো ইউরোপে অভিবাসী হতে আগ্রহীদের ভাগ্য৷ আয়লান কুর্দির এই ছবি৷ তুরস্কের উপকুলে এভাবেই পড়ে ছিল ৩ বছরের শিশুটির নিথর দেহ৷ মা-বাবা আর ভাইয়ের সঙ্গে আয়লানও কোবানির বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল নিরাপদ জীবনের খোঁজে৷ এভাবে চিরবিদায় নিতে হয় তাকে!

আয়লান জাগিয়ে গেল

আয়লানের ওই ছবি নাড়িয়ে দেয় বিশ্ববিবেক৷ ইউরোপে আসার পথে যেখানে হাজারো মানুষ শত বাধার মুখে এক সময় হার মানতো, প্রাণ দিতো, সেখানে ধীরে ধীরে অনেকটাই খুলে গেল ইউরোপের দ্বার৷ অভিবাসন প্রত্যাশীরা অবাধে আসতে শুরু করল মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা থেকে৷

যেভাবে বিদায় জানালো জন্মভূমি

দুই সন্তান আর স্ত্রী-কে হারিয়ে নিরাপদ জীবনের প্রতি আগ্রহহারিয়ে ফেলেন আয়লানের বাবা আব্দুল্লাহ কুর্দি৷ তাই গ্রিস হয়ে ইউরোপের উন্নত কোনো দেশে নতুন করে জীবন শুরু করার ইচ্ছে জলাঞ্জলি দিয়ে ফিরে যান সিরিয়ায়৷ তাঁর কোবানির বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় স্ত্রী ও দুই সন্তানের মৃতদেহ৷ জানাযা শেষে ওই শহরেই সমাধিস্থ করা হয় তাদের৷

কান্না আর আহাজারি

আব্দুল্লাহ কুর্দি তাঁর পরিবারের সদস্যদের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরলে কান্নার রোল উঠেছিল কোবানিতে৷ আয়লানদের জন্য কোবানি এখনো কাঁদে৷

আয়লান এখন প্রতিবাদের প্রতীক...

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে আয়লান এখন প্রতিবাদের প্রতীক৷ ইউরোপে যেখানেই অভিবাসন প্রত্যাশীদের প্রতিবাদ, সেখানেই থাকে আয়লানের ছবি৷ অভিবাসন প্রত্যাশীদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভের এই ছবিটি প্যারিসের৷

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তরেও আয়লান

ছবির এই নারী আয়লানের আত্মীয়া, নাম ফাতিমা কুর্দি৷ সোমবার ব্রাসেলসে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের বাইরে এক প্রতিবাদ সমাবেশে ছিলেন তিনি৷ ইউরোপের দেশগুলোতে অভিবাসন আইনের সমন্বয়ের দাবিতে আয়োজিত সেই সমাবেশেও ছিল আয়লানের ছবি৷ তবে সেই ছবি নয়, সেই ছবির আদলে হাতে আঁকা একটি ছবি দেখা যায় দেয়ালে৷ সেই ছবির পাশেই দাঁড়িয়ে ফাতিমা কুর্দি৷

আরো প্রতিবেদন...